দুর্যোগের পৃথিবী এবং আমাদের দায়

Secretary-General António Guterres holds a lecture at Columbia University entitled “State of the Planet”.

লেখক: আন্তেনিও গুতেরেস

আমরা একটি বিধ্বংসী মহামারি মোকাবিলা করছি। একটি সমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের বিপরীতে আমরা দেখছি, বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন উচ্চতা, বাস্তুসংস্থান অবক্ষয়ের নতুন মাত্রা ও বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের নতুন সংকট। এক কথায় বলতে গেলে, আমাদের এই পৃথিবীর এক ভঙ্গুর দশা।

মানুষ যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে। এটি আত্মঘাতী। প্রকৃতি সবসময়ই তা ফিরিয়ে দেয়। আর তার প্রকাশ আমরা দেখছি আরও শক্ত ও রুদ্ররূপে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। দশ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাস্তুতন্ত্র আমাদের চোখের সামনেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। মরুভূমি প্রসারিত হচ্ছে। জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবছর আমরা এক কোটি হেক্টর বন হারাচ্ছি। সমুদ্রগুলোতে মাছ নিঃশেষ হয়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপে পরিণত হচ্ছে। এগুলো কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করছে বলে সমুদ্রকে বিষাক্ত করে ফেলছে। কোরাল দ্বীপগুলো মরে যাচ্ছে। প্রতিবছর বায়ু ও পানিদূষণে ৯০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে, যা বর্তমান মহামারির চেয়েও ছয়গুণ বেশি। মানুষ যেভাবে প্রাণীর আবাসন ধ্বংস করছে এবং বন্যপ্রাণীর বসবাসে হস্তক্ষেপ করছে, তাতে আমরা হয়তো আর এক ভাইরাসের অস্তিত্ব দেখতে পাব, যেটা প্রাণী থেকে মানুষের দেহে আসছে। ভুলে যাওয়া চলবে না, মানুষের সংক্রামক রোগের ৭৫ ভাগই প্রাণী থেকে আগত।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও জাতিসংঘের দুটি নতুন প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, আমরা জলবায়ু বিপর্যয়ের কতটা কাছাকাছি। এ বছর লা নিনার প্রভাবে শীত পড়া সত্ত্বেও ২০২০ সালটি বিশ্বের তিনটি উষ্ণতম বছরের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত দশকটি বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ দশক ছিল। সমুদ্রের তাপ ছিল রেকর্ড পর্যায়ে। এ বছর বিশ্বের আশি ভাগেরও অধিক সমুদ্র লু হাওয়ার শিকার হয়েছে। উত্তর মেরুতে এ বছরটি ছিল বিশেষভাবে উষ্ণ। যেখানে আবহাওয়ার গড় ছিল তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। অন্যদিকে উত্তর সাইবেরিয়ায় তাপমাত্রা ছিল পাঁচ ডিগ্রির ওপরে। অক্টোবরে উত্তর সাগরে সবচেয়ে কমের রেকর্ড হয়। এখন আবার তা পুনঃহিমায়িত হওয়ার ধীরগতির রেকর্ড হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফ দীর্ঘমেয়াদে ভাঙতে শুরু করেছে। মিথেনের ফলে ভূগর্ভস্থ হিমায়িত অঞ্চল গলতে শুরু করেছে। যেটা গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের প্রভাবক।

অগ্ন্যুৎপাত, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় এতই বাড়ছে যে, এগুলো যেন নতুন বাস্তবতা। উত্তর আটলান্টিক হারিকেন সিজন ৩০টি ঝড় দেখেছে। যেটি স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণ। মধ্য আমেরিকা পর পর দুটি হারিকেনের আঘাতে এখনও বিপর্যস্ত।

বিজ্ঞানের সমীকরণ এখানে স্পষ্ট। বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে বিশ্বকে এখন থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ছয় শতাংশ হারে জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন কমাতে হবে। বাস্তবতা হলো, বিশ্ব এখন উল্টোটা করছে, প্রতি বছর তা দুই শতাংশ হারে ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ফলে আমাদের পৃথিবীর ওপর আপাতত দুর্যোগ, দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তা প্রচেষ্টার বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি এটি শান্তির জন্য করা আমাদের কাজকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ এসব দুর্যোগ অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে। মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে এবং সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। এটি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার ৭৫ শতাংশ দেশই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে ভঙ্গুর দেশগুলোর অন্যতম।

সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, মানুষের কর্মকাণ্ডই আমাদের বিশৃঙ্খলার মূল কারণ। আবার মানুষের পদক্ষেপই এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। একুশ শতকের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত, প্রকৃতির সঙ্গে ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ আচরণ। এটি সবার জন্য সবক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে, মহামারি থেকে উত্তরণ ঘটানোর সুযোগটা গ্রহণ করতে হবে। আমরা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে একটি আশার আলো দেখছি। তবে প্রকৃতির ভ্যাকসিনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি পরিত্রাণের পথ। মহামারি মোকাবিলায় আমরা জলবায়ু আগ্রাসী কোনো কাজ করব না। আবহাওয়ার অনুকূলে পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের ওপর আপাতত এই মহামারি থেকে বাঁচতে পারি।

এটা আমাদের জন্য পরীক্ষা, নৈতিকতার পরীক্ষা। করোনাভাইরাস থেকে উত্তরণে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে লাখ লাখ কোটি টাকা ধার করা প্রয়োজন। একটি ভঙ্গুর পৃথিবীতে তাদের ওপর এই ঋণের চাপ যাতে রেখে যেতে না হয়, সেজন্য নীতি প্রয়োজন। এখন প্রয়োজন ‘সবুজ সুইচ’। বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরায় স্থাপন না করে বরং একে রূপান্তরের সুযোগ আমাদের হাতে রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পরিচালিত একটি টেকসই অর্থনীতি নতুন কর্মসংস্থান এবং সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। মানুষের ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান ও পৃথিবীতে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক পৃথিবী সাহায্য করবে। করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি ও পৃথিবী বাসযোগ্য করা উভয়টি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

জলবায়ুর জরুরি অবস্থা উত্তরণের কথা বলি। জলবায়ু সমস্যার সমাধানে আমরা তিনটি বিষয় দেখছি : প্রথমত, পরবর্তী তিন দশকের মধ্যে আমাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য পূরণ করতেই হবে।

দ্বিতীয়ত, প্যারিস চুক্তির আদলে আমাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। ওই চুক্তিটি জলবায়ুর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তৃতীয়ত, পৃথিবী রক্ষায় অভিযোজনের ক্ষেত্রে আমাদের যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে, জলবায়ুর প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।

এ তিনটির ব্যাখ্যায় আসি। প্রথমটি কার্বন নিরপেক্ষতা। তথা গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন শূন্যের কোঠায় আনা। সাম্প্রতিক সময়ে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ আমরা দেখেছি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ২০৫০ সালের মধ্যে প্রথম জলবায়ু নিরপেক্ষ মহাদেশ হওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। আমি প্রত্যাশা করব, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের পর্যায়ের ৫৫ শতাংশে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ১১০টিরও অধিক দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রশাসনেরও অনুরূপ লক্ষ্য রয়েছে। চীন অবশ্য ২০৬০ সালের অঙ্গীকার করেছে।

তার মানে আগামী বছরের প্রথম দিকেই বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ৬৫ ভাগেরও অধিক ও বিশ্ব অর্থনীতির ৭০ ভাগেরও অধিক, যাদের এমন দেশগুলো কার্বন নিরপেক্ষকতা অর্জনের অঙ্গীকার করে থাকবে। এই শুভ মুহূর্তকে আমরা অবশ্যই একটি আন্দোলনে পরিণত করব।

দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির প্রশ্নে বলা প্রয়োজন। শূন্য নির্গমনের অঙ্গীকারের বার্তা বিনিয়োগকারী, মার্কেট ও অর্থমন্ত্রীদের কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবে আমাদের আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন। ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধ করতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর্তুকি বন্ধ করতে কার্বনের ওপর মূল্য আরোপ করা প্রয়োজন। নতুন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। সবুজ অর্থনীতি, সহনশীলতা, অভিযোজন ও রূপান্তর কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা উচিত। এ জন্য আমাদের প্যারিস চুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, অভিযোজন ও সহনশীলতা কার্যক্রমে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ আমরা একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চাই। জলবায়ু পদক্ষেপে অভিযোজন কোনোভাবেই ভোলা যাবে না। আমাদের ব্যাপকভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও পদ্ধতিগত অভিযোজন সহায়তায় যেতে হবে। এটা বিশেষ করে, ছোট দ্বীপবিশিষ্ট উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জরুরি। তারা ব্যাপকভাবে হুমকির মুখে।

অনেক শহরই সবুজায়ন হচ্ছে। নতুন সার্কুলার অর্থনীতিতে অপব্যয় কমছে। পরিবেশ আইনগুলো শক্তিশালী হচ্ছে। জাতিসংঘের অন্তত ১৫৫টি সদস্য রাষ্ট্র এখন শক্তিশালী পরিবেশকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একইসঙ্গে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় জ্ঞান প্রাধান্য পাচ্ছে।

একটি নতুন বিশ্ব পরিগঠিত হচ্ছে। মানুষ ধীরে ধীরে প্রচলিত পদ্ধতি যেগুলো পরিবেশের ক্ষতি করছে, তার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছে। মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষ তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমিয়ে পৃথিবীকে বুঝতে পারছে।

সংহতিই মানবতা। সংহতিই বেঁচে থাকার উপায়। এটাই ২০২০ সালের শিক্ষা। বিভেদ ও বিশৃঙ্খল বিশ্বে এসেছে মহামারি। তাই আসুন এই শিক্ষা ধারণ করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের জীবনপ্রণালি পরিবর্তন করি।

Post By মাহফুজ মানিক (470 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *