
রোহিঙ্গা ঢলের আট বছরে এসেও সমাধান প্রক্রিয়া যেন তিরতির করে চলছে। সেই তিরতির জলপথও দৃশ্যত চলছে কানাগলির দিকে, যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। চলতি বছরের ১৪ মার্চ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন জাতিসংঘ মহাসচিবকে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘সলিডারিটি ইফতার’-এ অংশ নিয়ে আশা ব্যক্ত করেন– আগামী ঈদ তারা মাতৃভূমিতে করতে পারবে, তখন অনেকের চোখেই আশার আলো দেখা গেছে।
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ওই সময় লিখেছিলাম, রোহিঙ্গাদের ঈদের আনন্দ কতটা বাড়বে (সমকাল, ১৭ মার্চ ২০২৫)। প্রশ্ন করেছিলাম, বাংলাদেশ কি পারবে? কারণ মিয়ানমারের পরিস্থিতির কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জটিলতায় পড়েছে। তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিবাস রাখাইন এখন আরাকান আর্মির দখলে। সেখানে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় রোহিঙ্গারা এখনও প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। ছোট্ট নৌকায় নাফ নদ বা বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিচ্ছে।
পরিস্থিতির জটিলতার পরও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব যে জাতিসংঘ মহাসচিবকে সামনে রেখে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, সেটাই ছিল অনেকের প্রত্যাশার কারণ। শান্তিতে নোবেলজয়ী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন– এ বিশ্বাস ছিল। জানা কথা, রোহিঙ্গা বিষয়টি আর দ্বিপক্ষীয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক সংকট। সে জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা জরুরি। সেখানে ইউনূসের জামানায়ও বিশ্বের সদিচ্ছা দেখা না যাওয়া বরং শঙ্কার কারণ।
হতাশার আরও কারণ আছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বেশির ভাগের জোগানদাতা যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এক বছরের ব্যবধানে দেশটির সহায়তা নেমেছে অর্ধেকের নিচে। তা ছাড়া ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর যে ধরনের নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, আট বছর পর এসেও সে জন্য মিয়নমারকে জবাবদিহি করা যায়নি।
২৫ আগস্ট সামনে রেখে সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, অধিকার, রিফিউজি ইন্টারন্যাশনালসহ ৫৮টি সংস্থা সম্মিলিত বিবৃতিতে ‘এইট ইয়ার্স অন: অ্যাকাউন্টিবিলিটি নিডেড ফর মিয়ানমার অ্যাট্রসিটিজ এগেইনস্ট রোহিঙ্গা’ শিরোনামে মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছে। ২০১৭ সালের সেই গণহত্যা ও নির্যাতনে যেমন মিয়ানমার সামরিক বাহিনী নেতৃত্ব দিয়েছিল, অনুরূপ ২০২১ সালে এসে দেশটিতে যখন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে তারপরও সেখানকার জান্তা সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ থামায়নি। বরং নতুন করে জান্তাবিরোধী আন্দোলনের জন্য বেসামরিক নাগরিকদের নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সে জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে আগে থেকেই তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের আওতায় আনা জরুরি ছিল।
বলাবাহুল্য, মিয়ানমারকে জবাবদিহি করতে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারার পেছনেও দেশটির প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন কাজ করেছে। শক্তিশালী দেশগুলো একমত হয়ে মিয়ানমারকে চাপ দিলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। আমরা দেখেছি, চীন কীভাবে ব্যবসায়িক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ভারতেরও বিনিয়োগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের সমর্থন ও এগিয়ে আসাই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ। সে জন্য বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরতে চায় বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। প্রথম সম্মেলনটি রোববার শুরু হয়েছে কক্সবাজার; দ্বিতীয় সম্মেলনটি হবে ৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে; তৃতীয়টি ৬ ডিসেম্বর কাতারের দোহায়।
রোহিঙ্গা সংকট ক্রমান্বয়ে যখন আন্তর্জাতিক মনোযোগ হারাচ্ছে, তখন এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের উপায় নেই। রোহিঙ্গা নিয়ে আগ্রহ কমার সঙ্গে আন্তর্জাতিক তহবিল কমার সম্পর্কও আছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনের সঙ্গে জড়িত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের বিরুদ্ধে থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আলাপও দেখা যাচ্ছে। তেমনটা হলে পুরো রোহিঙ্গা সংকট অন্যদিকে মোড় নিতে পারে।
এটাও সত্য, আলাস্কায় সাম্প্রতিক ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের পরও ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কোনো সুখবর নেই। বিশ্বের সামনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়, গাজায় গণহত্যা চলছেই। গাজা দখলে ইসরায়েল আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা বিশ্বের নীরবতা ও সমর্থন সেখানে সংকট বাড়াচ্ছে। তারপরও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিশ্ব সম্প্রদায়কেই যুক্ত করতে হবে।
স্বীকার্য, রোহিঙ্গা সমস্যার রাতারাতি সমাধান নেই। তবে বহুমুখী তৎপরতা চালাতেই হবে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি রাখাইন দখলে থাকা আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখার বিকল্প নেই। সব পক্ষকে আস্থায় নিয়েই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে খুব বেশি সময়ও নেই। তবে মুহাম্মদ ইউনূস যদি সফলভাবে ভবিষ্যতের পথ উন্মুক্ত করতে পারেন, তা পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য কাজে দেবে। সেই প্রাণপণ চেষ্টা কি দেখা যাচ্ছে? বিশ্বের বোঝা বাংলাদেশ যেভাবে একাই বহন করে চলেছে, সেখানে আমাদের মরিয়া প্রচেষ্টার বিকল্প কী?