গাজা হামলা এবং পরাজিত বিশ্ববিবেক

উরি আভনারি

gazaaগাজায় বৃষ্টির মতো বোমা পড়ছে আর রকেট পড়ছে ইসরায়েলের দক্ষিণাংশে। মানুষ মারা যাচ্ছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে। আবারও কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই এসব চলছে। নিশ্চিত করেই বলা যায়, আবারও এসব ধ্বংসযজ্ঞ শেষ হলে সবকিছু প্রয়োজনেই আগের মতো হয়ে যাবে।তবে আমি খুব কমই সে সাইরেনের শব্দ শুনতে পাই, যেটি তেলআবিব লক্ষ্য করে আসা রকেটের সতর্ক সংকেত। জেরুজালেমে ভয়ঙ্কর যা হয়েছে তাতে আমি বিক্ষুব্ধ না হয়ে পারছি না। নব্য নাৎসি কোনো গোষ্ঠী যদি রাতের অন্ধকারে লন্ডনের প্রতিবেশী ইহুদি ১৬ বছর বয়সী কোনো বালককে অপহরণ করে তাকে হাইড পার্কে নিয়ে যায়, মারধর করে, তার মুখে পেট্রোল ঢালে এবং তাকে তাতে চুবিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করে_ তখন কী হতো?

তখন যুক্তরাজ্য কি ক্রোধে উন্মত্ত ও রাগে ফেটে পড়ত না? রানী কি তখন ক্ষোভের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন না? প্রধানমন্ত্রী কি তখন দ্রুত শোকাচ্ছন্ন পরিবারের বাড়ি গিয়ে গোটা জাতির তরফ থেকে তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন না? নব্য নাৎসি নেতৃত্ব, তাদের সক্রিয় সমর্থক এবং তাদের মগজ ধোলাইকারীরা কি অভিযুক্ত ও নিন্দিত হতেন না? সম্ভবত যুক্তরাজ্য কিংবা জার্মানিতে সেটা হতো, কিন্তু এখানে নয়।
এই জঘন্য নৃশংসতা জেরুজালেমে সংঘটিত হয়েছে। ফিলিস্তিনি একটি শিশুকে অপহরণ করা হয়েছে এবং তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। ইসরায়েলে এ রকম বর্ণবাদী অপরাধের এটাই শেষ নয়। জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা সারা পৃথিবীতে একটি ঘৃণ্য অপরাধ। আর একটি রাষ্ট্র যাকে ‘ইহুদি’ নামে দাবি করা হয় সেটি এর চেয়ে জঘন্য।
ইসরায়েলের আইন অনুসারে, পূর্ব জেরুজালেম দখলকৃত ভূখণ্ড নয়। এটি সার্বভৌম ইসরায়েলের অংশ। ঘটনার ধারাবাহিকতা এ রকম : দু’জন ফিলিস্তিনি, দৃশ্যত তারা কেবল দু’জনই, যারা হেবরনের কাছের একটি জনপদ থেকে রাতে ইসরায়েলের তিন তরুণী অপহরণের ঘটনায় অভিযুক্ত। তাও ঘটনাটি অন্যিদিকে যেতে পারতো, যখন এই তিন তরুণীর একজন তার মোবাইল থেকে জরুরি নম্বরে কল করে ইসরায়েলের পুলিশকে জানাতে সক্ষম হয়। অচিরেই পুলিশের আয়ত্তে চলে আসতে পারে এই ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অপহরণকারীরা তখনই তিনজনকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের লাশ একটি মাঠে ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়। (আসলে পুলিশ এখানে অদক্ষতার পরিচয় দেয় এবং পরদিন সকালের শিকারে কেবল তারা অভিযান শুরু করে)।
ইসরায়েলিরা তখন এটা নিয়ে হৈচৈ শুরু করে। তাদের হাজারো সৈন্য তিন সপ্তাহ ধরে তখন এই তিন তরুণী খোঁজার জন্য মোতায়েন করা হয়। এবং তারা হাজারো ভবন, গুহা এবং মাঠে চিরুনি অভিযান চালায়।
এ ঘটনায় জনসাধারণের হৈচৈ ন্যায্য বটে। তবে এটি অন্যদিকে মোড় নিয়ে অচিরেই একটি অশ্লীল বর্ণবাদী উত্তেজনায় পরিণত হয়। দিন দিন যার তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদপত্র, বেতার কেন্দ্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নির্লজ্জের মতো এই বর্ণবাদ প্রচারণাকে আরও উস্কে দেয়। অত্যন্ত বিরক্তিকরভাবে তারা এই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন তাদের নিজস্ব বিদ্বেষী মতামতসহ প্রতিদিন অবিরতভাবে প্রচার করে।
ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ যেটি সর্বতোভাবে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থার সাহায্যে চলে, তারা আগেভাগে অভিযুক্ত দুই অপহরণকারীকে শনাক্ত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আরব রাষ্ট্রগুলোর এক সভায় দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে এই অপহরণের নিন্দা জানান এবং এতে একজন আরব বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তারই অন্য অনেক লোকের কাছে পরিচিতি পান। অন্যদিকে ইসরায়েলি নেতারা তাকে আখ্যা দেন ভণ্ড হিসেবে।
ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের উচ্চারণে তাকে সরাসরি ফ্যাসিস্ট হিসেবেই দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী ড্যানি ড্যাননের কথা বলা যায়, ‘যদি রাশিয়ার কোনো বালক অপহৃত হতো তাহলে পুতিন গ্রামকে গ্রাম উজাড় করত!’
‘জিউস হোম’ দলীয় নেতা আয়লা শ্যাকড বলেন, ‘ শিশু হত্যাকারীর সঙ্গে আমাদের ডিল তেমনই হতো’ (জিউস হোম_ সরকারের অঙ্গীভূত অন্যতম দল)। নোয়াম পার্ল, নেই অকিভার (সেটেলারদের যুব আন্দোলন) বিশ্ব পরিচালক বলছেন, ‘প্রতিশোধই গোটা জাতি এবং হাজার বছরের ইতিহাসের দাবি’। আর ইসরায়েলে প্রেসিডেন্টে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজে ফিলিস্তিনি জনসাধারণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা আমাদের মতো নয়, আমাদের কাছে জীবন পবিত্র, আর তাদের কাছে মৃত্যু’।
যখন অপহৃত তিনজনের লাশই টুরিস্ট গাইডের মাধ্যমে পাওয়া যায়, তখন ঘৃণার সম্মিলিত মাত্রা এক নতুন গতি পায়। সৈন্যদের প্রতিশোধে উন্মত্ত করতে ইন্টারনেটে হাজারো মেসেজ প্রদান করা হয়। রাজনীতিবিদরা সেখানে তা দেয়, আর সংবাদমাধ্যম যোগ করে তেল। জেরুজালেমের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ জড়ো হয়ে নির্বিচারে হত্যার জন্য আন্দোলন করে। আন্দোলন করে আরব কর্মীদের শিকার করে নির্যাতনের জন্য। তবে স্বল্প কিছু স্বর ছিল ব্যতিক্রম। এতে মনে হয় যে সব ইসরায়েলি ফুটবল মাঠে একত্র হয়ে চিৎকার করছে, ‘আরবদের মৃত্যু চাই’।
আজকে কেউ কি এমন কল্পনা করতে পারে, কোনো ইউরোপিয়ান কিংবা আমেরিকান একত্রে চিৎকার করে বলছে, ‘ইহুদিদের মৃত্যু চাই’?
আরব বালকের পাশবিক হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন সরাসরি ‘আরবদের মৃত্য চাই’ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। তারা প্রথম ফিলিস্তিনের নিকটবর্তী আরব এলাকা শাফাতের নয় বছরের এক বালককে অপহরণের চেষ্টা করে। একজন বালকটিকে রাস্তায় ধরে তাদের গাড়ির নিকট টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যায় একই সঙ্গে শ্বাসরোধের চেষ্টা করে। ভাগ্যবশত ছেলেটি মামা বলে চিৎকারে সমর্থ হয় এবং তার মা অপহরণকারীকে তার মোবাইল ফোন দিয়ে আঘাত করতে থাকে। সে এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয় এবং পালিয়ে যায়। শ্বাসরোধের চিহ্ন ছেলেটির ঘাড়ে কয়েকদিন পর্যন্ত দেখা যায়।
পরদিন ওই গ্রুপটি আবার আসে, তারা মুহম্মদ আবু খাদেইর নামে ১৬ বছরের একটি হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত ছেলেকে ধরে তার মুখে পেট্রোল ঢেলে দেয় এবং তাকে পুড়িয়ে হত্যা করে। এতেও শেষ হয়নি, সীমান্ত পুলিশ এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে তার এক চাচাতো ভাইকে ধরে, তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে মেঝেতে ফেলে মাথা ও মুখে লাথি মারা শুরু করে। নির্যাতনের শিকার বিকৃত চেহারা নিয়ে ছেলেটি গ্রেফতার হয়, পুলিশের কিছুই হয়নি।
নিষ্ঠুরভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার মুহাম্মদের হত্যার কথা প্রথমে বলা হয়নি। এটা প্রকাশ হয় একজন আরব প্যাথলজিস্টের মাধ্যমে, যিনি তার আনুষ্ঠানিক ময়নাতদন্তের সময় উপস্থিত ছিলেন। অধিকাংশ ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এ ঘটনাকে কয়েক শব্দে ভেতরের পাতায় প্রকাশ করে। অধিকাংশ টেলিভিশন এ ঘটনা আদৌ প্রচারই করেনি। ইসরায়েলে আরব নাগরিকরা জেগে ওঠে, যেটা অনেক বছরেও তারা করেনি। কিছুদিন ধরেই গোটা দেশে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। একই সঙ্গে গাজার সম্মুখে রকেট ও বোমা হামলা চালানো হয়, এটি আসলে সত্যিকার একটি ছোট যুদ্ধের মতোই। ইতিমধ্যেই যার একটা নামও আছে ‘সলিড ক্লিফ’।
Palastineআগুন দিয়ে হত্যায় ছয়জন সন্দেহভাজন, যাদের কয়েকজন ইতিমধ্যেই দোষ স্বীকার করেছে তাদের নাম এখনও দেওয়া হচ্ছে না। তবে অনানুষ্ঠানিক প্রতিবেদন বলছে তারা গোঁড়া কমিউনিটির। দৃশ্যত মনে হয় তারা ঐতিহ্যগতভাবে ইহুদিবিরোধী এবং মধ্যপন্থি। এখন তারা পোনা ছড়ানো নব্য নাৎসির বংশধর। যারা এখন এমনকি তাদের ধর্মীয় প্রতিযোগী ইহুদিদেরও ছাড়িয়ে গেছে।
এই ভয়ঙ্কর ঘটনায় আমার মনে হয় জনগণের প্রতিক্রিয়াও খুব খারাপ। কারণ সেখানে কেউ এবং সত্যিকারার্থে অল্প কয়েকজনের বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন স্বর শোনা গেছে। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এ ব্যাপারে তাদের ঘৃণ্য স্বরই উচ্চকিত হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত চরম নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ মূর্তমান হয়নি।
সবকিছুকে সাধারণ ‘ঘটনা’ বলে চালানো এবং এর প্রচার ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে প্রতিরোধ করা হয়েছে। জীবন আগের মতোই হয়ে গেছে। কিছু সরকারি নেতা ও রাজনীতিবিদ তাদের রুটিনমাফিক নিন্দা জানিয়েছে, তাও বাইরে দেখানোর জন্য। এখন বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা সামনে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, এই নৃশংসতাকে সাধারণ একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
কোথায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ, কোথায় জাতির নৈতিক উত্থান? যেখানে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ফ্যাসিজম পিষে চূর্ণ করা হয় সেখানেই এ ধরনের নৃশংসতা সম্ভব।
আকস্মিক বিস্ফোরণে গাজা এবং এর চতুর্দিকে জ্বলে ওঠা সামষ্টিক নিষ্ঠুরতা সব নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। জেরুজালেম এবং এর উত্তরের শহর তেলআবিবে সাইরেন বেজে ওঠে। ইসরায়েলি জনগণের উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত মিসাইল এখন পর্যন্ত কাউন্টার মিসাইলে বাধাপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু হাজারো মানুষ, নারী ও শিশু আশ্রয়ের জন্য দৌড়াচ্ছে। অপরদিকে, প্রতিদিন শত শত ইসরায়েলি বিমান গাজাকে পরিণত করছে নরকে।
কামান গর্জে ওঠে, দেবী নীরব রয়। দুঃখ কেবল সে বালকের জন্য, যে পুড়ে মারা গেল।

Post By মাহফুজ মানিক (444 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *