
সবকিছু ঠিক থাকলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। সাধারণত নির্বাচনের আগে অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রতিটি দল নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। সেখানে দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতির কথা জানায়, যেগুলো নির্বাচনে জয়ী হলে বাস্তবায়ন করবে। নাগরিকরাও দলগুলোর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায়। অনেকে তা দেখেই ভোট দেয়। ইতোমধ্যে নির্বাচনী তপশিল ঘোষণা করায় রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চয় নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতে ব্যস্ত। জাতি গঠনে শিক্ষা যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ, তাই এ খাত অগ্রাধিকারে রাখা হবে যথার্থ। দলের মতাদর্শ অনুসারে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু শিক্ষা খাতের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে যারাই ক্ষমতায় আসুক, তাদের অভিন্ন কিছু বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমরা ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে গেছি। পুরোনো শিক্ষাক্রমের কারণে বর্তমান বিশ্বের অনেক কিছু থেকে আমরা পিছিয়ে। সে জন্য আপডেটেড শিক্ষাক্রম প্রয়োজন। তবে নতুন সরকারের জন্য এ কাজ কিছুটা এগিয়ে রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছরের জুন মাসে শিক্ষা উপদেষ্টা ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৭ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে। সে জন্য নিড অ্যাসেসমেন্টের গবেষণা শুরু হয়েছে বলে জেনেছি। এ সরকারের মনোযোগ যেহেতু এখন নির্বাচনে, সংগত কারণেই শিক্ষাক্রমের কাজ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এগোয়নি। নির্বাচনী ইশতেহারে সে জন্য নতুন শিক্ষাক্রম গঠনের বিষয় থাকা দরকার। শিক্ষাক্রম রাতারাতি প্রণয়ন সম্ভব নয়। গবেষণা, দেশের বাস্তবতা ও বৈশ্বিক উদাহরণ সামনে রেখেই তা করতে হবে। একই সঙ্গে স্থায়ী শিক্ষা আইন করা দরকার, যাতে কেউ চাইলেই হুট করে তা বদলাতে না পারে। আগে শিক্ষা নিয়ে বারবার যে ধরনের ‘এক্সপেরিমেন্ট’ হয়েছে, সে প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে।
শিক্ষা বাজেট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেখানে সবাই জোর দেওয়ার কথা বললেও বরাদ্দ দেওয়া হয় খুবই সামান্য। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশেরও কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রবণতা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারও বের হতে পারেনি। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, এ সরকার এমন এক উদাহরণ সৃষ্টি করে যাবে, যা পরে অনুকরণীয় হবে। বাস্তবে সেটা হয়নি। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। সে জন্য নির্বাচনী ইশতেহারেই তার প্রতিফলন থাকা দরকার। ইউনেস্কো জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা বললেও আমাদের পক্ষে হয়তো একবারে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে অঙ্গীকার করতে হবে, যাতে ধীরে ধীরে সেখানে পৌঁছানো যায়।
শিক্ষার মান এখনও উদ্বেগের বিষয়। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের সাধারণ ‘রিডিং’ দক্ষতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন আছে। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংকের জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিকের মাত্র ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে। এখনও পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। শিক্ষার্থীদের এ অবস্থার দায় যেমন শিক্ষা ব্যবস্থার, তেমনি তাদের যারা পড়ান, সেই শিক্ষকরাও এ দায় থেকে মুক্ত নন। শিক্ষকদের সেই মানে উন্নীত করার ক্ষেত্রেও বাজেট জরুরি। যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য তাদের বেতন কাঠামোও উন্নত করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করে সেভাবে তাদের পদোন্নতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকা দরকার। সে জন্য শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ালেই হবে না, তার বরাদ্দের খাত আগেই চিহ্নিত করতে হবে।
আদর্শ নাগরিক গঠনের শিক্ষা প্রাথমিক পর্যায়েই দিতে হবে কার্যকরভাবে। হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা হতে হবে বাস্তবসম্মত। পঞ্চম শ্রেণি পড়ে কেউ ঝরে পড়লেও যাতে জীবন পরিচালনার মতো ন্যূনতম শিক্ষা পেয়ে যায় শিক্ষার্থী। অবহেলিত কারিগরি শিক্ষাকে জনপ্রিয় করা দরকার। দক্ষ মানবগোষ্ঠী গড়ার বিষয়টি শিক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে। সে জন্য কেবল কথার কথা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি।
উচ্চশিক্ষা গড়পড়তা সবাই গ্রহণ করছে এবং লাখ লাখ শিক্ষার্থী বেকার থাকছে। শিক্ষা যেন শিক্ষার্থীদের চাকরিমুখী না করে উদ্যোক্তামুখী করে– এ বিষয়টি বর্তমান সময়ে শিক্ষার অগ্রাধিকারে থাকতে হবে। তরুণদের বিশাল একটা অংশ শিক্ষা কিংবা কাজে কোথাও নেই। তাদের লক্ষ্য করে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া উচিত। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না হলেও অনানুষ্ঠানিক কিংবা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় এনে তাদের প্রশিক্ষিত করে কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা যেতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির এ সময়ে শিক্ষাকে প্রযুক্তিবান্ধব করা কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সঠিক দিকনির্দেশনা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলোকে একই সঙ্গে অঙ্গীকার করতে হবে শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়করণের বাইরে রাখার। বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষার সকল পর্যায়ে দলীয়করণের ফল কতটা ভয়ানক হতে পারে, তার নমুনা আমরা বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে দেখেছি। নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকার করতে হবে, তারা যাতে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিকে প্রশ্রয় না দেয় এবং শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়করণ না করে।
শিক্ষা খাতের বর্তমান অবস্থা এবং তার আলোকে অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা বের করতে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগাতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে রাখলে একই সঙ্গে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। বর্তমান প্রয়োজনের আলোকে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করা প্রয়োজন।
বড় কথা, নির্বাচনী ইশতেহার যেন কথার কথা না হয়। রাজনৈতিক দলগুলো কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়তে চায় তার ওপরেই নির্ভর করবে এ জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের কাছে শিক্ষা খাত যথাযথ গুরুত্ব পেলেই জাতি তার সুফল পেতে পারে।