
ডেঙ্গুর বিপৎসংকেত সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই স্পষ্ট। ডেঙ্গু সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান বড় বিপদের কথা বলছে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার দরকার ছিল, তা দেখা যাচ্ছে না। সমকালের মঙ্গলবারের প্রতিবেদন: ডেঙ্গু আক্রান্ত ৫০ হাজার ছাড়াল, ঢাকার বাইরেই ৭০ শতাংশ। তার আগের দিনের শিরোনাম ছিল: এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্ত। তার দুই দিন আগে শনিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন ছিল: সংক্রমণ ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি, শঙ্কার মাস শুরু। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও দিনের পর দিন এভাবে গুরুত্ব দিয়ে ডেঙ্গুর খবর প্রকাশ করছে।
ব্যক্তিগতভাবে ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি কীভাবে ডেঙ্গু রোগীরা অকূল পাথারে পড়ে যান। আমার শিশুকন্যা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থেকেও যেমন চিকিৎসার অব্যবস্থাপনা দেখার সুযোগ হয়েছে, তেমনি দেখেছি বাস্তবে মশক নিধন কার্যক্রম কিতাবে থাকলেও গোয়ালে নেই। আমরা জানি, রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। অথচ ডেঙ্গু মোকাবিলায় এই উভয় ক্ষেত্রেই প্রশাসন করছে নিদারুণ অবহেলা।
সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারের এডিস মশার প্রজনন কেন্দ্রে নিয়মিত মশকবিরোধী অভিযান চালানোর কথা। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় থেকেও এ অভিযান নিয়মিত দেখা যাচ্ছে না। এডিস মশার বিরুদ্ধে পাড়ায় ও বাড়িতে মশকবিরোধী কীটনাশক ছিটানোর জন্য দায়িত্বে লোক আছেন বটে, তদারকির কেউ নেই। বাসার আঙিনায় কালেভদ্রে আমাদের এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটি আসেন। যখনই আসেন তাঁর মনোযোগ যতটা না ওষুধ ছিটানোয়, তার চেয়ে বেশি থাকে অর্থপ্রাপ্তিতে। সিটি করপোরেশন যখন তাদের নিয়োগ দিচ্ছে, তাদের বেতন-ভাতা সেভাবে দিচ্ছে না? তাদের রুটিনও কি ঠিক করে দিচ্ছে না?
প্রাথমিকভাবে শহরকেন্দ্রিক ডেঙ্গু সংক্রমণ এখন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে।
মশার বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে যেমন অভিযোগের অন্ত নেই, তেমনি ছিটানো মশার ওষুধ কতটা কার্যকর– এ নিয়েও আছে প্রশ্ন। আরও প্রশ্ন আছে ডেঙ্গু মোকাবিলায় জনসচেতনতা তৈরিতে প্রশাসনের ভূমিকায়ও। বাসাবাড়িতে পানি না জমার বিষয়ের প্রচার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর কী কী চিহ্ন দেখলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়, সে তথ্যও নাগরিকদের কার্যকরভাবে জানানো জরুরি। জ্বর হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা এবং রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।
চলতি বছর ২১৫ জনের মৃত্যুই প্রমাণ করছে, ডেঙ্গু জ্বর কতটা ভয়ংকর। এডিস মশার আক্রমণে জ্বর শেষ হওয়ার পরই মূলত বিপদের লক্ষণগুলো দেখা দেয়। আমার কন্যার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ডেঙ্গুর পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পরদিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করি মূলত বমি না কমায়। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল নিকটবর্তী হওয়ায় সেখানেই প্রথমে যাই। জানতে পারি, কন্যা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত। স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসকরা তার রক্তচাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। কিছুটা স্বস্তি বোধ করছিলাম এই ভেবে, পরিস্থিতি চিকিৎসকরা বুঝতে পেরেছেন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা জানালেন, রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি সেভাবে হচ্ছে না। এমনকি তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া লাগতে পারে। আবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেই আইসিইউর ব্যবস্থা নেই; অন্য কোথাও নিতে হবে।
সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পর রোগীকে অন্য হাসপাতালে কেন যেতে হবে? সেখানে যারা চিকিৎসা নিতে যান, অধিকাংশেরই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বহন করার মতো পরিস্থিতি থাকে না। আইসিইউতে থাকতে গেলে বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন যে ব্যয় হয়, তা এসব রোগীর নাগালের বাইরে। সে জন্য সব সরকারি হাসপাতালে আইসিইউসহ সকল প্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। না থাকলেও সেখানকার চিকিৎসকদের উচিত অন্য সরকারি হাসপাতালে ব্যবস্থা করে রেফার করা। তা না করলে রোগী নিয়ে অভিভাবকদের সামনে অন্ধকার দেখা ছাড়া পথ থাকে না। তখন তাকে খুঁজতে হয় কোথায় আইসিইউ আছে? গ্রামের কোনো রোগী এলে তার জন্য এটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।
আমাদের যখন বলা হলো, কন্যাকে আইসিউতে নিতে হবে, তখনকার কঠিন পরিস্থিতি বোঝানোর মতো নয়। সরকারি হাসপাতালে খুঁজে ব্যর্থ হলাম। পরে বেসরকারি একটি হাসপাতালে কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের কল্যাণে আইসিইউ পেলাম। দিন দশেক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে গিয়ে বিলের পাহাড় বলার অপেক্ষা রাখে না।
ডেঙ্গু চিকিৎসার কথা যখন সরকার নিশ্চিত করার কথা বলছে, তখন আইসিইউসহ সম্ভাব্য সব চিকিৎসাই নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা দেখার পরও যদি সরকারি হাসপাতালে সে ব্যবস্থা না থাকে, তার চেয়ে হতাশাজনক আর কী হতে পারে! ২০১৯ সালের পর ২০২৩ সালের পরিস্থিতিও ছিল ভয়ংকর। এর পর থেকে বাড়বাড়ন্ত। এত বছর ধরে এক ডেঙ্গু জ্বর যেভাবে মানুষকে ভুগিয়েছে; যেভাবে প্রাণহানির কারণ হয়েছে, তারপরও এটি মোকাবিলায় আজ পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় বছরের পর বছর যে অবহেলা ও উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। হতাশাজনক বিষয় হলো, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে জনতার সরকার এলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন যেভাবে ডেঙ্গুর বিপৎসংকেত দেওয়া হচ্ছে, তা অনতিবিলম্বে আমলে নেওয়া দরকার। নাগরিক জীবনকে এভাবে অবহেলার আর সুযোগ নেই। ডেঙ্গু নিয়ে এখনও যদি সরকারের টনক না নড়ে, তবে আর কত প্রাণ গেলে তারা জাগবে?
সমকালে প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৫, ডেঙ্গুর বিপৎসংকেত এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা