Mahfuzur Rahman Manik
প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে মেকানিজম পরিবর্তন দরকার
সেপ্টেম্বর 25, 2022

সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ মজিবুর রহমান

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মাহফুজুর রহমান মানিক

মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি ইনস্টিটিউটের উপানুষ্ঠানিক ও অব্যাহত শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন। মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য লিখিত কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা বইয়ের প্রধান লেখক তিনি। শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কমনওয়েলথ রিসার্চ ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের জন্ম কুমিল্লায়।

সমকাল: প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত শিক্ষক, দুই কর্মকর্তার যোগসাজশও স্পষ্ট। শিক্ষা সচিবের প্রশ্নটি দিয়েই শুরু করি- 'কাকে বিশ্বাস করব'?

মোহাম্মদ মজিবুর রহমান: প্রথম কথা হলো, দিনাজপুর বোর্ডে যেভাবে প্রশ্ন ফাঁসের অঘটন ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণিত কাজ। কয়েক বছর এটি বন্ধ ছিল। এখন আবার সেটি আমরা দেখছি। সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, তাতে জড়িত শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সে জন্যই শিক্ষা সচিবের অসহায় উচ্চারণ- 'কাকে বিশ্বাস করব'? কিন্তু আমার কথা হলো, বিশ্বাস করার মতো মানুষকে আমরা যথাস্থানে বসাচ্ছি কিনা? বর্তমানে আমরা যে চর্চা দেখছি, তাতে অনেক সময় যোগ্য বিকল্প থাকা সত্ত্বেও অযোগ্যরা চেয়ারে বসছে। যখন যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের দায়িত্বশীল পদে বসানো হয় তখন আক্ষেপ না করে সে মেকানিজমে পরিবর্তন আনা দরকার।

সমকাল: তাই বলে একজন শিক্ষক কেন প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘৃণিত কাজ করবেন?

মজিবুর রহমান: শিক্ষক কেন; কারও দ্বারাই প্রশ্ন ফাঁসের মতো কাজ সমর্থনযোগ্য নয়। এখানে শিক্ষকের ব্যক্তিগত সততা ও মূল্যবোধের জায়গা যে নষ্ট হয়ে গেছে- তা তো স্পষ্ট। একই সঙ্গে এটা বলা দরকার, বিষয়টিকে একেবারে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে দেখার সুযোগ সামান্যই। দেখুন, শিক্ষক কিন্তু সমাজ থেকে আলাদা কেউ নন। সমাজে এখন টাকা না থাকলে মূল্যায়ন হয় না। আগে গ্রাম কিংবা শহরেও একজন সৎ কিন্তু দরিদ্র মানুষকে সবাই সম্মান করত। সে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এখন শিক্ষককে তাঁর অর্থ না থাকার কারণেই তাচ্ছিল্য করা হয়। তার ওপর সামাজিক এমনকি পারিবারিক চাপের বিষয়ও অস্বীকার করা যাবে না। সে জন্য শিক্ষকদের কেউ কেউ অর্থ উপার্জনে অসৎ উপায় অবলম্বন করছেন।

সমকাল: দিনাজপুরের প্রশ্ন ফাঁসের ক্ষেত্রে কোচিং ব্যবসার সম্পর্কের বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সেটাও আপনি একইভাবে দেখছেন?

মজিবুর রহমান: হ্যাঁ, সেটাও অর্থের মূল্যায়নের নিরিখে দেখার সুযোগ আছে। কিন্তু এটাও ঠিক, শিক্ষকতা পেশায় থাকলেও অনেকে আসলে সে অর্থে 'শিক্ষক' নন। শিক্ষক হওয়ার যে গুণ থাকা দরকার, তা তাঁদের মাঝে নেই। তাঁদের কারণে পুরো শিক্ষক সমাজের বদনাম। অশিক্ষকসুলভ এমন অনেক কাজ তাঁদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। গত মাসে আমরা দেখেছি, নার্সিং কলেজের প্রশ্ন ফাঁসেও কীভাবে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা জড়িত! দায়িত্ব আমানত হলেও তা খেয়ানত করে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নিজের পকেট ভারী করার মাধ্যম বানানো গর্হিত কাজ এবং গুরুতর অপরাধ। অনেক শিক্ষকই নানা অপচর্চার সঙ্গে যুক্ত। পছন্দের শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বেশি মার্কস দেওয়ার অভিযোগও আছে। আবার প্রভাবশালীদের সন্তানদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ ইত্যাকার অভিযোগ বিস্তর। পাবলিক পরীক্ষা তো নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই হতে পারে। কেন হয় না? শিক্ষকদের ভূমিকাই তার অন্যতম কারণ।

সমকাল: প্রশ্ন ফাঁস তো ঘটতে দেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

