Mahfuzur Rahman Manik
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সু চির হাতেই
অক্টোবর 18, 2017

সাক্ষাৎকার: পেনি গ্রিন

লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির ল অ্যান্ড গ্লােবালাইজেশনের অধ্যাপক ও ইন্টারন্যাশনাল স্টেট ক্রাইম ইনিশিয়েটিভের (আইএসসিআই) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক পেনি গ্রিন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারের কর্মকান্ড গত পাঁচ বছর ধরে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। ১২ মাসের ফিল্ড ভিজিট ও দুই শতাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আইএসসিআই ২০১৫ সালে এক প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহুবিধ প্রমাণ সংস্থাটি পেয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, নাগরিকত্ব অস্বীকার, বাড়িঘর ধ্বংস, ভূমি বাজেয়াপ্ত করা ও জোরপূর্বক বেগার খাটানো। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে পেনি গ্রিন লেখক নেভে গর্ডনের মুখোমুখি হন। আমেরিকার প্রাচীনতম সাময়িকী দ্য নেশন তার বিস্তারিত প্রকাশ করে। প্রাসঙ্গিক দুটি প্রশ্ন আলোচিত হলো

নেভে গর্ডন : আপনার ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার হুমকি রয়েছে। আসলে কোন ধরনের প্রমাণ গণহত্যার দিকে ধাবিত করে? এখানে জাতিগত নিধন কি বেশি যথোপযুক্ত পরিভাষা?
পেনি গ্রিন : 'এথনিক ক্লিনজিং' বা 'জাতিগত নিধন' পরিভাষাতে কয়েকটি কারণে সংশয় রয়েছে। প্রথমত, এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। মিয়ানমারে যা হচ্ছে তা দেখে বিদেশি সরকারগুলোর জাতিগত নিধন বলা এ জন্য সহজ যে, তাতে হস্তক্ষেপ করা, সহিংসতা প্রতিরোধ ও রোহিঙ্গাদের রক্ষা কিংবা অপরাধীদের শাস্তির কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অন্য সমস্যা হলো, 'এথনিক ক্লিনজিং' পরিভাষাটি স্লোবদান মিলসেভিক প্রথমে চালু করেছিলেন বসনিয়ার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার উপাদান আড়াল করার জন্য। এটি আসলে অপরাধীদের পরিভাষা।
রাফায়েল লেমকিন জেনোসাইড বা গণহত্যার বিষয়টি বুঝেছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক আইন করার জন্য ক্যাম্পেইন করেছিলেন। সামাজিকভাবে হেয় করা ও অমানবিক আচরণের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়। যার প্রমাণ আমরা মিয়ানমারে দীর্ঘ সময় ধরে দেখছি। রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্ন করে সমাজচ্যুত করার চেষ্টা অব্যাহত। তাদের থেকে নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়া হয়েছে; যেমন তারা ভোট দিতে পারবে না, নির্দিষ্ট যানবাহনে চড়তে পারবে না, পছন্দমতো কিছু করতে পারবে না। ঠিক এ সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নির্দিষ্ট গ্রুপের ওপর পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত এ সহিংসতায় দেখার চেষ্টা করা হয়েছে যে, তাতে স্থানীয় মানুষ কতটা জড়িত হয় ও তাদের প্রস্তুতি কেমন। ২০১২ সালে রাখাইনের সহিংসতায় রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক এক জায়গায় করে সেখানকার অন্য জাতি থেকে আলাদা করে। তারা তখন সম্পূর্ণভাবে একঘরে হয়ে পড়ে। এই চর্চা রোহিঙ্গা নিধনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি ও সক্রিয় অংশগ্রণের জন্য জরুরি ছিল।
১৯৩০ সালে ইহুদিদের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়- যখন কোনো সম্প্রদায় একঘরে হয়ে পড়ে, তাদের খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, স্বাস্থ্যসেবা ঠিকমতো পায় না, কাজ ও বাসস্থান সংকুচিত হয় এবং অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়; তখন সে সম্প্রদায় অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়ে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই হয়েছে। আর তাদের দুর্বলকরণের মূলে রয়েছে মিয়ানমার সরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১২ সালের সহিংসতার পরিকল্পনায় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও জড়িত ছিল। তারা বাস সংগ্রহ করে রাখাইন কিছু নারী-পুরুষকে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে আসে। আইএসসিআইর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তারা জানায়, কীভাবে তাদের বিনামূল্যে খাদ্য ও সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র দিয়েছিল।
