Mahfuzur Rahman Manik
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন আমাদের দায়ী করতে না পারে
নভেম্বর 2, 2021

যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে রোববার শুরু হয়েছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ২৬তম আসর 'কপ২৬'। এ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক ব্র্যাডি ডেনিস। ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের ইংরেজি থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক


ব্র্যাডি ডেনিস: জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আপনার অবস্থান স্পষ্ট। আপনি এ সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলেছেন। বাস্তবে এ প্রত্যাশা তেমন পূরণ না হওয়ার ফলে আপনার হতাশাও আমাদের চোখ এড়ায়নি। এবারের গ্লাসগোর কপ২৬ আপনি কীভাবে দেখছেন?

আন্তোনিও গুতেরেস: আমার ৭২ বছরের জীবনে আমি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তবে এটি আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক যুদ্ধের সময়। জীবনের অভিজ্ঞতার বিচারে আমি বলতে পারি, কপ২৬ একদিকে যেমন অত্যন্ত উদ্বেগের, অন্যদিকে প্রত্যাশারও। উদ্বেগের কারণ হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী যে দুর্যোগ আর খারাপ অবস্থা আমরা দেখছি, তাতে এটা স্পষ্ট- পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছাব, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ থাকবে না। আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন। কারণ আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা- ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবী ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণ হতে দেব না; সে লক্ষ্য পূরণে আমি তেমন আন্দোলন কিংবা কার্যকর পদক্ষেপ দেখছি না। এখানে উন্নত ও শিল্পে বিকাশমান দেশগুলোর মধ্যে যেমন অবিশ্বাস রয়েছে, তেমনি অবিশ্বাস দেখছি উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে। উন্নত বিশ্বের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর অভিযোজনে যে ১০০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেওয়ার কথা, তারা সে অনুযায়ী কথা রাখেনি। তবে আমি এখনও আশাবাদী। কারণ আমি দেখছি, জলবায়ুর দিক থেকে আমরা যে খাদের কিনারে পৌঁছে গেছি, এ বিষয়টি নিয়েও সচেতনতা বাড়ছে।

ব্র্যাডি ডেনিস: আপনি পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে বলা চলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। এ সময়ের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আপনার চিন্তার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি?

আন্তোনিও গুতেরেস: আপনি ঠিকই বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরেই বিষয়টি আমার কাজের অংশ। পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে একটি আইন পাস করি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রয়োজন। তার মানে, বিষয়টি নিয়ে আমি সর্বদাই সচেতন। এখন আমার বৈশ্বিক দায়িত্ব। আমি মানুষের স্থানান্তরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখি। অনেক মানুষ এ কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন অনেককে দারিদ্র্যে নিপতিত করেছে। বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও মানুষের নিরাপত্তহীনতার মধ্যেও এর সংযোগ স্পষ্ট। পানি সংকটে কৃষক ও পশুপালকদের মধ্যকার বিভেদের সুযোগ কীভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কাজে লাগাচ্ছে, সেটাও আমি দেখছি।

সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ। আমার নাতনিরা, হয়তো এ শতকের শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। আমি যখন তাদের দিকে তাকাই, আমি তাদেরকে এটা বলতে দিতে চাই না- বিশ্বটা নরক হয়ে গেছে। সেখান থেকে রক্ষা পেতে আমরা খুব বেশি কিছু করতে পারিনি।

ব্র্যাডি ডেনিস: আপনি জাতিসংঘের সেই প্রথম মহাসচিব, একটি দেশের নির্বাচিত নেতা ছিলেন। প্রতিটি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে যে চাপ মোকাবিলা করছে, তা আপনাকে কতটা পীড়িত করে?

আন্তোনিও গুতেরেস: আমরা জানি, প্রতিটি দেশের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। আমরা যখন একটি সংস্কার চাই তখন আমাদের স্মার্ট হওয়া প্রয়োজন। দুটি উদাহরণ দিই, আমি দৃঢ়ভাবে কার্বন করের পক্ষে। আমি বলি, আয়ের পরিবর্তে কার্বন হোক ট্যাক্স নির্ধারণের বিবেচ্য বিষয়। কার্বন করের জন্য আয়ের ওপর কর কমানো হোক। মৎস্য পেশাজীবী যেখানে, তাদের জন্য গ্যাস কিংবা তেল বা জীবাশ্ম জ্বালানির দাম কমানো জরুরি। কিন্তু আমি মনে করি, এগুলোর দাম কমাতে সাহায্য না দিয়ে বরং ছোট জেলেদের সাহায্য করা যেতে পারে। তাতে এসব মানুষ বুঝবে, সরকার কিংবা প্রশাসন তাদের কথা চিন্তা করে।

ব্র্যাডি ডেনিস: জলবায়ু বিষয়ে আরও বেশি অবদান কীভাবে রাখা যায়, তা কি আপনি চিন্তা করেন? আপনি জাতিসংঘের প্রধান, যদিও আপনার সীমাবদ্ধতা কম নয়।

আন্তোনিও গুতেরেস: জাতিসংঘ মহাসচিবের ক্ষমতা নিয়ে অনেক বিভ্রম রয়েছে। কিন্তু আমাদের অবস্থা দন্তহীন বাঘের মতো। কিংবা দাঁত থাকলেও ক্ষুধায় আপনি সেটা কমই বের করতে পারবেন। নিঃসন্দেহে জাতিসংঘ নেতৃত্ব দিতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বৈশ্বিক শক্তি আর নেতৃত্ব এক বিষয় নয়। কখনও কখনও নেতৃত্ব থাকে কিন্তু ক্ষমতা থাকে না; আবার কখনও কখনও ক্ষমতা থাকে কিন্তু নেতৃত্ব থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও ভিন্ন নয়।

ব্র্যাডি ডেনিস: জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেন?

আন্তোনিও গুতেরেস: যুক্তরাষ্ট্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে প্যািরস চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট বাইডেন পুনরায় সে চুক্তিতে প্রবেশ করেন। সুতরাং এটা সত্য যে, দ্রুত নীতির বদল হয়েছে- প্রেসিডেন্টের পরিবর্তনের নীতির পরিবর্তন। একই দেশের মধ্যে এ অবস্থা অন্য দেশগুলোর বিশ্বাসের জায়গা থেকে ভালো দৃষ্টান্ত নয়। তবে গণতান্ত্রিক জীবনে এটাই বাস্তবতা, যা আমাদের স্বীকার করতেই হবে।

আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা আশাপ্রদ। আমরা প্রত্যাশা করতে পারি, কার্বন নিঃসরণ কমাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। তবে দুঃখজনক হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অভিযোজনের সহযেগিতার হার কত হবে, তা এখনও যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করেনি। এ ব্যাপারে তাদের মনোযোগী হওয়া উচিত।

ব্র্যাডি ডেনিস: করোনাভাইরাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি আপনি বারবার বলেছেন।

আন্তোনিও গুতেরেস: করোনাভাইরাস অর্থনীতিতে ব্যাপক সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। কভিডের কারণে বৈশ্বিক সুশাসন, সমাজ, সর্বোপরি আমাদের পৃথিবী নাজুক অবস্থায় পড়েছে। এটি আমাদের জন্য জেগে ওঠার সংকেত। আমার মনে হয়, জলবায়ুর ক্ষেত্রে এ সংকেত কাজে লাগছে।

ব্র্যাডি ডেনিস: প্যারিস চুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে দ্রুততর হচ্ছে, এ চুক্তি বাস্তবায়নে বিশ্ব কি সেভাবে অগ্রসর হচ্ছে?

আন্তেতনিও গুতেরেস: প্যারিস চুক্তি বলা চলে খুব কঠিন নয়; নমনীয়। আপনি জানেন, এমনকি এ চুক্তিটি আবশ্যকীয় নয় যে, বাস্তবায়ন করতেই হবে। তবে এমন নয় যে, চুক্তিটি পরিবর্তন করা যাবে না। এ চুক্তির মাধ্যমে একটি কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ আমরা দেখছি। তাই আমাদের এ আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে রাখতে অপরাপর বিষয়ে নজর দিতে হবে।

ব্র্যাডি ডেনিস: কপ২৬-এর চলমান জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব যদি প্রতিশ্রুতির বিষয়ে গ্লাসগোতে ঐকমত্যে না পৌঁছে, তবে এটি নিশ্চয় শেষ নয়। তাহলে পরবর্তী সময়ে কী অপেক্ষা করছে?

আন্তোনিও গুতেরেস: আমরা সে ক্ষেত্রে নতুন করে শুরু করব। কখনও হতাশ হওয়া যাবে না। তবে হতাশ হওয়া যাবে না- এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা উচিত- এ সুযোগ হাতছাড়া করা ভালো লক্ষণ নয়।

ট্যাগঃ , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।