মজিবুর রহমান: কেউ চাইলেও যাতে প্রশ্ন ফাঁস না করতে পারে, সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কাউকে শতভাগ বিশ্বাস করে তার ওপর কিছু ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আমরা সব জায়গায় চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের কথা বলি। সে জন্যই পরীক্ষার খাতায় ডাবল পরীক্ষকের বিষয় আসে। প্রশাসনিক এ রকম সব জায়গায় ক্রস চেকিং জরুরি। দিনাজপুর বোর্ডে আমরা যেটা দেখলাম, নেহাল উদ্দিন বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান প্রথম দিনই থানায় সংরক্ষিত একটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র আনতে গিয়ে আরও কয়েকটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিয়ে এসেছেন। বিষয়টি এত সহজে কীভাবে ঘটল? আমি মনে করি, দিনাজপুরের ঘটনায় প্রশাসনের অবহেলাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেন প্রশ্ন আনতে তাঁকে এককভাবে দায়িত্ব দেওয়া হলো? নিয়ম অনুযায়ী, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ট্যাগ কর্মকর্তা সিলগালা করা প্রশ্ন নেওয়ার সময় সঙ্গে থাকার কথা। তাঁরা কোথায় ছিলেন? তাঁরা থাকলে ওই শিক্ষক অন্যান্য প্রশ্ন আনতে পারতেন না।

সমকাল: এবারের প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে প্রশাসনের যোগসাজশও দেখা যাচ্ছে।

মজিবুর রহমান: এমনটি না হলে এটা হতে পারত বলে আমার মনে হয় না। কারণ, কয়েক বছর আগে যে প্রশ্ন ফাঁস আমরা দেখছিলাম, তা বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এ ক্ষেত্রে তৎপর। এমনকি পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক মিনিট আগে বিশেষত অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাতে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই যদি এ ক্ষেত্রে হাত থাকে, তা হতাশাজনক। দিনাজপুরের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটিসূত্রে ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে এসেছে, দুই সরকারি কর্মকর্তার কাজে গাফিলতি ও যোগসাজশ না থাকলে কেন্দ্র সচিবের একার পক্ষে প্রশ্ন ফাঁস কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কারণ ওই দুই কর্মকর্তার সই ছাড়া থানায় সংরক্ষিত থাকা প্রশ্নের প্যাকেটগুলো কেন্দ্র সচিবের খোলার সুযোগ নেই।

সমকাল: আমরা জানি, ইংরেজি মাধ্যমের 'ও লেভেল' কিংবা 'এ লেভেল' পরীক্ষার কয়েক মিনিট আগে প্রযুক্তি ব্যবহার করে একযোগে সরাসরি কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়। আমরা কি তেমনটা করতে পারি না?

মজিবুর রহমান: আমাদেরও তা একেবারে অসম্ভব নয়। আমাদের তো 'পেপার বেজড' পরীক্ষা হয়। বিদেশের অনেক পরীক্ষায় অনলাইনেই উত্তর করার ব্যবস্থা রয়েছে। এখন কয়েক মিনিট আগে অনলাইনে প্রশ্ন পাঠানোর এ বিষয়টি দুইভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। একটা হলো- উপজেলাকেন্দ্রিক একটি বা একাধিক বড় হলরুম থাকলে সেখানে এমনকি বড় স্ট্ক্রিনে প্রশ্ন প্রদর্শন করে পরীক্ষা নেওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নটি চাইলে ও রকম উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রিন্টার থাকলে সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্ট করেও দেওয়া যায়। তবে কাউকে না কাউকে বিশ্বাস করতেই হবে। কিন্তু সে ধরনের হলরুম কই?

সমকাল: আপনি মাল্টিপারপাস হলরুমের কথা বলছেন?

মজিবুর রহমান: হ্যাঁ, আমরা মাল্টিপারপাস হলরুমের বিষয়টি আগে থেকেই বলে আসছি। সেখানে যেমন পাবলিক পরীক্ষা হতে পারে, তেমনি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সম্মিলনী বা সামাজিক যে কোনো কাজে সেগুলো ব্যবহার করা যায়। আর প্রশ্ন অনলাইনে পাঠানোর আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো আমাদের এখানে বিদ্যুতের নিশ্চয়তা থাকে না। যখন পরীক্ষা হবে তখন এই নিশ্চয়তা দিতে হবে- এই সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ যাবে না।

সমকাল: সেখানে যেসব বিষয়ে পরীক্ষা আগেই হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারেও অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন...।

মজিবুর রহমান: যেভাবে কেন্দ্র সচিব কর্তৃক প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, সেখানে ইতোপূর্বে নেওয়া পরীক্ষাগুলোর ব্যাপারে সন্দেহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ফাঁস হওয়ার বিন্দুমাত্র সংশয় থাকলে আগের পরীক্ষাগুলো আবার নেওয়া উচিত। তা না হলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।

সমকাল: প্রশ্ন ফাঁসকারীদের কেমন বিচার হওয়া উচিত?

মজিবুর রহমান: প্রশ্ন ফাঁসের মতো এমন ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আমি মনে করি, দিনাজপুরের ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। এ অঘটনের সঙ্গে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের বাইরে অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলেও যেন ছাড় না পায়। আমরা চাই পুরো চক্রটিকে বিচারের আওতায় আনা হোক। এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত, যাতে দ্বিতীয়বার কেউ প্রশ্ন ফাঁস করতে সাহস না পায়।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মজিবুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সমকালে প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

ট্যাগঃ , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।