Mahfuzur Rahman Manik
শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্প খাতের সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে
সেপ্টেম্বর 5, 2022

সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মাহফুজুর রহমান মানিক

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে ২০২০ সালে অবসরের পর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের এই ফেলো ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া থেকে ১৯৮৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি এবং ১৯৮২ সালে থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি পদকপ্রাপ্ত মোহাম্মদ কায়কোবাদের জন্ম ১৯৫৪ সালে মানিকগঞ্জে।

সমকাল: সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষার ডিপ্লোমা কোর্সের মেয়াদ তিন বছরে নামিয়ে আনার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী। সংশ্নিষ্টরা চার বছর মেয়াদ রাখার জন্য আন্দোলন করছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: বর্তমানে চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে। হঠাৎ করে কীসের ভিত্তিতে সময় কমানো হচ্ছে? যদি এমন কোনো গবেষণা হতো, যার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে চার বছরের প্রয়োজন নেই, তিন বছরেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে কিংবা চার বছরের দক্ষতা তিন বছরেই অর্জন সম্ভব তাহলে এটা নিয়ে কথা বলা যেত। যদিও আমি বিশ্বাস করতে চাই কোর্সের সময়কালের এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পেছনে যথেষ্ট গবেষণা করা হয়েছে; তবে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সমকাল: যেখানে কারিগরি শিক্ষার মৌলিক ব্যাপারে সমস্যা রয়ে গেছে, সেগুলোর সমাধান না করে মেয়াদ নিয়ে কথা উঠছে কেন?

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: সেটাই আমি বলছি। যতদূর জানি, কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট প্রবল। সেখানে ল্যাব সংকট তো আছেই, হাতে-কলমে শিক্ষার ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়। সেখানেই আগে নজর দেওয়া দরকার। কোর্স সংক্ষিপ্ত করলে বরং শিক্ষা-দক্ষতা অর্জনে আরও ক্ষতি হবে। মেয়াদ কমানোর বিরোধিতাকারীরা বলছেন, চার বছর হলে সরকারি দশম গ্রেডে চাকরি করতে পারেন আর তিন বছর হলে তাঁরা আরও দুই ধাপ পিছিয়ে যাবেন।

সমকাল: তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু হলে কারিগরি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আরও কমবে? এ বছর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ৭৮ শতাংশ আসনই খালি।

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ৭৮ শতাংশ আসন খালি থাকার বিষয়টি একদিকে এ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কম থাকার পরিচায়ক বটে এবং এটা আমাদের একটি শঙ্কার কারণ। নানা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অর্জিত বিদ্যার ব্যবহার পেশাজীবনে ব্যবহার করতে না পারার চেয়ে কারিগরি শিক্ষা লাভ করে সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় দেখা দরকার। দেখা যাচ্ছে সরকারি পলিটেকনিকগুলোর আসন পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু খালি রয়েছে বিপুল বেসরকারি পলিটেকনিকের আসন। বেসরকারি পলিটেকনিকে শিক্ষার্থীদের ভর্তি না হওয়ার কারণ একটা হতে পারে- ফি বেশি। আবার সেগুলোয় শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকার কারণেও শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হচ্ছে না।

সমকাল: কারিগরি শিক্ষার প্রতি সরকার জোর দিচ্ছে, অথচ প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী পাচ্ছে না?

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: কারিগরি শিক্ষার প্রতি সরকার গুরুত্ব দিয়ে আসছে, এটা অন্তত কর্তাব্যক্তিদের কথায় স্পষ্ট। কিন্তু বাস্তবে এ শিক্ষার জন্য জরুরি করণীয় অনেক জায়গায়ই হাত দেওয়া হয়নি। এমনকি গুরুত্বের সূচক হিসেবে আমরা যদি দেখি বাজেটেও এ শিক্ষার বরাদ্দ অনুদার কিংবা যথাযথ নয়। এখানে বরাদ্দ না বাড়ালে কীভাবে উন্নয়ন সম্ভব? তা ছাড়া প্রশাসনিক অন্যান্য বিষয় যদি আমরা দেখি, কীভাবে এতসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হলো? শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠানকে চলতে দেওয়া কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। আমার মনে হয়, বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর মানসম্মত কিংবা গ্রহণযোগ্য করতে নিবিড় যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে প্রচার-প্রচারণায়ও ঘাটতি কম নয়।

সমকাল: কী ধরনের প্রচার-প্রচারণার কথা বলছেন?

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: যদি বোঝানো যায়, সাধারণ উচ্চশিক্ষায় না দিয়ে কারিগরিতে সন্তানদের দিলে সহজেই আয়ের পথ মিলবে কিংবা কেউ বেকার থাকবে না কিংবা নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিজেই করতে পারবে- তবে অভিভাবকরা এদিকে মনোযোগী হতে পারেন। দেশের উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে। প্রকৃতপক্ষে প্রতি বছর নানা বিষয়ে পড়ালেখা করে কর্মজীবনে প্রবেশ করার হারও প্রকাশ করা যেতে পারে; যাতে করে ছাত্র ও অভিভাবকরা কোন ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করা যায় সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

সমকাল: কারিগরি শিক্ষায় এখন ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন, যা ২০৪১ সালে ৫০ শতাংশে করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা সুদূরপরাহত?

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: প্রথম কথা হলো, কারিগরি শিক্ষায় এখন ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ছে কিনা- এ পরিসংখ্যান নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলছেন বাস্তবে সংখ্যাটি আরও কম। তারপরও এ হিসাবটি ধরেও যদি আমরা বলি, কারিগরি শিক্ষায় বর্তমান যে বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে তাতে ৫০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা সুদূরপরাহত ভাবা অমূলক নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কারিগরি শিক্ষার যে চাহিদা এবং সময়ের আলোকে প্রয়োজন তাতে এ লক্ষ্য যথার্থ। দেখুন যাঁরা বিসিএস পাস করছেন, তাঁদের অধিকাংশই এখন নিজেদের বিষয়ে চাকরি করছেন না। তাঁদের পেছনে উচ্চশিক্ষায় সরকারের কিংবা জাতির যে বিনিয়োগ তা সরাসরি কাজে আসছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে অনেক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করেন, কিন্তু তাঁরা তাঁদের অর্জিত বিদ্যা যথাস্থানে প্রয়োগ করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কারিগরি শিক্ষাকে জনপ্রিয় করতে পারলে এবং একে 'মেইনস্ট্রিম' করতে পারলে ৫০ শতাংশের লক্ষ্যপূরণ অসম্ভব নয়।

সমকাল: বিদেশে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বের কথাও বিবেচনাযোগ্য।

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: জাপান কিংবা জার্মানিতে কারিগরি শিক্ষা অনেক গুরুত্ব পাচ্ছে। জার্মানিতে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তাদের মোট শিক্ষার্থীর ৭৩ শতাংশ, জাপানে তা ৬৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৬৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৬০ শতাংশ, চীনে ৫৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ এমনকি মালয়েশিয়ায় ৪৬ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে তা মাত্র ১৭ শতাংশ। আমাদের যেসব শ্রমিক বিদেশ যান, তাঁদের যদি আমরা কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠাতে পারতাম, তাহলে তাঁরা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে অনেক বেশি বেতন ও মর্যাদা পেতেন। কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়া হলে দেশের অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানও হবে।

সমকাল: তার মানে, দক্ষতামুখী শিক্ষায় জোর দেওয়ার কথা বলছেন?

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা হলো দক্ষতামুখী শিক্ষা। এ শিক্ষা এখন অতি জরুরি হয়ে পড়ছে। কারণ উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন, দেশের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে চাহিদা অনুসারে প্রযুক্তি, কারিগরি, যোগাযোগ ইত্যাদি দক্ষতা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে বিদেশি প্রকৌশলী, ব্যবস্থাপক, মার্চেন্ডাইজার এবং কারিগর নিয়ে আসছেন। এই চাহিদা পূরণ করতে পারে কারিগরি শিক্ষা। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে শিল্পপতিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। দক্ষতা তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থাকে সহায়তা করা যেমন উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব, ঠিক তেমনই শিক্ষা নীতিনির্ধারকদের উচিত স্থানীয় শিল্পের চাহিদা নিরূপণ করে শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা। সেভাবে যদি আমরা কারিগরি শিক্ষাকে সাজাতে পারি, নিঃসন্দেহে দেশে এ শিক্ষা জনপ্রিয় হবে এবং শিক্ষার্থী বাড়বে।

সমকাল: কারিগরি শিক্ষায় তো অনেকে আগ্রহী হন না, পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত বলে।

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: কারিগরি শিক্ষা সমাপ্ত করেও অনেকেই উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হতে পারেন। সে জন্য তাঁদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা জরুরি। বর্তমানে কারিগরি থেকে ডিপ্লোমা করে সরকারিভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম। ডিপ্লোমা করা শিক্ষার্থীরা শুধু ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে (ডুয়েট) পড়ার সুযোগ পান। সরকারিভাবে তাঁদের আরও সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

সমকাল: সরকারি হিসাবেই কারিগরি শিক্ষায় দিন দিন মেয়ের সংখ্যাও কমছে।

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: সাধারণ শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে এখন ছেলের তুলনায় মেয়ের সংখ্যা বেশি। সে হিসেবে কারিগরিতেও মেয়ের সংখ্যা বাড়া সংগত। এর বিপরীতে মেয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়। মেয়ের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে কারিগরি শিক্ষা আরও আকর্ষণীয় করতে হবে। এর কারিকুলাম ও বিষয়েও সমান নজর দিতে হবে।

সমকাল: কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে আর কী করা উচিত?

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষার বিষয় ঠিক করতে হবে। যেমন সারাবিশ্বেই এখন অন্যতম চাহিদা 'ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট' বিষয়ের। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এ বিষয়টি চালু করেছে মাত্র কয়েক বছর আগে। তাও এখানে শিক্ষক নিয়োগ সেভাবে হয়নি। সরকার এ শিক্ষায় যদি সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গবেষণা করতে হবে। বাজার বিশ্নেষণ করে বিষয় সাজানোসহ দেশে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। কারিগরি শিক্ষা জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় এবং বাজার উপযোগী হওয়ার পর কোর্সের মেয়াদ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

সমকালে প্রকাশিত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

ট্যাগঃ , , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।