জলবায়ু পরিবর্তন : প্রয়োজন নতুন ‘সবুজ চুক্তি’

মূল: এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন ২০২১ সালের জলবায়ুর দিকে তাকাবে তখন হয়তো বলবে, ‘সেটা ছিল এমন বছর, যখন সমস্যার অন্ত ছিল না।’ ইংল্যান্ডে তীব্র তাপমাত্রা ও বন্যা, পাকিস্তানে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় তীব্র তাপমাত্রায় মানুষের মৃত্যু, জার্মানি ও চীনে মরণঘাতী বন্যা। এক মাসের মধ্যে এত অঘটন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আবহাওয়া অফিসের সতর্কবার্তা। যেখানে বলা হয়েছে, তীব্র আবহাওয়ার সময় মাত্র শুরু হলো।

সতর্কবার্তা অনিবার্য এ কারণে যে, জলবায়ুর অবস্থা সঙ্গিন। যেখানে এও বলা হয়েছে, সংকটের ইতিহাসে বর্তমান প্রজন্ম এক বিশেষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে। যে নাজুক ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, সে জন্য জলবায়ু সংকট উড়িয়ে দেওয়ার অবস্থায় নেই। একে আমরা এড়িয়ে গেলে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বড় ক্ষতি শিগগিরই অপেক্ষা করছে। যত দিন যাচ্ছে আমাদের সম্ভাবনার জানালা যেন একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা এ যুদ্ধে এমন দশকে অবস্থান করছি, যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে জলবায়ু সংকটের সমাধানের বিকল্প নেই।

আগামী কয়েকটি বছরে আমরা যা করব, তার ফল পরবর্তী কয়েকশ বছর পর্যন্ত থাকবে। বিশ্ব এই দশকে কার্বন নিঃসরণ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে না পারলে আমরা ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ সেলসিয়াসের মধ্যে আনতে ব্যর্থ হবো। আমরা ১ দশমিক ২ সেলসিয়াস উষ্ণতার বিধ্বংসী ফল দেখছি। এটি বেড়ে যদি ২ দশমিক ৫ বা ৩ সেলসিয়াসে পৌঁছে, তার পরিণতি কী হতে পারে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে গরম আমরা দেখেছি, তা এর আগে দেখা যায়নি। এমনকি সাম্প্রতিক শীতের অবস্থাও তথৈবচ।

সত্য হলো, আমাদের বড় শত্রু আর জলবায়ু অস্বীকার নয় বরং জলবায়ুর জন্য বিলম্বিত পদক্ষেপ। যেমন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ বিল ম্যাককিবেন জলবায়ু সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমরা ধীরে ধীরে জয় করছি; একই সঙ্গে হারাচ্ছিও।’ ইংল্যান্ড সরকার এ ক্ষেত্রে উদাহরণ। জনসন সরকার যা করছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার অনেক ফারাক। এখানে জলবায়ু নিয়ে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তন কমিটি তার নাম্বারিং করেছে ১০-এ ৪।

প্রশ্ন হলো, কেন এই ব্যর্থতা? সবুজীকরণের পদক্ষেপ একদিকে রেখে সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনাই এর মূল কারণ। সরকার যখন যথাযথ পরিকল্পনা ও অর্থায়নে ব্যর্থ, তখন যানবাহন বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি, শিল্প ও বয়লারে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে গড়বে। সরকার যখন তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম তখন এসব নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে? এটা কেবল যে সংকট আমরা মোকাবিলা করছি, দীর্ঘমেয়াদে তা থেকে আমাদের রক্ষার হুমকিই বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনীতির দিক থেকে এসব কর্মকাণ্ড অজ্ঞতারও বহিঃপ্রকাশ।

এক্ষেত্রে যথাযথ বিনিয়োগে আমাদের ব্যর্থতা কেবল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের বেঁচে থাকার ন্যায্যতার প্রশ্নে আমাদের অবস্থানকেই স্পষ্ট করছে না; একই সঙ্গে খরচ ও মুনাফার প্রশ্নে বাস্তবোচিত বিশ্নেষণের উপসংহারও এনে দিচ্ছে। বাজেটবিষয়ক বিশ্নেষণকারী প্রতিষ্ঠান ওবিআর সূত্রে আমরা দেখছি, করোনা মহামারি মোকাবিলার চেয়েও জলবায়ুর জন্য আমাদের বরাদ্দ কম। জাতীয় হিসাবে জিডিপির দিক থেকে গড় বার্ষিক বিনিয়োগ মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। যদিও আমরা জানি, আমাদের এই অবহেলার দায় কিন্তু অনেক ভারি হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদেরকে নাজুক বিধ্বংসী জলবায়ু রেখে যেতে হবে। এমনকি ইংল্যান্ডের ওবিআর এও বলছে, দেরি হলে তা আরও খরচ বাড়াবে। কারণ আমরা আমাদের অবকাঠামোর মাধ্যমে উচ্চ কার্বন নিঃসরণ করছি। নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে তা হবে আমাদের সন্তান ও তাদের সন্তানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

জরুরি পদক্ষেপ শুধু এ কারণেই নয় যে, আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা করব। বরং এ কারণেও যে, আমাদের পদক্ষেপ অধিক সুন্দর একটি পৃথিবীও উপহার দিতে পারবে। এ জন্য কার্বন নিঃসরণ ব্যাপক হারে কমানো প্রয়োজন। এটি এমনভাবে করব, যাতে বর্তমান অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে যে বৈষম্য রয়েছে, তারও যেন নিরসন হয়। ‘গ্রিন নিউ ডিল’-এ নতুন সবুজীকরণের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে বিনিয়োগে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বিদ্যমান শিল্পায়নকে নতুনভাবে সাজাতে সাহায্য করবে। এটি উষ্ণ বাড়ি, বিশুদ্ধ বাতাস যেমন উপহার দেবে; তেমনি দেশব্যাপী সম্পদ ও ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করবে। এটি আমাদের ‘ভিশন’। আমরা এ জন্য কাজ করব।

বিশেষ করে আমরা এখন যা বাড়িতে করছি অর্থাৎ আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডই বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলবে। এ বছরের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন তথা কপ২৬-এর ১০০ দিনও বাকি নেই। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে তৎপর হতেই হবে। সম্মেলনকে শুধু আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর সুযোগ হিসেবে না নিয়ে বরং দৃষ্টি দিতে হবে একটি কার্যকর দরকষাকষির দিকে। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যথাযথ কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি।

৫০ বছর আগে মার্টিন লুথার কিং জাতিগত ও অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠায় বলেছিলেন, ‘আমরা এমন একটি বিষয় মোকাবিলা করছি, তার আগামীকালই যেন আজ। আমাদের কাজটি জরুরি ভিত্তিতে এখনই করতে হবে। জীবন ও ইতিহাসের নতুন অধ্যায় উন্মোচনে দেরির কোনো অবকাশ নেই।’ প্রজন্ম যখন জলবায়ুর বিধ্বংসী অভিঘাতে সঙ্গিন, তখন এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে এ কথাগুলো মনে রাখতে হবে।

ইংল্যান্ডের লেবার পার্টির সংসদ সদস্য গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত
ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

 

Post By মাহফুজ মানিক (481 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *