
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পুরোনো আইন বাতিল করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। এ অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতার সঙ্গে পরিসরও বাড়ানো হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থা বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যকে সন্দেহভাজন মনে হলে তা তদন্ত করার ক্ষমতাও মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন আন্দোলন দমাতে পুলিশ বাহিনীর যে মারমুখী অবস্থান আমরা দেখি, সেখানে মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপের সুযোগ আছে কি?
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের আন্দোলনে তো বটেই, এর আগে-পরেও বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে পুলিশের বাড়াবাড়ি আমরা দেখেছি। তাতে ক্ষেত্রবিশেষ আন্দোলন বরং তীব্রতা পেয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড উন্নয়ন ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ভাতা বাড়ানোর দাবির আন্দোলনের সূচনাতেই যখন পুলিশ লাঠিচার্জ এবং জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তখন শিক্ষকদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হিসেবে কর্মবিরতি শুরু হয়। কর্মবিরতির কারণে শিক্ষার্থীরা জিম্মি হয়ে পড়লে সরকারের ওপরেও চাপ বাড়ে। সরকার আংশিক হলেও দাবি মানতে বাধ্য হয়। এ থেকে সরকার কি কোনো শিক্ষা নেবে?
আইনত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ করতে পারে না। অথচ তারা এমনটা অহরহ করে থাকে। এ নিয়ে আন্দোলনকারী কিংবা মার খাওয়া ব্যক্তি সরব হলেও পুলিশকে সেভাবে দায়বদ্ধ করা হয় না। অথচ এর প্রতিটি ঘটনায় পুলিশকে জবাবদিহি করা জরুরি। আইনশৃঙ্খলার পোশাকে নিরাপত্তা বাহিনীই যখন আইন লঙ্ঘন করে তখন মানবাধিকার কমিশনের বিষয়টি আমলে নেওয়া উচিত। তাতে নাগরিক অধিকার সমুন্নত হবে। তার চেয়ে বড় বিষয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারা বন্ধ হবে।
দেশের প্রত্যেক নাগরিকের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা দেওয়া আছে সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে। কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নামতে পারে; দাবি-দাওয়া আদায়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে পারে। সেখানে পুলিশ বাধা দিতে পারে না। তবে সভা-সমাবেশ সহিংস হয়ে উঠলে কিংবা বড়সড় জনভোগান্তির কারণ হলে পুলিশ তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে পুলিশ কোথায় কীভাবে বলপ্রয়োগ করবে তার উল্লেখ আছে। কিন্তু এসব কম ক্ষেত্রেই মান্যতা পায়।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশনের জনমত জরিপে অংশ নেওয়া ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ পুলিশের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে ফৌজদারি অপরাধ বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের শাস্তি চেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে শক্তি প্রয়োগের ধাপগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করার সুপারিশ করা হয়। কমিশন পাঁচ ধাপে বলপ্রয়োগের একটি পরিকল্পনার সুপারিশ করে, যার সঙ্গে পুলিশ প্রবিধান ১৯৮৩ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর বলপ্রয়োগের নীতিমালার সাযুজ্য আছে।
কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ জনতার মিছিল, সমাবেশ বা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ সদস্যরা দৃশ্যমান থাকবে; কোনো পদক্ষেপ নেবে না। পুলিশের বলার পরও সরে না গিয়ে আন্দোলনকারীরা মারমুখী আচরণ করলে কিংবা ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটালে এবং পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে আহত করলে পুলিশ গ্যাস স্প্রে, সাউন্ড হ্যান্ড গ্রেনেড, জলকামান, ক্ষেত্রবিশেষ লাঠিচার্জ করতে পারবে। পিস্তল ও গুলিবর্ষণেরও সীমিত অধিকার দেওয়া আছে পুলিশের আত্মরক্ষার জন্য। এ সকল ধাপ মানা না হলে পুলিশকে অবশ্যই দায়বদ্ধ করা যায়।
আমরা পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সর্বোচ্চ ব্যবহার গত বছরের জুলাই আন্দোলনে দেখেছি। জুলাই অভ্যুত্থানে সে জন্য পুলিশের প্রতি মানুষের আক্রোশও দেখা গেছে। বাহিনীটি নৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। এমনকি অভ্যুত্থানের পর তাদের কাজে যোগ দিতেও অনেক সময় লেগে যায়। এরপরও পুলিশের আচরণে তেমন পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠিত হলেও তাদের সুপারিশ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। পুলিশ যেন যে কোনো আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ দিয়ে শুরু করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শিক্ষকদের ওপর লাঠিচার্জ, বিসিএস পরীক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, নাগরিক কর্মসূচিতে লাঠিচার্জ– এভাবে লাঠিচার্জের খবর আমরা নিয়মিতই সংবাদমাধ্যমে দেখে থাকি।
পুলিশের লাঠিচার্জ কতটা ভয়ংকর তা সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয় জানেন। লাঠিচার্জ করে আন্দোলনকারীদের আহত করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেও এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া নিন্দা জ্ঞাপন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। একটি ঘটনা ধরেও যদি মানবাধিকার কমিশন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং সেখানে পুলিশের কী কী মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে তা বের করে, ওইসব পুলিশ সদস্যস্যকে জবাবদিহির আওতায় আনে তবে এ অপচর্চা বন্ধ হতে পারে। একজন শিক্ষক কিংবা বিসিএস পরীক্ষার্থীরা কি এতটাই ভয়ংকর, তাদের লাঠিচার্জ, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড; সবই প্রয়োগ করতে হবে! নিরস্ত্র ও নিরীহ এসব দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে পুলিশের ব্যবহারের একটি ঘটনার বিস্তারিত হলেও সামনে আসা দরকার।
আমরা জানি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গুম-খুনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক বড় অঘটন ঘটেছে। সেখানে বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাগুলোরও নজর থাকে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সেসব বিষয়ে সোচ্চার হতেই হবে। পাশপাশি নাগরিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে বেআইনিভাবে লাঠিচার্জের ঘটনার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। মানবাধিকার কমিশনসহ সরকারও যদি বিষয়টি আমলে নেয় তবে সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ এভাবে হবে না। তারা নির্দয়ভাবে প্রহৃত হবেন না। সাধারণভাবে বুঝিয়েও হয়তো অনেক আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করা যায়। পুলিশ সেভাবে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের জবাবদিহি করতেই হবে। যেখানে বলা হয়– পুলিশ জনতার বন্ধু, সেখানে এভাবে লাঠিচার্জ চলতে পারে না।
সমকালে প্রকাশ, ১৪ নভেম্বর ২০২৫– পুলিশের লাঠিচার্জ এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন