Mahfuzur Rahman Manik
অপরাধের বাস্তবতা এবং সংখ্যা বিতর্ক
আগস্ট 16, 2025

চলতি বছর গুরুতর অপরাধের সংখ্যা বাড়েনি বলে সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে দেওয়া বিবৃতিটি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিবৃতির শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘চলতি বছর দেশে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরে জনমনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।’ অথচ প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে অপরাধের সংখ্যার যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে অপরাধের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই বেড়েছে। বিশেষ করে মিটফোর্ডে যেভাবে ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে, এমন একটি অঘটনই ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট।

ওই ফেসবুক পেজে শেয়ার করা পোস্টে অপরাধের দুটি পরিসংখ্যান এসেছে। প্রথমটিতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি সালের জুন পর্যন্ত অপরাধের হিসাব আর দ্বিতীয়টিতে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫-এর জুন পর্যন্ত অপরাধের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমটায় এ বছরের খুনের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসেই এর সংখ্যা বাড়ছে। জানুয়ারিতে যেখানে খুন হয়েছে ২৯৪ জন, জুনে এসে তা বেড়ে হয়েছে ৩৪৪। বছরের হিসাবে যদি ধরি, ২০২৩ সালে ৩১৯টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ৪৯০। ২০২৫-এর প্রথম ছয় মাসে ডাকাতি হয়েছে ৩৬৭টি। একই ধারা বজায় থাকলে বছর শেষে তা ২০২৪ সালকেও যে ছাড়িয়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায়ও অনুরূপ প্রবণতা স্পষ্ট। ছয় মাসের হিসাবে যা দেখা যাচ্ছে, বছর শেষে হিসাব করলে হয়তো দেখা যাবে তা ২০২৩ ও ২০২৪ সালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বলে রাখা দরকার, এমন অনেক অপরাধ ঘটে থাকতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা মিডিয়া পর্যন্ত আসে না।

অস্বীকার করা যাবে না, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই ভেঙে পড়ে। বিগত আমলে রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী যেভাবে অনেকটা দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়, তাতে তাদের নৈতিক মনোবল ভেঙে পড়ে। জনরোষেরও শিকার হয় এই বাহিনী। সে কারণে গণঅভ্যুত্থানের পরও তাদের কাজে যোগ দিতে অনেক সময় লেগে যায়। এমনকি কোনো কোনো পুলিশ অফিসারের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ার কারণেও অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার ক্ষেত্রে অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় অন্তর্বর্তী সরকার।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. বাহারুল আলম সম্প্রতি (১২ জুলাই) যদিও বলেছেন, দেশব্যাপী চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য বন্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে; তিনি এও বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর এখনও পুলিশ বাহিনীর মনোবল দুর্বল। যার ফলে শতভাগ কাজ করতে পারছে না। এ কারণে মব সহিংসতার ঘটনায় তাদের খুব একটা কার্যকর দেখা যায়নি। বিগত সময়ে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যে নানা অনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেই প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।

এসব বাস্তবতা তুলে ধরেও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বক্তব্য দিতে পারত। তা না করে তারা সংবাদমাধ্যমে উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে চলতি বছরে অপরাধের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার বিষয়কে অতিরঞ্জন বলল। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বেশ তৎপর এবং দ্রুততম সময়ে যে কোনো বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে সচেষ্ট। প্রেস উইং যেভাবে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে, তা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। কিন্তু শব্দচয়নে সতর্ক থাকার পাশাপাশি বিষয় উপস্থাপনে নৈর্ব্যক্তিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সন্তোষজনক উন্নতি না হওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করা উচিত। বাস্তবতা অস্বীকার বরং পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বিবৃতিতে প্রেস উইং নাগরিকদের সতর্ক থাকার যে আহ্বান জানিয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত রোববারের ওয়ারীর হাটখোলার ঘটনায় তা বোঝা যায়। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে জনপ্রতিরোধে রক্ষা পায় এক কিশোর। তাকে হামলায় জড়িত দু’জনকে ধরে থানায় দেয় জনতা। জনতার দায়িত্বশীলতায় এভাবেই মব সন্ত্রাসের পথ বন্ধ হতে পারে।

প্রেস উইং নাগরিকদের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরেও বিশ্বাস রাখতে বলেছে। বিশ্বাস আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরেই করতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের তৎপরতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে, তা এড়ানোর সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি দু-একটা মব সন্ত্রাস বন্ধ করে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারত, তা নিঃসন্দেহে নাগরিক আস্থা ফিরে আসার কারণ হতো।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই শেষ ভরসা। কিন্তু এ বাহিনী কতটা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী হিসেবে নাগরিককে যথাযথ সেবা দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হওয়ার মতো পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ার জন্য পুলিশের সংস্কারে হাত দিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে পুলিশ সংস্কার কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করে এ বাহিনীকে ঢেলে সাজানো দরকার।

মনে রাখতে হবে, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে যেমন জনমনে স্বস্তি আসে, তেমনি তা অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাভাবিকভাবেই একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। সে জন্যও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা জরুরি। ইতোমধ্যে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকার যে অভিযান শুরু করেছে, তা কার্যকর করা দরকার। এ ক্ষেত্রে কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। বাস্তবতা মেনে নিয়ে সেভাবে ব্যবস্থা নিলে আমাদের বাহিনীগুলোর মাধ্যমেই দেশ নিরাপদ করা সম্ভব।

সমকালে প্রকাশ:  প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৫

ট্যাগঃ ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।