বিজেপির বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছি-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

নির্বাচনে জয়লাভ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়া টুডের মুখোমুখি হন। এই সাক্ষাৎকারে তিনি তার নির্বাচনী লড়াইয়ের পথপরিক্রমা, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং করোনা প্রসঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজদ্বীপ সরদেশাই। ইংরেজি থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

ইন্ডিয়া টুডে: শুরুতেই আপনাকে অভিনন্দন জানাই। আপনি কি এমন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয় আশা করেছিলেন? এবার এমনকি ২০১৬ সালের নির্বাচন থেকেও বেশি ভোট পেয়েছেন…

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: দেখুন, আমার টার্গেট ছিল ২২১টি আসন পাওয়া। কারণ এখন ২০২১ সাল চলে, তাই সিম্বলিক হিসেবে ২২১। এবার নির্বাচন কমিশন যে আচরণ করেছে, তা ছিল ভয়ংকর। কেন্দ্রীয় সরকারসহ সব এজেন্সিও আমাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলকভাবে কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। তারা আমাদের জন্য কাজ করেছে এবং তাদের কারণেই আমরা যুদ্ধে জয়লাভে সক্ষম হই। মাঠে তারাই ছিল আমাদের যোদ্ধা। করোনা-দুর্যোগের এ সময়ে আমরা কোনো ধরনের বিজয় উৎসব পালন করিনি। আমরা করোনা রোগীদের জন্য কাজ করছি। দেশের সবাইকে টিকা দেওয়ার জন্য আমি কেন্দ্রীয় সরকারকে আহ্বান জানাই। তারা যদি এটি না করে, তাহলে আমি অহিংস আন্দোলনে নামব। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য হবে এ আন্দোলন।

ইন্ডিয়া টুডে: আপনি বললেন, আপনার টার্গেট ছিল ২২১। এমন আত্মবিশ্বাস আপনি কীভাবে পেলেন। বিশেষ করে আমরা দেখেছি, বিজেপি এবার খুব আগ্রাসী প্রচারণা চালায়। অনেকে বলেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার ব্যাকফুটে আছে। এরপরও এমন আত্মবিশ্বাসের হেতু কী?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি শুরু থেকেই বলে আসছিলাম, আমরা ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ করব। আর বিজেপি ৭০ আসনের বেশি পাবে না। নির্বাচন কমিশন যদি এভাবে তাদের সহায়তা না করত তারা ৫০টির বেশি আসন পেত কিনা সন্দেহ। আমাদের কাছে অনেকে অভিযোগ করেছেন, তাদের ব্যালট নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের অভিবাদন জানাই। তারাই পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশের জন্য লড়াই করেছেন। আমাদের দেশকে নিরাপদ রাখতে হবে। আমি আমার জন্মভূমিকে ভালোবাসি। ভালোবাসি পশ্চিমবঙ্গকে। পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশকে পথ দেখাবে।

ইন্ডিয়া টুডে: আপনার ভূমিধস বিজয় আমরা দেখছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের হিসাবে নন্দীগ্রামে আপনি হেরেছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: আসলে এটা হারা নয়। সেখানে আবার ভোট গণনার দাবি জানিয়েছি আমরা। নির্বাচন কমিশন ইভিএম মেশিনে কারসাজির চেষ্টা করেছে। অভিযোগ পেয়ে একটি বুথে আমি প্রায় তিন ঘণ্টা বসে ছিলাম। আমাদের ভোটারদের অনেককেই ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। নন্দীগ্রামে আসলে একটি ষড়যন্ত্র হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ষড়যন্ত্র। তাই আমি শুরু থেকেই ভোট পুনরায় গণনার কথা বলেছি। যাতে সেখানে কী ঘটেছে, তা জনগণ জানতে পারে।

ইন্ডিয়া টুডে: নন্দীগ্রামে পরাজিত হওয়া নিয়ে আপনার কোনো আফসোস রয়েছে?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: নন্দীগ্রাম নিয়ে আমি চিন্তিত নই। নন্দীগ্রামে নির্বাচনের ফল আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু বড় বিষয় হচ্ছে, আমি নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের কারসাজির শিকার হয়েছি।

ইন্ডিয়া টুডে: আপনি ২০১১ সালে জিতেছেন, ২০১৬ সালে বিজয়ী হয়েছেন এবং সে পথ ধরে এবারও। এটি কী আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বিজয়? আপনি বলছেন, সবাই আপনার বিরুদ্ধে ছিল। তাহলে এটি কি মমতা ভার্সেস অল?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: আপনি ঠিকই বলেছেন। এ নির্বাচনটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। এই নির্বাচনে বিশেষত নারী ভোটার এবং অন্যরা আমাদের ভোট দিয়েছে। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এটি আমাদের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। এর মাধ্যমে আমরা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলকে চ্যালেঞ্জ করেছি।

ইন্ডিয়া টুডে: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন পশ্চিমবঙ্গের নাম্বার ওয়ান নেতা। এখন আপনার লক্ষ্য কি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে গোটা দেশের দিকে?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: দেখুন, না, আমি নেতা নই। আমি একজন সাধারণ কর্মী। আমি নিজেকে ভিভিআইপি মনে করি না। আমি বিরোধীদলীয় সবার সঙ্গে বন্ধু হিসেবে থাকতে চাই। সব মানুষের সঙ্গে সাধারণভাবে থাকতে চাই।

ইন্ডিয়া টুডে: এ নির্বাচনে আমরা তিক্ত অনেক প্রচার দেখেছি। বিশেষ করে অনেক বিতর্কিত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এ অবস্থায় আপনি কি পারবেন কেন্দ্রের সঙ্গে, বিজেপির সঙ্গে একত্র হয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: আমরা করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করব। করোনা আক্রান্তদের অক্সিজেনসহ সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে আমি মনে করি না, করোনার বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে নির্বাচনের বিষয়টি ইস্যু হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত হবে সব রাজ্যে সমান নজর দেওয়া। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী পক্ষ শাসিত রাজ্যগুলোতে অক্সিজেন ও টিকা সরবরাহ করছে না। তারা নিজেদের দল শাসিত রাজ্যে সেগুলো ঠিকই দিচ্ছে। করোনা অবশ্যই আমার অগ্রাধিকার। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদকে আমি সম্মান করি। তবে রাজনৈতিক দিক থেকে আমি তাদের সঙ্গে আপস করতে পারি না।

ইন্ডিয়া টুডে: অনেকেরই প্রশ্ন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টক্কর দিতে যাচ্ছেন?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলার জনগণ এবারের নির্বাচনে তাদের প্রত্যাশা বুঝিয়ে দিয়েছে। তারা জানিয়ে দিয়েছে, নরেন্দ্র মোদির বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে এবং নতুন নেতৃত্ব আসছে। তারা বুঝে গেছে, কোনো কিছুই ঠিকমতো চলছে না। আমরা যদি সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতাম, তাহলে করোনা পরিস্থিতি এমন হতো না। আজ মহারাষ্ট্র, দিল্লিসহ অনেক রাজ্যে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমার নিজের রাজ্যেও পরিস্থিতি গুরুতর। কেন্দ্রীয় সরকার যদি বসে বসে ছয় মাস নষ্ট না করত, তাহলে এ পরিস্থিতি হতো না। উপরন্তু বিজেপি নির্বাচনী প্রচারণার নামে গ্রামে গ্রামে গিয়ে করোনা ছড়িয়ে দিয়েছে। আর আমাদের লোকজনকে ভোট গণনাকেন্দ্রে যেতে দেয়নি। নির্বাচন কমিশন জেনেবুঝে এই বৈষম্য করেছে।

ইন্ডিয়া টুডে: নির্বাচন কমিশনের প্রতি আপনার অনেক অসন্তোষ…

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: এখানে ব্যক্তিগত অসন্তোষের কিছু নেই। আমি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে সম্মান করি। কিন্তু আমরা নির্বাচনী পদ্ধতির সংস্কার চাই। এ জন্য আমাদের সুপ্রিম কোর্টে যেতে হবে। এ বিষয়ে একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করা দরকার। যাতে করে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন কমিশনারদের মনোনয়ন দিতে না পারে। আপনি বিস্মিত হবেন, পশ্চিমবঙ্গে দুইজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে এবং তারা মর্জিমাফিক সবকিছু করেছে।

ইন্ডিয়া টুডে: এই লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন পর্যায় ছিল কোনটি?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি ৫১ দিনের র‌্যালি করে বলেছি আমার তরুণ ভোটারদের, তারা অনেক কঠিন কাজ করেছে। নারী ভোটাররা আনুপ্রাণিত হয়েছে। আমাদের দুটি স্লোগান ছিল- ‘খেলা হবে’ এবং জয় বাংলা। এই স্লোগান আমাদের অনুপ্রেরণা।

ইন্ডিয়া টুডে: নারী ভোটাররা সবসময়ই আপনাকে ভোট দেয় কেন?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: নারীরা আমাদের গৌরব। তারা ঘরে যেমন কাজ করে, তেমনই বাইরেও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন প্রজন্মও আমাদের ভোট দিয়েছে। সবাই মিলে তৃণমূলকে বিজয়ী করেছে।

ইন্ডিয়া টুডে: আপনি কি আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন? যেভাবে বিজেপি উঠেপড়ে লাগছিল?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি কখনই আশা ছাড়ি না। আমি সবসময় আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। তৃণমূল পর্যায়ে আমি মানুষের চোখ দেখলেই তাদের প্রত্যাশার কথা বুঝি। আমি জানি কীভাবে ভোট করতে হয়। যে কারণে ডাবল সেঞ্চুরির প্রত্যাশা করেছিলাম।

ইন্ডিয়া টুডে: আপনি এবারের নির্বাচনে অধিকাংশ আসন পেয়েছেন। আপনি কি আপনার শাসন ‘স্টাইল’ পরিবর্তন করবেন?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: না আমি নিজেকে পরিবর্তন করব না। আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমি রাজপথ থেকে যুদ্ধ করে উঠে আসা রাজনীতিক। আমার রাজনীতির স্টাইলই আমি বজায় রাখব।

ইন্ডিয়া টুডে: রাজনীতিতে আপনি দীর্ঘদিনের যোদ্ধা। টানা তিনবারের জয়ে আপনার কাছে প্রশ্ন, বামদের নাকি মোদি-শাহদের পরাজিত করা কঠিন?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: বামদের নির্দিষ্ট আদর্শ রয়েছে, কংগ্রেসের কিছু আদর্শ রয়েছে। কিন্তু মোদি-শাহদের আদর্শ কিছুটা ভিন্ন। তাদের বাড়াবাড়ি অগ্রহণযোগ্য। আপনি তাদের বিশ্বাস করতে পারেন না। তারা যে কোনো কিছু করতে পারে। তারা হাসিমুখেই যে কোনো কিছু করতে পারে। তারা দাঙ্গা করতে পারে, ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করতে পারে। তাদের নিয়ে আসলে কথা বলতে চাই না।

ইন্ডিয়া টুডে: নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালে আপনি কি কখনও হেরে যাওয়ার ভয় পেয়েছিলেন?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: আমরা লড়াই করি, আমরা মরার ভয় পাই না। আমাদের স্লোগান হচ্ছে, আমরা কাজ করব, লড়াই করব, জিতব। সেটা আমরা করেছি।

ইন্ডিয়া টুডে: আপনার কাজের ক্ষেত্রে কারা আপনার প্রেরণা?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: পশ্চিমবঙ্গের মাটি আমার প্রেরণা।

ইন্ডিয়া টুডে: জয় বাংলা স্লোগান থেকেই কি শক্তি পেয়েছেন?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: এই স্লোগানের মধ্যে আমরা বাংলাকে গৌরবান্বিত করছি। যে কেউ তার মাতৃভূমিকে গৌরবান্বিত করতে চাইবে।

Post By মাহফুজ মানিক (481 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *