Category Archives: পাঠোদ্ধার

৫০০!

আলহামদুলিল্লাহ। আমার ওয়েবসাইট তথা মাহফুজমানিক ডট কমের ৫০০তম পোস্ট এটি। ব্যক্তিগত পাঁচশত পোস্ট হওয়ার তাৎপর্য এটাই যে, এটি আমার লেখালেখি জীবনের একযুগের অধিককালের সঞ্চয়। এখানে আমার বিপুল অধিকাংশ কাজের লিখিত রূপ রয়েছে; সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কলাম আছে; রয়েছে অনুবাদ এবং সাক্ষাৎকার। বই আলোচনা কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ আছে। আছে ভিন্ন কিছুও।

বলেনিই, ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর এ ওয়েবসাইটের ২০০তম পোস্ট হওয়া সংক্রান্ত ডাবল সেঞ্চুরি শিরোনামে একটা লেখা লিখেছিলাম। ক্রিকেটীয় অভিধা দিয়ে সেটি লিখেছিলাম বলে বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতের অন্যতম তারকা সাংবাদিক রানা ভাই (রানা আব্বাস) ক্রিকেটীয় উদাহরণ দিয়েই তখন এই মন্তব্য করেছিলেন- ‌’আপনার ২০০তম লেখার জন্য অভিনন্দন! 🙂 আশা করি একদিন এটা ৪০০তম হবে। তখন আপনি ক্রিকেট বরপুত্র লারার রেকর্ডটি স্পর্শ করবেন। তিনি একবার ৪০০ (নটআউট) করেছিলেন; যেটি টেস্টম্যাচের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান। আর ৪০১ হলে লারার রেকর্ডও ভেঙে যাবে। বোধ করি লারা তাতে অখুশি হবেন না। কেননা তিনি জানবেন, যোগ্য লোকটিই তাঁর রেকর্ড ভেঙেছেন!’
মন্তব্যটি অবশ্য রানা ভাইয়ের উদারতার প্রমাণ। ৫০০তম পোস্ট লিখতে এসে সে উদাহরণ আনলেও আহামরি কিছু করেছি বলে মনে হয় না। কারণ বলাচলে এসব অধিকাংশ আমার পেশাগত কাজেরই অংশ। তারপরও আনন্দের জায়গা এটাই যে আমার কাজগুলো এক জায়গায় রয়েছে। যদিও প্রতিবছরই যখন ওয়েবসাইটটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, ডোমেইন হোস্টিং মিলে রিনিউ চার্জ যা-ই হোক, এক মুঠে দিতে কিছুটা কষ্টই হয়। তারপরও ভালো লাগে। আন্তরিকভাবে আমি ওয়েবসাইটে লেখাগুলো আপ করি। অন্যদের না হোক, নিজের লেখার রেফারেন্সের প্রয়োজনেও এই ওয়েবসাইটই আমার প্রধান ভরসা। Continue reading

বঙ্গবন্ধুর জবানিতে ফজিলাতুন্নেছা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠার পেছনে যে মহীয়সী নারীর নেপথ্য ভূমিকা আমরা দেখি, তিনি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর দুটি গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’র উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী ‘রেণু’। বৃহৎ সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি অর্থসহ রাজনীতিতে নানাভাবে সহযোগিতা করে কীভাবে অনুপ্রেরণাদাত্রী হিসেবে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ভূমিকা পালন করেছেন, সে এক বিস্ময়। জেলবন্দি বঙ্গবন্ধুর কাছে জরুরি খবর, কর্মীদের কাছে নেতার নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়াসহ বহুমুখী ভূমিকা পালন করেছেন ‘বঙ্গমাতা’।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ঘটনাপর্ব ১৯৪৩ থেকে ১৯৫৫। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লেখার প্রেরণা হিসেবেই বঙ্গবন্ধু সহধর্মিণীর কথা বলেছেন- “আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’ আমার স্ত্রী- যার ডাকনাম রেণু- আমাকে কয়টা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।”

বঙ্গবন্ধু জীবনী লিখতেই বংশপরিচয় পর্বে আবার রেণুর প্রসঙ্গ। ‘আমার দাদার চাচা এবং রেণুর দাদার বাবা কলকাতা থেকে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে চলে আসেন বাড়িতে। …রেণুর দাদা আমার দাদার চাচাতো ভাই। তিনি তাঁর জীবনী লিখে রেখে গিয়েছিলেন সুন্দর বাংলা ভাষায়। রেণুও তার কয়েকটা পাতা পেয়েছিল যখন তার দাদা সমস্ত সম্পত্তি রেণু ও তার বোনকে লিখে দিয়ে যান তখন। রেণুর বাবা মানে আমার শ্বশুর ও চাচা তাঁর বাবার সামনেই মারা যান। মুসলিম আইন অনুযায়ী রেণু তার সম্পত্তি পায় না। রেণুর কোনো চাচা না থাকার জন্য তার দাদা সম্পত্তি লিখে দিয়ে যান। আমাদের বংশের অনেক ইতিহাস পাওয়া যেত যদি তাঁর জীবনীটা পেতাম। রেণু অনেক খুঁজেছে, পায় নাই।’

কৈশোরেই কীভাবে শেখ মুজিব ও ফজিলাতুন্নেছার বিয়ে হয়, এ ব্যাপারে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলা হয়েছে- “একটা ঘটনা লেখা দরকার, নিশ্চয়ই অনেকে আশ্চর্য হবেন। আমার যখন বিবাহ হয়, তখন আমার বয়স ১২-১৩ বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাওয়ার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাবো।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হল। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধ হয় তিন বছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তার মা মারা যান। Continue reading

অপরাধবোধ এবং এক নিষিদ্ধ গল্প!


উপন্যাস- গল্পটি শুনতে চেয়ো না
লেখক- সোহেল নওরোজ,
প্রকাশক- দেশ পাবলিকেশন্স
প্রচ্ছদ- সোহানুর রহমান অনন্ত

নাই কাজ তো খই ভাজ। লেখক বলছেন, না খইও ভাজা যাবে না; কারণ এটাও একটা কাজ। অলসভাবে শুয়ে থাকাটাই হতে পারে কাজহীন অবস্থা কাটানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। যদিও এর সঙ্গে ‘গল্পটি শুনতে চেয়ো না’ উপন্যাসের মূল ‘গল্পের’ কোনো সম্পর্ক নাই। তাহলে গল্পটা কী। যে গল্পটি শুনতে চাওয়া বারণ? যে গল্পটি হাফিজুল হক তার মেয়ে অর্পাকেও শুনতে দেননি। গল্পটা ঠিকই সোহেল নওরোজ পাঠকদের শুনিয়েছেন। কিন্তু সব পাঠকই যে তা ধরতে পারবে, সে নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। লেখকের মুনশিয়ানা বোধহয় এখানেই।

মোচড়ের পর মোচড় আর মন খারাপ করে দেওয়া উপন্যাসটি শুরু হয়েছে হাফিজুল আর মেয়ে অর্পার কথোপকথন দিয়ে। হাফিজুল হক লেখক মানুষ। একটি উপন্যাস তিনি দাঁড় করাচ্ছেন। উপন্যাসের চরিত্রগুলো লেখার সঙ্গে সঙ্গে হাতেও আঁকছেন। প্রথমে এসেছে এতিমখানার নাহিদ আর অনিকেত। মেধাবী নাহিদ অনিকেতের খপ্পরে পড়ে সামান্য অন্যায়ের শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে এক রাতে বেরিয়ে পড়ে অজানার উদ্দেশে। তারা ওঠে অনিকেতের পরিচিত এক কাকির বাসায়। সেখানে নাহিদকে চিঠি দিয়ে আবারও অনিকেতের নিরুদ্দেশ যাত্রা। এরপর নাহিদকে কেন্দ্র করে আগায় উপন্যাসটি। যেখানে নাহিদের এগিয়ে চলার প্রেরণা ছিল অনিকেতের চিঠি। Continue reading

হৃদয়ের গল্প

নির্মল সাদা কাগজে অসহায় কালো কালি জীবন্ত হয়ে ওঠে লেখকের তুলির আচড়ে। পাঠকের হৃদয়ে নিশ্চল শব্দ আলোড়িত করে লেখকের লেখা। লেখকের মুন্সিয়ানা, লেখার ঢং, জীবন অভিজ্ঞতা, জানার পরিধি ফুটে ওঠে তার লেখায়। পাঠকের কাছে বিষয় সহজে উপস্থাপনার মাধ্যমেই লেখকের সফলতা।

পড়ার ক্ষেত্রে পাঠকের আগ্রহ থাকে গল্প। কারণ গল্প যে মানুষের জীবনই তুলে ধরে। কোনোটা নিজের সঙ্গে মিলে যায়, কোনোটা কানের পাশ দিয়ে যায়। আবার কোনোটা যেন পরিচিত কারও জীবনকাহিনী। সোহেল নওরোজের ‘প্রেমের আলামত পাওয়া যায়নি’ ঠিক তেমন গল্পের বই। ১৪টি গল্পের প্রতিটির আয়নায় পাঠক হয়তো নিজের মুখই দেখবেন। কিংবা তা পাঠকের পারিপাশর্ি্বকতারই গল্প। ‘রোদচশমা’ এ ক্ষেত্রে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যেসব অন্যায় সংঘটিত হয়, সেগুলো খালি চোখে সহ্য করা সত্যিই কঠিন। তাই গল্পের রাশেদ চোখে কালো চশমা পরে থাকে। আইডিয়া ও গল্পের নামের প্রশংসা এখানেই করতে হবে। তবে জীবনঘনিষ্ঠ বললে ‘হিডেন ফোল্ডার’ গল্পের কথা বলতেই হবে। গল্পটির কলেবর একটু বড়, তবে রহস্যটা বোধহয় শেষেই। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পর যে ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা এবং একে অপরকে গুরুত্ব ও সময় দেওয়ার ব্যাপার রয়েছে, তার বিপরীতটা ঘটলে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। তাতে হিডেন ফোল্ডার তথা কম্পিউটারের মতোই হৃদয়ের গোপন কোনো কুঠুরিতে দুঃখ জমা হয়। সুখের সংসার হলে সেখানে সুখও জমা হতে পারে। অবশ্য ‘চুপ’ গল্পটিও এদিক থেকে কম শিক্ষণীয় নয়। কাজের ক্ষেত্রে যোগ্যতাই মূল মাপকাঠি; তেলবাজি কখনোই তার সমকক্ষ হতে পারে না। চুপ গল্পের পরতে পরতে পাঠক শিক্ষা পাবেন- ‘যোগ্য ও সৎ শত্রুর চেয়ে তেলবাজ ও অসৎ বন্ধু উত্তম হতে পারে না’। বলাবাহুল্য, পাঠক সোহেল নওরোজের বইটিতে সব গল্পই উপভোগ করবেন। গল্পের ভেতরে শিক্ষার বিষয়টি সচেতন পাঠকই ধরতে পারবেন।
Continue reading

কল্পনায় জীবন্ত গল্প

রাফিক হারিরির ফুলবানু ও অন্যান্য গল্প পড়ে চরিত্রদের কথা চিন্তা করি। ফুলবানু, হাবিবুল্লাহ, নুরু, হাজেরাদের কথাই বারবার মনে পড়ছে। কত শত চরিত্রের মাঝে কবি চরিত্রটাও ভোলার মতো নয়। ৩৩টি গল্পে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চরিত্র রয়েছে। একেকটা গল্প ধরে হয়তো বর্ণনা করা যাবে। কিন্তু মোটের ওপর কয়েকটি চরিত্র হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। চরিত্র কতটা শক্তিশালী তা লেখকের ওপর নির্ভর করে। লেখকের চিত্রায়ন পাঠক অনুধাবনের চেষ্টা করে। কখনও কখনও পাঠকের কাছে তা জীবন্ত হয়ে ওঠে। হয়তো পাঠক নিজের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে, পরিচিতজনের সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করেন। ভাবেন, ওর জীবনে তো ঠিক এমনটাই ঘটেছে। একইভাবে লেখকও তার অভিজ্ঞতা থেকেই চোখের সামনে ঘটনাগুলোই তার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেন। হাজেরার কথাই ধরা যাক। প্রতিনিয়ত শাহবাগের পথে কত হাজেরার দেখাই না আমরা পাই। আমাদের কাছে সে হয়তো হাজেরাই। কিন্তু লেখকের কাছে সে অন্য কিছু। রাফিক হারিরি তাকে কল্পনা করেছেন ছায়াময়ী হিসেবে,যে ঘুরে ঘুরে ফুল বিক্রি করে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী সে। কিন্তু গল্পটা যে তার কুকুরকে নিয়ে। লেখক যাকে বিপদের ত্রাণকর্তা হিসেবে এনেছেন। সে এক অসাধারণ গল্প। রাফিক হারিরির এ রকম প্রতিটি গল্পই মোড় ঘুরানো। পাঠক গল্পগুলো পড়ে চমৎকৃত না হয়ে পারবেন না। Continue reading

গল্প ও জীবন- সমানে সমান

Dana Vanga Shaliker Shukhগল্প আর জীবনের দুরত্ব কতটুকু? লেখকের কাছে এর উত্তর হয়তো আছে। একেকজন একেকভাবে সেটা বলতে পারেন। তবে এটা মনে হওয়াও বিচিত্র নয় যে, এ দুয়ের মাঝে বিশেষ কোন দুরত্বই নেই। গল্পকার গল্প বানান ঠিকই আছে। তা জগতের বাইরের কিছু নয়। মানুষেরই গল্প। মানুষের হাসি-কান্না-সুখ-দুঃখের গল্প। ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কিংবা অন্য কোন জীবনের গল্প। সেখানে গল্প ও জীবন চলে সমানে সমান। জীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার যার যত বেশি সে তত শক্তিশালী লেখক বা গল্পকার।
এ জন্য লেখক হওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা চোখ লাগে। সাধারণ মানুষ কোন কিছু দেখে যখন হাঁসে কিংবা কাঁদে লেখক কেবল তা-ই করে না, এর ভেতর থেকে লেখাটাও তৈরি করে নেয়। গল্পকার গল্প সাজায়, একেকটা ঘটনা একেকটা অভিজ্ঞতা দেয়। তা নিয়ে গল্প লেখা হয়। তাতে এমন অনেক বিষয় উঠে আসে যেটা হয় চাক্ষুষ নয় অন্তরের বিষয়। কিন্তু গল্পকারের চোখে ধরা না পড়ে পারে না। সে গল্প পড়ে পাঠকও আশ্বর্য হয়। ভাবে এ যে তারই গল্প, তারই আত্মকথা।সোহেল নওরোজের ডানাভাঙা শালিকের সুখ তেমনি এক গল্পগ্রন্থ। নামের সঙ্গে সুখ থাকলেও ১৬ টি গল্পে কেবল সুখই নেই বেদনাও আছে, আশা নেই হতাশাও আছে, ভালো লাগা নেই মন্দ লাগাও আছে। গল্পের একেকটা শিরোনামই যেন সে অবস্থা বলে দেয়। বোধের দরজায় বৃদ্ধ বাবার সামনে এক কঠিন বাস্তবতা হাজির হয়। তার করুণ মৃত্যু পাঠককে অশ্রুসিক্ত না করে পারবে না। রোদবলিকা, টান কিংবা দোলাচল যেন নিঃশ্বাসে মিশে থাকা গল্প। এর মাঝেও সানাউল্লাহর কাহিনী আর অভিশপ্ত রাত তুমিগ্রস্ত আঁধারের মতই করুণ। Continue reading

নদীর বাঁকে জীবনের সুর

উপন্যাস: বলেশ্বরী পেরিয়ে

উপন্যাস: বলেশ্বরী পেরিয়ে

বলেশ্বরী বা বলেশ্বর (Baleswar) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিরোজপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা জেলার একটি নদী। একে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা মিহির সেনগুপ্ত। এত নিখুঁত বর্ণনা যে, এটি পড়লে কেউ হয়তো ভাবতেই পারবেন না_ লেখক বাংলাদেশের নন। আসলে বাংলাদেশে বাস না করলেও লেখকের জন্ম কিন্তু বলেশ্বরীর কাছেই। বরিশালে তার জন্ম দেশবিভাগের অব্যবহিত পরই, ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই ১৯৬৩ সালে পাড়ি জমান পশ্চিমবঙ্গে। উপন্যাসটি হয়তো তারই জীবন কাহিনী কিংবা তার দেখা কারও। উপন্যাসে যদিও মূল চরিত্র সুপর্ণ ও শ্যামশ্রী। হয়তো পশ্চিমবঙ্গ থেকেই তারা এসেছেন। ‘বলেশ্বরী পেরিয়ে’ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য শ্যামশ্রী বাপের বাড়ি যাবে। বাংলাদেশে বছরে এক-দুইবার আসে। বলেশ্বরী নদীর ঘাট থেকেই কাহিনী শুরু। ঘাটে এসেই সুপর্ণ ও শ্যামশ্রী তাদের পরিচিত মুচকুন্দকে পেয়ে যায়। মুচকুন্দকে নিজেদের গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। বলেশ্বরী পেরিয়ে গাড়ি চলছে গন্তব্যে, আর চলছে গালগল্প। এভাবে অনেকটা পারস্পরিক কথাবার্তা, আলোচনার ঢঙেই শেষ হয় উপন্যাসটি। গাড়িতে মুচকুন্দ ও তারপর বাড়িতে পেঁৗছে পরিচিত নানা মানুষের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথোপকথন। যেখানে উঠে এসেছে এখানকার সমাজ জীবন, গ্রামীণ জীবন, সাম্প্রতিক পরিবর্তন, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ ইত্যাদি। বোদ্ধাদের কাছে হয়তো উপন্যাসটি দুই বাংলার মানুষের সম্পর্ক, সম্পর্কের সূত্র ও ঐতিহাসিক বিষয় হিসেবেও হাজির হবে। ‘বলেশ্বরী পেরিয়ে’ এটি পেঁৗছে গেছে মানুষের জীবনে। Continue reading

গ্রাম জীবনের উপাখ্যান

Cover-Mayar-Kajolবজর উদ্দির পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও হাবিবুর রহমান জুয়েলের মায়ার কাজল নির্বিশেষে গ্রামের মানুষের জীবন ও সংগ্রামের এক অনুপম চিত্র। যদিও বজর উদ্দির চরিত্র নেতিবাচক। জুয়াখোরের কারণে একটি পরিবারে কেমন বিভীষিকা নেমে আসতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ বজর উদ্দি। জুয়ার টাকা জোগাড় করার জন্য যে কেবল স্ত্রী রাবেয়ার যত্নে লালিত হাঁস-মুরগিসহ অন্যান্য জিনিসপত্র গোপনে বিক্রিই করেনি, কাফনের টাকাও গায়েব করেছে। এমনকি নিজের ছেলে সন্তানকে বিক্রি করতেও ক্ষান্ত হয়নি। জুয়ার নেশা মানুষকে কতটা পশুতে পরিণত করে তা উপান্যসটি পড়লে পাঠক বুঝবেন। কোনো কোনো দিন চুলায় দু’বেলা হাঁড়িও চড়ে না, অথচ নির্বিকার বজর উদ্দি জুয়ার আসরে মশগুল।
তার পরও মায়াই প্রধান। মায়ার কাজল যেন তা-ই বারবার প্রমাণ করেছে। বজর উদ্দির হাতে টাকা নেই, মাথায় রাগ। রাবেয়াকে মারতে গিয়ে লুঙ্গি ছিঁড়ে ফেলে। রাবেয়ার খেদ নেই। বরং বলে ‘লুঙ্গিডা খুইলা রাখেন, ছিলাইয়া দিমু’। বজর উদ্দি সে মায়া বোঝে না। জুয়াই তার সব। সে বোঝে না, তার জন্য সন্তানরা সমাজে মুখ দেখাতে পারে না। রাবেয়া মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে কোনো রকম খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করে। বজর উদ্দি পরিবারের এ দুঃসময়ে একজনই বোধহয় সহানুভূতিশীল, সে তার ভাইয়ের ছেলে হারুন। এর পেছনের ‘কিন্তু’টা যে বজর উদ্দির মেয়ে বিলু। Continue reading

জীবন ও দ্রোহের কবিতা

Poem-didarহোসাইন মোহাম্মদ দিদারের ‘কাছে থেকো হৃদয়ের’ ও ‘সর্বাঙ্গে তোমার বিচরণ’ দুটি কবিতার বই। তাকে প্রেমিক কবি বলা যায়। উভয় বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় বইয়ের নামের ওপর ব্র্যাকেটে তা পাঠকদের কাছে স্পষ্ট করেছেন। প্রথমটিতে লিখেছেন প্রেম ও দ্রোহের শ্রেষ্ঠ কবিতা নিয়ে। আর দ্বিতীয়টিতে লিখেছেন জীবন ও প্রেমের শ্রেষ্ঠ কবিতা নিয়ে। বলাবাহুল্য, কবির অসংখ্য কবিতা থেকে বাছাইকৃত শ্রেষ্ঠ কবিতাই বই দুটিতে স্থান পেয়েছে। তবে উভয়টিতেই প্রেম কমন। বইগুলো দেখে তাই কবি কিসের প্রেমিক তা খোঁজার চেষ্টা করি। ‘তোমরাই ঋণী’ কবিতায় পেয়েও যাই। তিনি লিখেছেন_ ‘এই দিনমজুর, বস্তিবাসী না থাকলে/তোমাদের মিছিল জমবে না। জমবে না সমাবেশ। রক্তাক্ত করতে পারবে না/মিছিলে মিছিলে রাজপথ। তোমরাই ঋণী তাদের কাছে।’ কবি দিনমজুরের কথা বলেছেন। তিনি আসলে মানবপ্রেমী। অবশ্য তাকে কেবল প্রেমের ফ্রেমে আবদ্ধ করা কঠিন। তিনি তার কবিতায় স্বাধীনতার কথা বলেছেন। বলেছেন গণতন্ত্রের কথা, স্বপ্নের কথা। মৃত্যুর কথাও এসেছে কবিতায়। ভালোবাসার কথা তো আছেই। কবি ও কবিতার বন্দনা গেয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তারুণ্যের জয়গান গাইতেও ভোলেননি। কবি নামক কবিতায় তা-ই স্পষ্ট হয়_ ‘আমি রবির দলের তরুণ কবি’। তরুণ কবি দিদার নানা উপমা কবিতায় এনেছেন। সেসব তার কবিতার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে। তিনি লিখেছেন_ এতো দিন হৃদয় মহলের/সব দরজা-জানালা/খোলা ছিলো/ছিলো না কোনো প্রহরী। আরও লিখেছেন_ আমাকে সোনা ভেবে/ হাতে তুলে নিয়ে/আবার মাটির দলা মনে করে/ ছুড়ে ফেলে দিলে। এ রকম নানা জায়গায় অসাধারণ উপমা পাঠককে ধরা দেবে। কবি অবশ্য কবিতায় প্রকৃতির কথাও ভোলেননি। ভোলেননি দেশমাতৃকার প্রতি মানুষের দায়িত্বের কথা। Continue reading

স্বর্ণদ্বীপের ছবি

bookশিশু-কিশোর উপযোগী গল্প লেখা কঠিন কাজ। ‘স্বর্ণদ্বীপের ছেলে’তে তা সহজ করে দেখিয়েছেন লেখক মাসুদ আনোয়ার। শিশু বা কিশোরদের জন্য লিখতে গেলে গল্প ও ভাষা উভয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয়। কঠিন কোনো বিষয় এলে তাকে সহজ করে উপস্থাপন করতে হয়। মনোযোগ ধরে রাখতে কিংবা আকর্ষণ বাড়াতে শিশুতোষ নানা উপ-গল্পের আশ্রয় নিতে হয়। ‘স্বর্ণদ্বীপের ছেলে’ তারই প্রমাণ।
‘উপনিবেশ টুপনিবেশের গপ্পো’, ‘যুদ্ধের কাল’, ‘ওয়াক থু’, কিংবা ‘মেঘের দুপুর’_ প্রত্যেকটি গল্পই আলাদা। লেখক কেবল গল্প লিখেই ক্ষান্ত হননি; নির্দিষ্ট বার্তা দিয়েছেন, কিশোর মনের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন, অজানা বিষয় জানিয়েছেন। গল্পগুলোর কোনোটিতে গল্পের ছলে ইতিহাসের কথা এসেছে। কোনোটায় দেশ স্বাধীন করার জন্য কিশোর মনে যুদ্ধে যাওয়ার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। আবার কোনোটিতে এসেছে স্বপ্নের কথা। একই সঙ্গে কোনোটা হাসির গল্প, কোনোটা কান্নার। আনন্দ-বেদনা-আবেগ-আকাঙ্ক্ষার সম্মিলন ঘটিয়েছেন লেখক। তবে কোনোটাই কিশোর বয়সের বাইরে যায়নি।
Continue reading