কাগজ-কলমের সম্পর্ক!

চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে কাগজ-কলমের। রোগী অসুস্থ হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র লেখেন। ব্যবস্থাপত্রে রোগের বিবরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধপথ্যের বিস্তারিত লিখে থাকেন। চিকিৎসকের সঙ্গে অল্প সময়ের সাক্ষাতের পর সুস্থতায় পরবর্তী পদক্ষেপে ব্যবস্থাপত্রই ভরসা। স্বাভাবিকভাবেই সে ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন হওয়া উচিত সহজ-সরল, সাবলীল ও বোধগম্য। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় রোগী ব্যবস্থাপত্র বোঝেন না; এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত অন্যরাও বোঝেন না। দেখা গেল, চিকিৎসক এক ওষুধ লিখলেন আর ফার্মেসি থেকে দেওয়া হলো ভিন্ন ওষুধ। তা কারও মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এ অসুবিধার জন্য গত বছরের শুরুতে আদালত থেকে রায় আসে পরিস্কার হস্তাক্ষরে ব্যবস্থাপত্র লিখতে।
বলা বাহুল্য, ব্যবস্থাপত্র সমস্যা শুধু আমাদেরই নয়। আন্তর্জাতিক সমস্যা। এমনকি যে ইংরেজিতে ব্যবস্থাপত্র লেখা হয়, সে ইংরেজির পীঠস্থান খোদ ব্রিটেনেও সম্প্রতি এ নিয়ে নির্দেশনা জারি হয়েছে। মঙ্গলবার বিবিসি ‘ডক্টরস টোল্ড টু ইউজ প্লেইন ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেটি বলছে, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা ও পেশার বিশ্বনন্দিত প্রতিষ্ঠান ব্রিটেনের দ্য একাডেমি অব মেডিকেল রয়্যাল কলেজেস চিকিৎসকদের সহজ ইংরেজি লেখার নির্দেশনা দেয়। রোগী যাতে পড়ে বোঝেন- সহজবোধ্যভাবে ব্যবস্থাপত্র লিখতেই শুধু বলা হয়নি, বরং সুন্দর সম্বোধন, রোগীর মানসিক অবস্থাও বিবেচনার কথা বলা হয়। যেমন কারও ডায়াবেটিস হলে সেখানে ‘ইউ হ্যাভ ডায়াবেটিস’ না লিখে ‘ইউ আর ডায়াবেটিক’ লেখার পরামর্শ দেয়। সহজ শব্দ প্রয়োগ যেমন ‘সেরিব্রাল’-এর পরিবর্তে ‘ব্রেইন’; ‘করোনারি’র পরিবর্তে ‘হার্ট’; ‘হেপাটিক’-এর পরিবর্তে ‘লিভার’ ইত্যাদি ব্যবহারের কথা বলছে ব্রিটেনের প্রতিষ্ঠানটি।
ব্রিটেনের এ নির্দেশনা আমাদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক। একদিকে চিকিৎকদের যেমন স্পষ্টাক্ষরে লিখতে হবে, একই সঙ্গে সহজবোধ্য শব্দ ও বাক্য ব্যবহার জরুরি। দেশে কিছু হাসপাতালে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র কম্পিউটার টাইপে লেখা হয়। এটি ভালো বিষয়। স্পষ্ট হাতের লেখায় হোক কিংবা কম্পিউটার কম্পোজ হোক, তা সহজ ও প্রচলিত ইংরেজি শব্দ ও বাক্যে হওয়া দরকার। চিকিৎসকের মনে রাখা দরকার, তিনি লিখছেন প্রথমত রোগীর জন্য। রোগী যেমন শিক্ষিত হতে পারেন, তেমনি কম শিক্ষিতও হতে পারেন। কিন্তু ব্যবস্থাপত্র ও রোগীর জন্য চিকিৎসক যা-ই লিখবেন সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখেই লেখা উচিত।
ব্রিটেনের দ্য একাডেমি অব মেডিকেল রয়্যাল কলেজেস তার ওয়েবসাইট এওএমআরসি ডট ওআরজি ডট ইউকে-তে রিপোর্ট অ্যান্ড গাইড্যান্স বিভাগে সংশ্নিষ্ট নির্দেশনার শিরোনাম দিয়েছে- প্লিজ, রাইট টু মি। দয়া করে সরাসরি আমাকেই লিখুন। এখানে আমি মানে রোগী। কেন সরাসরি রোগীকেই লিখতে হবে, তার ব্যাখ্যা রয়েছে নির্দেশনায়। এটি স্পষ্ট, যখন ডাক্তার সরাসরি লিখবেন- আপনার এই রোগ, এ ওষুধ আপনাকে খেতে হবে, এভাবে আপনাকে চলতে হবে; তাতে চিকিৎসককে অধিক আপন ও আন্তরিক মনে হবে। যখন আপনি ব্যবস্থাপত্রটি পড়বেন তখনই নিজে তা মেনে চলার জন্য বিশেষ দায়িত্ববোধ করবেন। সেটা বোঝার জন্যও ভালো।
আসলে রোগীই একজন চিকিৎসকের ধ্যান-জ্ঞান। তার রোগ সারাতে চেষ্টা করেন চিকিৎসক। রোগী যখন কথায় চিকিৎসকের আন্তরিকতার ছোঁয়া পান, লেখায় আপনের পরিচয় পান, তাতে তিনি আশ্বস্ত হন। ভালো চিকিৎসার ভরসা পান। রোগীর এ আস্থাই তো তাকে অনেক দূর সারিয়ে তুলতে পারে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কটা কাগজ-কলমের মনে হলেও এর ভিত অনেক গভীরে। রোগী যখন চিকিৎসককে বিশ্বস্ত ভাববেন, চিকিৎসক যখন রোগীকে আপন ভাববেন, তার ছাপ ব্যবস্থাপত্রেও পড়বে। চিকিৎসক যখন সুন্দর করে স্পষ্টাক্ষরে সহজবোধ্যভাবে লিখবেন, তখন কাগজ-কলমের কথা অন্তরেও বাজবে।

Post By মাহফুজ মানিক (470 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *