Category Archives: Uncategorized

করোনায় তারাবির নামাজ

পবিত্র রমজানে রোজা পালনের সঙ্গে মসজিদে জামাতে তারাবির নামাজ পড়ার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে সাধারণত রমজানের এক মাস তারাবির নামাজে অনেক মসজিদেই পবিত্র কোরআন খতম করা হয় বলেই হয়তো এ নামাজের এত গুরুত্ব। কিন্তু এ বছর এমন সময়ে রমজান শুরু হচ্ছে, যখন করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে মানুষ ঘরবন্দি; যখন নিয়মিত ফরজ নামাজ মসজিদে হওয়ার ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা রয়েছে; যখন পরিস্থিতির নাজুকতায় বিজ্ঞ আলেমগণ ঘরেই নামাজের ব্যাপারে একমত হয়েছেন; যখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য প্রশাসনের তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় মসজিদে তারাবির নামাজের বিষয়টা আলোচনায় এসেছে। রমজান মাসে ইবাদতের গুরুত্ব বিবেচনায় হয়তো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের হৃদয়ের আকুতি মসজিদে তারাবি পড়া। কিন্তু পরিস্থিতি যেখানে ভয়াবহ এবং মহামারিতে জীবন-মরণের প্রশ্ন, সেখানে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে সুরক্ষাই অগ্রাধিকার। তারাবির প্রশ্নে এটাই বলা যুক্তিসঙ্গত যথেষ্ট যে, যেহেতু করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি, উল্টো করোনায় আক্রান্ত ও শনাক্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন ব্যাপক হারে বাড়ছে; বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, এ অবস্থায় ঘরে থাকা জরুরি।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জুমার নামাজসহ নিয়মিত নামাজের ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের যে নির্দেশনা ছিল, তাই হয়তো বলবৎ থাকবে। Continue reading

দুটি স্ট্যাটাস মিস, তৃতীয়টির গল্প

স্ট্যাটাস দিয়েই গল্পটা শুরু করা যাক, ফেসবুকে আমার ওয়ালে যেটি পোস্ট করা হয়ে গেছে- ‘আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে ছোট ভাইয়ের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার জন্য অভিনন্দন Mahbubur Rahman Masum।’ চান্স বলতে ভর্তির সুযোগ। কিন্তু যদি বলি ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করা কিংবা ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হিসেবে নাম আসা- সে স্বপ্ন অবশ্য মাসুমের অনেক আগেই পূরণ হয়েছে। অনেক আগে মানে গত বছর। সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই। ঘ ইউনিটে। বিজনেস ব্যাকগ্রাউন্ড, এখানে সিরিয়াল দূরে বলে ভর্তি হতে পারনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওর নিজস্ব বিজনেস এর সি ইউনিটেও উত্তীর্ণ হয়। এখানেও সিরিয়াল আসেনি। উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারই ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ। তাই এবার অন্যগুলোতে মনোযোগ। এ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বিজনেস, আইবিএ ও সামাজিক বিজ্ঞান তিন ইউনিটে পরীক্ষা দিয়ে সবগুলোতেই পাশ করে। কিন্তু সেই সিরিয়ালের ভূত যে তাকে ছাড়ে না। তার কোটা নেই, দুইটায় এ প্লাস নেই। সুতরাং ভর্তির সুযোগ আর হয় না। এক্ষেত্রে এসএসসি এইচএসসির ফল যে তাকে ভুগিয়েছে, বলাই বাহুল্য। এ দুই পরীক্ষায় তার ফল চার (৪.০০) এর নিচে নয় আবার সাড়ে চার (৪.৫০) এর উপরে নয়। মূল ভর্তি পরীক্ষায় মোটামুটি মার্কস পেয়েও অনেকে দুইটায়ই জিপিএ-৫ বা খুব ভালো ফল দিয়ে এগিয়ে যায়। মাসুমের ক্ষেত্রে সেটি ঘটেনি। এভাবে প্রথম বছর গেলো, দ্বিতীয় বছরও যায় যায়। আমাদের চাঁদপুরের প্রতিবেশি হিসেবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি বিশেষ নজর থাকলেও এ বছর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের দীর্ঘসূত্রীতায় আশা করা না করা সমান হয়ে দাঁড়ায়।
সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। অথচ কুমিল্লার ভিসি নিয়োগেরই খবর নেই। নভেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ঝুলে থাকে- অনিবার্য কারণে ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত। তারিখ পরে জানানো হবে। ইতিমধ্যে মাসুম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তারপরও দৃষ্টি কুমিল্লায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যে একটু আশা তাও ঝুলে আছে। নভেম্বর গেলো, ডিসেম্বর গেলো, জানুয়ারি যয়। কিন্তু কুমিল্লার ‘কু’ যে সরে না। টেনশন টেনশন। ভিসি নাই। পরীক্ষা আদৌ হবে কি-না ঠিক নেই। ও জাতীয়তে যায়, যায় না। এভাবেই আসে ফেব্রুয়ারি। সেখানে পরিচিত শ্রদ্ধেয় এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলি, খোজ নেই। তিনি এ নিয়ে পত্রিকায় লিখেনও। অভিভাবক ছাড়া একটা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামনে চলে। যাহোক, একটা সময় বলেন ভিসি শীঘ্রই নিয়োগ হবে। অবশেষ কুমিল্লার সন্তান আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী কুমিল্লা বশ্বিবিদ্যালয়ে ভিসি হন। ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে।
ছোট ভাই সেখানে চান্স পায় বি ইউনিটে মানে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে। এর মাধ্যমে আসলে কেবল তার স্বপ্নই নয়, আমাদের পরিবারের সকলের স্বপ্নও পূরণ হয়। Continue reading

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অবকাঠামোগত উন্নতি দেখে ভালো লাগছে

সাক্ষাৎকার// ড. হেলেন জারভিস

ড. হেলেন জারভিস মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে ঢাকায় তিন দিনের ‘পঞ্চম বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস’ সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশে আসেন। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি কম্বোডিয়ার গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে কাজ করছেন। কম্বোডিয়ার গণহত্যার বিচারে গঠিত এক্সট্রা অর্ডিনারি চেম্বারস ইন দ্য কোর্ট অব কম্বোডিয়ার (ইসিসিসি) তথ্য বিভাগের সাবেক এ প্রধান কর্মকর্তা পিএইচডি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব সিডনি থেকে। কম্বোডিয়া সরকারের উপদেষ্টা ড. হেলেন অস্ট্রেলিয়া ও কম্বোডিয়া উভয় দেশের নাগরিক। বাস করেন কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে- সাক্ষাৎকার গ্রহণ :মাহফুজুর রহমান মানিক

সমকাল :আগেও আপনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছেন, এবার এসে নতুন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কেমন দেখছেন?

ড. হেলেন জারভিস :মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবন আগে দেখিনি। শুনেছি সম্প্রতি নতুন ভবন উদ্বোধন হয়েছে। অবশ্যই এটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অবকাঠামোগত উন্নতি, দেখে ভালো লাগছে। এটি সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। এখানকার কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা কেবল ভবনকেই চিত্তাকর্ষক করছেন না, একই সঙ্গে কমিউনিটির সঙ্গেও কাজ বাড়াচ্ছেন। এটা নিঃসন্দেহে ভালো। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই পরিবেশ গবেষণা ও ডকুমেন্টেশনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই সহায়ক হবে।

সমকাল :বাংলাদেশে ‘জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস’ শীর্ষক কনফারেন্সও আপনার কাছে নতুন নয় …

ড. হেলেন : হ্যাঁ, এর আগেও আমি এই কনফারেন্সে এসেছি। লেকচার দিয়েছি। শুধু তা-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উইন্টার স্কুলেও এসেছি।

সমকাল :আপনি অনেক বছর ধরে কম্বোডিয়ায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা নিয়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যা আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. হেলেন : বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। বাংলাদেশে যে মাত্রায় মানবতাবিরোধী কাজ হয়েছে তার প্রভাব থাকবে দীর্ঘদিন। নারীরা নির্যাতিত হয়েছেন। অনেক হিডেন জেনোসাইডও হয়েছে। মানুষ আপনজন হারিয়েছে। এসব দুঃখগাথা বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জেনেছি। Continue reading

গণমানুষের শিল্পী

Abbas-U

শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ (অক্টোবর ২৭, ১৯০১ – ডিসেম্বর ৩০, ১৯৫৯)

গান মানুষকে বিনোদিত করে। অনেকের একাকী সময়ে সঙ্গী গান। কাজের মধ্যে গান না শুনলে কারও আবার কাজটা নাকি ঠিকমতো হয় না। এটি মানুষকে আলোড়িত করে। হাজারো শিল্পী, হাজারো গানের মাঝে প্রত্যেকে তার প্রিয় শিল্পী খুঁজে নেন। তার মাঝেও কিছু শিল্পী থাকেন যারা সবার জন্য হয়ে ওঠেন। শিল্পী আব্বাসউদ্দীন তাদেরই একজন। প্রজন্মের পর প্রজন্মান্তরে তার বসত এখনও সাধারণ মানুষের অন্তরে।
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি ঈদের আনন্দ আরেকটু বাড়ায় কি-না জানা নেই। তবে রোজার ঈদ এলে গানটি যে অনেকেরই নিত্যসঙ্গী সে কথা বলাই বাহুল্য। বাঙালি মুসলমানের কাছে আকাঙ্ক্ষিত ঈদ যে আনন্দ নিয়ে আসে তা নিয়ে হাজারো গান থাকলেও এই একটি গান ছাড়া যেন ঈদ পূর্ণ হয় না। গানটি সে শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধেই Continue reading

বরেণ্য সাংবাদিক ওবায়েদ উল হক

OBaএকজীবনে মানুষের পরিচয় কয়টা হতে পারে? এর নির্দিষ্ট কোনো উত্তর হয়তো নেই। তবে আমরা একটা পরিচয় দিয়েই অনেককে চিনি। ব্যক্তির এক পরিচয়ই তাকে বহন করে। এর বাইরেও বহুবিধ পরিচয়ের অধিকারী মানুষ থাকেন। যারা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, প্রতিভার বিভিন্ন শাখায় তাদের অবদান স্বমহিমায় উজ্জ্বল। প্রতিভা দিয়েই তারা বেঁচে থাকেন ইতিহাসের পাতায়। তাদেরই একজন ওবায়দ উল হক। তিনি একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলিচ্চত্রকার। একই সঙ্গে লেখক, কবি, ঔপন্যাসিক, প্রযোজক, সুরকার ও গীতিকারও। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ই তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। যদিও তার সাংবাদিক হওয়ার ঘটনা কিছুটা চমকপ্রদ। Continue reading

নদী রক্ষায় সাইকেল

Cycle-singleআদর্শ বাহন হিসেবে সাইকেলের জুড়ি নেই। দুই চাকার বাহনটি যেমন পরিবেশসম্মত, তেমনি সুস্থতার জন্যও এটি চালানোর পরামর্শ দেন অনেকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় বাহন হিসেবে তো বটেই, এর বাইরে নানা কাজে সাইকেল ব্যবহার করেন মানুষ। সাইকেলে র‌্যালি কিংবা শোভাযাত্রা দেখা যায় অহরহ। এতে চড়ে বিশ্বভ্রমণের রেকর্ডও অনেক আগের আর সাইকেল রেস তো আছেই। অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবটের সাইকেলে চড়ে বিজয় উদযাপনের দৃশ্যও দেখা গেছে। তবে সাইকেলের ব্যতিক্রম ব্যবহারের খবর দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। Continue reading

আহাজারির শেষ নেই…

Rescue workers try to rescue trapped garment workers in the Rana Plaza building which collapsed, in Savarঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে লেখাটি এভাবে শুরু করতে চেয়েছিলাম…
দুর্ঘটনার হাত পা নেই। এটা বলে কয়ে আসেনা। তারপরও দুর্ঘটনার জন্য সবাই প্রস্তুত থাকে। কোথাও তা ঘটার আশংকা থাকলে তার হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেমন ট্রাকের পেছনে লেখা থাকে ‘১০০ হাত দূরে থাকুন’ কিংবা লঞ্চে আমরা লাইফবোট দেখি, বিভিন্ন ভবনে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রও দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচার প্রস্তুতি। তা ঘটুক আর না ঘটুক অনেক আগ থেকেই এসব প্রস্তুতি আমরা দেখছি। আর দুর্ঘটনা নিশ্চিত ঘটবে এরকম আশংকা থাকলে তা থেকে বাঁচার জন্য কেমন প্রস্তুতি হতে পারে বলাই বাহুল্য। নিশ্চিত ঘটার আশংকা থাকা সত্ত্বেও সতর্কতা বা কোনোরূপ প্রস্তুতি গ্রহন না করার কথা আমরা চিন্তাও করতে পারিনা। আর এরকম অপ্রস্তুত অবস্থায় দুর্ঘটনা ঘটলে তার ভয়াবহতাও আমাদের কল্পনার বাইরে। ঠিক এ ঘটনাই ঘটলো সাভার।
কিন্তু দিন যত গড়ালো হিসেবও দ্রুত পাল্টালো। সেই সঙ্গে শুরুটা পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। Continue reading

ভাটির দেশের নাইয়া

শিল্পী আব্দুল আলীম (২৭ জুলাই, ১৯৩১- ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪)

অগ্রজ অনেকেই অভিযোগ করেন বর্তমান শিল্পীরা নাকি গান গায় গলা দিয়ে। তারা বলেন গান গাইতে হয় হৃদয় দিয়ে। হৃদয়ের আবেগ উজাড় করে দিয়ে যে গান গাওয়া হয় সেটাই তো সঙ্গীত হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে সাধনা। বর্তমান প্রজন্মের একজন হিসেবে আব্দুল আলীমের গান শুনলে মনে হয় তারা ঠিকই বলেছেন। কী অসাধারণ গেয়েছেন তিনি! মানুষের মনের সঙ্গে ‘হলুদিয়া পাখি’র কী চমৎকার তুলনা! আব্দুল আলীম যেন সারাটা জীবন গানের মধ্য দিয়ে মানুষ, মন ও প্রকৃতিকেই খুঁজেছেন। বিশেষ করে নদী। আমরা দেখেছি, নদীকে উপজীব্য করে তার গানে বারবারই এসেছে মাঝির কথা. নৌকার কথা, ঘাটের কথা। তিনি গেয়েছেন রূপালি নদী রে… গেয়েছেন কলকল ছলছল নদী করে টলমল… কিংবা মেঘনার কূলে ঘর বান্ধিলাম…।
এক প্রমত্তা পদ্মা দেখেছেন আব্দুল আলীম, গেয়েছেন গলা ছেড়ে_ ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী…’। এখন পদ্মার আর সেই রূপ নেই, প্রবাহ নেই; নেই আব্দুল আলীমও। সেও ৩৮ বছর; ১৯৭৪ সালের ঠিক আজকের দিনটায় তিনি পাড়ি দেন পরপারে। কিন্তু তার গান এখনও তাঁকে জীবন্ত রেখেছে। এখনও মানুষ তাকে স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে। সঙ্গীতের জগতে এক জীবন্ত কিংবদন্তি তিনি। তার গান মানুষের মুখে মুখে। তিনি পল্লীগীতি, লোকসংস্কৃতি, ভাটিয়ালি সব গেয়েছেন। মারফতি আর মুর্শিদির সুরে তিনি গেয়েছেন। গান দিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছেন সাধারণ মানুষের অন্তর।
আব্দুল আলীমের গানের বিষয় যেমন ছিল নদী, তেমনি তার গানগুলোও ছিল নদীর মতো বহমান। নদীর সঙ্গে সঙ্গে তিনি এনেছেন পরিবেশ-প্রকৃতিকে। তার গানে ফুটে উঠেছে আল্লাহ-নবীর কথা, মুর্শিদের কথা। গেয়েছেন নবী মোর পরশমণি… কিংবা মুর্শিদ পথের দিশা দাও। আব্দুল আলীম মানুষের বন্ধুত্ব, প্রেম-ভালোবাসা, সংসার নিয়েও গেয়েছেন অজস্র গান। তার সব সখিরে পার করিতে নিবো আনা আনা.. জনমুখে প্রচলিত এক বিখ্যাত গান। একই সঙ্গে গেয়েছেন বহু দিনের পিরিত গো বন্ধু… বা বন্ধুর বাড়ি মধুপুর। এসব কিছুর মাঝেও যেন আব্দুল আলীম অন্য কিছু খুঁজেছেন। তার শ্রোতাদের নিয়ে গেছেন অন্য কোনো খানে; নদীর ওপারের এক ভিন্ন জগতে। পরের জায়গা পরের জমি… আর সেই পারে তোর বসত বাড়ি… কিংবা চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখী… তা-ই বলছে।
১৯৩১ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদে জন্ম নেওয়া আব্দুল আলীম ছোটবেলা সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট ছিলেন। আজকের দিনের মতো গান শুনবার কিংবা শিখবার এরকম সাজ-সরঞ্জাম তখনকার সময় না থাকলেও তিনি গ্রামোফোন রেকর্ড শুনতেন। তিনি ঢাকায় আসেন ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর। ঢাকায় এসে সঙ্গীতের তালিম নেন মমতাজ আলী খান ও মোহাম্মদ হোসেন খসরুর মতো সঙ্গীতবোদ্ধাদের কাছে। এ সময়ই তিনি কবি জসীম উদ্দীন, বেদার উদ্দিন আহমেদ. আবদুল লতিফ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সানি্নধ্যে আসেন। কবি নজরুলের সঙ্গে আগ থেকেই তার পরিচয়। তারও আগে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক তো তার গানে মোহিত হয়ে তাকে বিশেষ পুরস্কার দেন। তার রেকর্ড করা গানের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এ ছাড়া তার গান রয়েছে বেতার স্টুডিওতে। তিনি গান করেছেন পাকিস্তানের প্রথম ছবি মুখ ও মুখোশসহ টেলিভিশন ও অসংখ্য ছায়াছবিতে। আব্দুল আলীমের ঝুলিতে পুরস্কারেরও কমতি নেই, জীবদ্দশায় তো বটেই এরপরও পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার ইত্যাদি।
মাটি আর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত আব্দুল আলীম বরাবরই বলেছেন ভাটির দেশের কথা। তার গান মানুষকে নিয়ে যায় গ্রামে, সুন্দর বহমান নদীর ধারে, ছলাৎ ছলাৎ চলমান কী সুন্দর সে নদী!

সমকালে প্রকাশিত ৫ সেপ্টম্বর ২০১২

সংগ্রামী মেধাবীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি

প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষা ফল প্রকাশের পরই গণমাধ্যমে কিছু অদম্য মেধাবীর সন্ধান পাওয়া যায়। যারা বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা করে সম্মানজনক ফল করে থাকে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ ৫ হিসেবে, সাধারণত যারা ‘এ প্লাস’ পেয়ে থাকে, তারাই গণমাধ্যমে আসে; তবে সব সংগ্রামী প্লাসধারীই আসে এমনটা নয়। এ প্লাসধারী কিংবা যারা এ প্লাস পায়নি, এমন সব শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক সংগ্রামই উঠে আসে তাতে। ৮ মে এসএসসির ফল প্রকাশ পেল। এর পরই এমন কিছু অদম্য মেধাবীর কথা পত্রিকায় এলো, যাদের শিরোনামে পত্রিকাগুলো বলছে— দিনমজুর অদম্য মেধাবী, দারিদ্র্যজয়ী অদম্য মেধাবী বা গৃহপরিচারিকার কাজ করে জিপিএ ৫ পেয়েছে অদম্য মেধাবী। এসব শিরোনামই বলে এদের সংগ্রামটা অর্থনৈতিক।
পাবলিক পরীক্ষার পর এ ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধে জয়ীদের যেমন দেখা যায়, ঠিক একই সঙ্গে বছরের বিভিন্ন সময়ে হাসিমাখা কিছু মুখ দেখা যায়; যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে থাকে। আমরা অবশ্য জানি না এ হাসিমাখা মুখগুলো আসলে ওই সংগ্রামী মেধাবীরা কি না। এ বিষয়ে যাওয়ার আগে শিক্ষাবৃত্তিতে আসি। বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রতি বছর শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের কথা বললে মোটা দাগে ব্যাংকগুলোর কথাই বলতে হবে। অনেক ব্যাংকই, বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রতি বছর দরিদ্র ও মেধাবীদের এ শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। এ তালিকায় শীর্ষ ব্যাংক হলো ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকসহ আরও অনেক ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন গত ২৭ মে বণিক বার্তার খবর হলো ‘সুবিধাবঞ্চিত ২০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিল লংকাবাংলা ফাউন্ডেশন।’
এ ধরনের ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যত বাড়বে, বাংলাদেশের শিক্ষার জন্য ততই মঙ্গল। প্রতি বছর ঠিক কত শিক্ষার্থী এ রকম শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে থাকে, তা বের করা কঠিন। তবে টাকার অঙ্কটা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেখিয়েছেন ৪০ কোটি অর্থাৎ তিনি ব্যাংকগুলোর ২০১০ সালে শিক্ষাবৃত্তি বাবদ ব্যয়কে ধরে বলেছেন, বছরে তারা ৪০ কোটি টাকা ব্যয় করছে। ৪০ কোটি সামান্য টাকা নয়। আবার আমরা দেখছি, গত বছর কেবল ডাচ্-বাংলা ব্যাংকই তিন হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছে। অন্যান্য ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান মিলে এ সংখ্যাটা আরও কয়েক হাজার বাড়বে। সংখ্যাটা সার্বিক সংখ্যার চেয়ে হয়তো কম, তবে নেহাত কম নয়। প্রশ্নটা অন্য জায়গায় সেটা হলো, যাদের এ বৃত্তি পাওয়া উচিত, তারা পাচ্ছে কি না?
প্রশ্নটা করা হচ্ছে, যারা সত্যিকারার্থে অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করছে কিংবা যাদের পরিবার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগান দিতে একেবারে অক্ষম বা টাকা-পয়সা ছাড়া যাদের পড়াশোনা বন্ধ হবে, এ রকম শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছে কি না এর একটা উত্তর এমন হবে যে, নিশ্চয়ই তেমন শিক্ষার্থীই বৃত্তি পাচ্ছে। এটা ঠিক যারাই বৃত্তিটা পাচ্ছে, ফলাফলের দিক থেকে তারা মেধাবী। যেহেতু বলা চলে ব্যাংক নির্বাচক কমিটি শিক্ষাবৃত্তি দেয়ার ক্ষেত্রে রেজাল্টই প্রথমে দেখে। তবে অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে সবার এক রকম অবস্থা নয়। অনেকের হয়তো ভালো অবস্থাও থাকতে পারে।
ধরা যাক সব ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান মিলে প্রতি বছর ছয়-সাত হাজার শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়। প্রয়োজন হয়তো আরও কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর। যেহেতু অনেকেরই প্রয়োজন, ফলে প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকুক, যাদের প্রয়োজনটা অন্যদের চেয়ে বেশি। বলা হয়, প্রয়োজন হলেও এরাই যে পাচ্ছে তা নয়; অন্যরাও পাচ্ছে। অন্যরা পাবে কেন? অন্যরা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় নিশ্চয়ই আছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবৃত্তির প্রচারের কথাটা শুরুতেই আসবে। দেখা গেল কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষাবৃত্তির বিজ্ঞপ্তি দিল। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, ব্যাংকগুলো একটা পত্রিকায়ই বিজ্ঞপ্তি দেয়; অনেকে আবার দুটায়ও দিয়ে থাকে। এ বিজ্ঞপ্তি ঠিক যে শিক্ষার্থীর দেখা উচিত, সে হয়তো দেখল না। সে না দেখলে বা না জানলে তো আবেদন করতে পারবে না। অথচ বৃত্তিটা তারই প্রয়োজন। যারা একেবারে গ্রামে থাকে, তাদের পত্রিকার মাধ্যমে জানানো অসম্ভবই বলা চলে। ফলে বৃত্তি প্রচারের কাজটা জরুরি। অন্তত শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো দরকার। সব প্রতিষ্ঠান বৃত্তির খবর পেলে সব শিক্ষার্থীও সহজে
বিষয়টা জানতে পারবে।
শিক্ষাবৃত্তি যেহেতু ব্যাংকগুলোই বেশির ভাগ দিয়ে থাকে, ফলে সব ব্যাংক একত্রে বৃত্তিটা দিতে পারে। সাধারণত প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর ব্যাংকগুলো এ বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাকে। সব ব্যাংক যদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচার চালিয়ে একসময়ে বৃত্তি আবেদনপত্র গ্রহণ করে এবং তা দেয়ার ক্ষেত্রে পরস্পর সমন্বয় করে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে যাদের প্রয়োজন, আশা করা যায় তারা বৃত্তিটা পাবে এবং উপকৃত হবে।
আরেকটা বিষয় হলো, ব্যাংকগুলো বৃত্তি দেয় এসএসসি-এইচএসির ফলের ভিত্তিতে— এইচএসসি এবং অনার্স লেভেলে ভর্তির পর। এটার যৌক্তিকতা আছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভালো ফল করা সত্ত্বেও অবস্থা এতটা শোচনীয় যে, পরবর্তী পর্যায়ে ভর্তির জন্য টাকা নেই। এখন কলেজে ভর্তি হতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি হতে ফরম কিনতেই হয়তো কয়েক হাজার টাকা লেগে যায়। যাদের পক্ষে এসব খরচ বহন করা সম্ভব নয়, তাদের ভর্তি অনেকটা অনিশ্চিত। গ্রামের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আসলেই টাকার অভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারে না। হয়তো এসব শিক্ষার্থী সহযোগিতা পেলে উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতায় তাদের স্থান করে নিতে সক্ষম হতো। কারণ গ্রামের যে
শিক্ষার্থীটি অন্তত জিপিএ৫ এর কাছাকাছি পেয়েছে, তার মেধা শহরের জিপিএ৫-এর তুলনায় বেশি বলা যায়। এ ক্ষেত্রে তাদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে বৃত্তিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু করতে পারে কি?। সাধারণত ব্যাংকগুলো যে বৃত্তি দেয়, তাতে শিক্ষার্থীরা নিশ্চিত থাকে না যে সেটি পাবে; যেহেতু তাকে আবেদন করতে হচ্ছে এবং তার মতো আরও অন্যদের ছাড়িয়ে সে পাবে কি না, সে নিশ্চয়তাও তার নেই। এখন যাদের কথা বলা হচ্ছে, তাদের একটা নিশ্চয়তা দরকার, আমি উচ্চশিক্ষায় সুযোগ পেলে ভর্তিসহ পড়াশোনা চালানোর নিশ্চয়তা পাব। তাদের বিষয়টা আপাতত প্রস্তাব আকারেই থাক।
উচ্চশিক্ষা বিস্তারে ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাবৃত্তি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এভাবে সবাই সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে এগিয়ে এলে আমাদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণসহ সার্বিক চেহারাটা বদলে যেত। আগামী দিনে সত্যিকার অদম্য মেধাবীদের অন্তত টাকার অভাবে উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হতে দেবে না আমাদের সমাজ; এ প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।

http://samakal.net/details.php?news=20&view=archiev&y=2012&m=06&d=10&action=main&menu_type=&option=single&news_id=266767&pub_no=1079&type=