
ফিলিস্তিনি মা হান্নার গল্প তুলে ধরেছিল বিবিসি। গত বছর এক প্রতিবেদনে বিবিসি লিখেছে, ‘দ্য গাজান চিলড্রেন অরফানড বাই ওয়ার’। অর্থাৎ যুদ্ধে গাজার এতিম শিশুরা। প্রতিবেদনটি বলছে, মা হান্না শুধু তাঁর সন্তানকে হাসপাতালে জন্ম দিয়েছিলেন। তারপরই তিনি ইসরায়েলি বিমান হামলায় শহীদ হয়ে যান। সন্তানের নামটুকুও রেখে যেতে পারেননি। বস্তুত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজার শিশুদের পরিস্থিতি এমনই বেদনাদায়ক। সম্প্রতি গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে– এসব শিশুর কী হবে?
এ বছর লিখেছিলাম, গাজার শিশুর আর্তনাদ শুনতে কি পাও (সমকাল, ১১ এপ্রিল ২০২৫)। ইসরায়েলের বর্বর গণহত্যার শিকার হয়ে সেখানে শহীদ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার শিশু। যেসব শিশু বেঁচে আছে; মৃত্যুভয়, অবর্ণনীয় দুর্দশা; খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে তারাও যেন জীবন্মৃত। তাদের শৈশব বলে কিছু নেই। যুদ্ধবিরতির পর গাজাবাসী তাদের বাড়িঘরে ফিরছেন আনন্দ নিয়ে। কিন্তু সবই যে ধ্বংসস্তূপ; মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েই তাদের চিন্তা। আর সেখানকার এতিম শিশুদের পরিস্থিতি অবর্ণনীয়। গাজার বর্তমান সংকট এতটাই জটিল, যারা শহীদ হয়েছেন, তারা বুঝি বেঁচে গেছেন। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, গাজার ৫৬ হাজার শিশু বাবা-মায়ের একজন বা উভয়কেই হারিয়েছে।
প্রায় প্রতিদিন গাজার শিশুরা দেখেছে বোমা হামলা। নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে তাদের বারবার স্থান ত্যাগ করতে হয়েছে। তাদের সামনেই দেখেছে মা-বাবা শহীদ হয়ে গেছে। প্রিয় ভাই কিংবা বোনকে হারিয়েছে। সতীর্থ ও স্বজনের লাশ রেখে হয়তো তাদের ছুটতে হয়েছে। হাসপাতাল বিধ্বস্ত। চোখের সামনে নাই হয়ে গেছে প্রিয় ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমন ভয়ানক অভিজ্ঞতা ভুলে তাদের স্বাভাবিক হওয়া নিশ্চয় সহজ নয়। দেশে চলতি বছরের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে এক বিমান দুর্ঘটনায় যে ট্র্যাজেডি হয়েছিল, সেখানে ২৮ শিশুসহ ৩৬ জন প্রাণ হারান। সাম্প্রতিক মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য বলছে, এখনও সেখানকার ৭১ শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঠিকমতো ঘুমোতে পারছেন না। সেদিক থেকে গাজার শিশুর অবস্থা অনুভব করা কঠিন নয়। সেখানকার শিশুর বাস্তবতা হচ্ছে, তাদের সেভাবে ঘুমানোরই জায়গা নেই।
বিশেষভাবে গাজার এতিম শিশুদের কথা বলতেই হবে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সেখানে এমন অন্তত ১৭ হাজার শিশু রয়েছে, যারা মা-বাবা উভয়কেই হারিয়েছে। অভিভাবকবিহীন এসব শিশুর পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। গাজার প্রায় সম্পূর্ণ অবকাঠামো যে ধ্বংস হয়ে গেছে, শুধু সে জন্য নয়; বরং নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকার এখনও সেখানে কাটেনি। আমরা জানি, ইতোপূর্বে বারবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে এবং প্রায় প্রতিবার ইসরায়েল তা ভঙ্গ করে ফিলিস্তিনি নিরপরাধ শিশু ও বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে। ইসরায়েল যেমন নিষ্ঠুরভাবে গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে, তাকে বিশ্বাস করা যায় কীভাবে? ইসরায়েল যে পরিকল্পিতভাবেই ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করেছে– তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। যুদ্ধবিরতির আগে গাজাগামী ত্রাণ সহায়তা আটকে রেখে ফিলিস্তিনিদের অনাহারে মারার আয়োজন করেছিল। অপ্রতুল যে ত্রাণ গাজাবাসী পেত, তার বিতরণস্থলেও আক্রমণ বন্ধ ছিল না। ত্রাণ গ্রহণ করতে গিয়েই শহীদ হন কয়েক হাজার গাজাবাসী।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এ চুক্তির বিস্তারিত এখনও স্পষ্ট নয়। ওদিকে ২০ লাখের বেশি গাজাবাসীর ৯০ শতাংশই বাস্তুচ্যুত। সেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসনসহ জরুরি মানবিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। তার আগে নিশ্চিত করতে হবে ফিলিস্তিনের মুক্তির পথ। স্বাধীনতা না পেলে, মুক্তি কী?
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন না হলে সেখানকার শিশুরাও তাদের অধিকার ফিরে পাবে না। গাজার শিশুর সংগ্রাম শুরু হয় তার জন্ম থেকেই। দুই বছরের আগ্রাসনে অনেক ভ্রূণ পৃথিবী দেখার আগেই চলে গেছে অনন্তের পথে। কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরের শিশুরাও শহীদ হয়েছে পৃথিবীর সংগ্রাম অনুধাবনের আগেই। যেসব শিশু বেঁচে আছে, তাদের নিরাপত্তা ও নিরাপদে বেড়ে ওঠার নিশ্চয়তা দিতে হবে বিশ্ববাসীকে।
৭ অক্টোবর যুদ্ধের দুই বছরে গাজার এতিম শিশুরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়েছিল– ‘উই আর নট নাম্বারস’। অর্থাৎ আমরা শুধু সংখ্যা নই। যে সংখ্যা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে আসছে– এতজন নিহত হয়েছে, এত সংখ্যায় এতিম হয়েছে। বরং তারা বোঝাতে চেয়েছে– আমরা শিশু; আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমাদের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করো, হে বিশ্ব। চীনা সংবাদমাধ্যম জিনহুয়া লিখেছে, গাজার এতিম শিশুদের এ প্রতিবাদে ৯ বছরের শিশু ইউছুফ আব্দুল হাদি বলেছে, ‘আমরা স্কুলে যেতে চাই। তোমরা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও।’
হাদির শহীদ বাবা তো আর কখনও ফিরে আসবে না। ফিরে আসবে না গাজার এমন অনেক শিশুর মা কিংবা মা-বাবা উভয়েই। তাদের শৈশব হারিয়ে গেছে যুদ্ধে। গণহত্যা চালিয়ে যারা তাদের মা-বাবাকে হত্যা করেছে, তাদের কি বিচার হবে না? যারা শিশুদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে, তারা এভাবেই পার পেয়ে যাবে? ইসরায়েলকে বিচারের আওতায় আনতেই হবে। তা না হলে নিয়মতান্ত্রিক বিশ্ব ভেঙে পড়বে। ইসরায়েলি যুদ্ধদানব পুনরায় গাজার শিশুদের হত্যা করবে; হত্যা করবে তাদের মা-বাবা ও ভবিষ্যৎকে।
সমকালে প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ গাজার এতিম শিশুরা শুধু সংখ্যা নয়