করোনার দিনগুলোতে ‘শিক্ষা’​

বাচ্চাদের পড়াশোনার মূল দায়িত্বটা কিন্তু নিতে হবে মা-বাবা/অভিভাবককে

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ ও তা থেকে সুরক্ষায় ‘ঘরে থাকা’ নিশ্চিত করতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল বাংলাদেশে বন্ধ হয়নি; বরং দেড় শতাধিক দেশের অবস্থাও তথৈবচ। তবে ১৬ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর ছুটি পেয়ে অনেকেই ‘বদ্ধ ঘরে’ না থেকে ‘জগৎ’ দেখার আশায় কক্সবাজারসহ নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। এমনকি অনেক শিক্ষকও এ ‘সুযোগ’ হাতছাড়া করেননি। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর, প্রশাসনের তরফ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ প্রবণতা কমেছে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আর এখন তো চলছে দেশব্যাপী ‘লকডাউন’। সংক্রামক ব্যাধি করোনা থেকে বাঁচতে কেবল ঘরে থাকাই যথেষ্ট নয় বরং আরও কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়াসহ বেশকিছু নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও মোবাইলে খুদেবার্তার মাধ্যমেও সতর্ক থাকার বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত জানছেন শিক্ষার্থী ও তার পরিবার।

সরকারের ঘোষণায় প্রথমে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কথা বলা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ৯ এপ্রিলের পরই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে- এ সম্ভাবনা রয়েছে সামান্যই। এমনকি এপ্রিলের প্রথম দিন থেকে অনুষ্ঠিতব্য চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা ইতোমধ্যে পেছানো হয়েছে। কথা হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি যদি আরও বাড়ে তাতে শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় বিরতি দীর্ঘ হয়ে যাবে। শিক্ষাবর্ষের এক-তৃতীয়াংশ এখনই পার হয়ে গেছে। নানা পরীক্ষার তারিখ থাকলেও পেছাচ্ছে। এ অবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা উপায়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে দেশ-বিদেশে।

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর তথ্যমতে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বে দেড় শতাধিক কোটি শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এর মধ্যে আমাদের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় তথা সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় পৌনে চার কোটি শিক্ষার্থীর ‘আনুষ্ঠানিক’ শিক্ষা কার্যক্রমে ছুটি চলছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তরফে বলছে, ইউনিসেফ ৭৩টি দেশের শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে এসব শিশুর কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারে, সে বিষয়ে মতামত জানতে চেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ইন্টারনেটে দূরশিক্ষণ, টিভি, বেতার ও অ্যাপের মাধ্যমে শেখার কার্যক্রম তারা হাতে নিয়েছে। তবে বাংলাদেশে ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য সংসদ টিভির মাধ্যমে শিশুর শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী শিক্ষাবিষয়ক অনুষ্ঠান প্রচার করার কথা বলছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে টিভির মাধ্যমে কিংবা অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কতটা সম্ভব? যেখানে অনেক শিক্ষার্থীর বাসাতে টিভি নেই। ইন্টারনেটও অনেকের বাড়িতে সেভাবে ব্যবহার করা হয় না। সীমিত পরিসরে অনেক পরিবারেই হয়তো বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্নভাবে কেউ না কেউ ইন্টারনেট ব্যবহার করে; সেটিও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার মতো কিনা, সন্দেহ রয়েছে।

উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কেউই এখন ইন্টারনেট-অনলাইনের বাইরে থাকার কথা নয়। ফলে তাদের জন্য এর ভালো বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি, করোনার বন্ধে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন। এ ক্ষেত্রে জুম ভিডিও কনফারেন্সিং অ্যাপের মাধ্যমে অন্তত ১০০ জনের ভিডিও ক্লাস করা সম্ভব। ই-লার্নিং কিংবা দূরবর্তী শিক্ষণ পরিভাষাগুলো আমরা শুনে আসছি, সেগুলো কাজে লাগানো যায়। গুগল ক্লাসরুম নামে একটি অ্যাপ আছে, এটিও এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকরী। তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী নানা দেশে বেশ প্রচলিত ও জনপ্রিয়। সেগুলো অনুসরণ করা যায়। আমাদের দেশেও এটি নতুন নয়। দেশে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ক্লাসরুম কার্যক্রম রয়েছে। ই-লার্নিংয়ের জাতীয় পোর্টাল আছে মুক্তপাঠ নামে। এমনকি অনেক বছর ধরে চলমান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণ কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে ভালো উদাহরণ। আর কেউ চাইলে বহুল ব্যবহূত ফেসবুক ব্যবহার করেও গ্রুপের মাধ্যমে পড়াশোনার পাঠ, প্রেজেন্টেশন সবই চালিয়ে নিতে পারেন।

করোনায় দীর্ঘ হতে পারে বিদ্যালয়ের ছুটি

করোনা সংক্রমণের এ সময়ে শিক্ষার সর্বস্তরে অনলাইন শিক্ষার এ পদ্ধতিগুলো অনুসরণযোগ্য। কিন্তু একদিকে সবার যেমন ইন্টারনেটের ব্যবস্থা নেই; অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশেরই কারিগরি প্রাযুক্তিক এ দক্ষতা থাকার কথা নয়। তাই অভিভাবকদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। সেটা সর্বাবস্থায়ই- অনলাইন শিক্ষা হোক বা না হোক। করোনাভাইরাসের কারণে যতদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকুক না কেন; প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদেরই নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বাড়িতে বসে সিলেবাস অনুযায়ী, নিজে নিজেই বিষয়ভিত্তিক/অধ্যায়ভিত্তিক পাঠ সমাপ্ত করতে পারে। কোনো বিষয় না বুঝলে বাড়িতে থাকা বড় কাউকে দেখাবে। হাতের লেখা, বাড়ির কাজে দায়িত্বও বাড়ির কাউকেই নিতে হবে। করোনার এ সময়ে অধিকাংশই যেহেতু বাড়িতে থাকবেন, পরিবারের ছোটদের কিংবা বাচ্চাদের জন্য এ দায়িত্বটুকু পালন করলে সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে যাবে।

হ্যাঁ, করোনার দিনগুলোতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সব নাগরিকের মূল ‘শিক্ষা’ এটাই, যথাসম্ভব ঘরে অবস্থান করে সম্ভাব্য সব সতর্কতা বজায় রাখা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বলে শিক্ষার্থীদের আগের মতো খেলার সময় এটি নয়। জাতীয় এ দুর্যোগে নিজে বাঁচলে বাঁচবে পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষ- এসব নিশ্চিত করেই মনোযোগ দিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়। টিভির মাধ্যমে শিক্ষায় সরকারের সিদ্ধান্ত স্বাগত। উচ্চশিক্ষায় অনলাইন ক্লাসরুম, আর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুঠোফোনে তত্ত্বাবধান, অভিভাবকের নির্দেশনা ও শিক্ষার্থীর নিজ দায়িত্ব নিয়ে পড়াশোনা নিশ্চিত করবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও।

Post By মাহফুজ মানিক (437 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *