
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল অনুযায়ী ২২ জানুয়ারি তথা বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারকার্য শুরু হচ্ছে। যদিও প্রার্থীরা অনেক আগে থেকেই নীরবে প্রচার চালিয়ে আসছেন। বৃহস্পতিবার থেকে পূর্ণোদ্যমে তা আমরা দেখব। এলাকার প্রার্থীদের বাইরেও জাতীয় নেতৃবৃন্দ মানুষের কাছে যাবেন। নির্বাচনী প্রচারণায় মানুষের কাছে যাওয়া মানে প্রথমত তাদের দাবি-দাওয়া পূরণের প্রতিশ্রুতি। এর বাইরেও অনেক প্রার্থী বাড়তি প্রতিশ্রুতি দেন। দলগুলো বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে নিজ নিজ অঙ্গীকারের কথা মানুষের কাছে পৌছে দেয়। তবে অভিজ্ঞতা বলে, এই অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই অতিরঞ্জন করা হয়। রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত। কারণ জনতুষ্টিমূলক অনেক প্রতিশ্রুতি মানুষের বাহবা কুড়ালেও আখেরে তা কারও জন্যই ভালো হয় না। অঙ্গীকার করতে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতাও আমরা দেখি। রাজনীতিবিদদের এ ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা দরকার।
অতীতে মানুষ যে ধরনের প্রতিশ্রুতি শুনে আসছে, তাতে এমনিতেই রাজনীতিকদের ওপর এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। কারণ সেসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত বাগাড়ম্বরে পরিণত হয়েছে। সেই আস্থা ফেরানো জরুরি। সে জন্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে প্রার্থীকে এলাকা সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। স্থানীয় প্রয়োজনও তাদের বোঝা উচিত। নির্বাচনের আগে রাজনীতিকরা জনসেবার কথা বললেও অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জয়লাভের পর প্রার্থীরর অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে গেছে। কিন্তু ভোটারদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। আমরা দেখেছি, এর আগে রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতিতে বেকারত্ব পুরোপুরি দূর করার অঙ্গীকার এসেছে। বাস্তবে বেকারত্ব আরও বেড়েছে এবং প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে নানা প্রকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মানুষ তার সুফল পায়নি। অভিভাবকের শিক্ষা ব্যয় অনেক বাড়লেও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে মানুষের অসহায়ত্ব স্পষ্ট। দ্রব্যমূল্যের নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি পেলেও মানুষ তার তেমন সুফল পায়নি। বাজারের অস্থিতিশীলতায় মানুষ এখনও নাজেহাল।
কৃষিনির্ভর দেশ হিসেবে কৃষিতে নানামুখী প্রতিশ্রুতি আমরা শুনে আসছি। বাস্তবে কৃষকই যেন সবচেয়ে অবহেলিত। যার লাভের গুড় খাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। দুর্নীতি নির্মূলের ঘোষণা রাজনীতিকরা বারবারই দিয়ে আসছেন। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্লোগানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এক মেয়াদেই দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের গল্প মানুষ কম শোনেনি। এসব গল্পের বিপরীতে বাস্তব প্রতিশ্রুতি চায় মানুষ। তারাও জানে, রাতারাতি কোনো কিছুর পরিবর্তন সম্ভব নয়। বললেই উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যাওয়া সহজ নয়। আমাদের বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
এটাও সত্য, মানুষ প্রতিশ্রুতি শুনতে পছন্দ করে। প্রার্থী নির্বাচিত হলে এলাকার কী কী উন্নয়ন করবেন, তা তারা জনসভায় রাজনীতিকের মুখ থেকে শুনতে চায়। সে জন্য পোস্টার, স্লোগান, মাইকিংয়েও দেখা যায় প্রতিশ্রুতির বন্যা। এলাকা নিয়ে প্রার্থীর চিন্তা ও পরিকল্পনা নিশ্চয়ই জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। কিন্তু সেটা তুলে ধরতে গিয়ে মাটিতেই থাকতে হবে। অযথা বাড়িয়ে মানুষকে সামর্থ্যের বাইরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া কেন? প্রার্থীকে অবশ্যই রাষ্ট্রের কাঠামো, বাজেট, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একজন এমপি বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা অসীম নয়। তিনি এককভাবে চাইলেও বড় শিল্পকারখানা গড়তে পারেন না; জাতীয় পর্যায়ের বেকারত্ব দূর করতে পারেন না বা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বদলে দিতে পারেন না। সে জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় তিনি বলতে পারেন– আমরা চেষ্টা করব। তাতে মানুষ অন্তত ব্যক্তির সদিচ্ছা বুঝতে পারবে। এর বিপরীতে তিনি যখন বলেন– এটা করবেনই অথচ করতে পারছেন না, তখন রাজনীতি সেবার জায়গা থেকে ধীরে ধীরে প্রতারণার সমার্থক শব্দ হয়ে উঠবে।
এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের বহুল প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটার প্রতীক্ষায় সবাই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্ম যে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখেছিল, তাদের বড় অংশ এবার ভোটার। এমনিতেও গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারায় এটাই অনেকের প্রথম নির্বাচন। সে জন্য রাজনীতিকদের তাদের ভোটারদের লক্ষ্য রেখেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত। ভোটারদের বোকা ভাবলে চলবে না। জনে জনে ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়ার কারণেও সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই জানে। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তারা প্রতিশ্রুতি শুনেই আবেগে ভোট দেবে– এমনটা ভাবার কারণ নেই। ভোট দেওয়ার আগে নিঃসন্দেহে বাস্তবতা চিন্তা করবে।
এবারের নির্বাচনে মোটাদাগে দুটি জোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। বিএনপির সঙ্গে যারা গত দেড় দশকে যুগপৎ আন্দোলনে ছিল তাদের জন্য আসন ছেড়েছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনীয় সমঝোতায় তরুণদের দল এনসিপি রয়েছে। এ দুটি জোটের দলগুলোর নিশ্চয়ই সমর্থক-ভোটার আছে। কিন্তু নির্বাচনে জয়-পরাজয় নিশ্চিত হবে এর বাইরের ভোটারদের মাধ্যমে, যাদের সুইং ভোটার বলা হয়। এই সুইং ভোটারদের টানতে বাস্তবভিত্তিক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশিত হয়নি। ইতোমধ্যে বিএনপির ৩১ দফা, ফ্যামিলি কার্ডসহ নানা প্রতিশ্রুতি সামনে এসেছে। মঙ্গলবার পলিসি সামিটের মাধ্যমে জামায়াতের অঙ্গীকারও এসেছে সংবাদমাধ্যমে। এগুলো হয়তো দলগুলোর ইশতেহারেও দেখা যাবে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ এবং প্রাসঙ্গিক বাস্তবতাও দলগুলোকে দেখাতে হবে। প্রতিশ্রুতির ৬০-৭০ শতাংশ বাস্তবায়ন হলেও হয়তো মানুষ মেনে নেবে। কিন্তু তা ২০-৩০ শতাংশ হলে সরকারের সঙ্গে জনতার দূরত্ব তৈরি হবে।
এ কারণেই অতীতে দেখা গেছে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও বছর না যেতেই সরকার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। কোনো সরকারই টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করতে পারেনি। ক্ষমতায় থাকার জন্য একাধিক সরকারকে নানা ফন্দিফিকির করতেও দেখা গেছে, যা বিগত সরকারের সময় চরম রূপ পায়। একেবারে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখা। এর ভয়ংকর পরিণতিও আমরা দেখেছি। যার পুনরাবৃত্তি আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়।
প্রতিশ্রুতির বন্যা বনাম বাস্তবায়নের খরা, সমকাল, ২১ জানুয়ারি ২০২৬