অধিকন্তু, গণহত্যার ক্ষেত্রে কেবল শরীরই ধ্বংস করা হয় না, বরং ব্যক্তির জাতিগত পরিচয়েরও বিনাশ ঘটানো হয়। যেটা এখন করছে মিয়ানমার। মিয়ানমার সরকারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চি রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত ব্যবহার করেন না। আইএসসিআই'কেও যখন মিয়ানমারে কাজ করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তখনও আমাদের রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করতে বেশ সতর্ক থাকতে হয়েছিল। এভাবে একটি জাতির পরিচয় ধ্বংসের প্রক্রিয়ার সঙ্গে লেমকিনের 'জেনোসাইড'-এর ধারণার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়।
২৫ আগস্ট থেকে আমরা যা দেখছি, আসলে তা এসব প্রক্রিয়ারই অংশ। এবার কেবল তার তীব্রতা প্রত্যক্ষ করছি। গ্রামগুলো ধ্বংস হচ্ছে। আমরা জানি না, ঠিক কত মানুষ এবার মারা গেল। তবে হাজার হাজার হবে এটা নিঃসন্দেহে বলাই যায়। নাফ নদ পেরিয়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। এর আগের সংখ্যা মিলে এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বেগ নিয়ে এখন বাংলাদেশে। এখনও হয়তো আরও কিছু রোহিঙ্গা রাখাইনে রয়েছে। নানা দিক বিশ্নেষণ করে বলা যায়, মিয়ানমার সফল। এখনও যেসব রোহিঙ্গা রাখাইনে বাস করছে, তাদের হয়তো এখন 'বাঙালি' বলে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে। এখন হয়তো গোটা রাখাইনের চিত্রই বদলে যাবে।
গর্ডন : অং সান সু চির নীরবতায় বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে। তার কী ভূমিকা আছে বলে আপনি মনে করেন? বিশেষত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার এ নতুন মাত্রায়?
পেনি গ্রিন : আমি এই নীরবতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করি। আসলে সু চি নীরব নন। তিনি ক্ষমতাবান- এটা স্বীকার করতে হবে। আসলে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এটা বিবেচনা করা খুব কঠিন যে, তিনি এ রকম গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধে অপরাধী। কারণ সু চি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল পেয়েছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার তার ঝুলিতে। তবে হ্যাঁ, আমরা তো জানি, হেনরি কিসিঞ্জারও শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। অথচ তিনি কম্বোডিয়ায় বোমা মেরেছেন। সু চির ক্ষেত্রে এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি ১৯ মাস ধরে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর। প্রধানমন্ত্রীর সমপর্যায়ের ক্ষমতা তার। তিনি অবশ্যই মিয়ানমারে ছোট কিংবা দুর্বল কোনো ব্যক্তি নন।
তার এ সময়ে সু চি একবারও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতার সমালোচনা করেননি। তিনি বরং অবিরতভাবে রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সেখানে প্রবেশ করতেও দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে আসলে তিনি সক্রিয়ভাবে তার সরকারের অপরাধ ঢাকতেই কাজ করছেন।
আমার তো মনে হয়, অং সান সু চি খুবই উচ্চাকাগ্ধক্ষী ও নির্মম রাজনীতিবিদ, যার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হওয়া। এমনিতেই তিনি একজন ইংরেজকে বিয়ে করা এবং তার দুই ছেলে ব্রিটেনে জন্ম নেওয়ার কারণে দেশের সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তার ১৯ মাসের কর্মকান্ড এটাই বলছে, তিনি আসলে সংবিধান পরিবর্তন করতে চান। যদিও সেখানকার সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া এটা সম্ভব নয়। তিনিও সেনাবাহিনীকে সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। কারণ মিয়ানমারের তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে- প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত।
যা হোক, অং সান সু চির ত্যাগই আসলে অনেক কিছু উপহার দিতে পারে। রোহিঙ্গা নিধনের সমাধান যার অন্যতম।

ট্যাগঃ , , , , , ,

2 comments on “রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সু চির হাতেই”

  1. অনুভূতিপূর্ণ আপনার হৃদয়ে উঠুক ঝড় , মিথ্যার স্বপ্নচারী জগৎকে লেখনীর ঝড়ে গুড়িয়ে উড়িয়ে দিন সৃষ্টির সাম্যতার ঝান্ডা ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।