Mahfuzur Rahman Manik
ভারতে বাংলাদেশি পর্যটক
ফেব্রুয়ারী 11, 2017
cox's bazar
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, কক্সবাজার

বাঙালি বহুকাল ধরে পরিচিত ছিল 'ঘরকুনো' হিসেবে। এ তকমার শানে নুযুল অবশ্য জানা নেই। তবে আমরা যে একেবারে বসে নেই- নজরুলের 'সংকল্প' কবিতা হয়তো তার প্রমাণ। কারণ বাঙালি আজ যথার্থ অর্থেই দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কক্সবাজারসহ দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো তো বটেই, দেশের বাইরেও বাঙালির জয়জয়কার। আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয় করেছি। আমাদের বসে না থাকার সাম্প্রতিক প্রমাণ হলো- প্রতিবেশী ভারতের শীর্ষ পর্যটক দেশ বাংলাদেশ।
ভ্রমণের জন্য আমাদের অনেকেরই দেশের বাইরে প্রথম পছন্দ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত। পর্যটনের জন্য, চিকিৎসার জন্য, ব্যবসা, আত্মীয়তা সূত্রসহ নানা কাজে বাংলাদেশিরা ভারতে যান। ভারতের পর্যটনে তার প্রভাবও পড়ছে নিঃসন্দেহে। সেখানকার পর্যটন মন্ত্রণালয় বলছে, ২০১৬ সালে ভারতে শীর্ষ পর্যটক বাংলাদেশেরবছরটিতে প্রায় চৌদ্দ লাখ বাংলাদেশি সেখানে যান। এর ফলে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে শীর্ষস্থানে পেঁৗছে বাংলাদেশ। পাঁচ বছরের রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, ক্রমবর্ধমানভাবে ভারতে বাংলাদেশি পর্যটক বাড়ছেই। ২০১২ সালে যেখানে ভারতে মাত্র প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি পর্যটক ছিল, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি হয়।
ভারতের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের অবদান একেবারে কম নয়, ২০১৫ সালের হিসাবে জিডিপির ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প জিডিপির সাড়ে চার ভাগ। পর্যটনের মাধ্যমে আয়ের দিক থেকে ভারত এগিয়ে। ভারতে বাংলাদেশের পর্যটক যখন সবচেয়ে বেশি, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের অর্থনীতিতে আমাদেরও অবদান রয়েছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশিদের ভারতে প্রবেশে যত বাধার কথা শোনা যায়, তা বিস্ময়কর। বিশেষ করে ভিসাপ্রাপ্তিতে ই-টোকেন নিয়ে যে ভোগান্তি আমাদের পোহাতে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। দালালদের পাঁচ হাজার টাকা ছাড়া এমনকি লাইনে দাঁড়িয়েও হাজার হাজার টাকা গোনা ছাড়া যেন ভারতীয় ভিসা মেলে না। অনেকে বলছেন, ভারতের ভিসা সোনার হরিণের চেয়েও দামি। এমন ভোগান্তি পেরিয়েও এত অধিক সংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে গেছে- তা এক আশ্চর্যের বিষয়ই বটে। ভিসা প্রাপ্তি সহজ হলে কত মানুষ যেত সে হিসাব না হয় থাক, তবে ভিসার ব্যাপারে বিলম্বে হলেও ভারতের বোধোদয় ঘটেছে। ২৯ জানুয়ারি ভারতীয় হাইকমিশন জানিয়েছে, এখন থেকে বাংলাদেশি পর্যটকদের আর ই-টোকেন লাগবে না। ভারত আরও বলছে, তারা ভিসা প্রাপ্তি আরও সহজ করবে। তাদের উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য।
প্রতিবেশী ছাড়াও হয়তো বাস্তবে নানা কারণে ভারতে বাংলাদেশিদের বেশি আসা-যাওয়া। তবে ভারতের জন্যও বাংলাদেশ নানা কারণে সম্ভাব্য বিকল্প হওয়া উচিত। পর্যটনসহ নানা দিক থেকে আমাদের সমৃদ্ধি কম নয়। বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এখানে। বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন ৫৩টি নদীর বাংলাদেশ অংশ নিয়ে ভারতীয় অনেকের কৌতূহল থাকতে পারে। সেগুলো দেখতেও তারা বাংলাদেশে আসতে পারেন। লাঙ্গলবন্দের মহাতীর্থ উৎসবেও ভারতের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আসতে পারেন। এমনকি তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক অতীশ দীপঙ্করের জন্মস্থানও বাংলাদেশে। আমাদের প্রতিবেশী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মুন্সীগঞ্জে এসে দেখে যেতে পারেন তার বজ্রযোগিনী গ্রাম। তার চেয়েও বড় কথা যেটা ভারতীয় হাইকমিশন বলেছে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ দৃঢ়করণ। যোগাযোগ বাড়াতে আসা-যাওয়ার বিকল্প নেই। সুতরাং বাংলাদেশ থেকে যেমন আমরা যাচ্ছি, ভারত থেকেও তেমনি তাদের আগমন প্রত্যাশিত।

Bangladesh-tourist-India
পরিসংখ্যান : ভারতে বাংলাদেশিসহ বিদেশি পর্যটক

এটা সত্য- ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যাসহ নানা বিষয়ে এখনও তিক্ততা রয়েছে। একই সঙ্গে এটাও সত্য, ছিটমহলসহ অনেক বিষয়ের সমাধান হয়েছে। দু'দেশের মধ্যে রয়েছে সরাসরি রেল যোগাযোগ। এখন ভারত ভিসা প্রাপ্তি সহজ করলে বাংলাদেশ থেকে আরও পর্যটক বাড়বে সন্দেহ নেই। তাতে অন্তত পর্যটনের দিক থেকে ভারত লাভবান হবে। আমরাও সেখানকার বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকৃতি দেখে, চিকিৎসাসেবাসহ নানা দিক থেকে লাভবান হবো। এতে প্রতিবেশী হিসেবে যোগাযোগও দৃঢ় হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। যোগাযোগ যখন দ্বিপক্ষীয় বিষয়, তখন ভারতীয়রাও বাংলাদেশের ব্যাপারে আরও আগ্রহী হবে- এটাই কাম্য।
তবে পর্যটনের ব্যাপারে আমাদেরও আরও এগিয়ে আসা উচিত। বাংলাদেশের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ ও তৎপরতা নেওয়া হয়েছে এটা সত্য। তবে আমরা পর্যটনে যতটা সমৃদ্ধ, সে তুলনায় তা নগণ্য। আমাদের বিদেশে প্রমোট করাসহ নিজেদের পর্যটন কেন্দ্রগুলো আরও আকর্ষণীয় করে তোলা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার। এর মাধ্যমে প্রতিবেশী হিসেবে ভারত থেকে তো বটেই, বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকেও পর্যটক আরও বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

ট্যাগঃ , , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।