
কয়েকদিন ধরে নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করছে সংবাদমাধ্যম। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ঢুকলে নোটিশ বোর্ডের শুরুতেই শোভা পাচ্ছে সেগুলো। সেখানে আসন অনুযায়ী প্রত্যেক প্রার্থীর হলফনামা, নির্বাচনী ব্যয়, ব্যক্তিগত সম্পদের বিবরণী, আয়কর রিটার্ন– এই তিনটি ফাইল উন্মুক্ত। নির্বাচনের আগেই বিষয়গুলো ভোটারদের কাছে উন্মুক্ত রাখার অন্যতম কারণ রাজনীতিকের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। যারা রাজনীতি করেন, এটা ঘোষণা দিয়েই করেন– তারা দেশ ও দশের সেবা করতে চান। যেন নিজের উন্নতির চেয়ে দেশের উন্নতিই মুখ্য। সে জন্য রাজনীতিককে ন্যায়নিষ্ঠ হতে হয়। জনগণের আমানত সুরক্ষা কিংবা প্রাপকের কাছে যথাযথভাবে তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যও স্বচ্ছতা জরুরি।
যাদের হলফনামা আমরা দেখছি, তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিতরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও দেখার বিষয় আছে। এখানে রাজনীতিকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শুধু জনগণের কাছে নয়; নিজের কাছেও, যদিও বাস্তবতা হতাশাজনক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষমতা পাওয়ার পর ব্যক্তির আয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। কারও আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। ক্ষমতাকে তারা দায়িত্ব হিসেবে না নিয়ে নিজের পকেট ভরার উপলক্ষ হিসেবে নেন; মানুষের বরাদ্দ আত্মসাৎ করেন। আমাদের রাজনীতিকরা যে গরিব, তা বলা যাবে না। অধিকাংশেরই অভাবের নয়, স্বভাবের দোষ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, যাদের অর্থ-সম্পদ কম; তাদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন। এবারের নির্বাচনও তার বাইরে নয়।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন বলছে, ‘বিএনপির ৮৩ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি, শতকোটি ৭ জন।’ অর্থাৎ বিএনপির অধিকাংশ প্রার্থীই কোটিপতি। জামায়াতেও কোটিপতি প্রার্থী কম নয়। এনসিপি কিংবা অন্যান্য দলেও রয়েছেন সম্পদশালীরা। কৃষিকাজ বা চাকরি করে নিশ্চয় এত অর্থ আয় করা সম্ভব নয়। সংগত কারণে ব্যবসায়ীরাই হয়ে উঠছেন রাজনীতির ধারক-বাহক। ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করার ক্ষেত্রে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু জাতীয় সংসদে একটি গোষ্ঠীর প্রাধান্য মানে সেখানে তাদের স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে। জনগণ স্বাভাবিকভাবেই সেখানে অসহায়। ব্যাপক অর্থ ছাড়া যেখানে নির্বাচন করা অকল্পনীয়। সে ধরনের পরিবেশ রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়।
নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থীরা যে তথ্য দিয়েছেন; অনেকে মনে করছেন, সেখানেও গরমিল রয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে সম্পদ কমিয়ে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। শুরুতেই যদি অঙ্গীকার বা হলফনামার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তবে মানুষ তাঁকে ভোট দেবে কী দেখে! সে জন্য প্রার্থীর স্বচ্ছতা জরুরি।
ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়ম আমাদের প্রধান সমস্যা। এগুলো বন্ধে রাজনীতিকরাই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু সরিষার ভেতরেই যখন ভূত থাকে, তখন আর ভূত তাড়ানোর উপায় কী? রাজনীতিকদের আর্থিক স্বচ্ছতা তাই সর্বাগ্রে জরুরি। আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতের একটা মাধ্যম হতে পারে নির্বাচনী হলফনামা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনূস উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখনও তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ হয়নি। তবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে যারা এমপি-মন্ত্রী হবেন, তারা যদি প্রতিবছর সম্পদের হিসাব দেন, তাহলে একটি উদাহরণ সৃষ্টি হবে।
রাজনীতিকদের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সততা গুরুত্বপূর্ণ। সততা না থাকলে হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিতেও কেউ কুণ্ঠা বোধ করবে না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে এই সততা সবচেয়ে জরুরি। রাজনীতিকদের কথা ও কাজে মিল থাকতেই হবে। নির্বাচনের আগে জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না; সেগুলো বাস্তবায়নে নির্বাচনের পর কাজও করতে হবে। ভোট নেওয়ার জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও রাজনীতিকের স্বচ্ছতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচনের আগে ভোটের জন্য সবাইকেই এলাকায় দেখা যায়। কিন্তু সংসদ সদস্য হওয়ার পর আর পাওয়া যায় না। মানুষ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয় এটা বিবেচনা করবে– অদূর ভবিষ্যতে কাকে দিয়ে এলাকার উন্নয়ন হবে।
মনে রাখতে হবে, মানুষ এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে তারা ভোট দিতে পারেনি। সে বিষয় আমলে নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে হবে। পাশাপাশি জনগণ যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে, তাদেরও ক্ষমতার সেই আমানত রক্ষা করতে হবে। সে জন্য দেশ পরিচালনায় রাজনীতিকদের স্বচ্ছতা, সততা ও দক্ষতার বিকল্প নেই। তারা নেতৃত্বের আসনে থাকবেন বলে তাদের দুর্নীতিপ্রবণ ব্যবস্থাকেও বদলাতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেই যেভাবে সংস্কার জপেছিল, দিন শেষে তার বাস্তবায়ন না হওয়ায় মানুষ হতাশ। সেই হতাশা দূর করতে পারেন রাজনীতিকরাই। গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটার পর নির্বাচিত সরকারে সেই শক্তিশালী ম্যান্ডেটও থাকবে, যাতে চাইলেই তারা দেশের স্বার্থে যে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেন।
রাজনীতিবিদরা সম্পত্তির দিক থেকে স্বচ্ছ থাকলে অন্যান্য ক্ষেত্রেই তার প্রতিফল ঘটে। সম্পত্তির ক্ষেত্রে নির্মোহ থাকলে দেশ ও দশের উন্নয়নে কাজ করতে সমস্যা হয় না।
কথায় আছে– সকাল দেখেই বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে। নির্বাচনী হলফনামা গোড়ার গলদ, না দিন দেখানো সকাল– সেদিকে আমরা নিশ্চয় নজর রাখব।
গোড়ার গলদ, না দিন দেখানো সকাল? Samakal, 7 January 2026