Mahfuzur Rahman Manik
'হাইব্রিড' পদ্ধতিতেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ
জুলাই 22, 2022

সাক্ষাৎকার: অ্যান্ড্রূ ওয়াকার
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মাহফুজুর রহমান মানিক

অধ্যাপক ড. অ্যান্ড্রু ওয়াকার মোনাশ ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০১৬ সালে মোনাশ ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। দ্য অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী অ্যান্ড্রু ওয়াকার নৃবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে তাঁর বেশ কিছু গবেষণা রয়েছে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মাহফুজুর রহমান মানিক
সমকাল: বাংলাদেশে এটিই আপনার প্রথম সফর?
অ্যন্ড্রু ওয়াকার: ধন্যবাদ। বাংলাদেশে এটি আমার প্রথম সফর। যদিও সংক্ষিপ্ত সফর, তারপরও আমি সত্যি আনন্দিত।
সমকাল: প্রথম সফরের অভিজ্ঞতা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: বাংলাদেশ এ অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। আর এসেছি মোনাশ ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া থেকে। সেখানেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমাদের বাংলাদেশি অনেক শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়েট রয়েছে। তাদের সঙ্গে কাজ করতে পেরেও আমি খুব খুশি।
সমকাল: আপনি একজন নৃবিজ্ঞানী এবং দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে আপনার গবেষণাও রয়েছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে আপনি কিছু বলবেন?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: আমি যদিও সরাসরি বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করিনি। বাংলাদেশের প্রতিবেশীদের নিয়ে কাজ করেছি। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের কথা বলতেই হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা বলছে, এখানকার মানুষ খুবই কর্মঠ। তারা আত্মোন্নয়ন এবং জীবনমান উন্নয়নে বেশ পরিশ্রম করে। সে কারণেই বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা দেখছি, বাংলাদেশের মানুষ শিক্ষায় খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। একজন নৃবিজ্ঞানী হিসেবে আমি শিক্ষানুরাগী এবং শিক্ষাই সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
সমকাল: আপনি একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বৈশ্বিক যোগ্যতা অর্জনে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য বৈশ্বিক পাঠ্যসূচি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: বর্তমানে বৈশ্বিক এবং স্থানীয় উভয়ের সম্পর্ক খুব নিবিড়। বাংলাদেশ যেহেতু দিন দিন উন্নতি করছে; এখানকার গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা আরও বেশি সামনে আসবে। তাই বৈশ্বিক দক্ষতা এখানে খুব বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশে বসে কাজ করলেও এসব দক্ষতার প্রয়োজন হবে। আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের দক্ষতা ব্যবসার দক্ষতা। এসব দক্ষতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগবে। তাই বৈশ্বিক কোলাবোরেশন বা সহযোগিতা এখানে জরুরি।
সমকাল: করোনা-পরবর্তী বিশ্বে আমরা দেখছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা এখন খুব সহজ হয়েছে। আপনার কী মতামত?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: আমরা মোনাশ ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে পেরে খুব খুশি। আমাদের ক্যাম্পাসে সরাসরি পাঠদান হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীরাও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। আর যারা সরাসরি অংশ নিতে না পারছে; আমরা তাদেরকে অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করছি। অত্যন্ত গুণগত মানসম্পন্ন অনলাইন শিক্ষা। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা কিংবা চীনে বসেই তারা শিক্ষা নিতে পারছে। এমনকি কভিড মহামারির মধ্যেও আমরা পড়াশোনা চালিয়ে নিয়েছি। এ ব্যাপারে মোনাশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যা-ই ঘটুক; আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রয়েছি।
সমকাল: মোনাশ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে ইউসিবির মাধ্যমে এক বছর ধরে কাজ করছে। আপনি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন? তাদের জন্য গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে কী করা উচিত?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: শিক্ষা সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষার্থীই ব্যতিক্রম। প্রতিটি পরিবার ভিন্ন ধরনের। তাই তারা ভিন্ন ধরনের পরিবেশ চায়। মোনাশ ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আমরা এখানে যে অংশীদারিত্বে কাজ করছি; এটিও অনেকের জন্য খুব ভালো বিকল্প হতে পারে। আমরা মোনাশ ইউনিভার্সিটির সঙ্গে প্রথম শ্রেণির বৈশ্বিক ডিগ্রি প্রদান করছি। বাংলাদেশের হয়তো অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারেরই সামর্থ্য নেই যে তারা সন্তানদের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাবে। ফলে মোনাশের মাধ্যমে ঢাকায় থেকেই তারা বৈশ্বিক শিক্ষা অর্জন করতে পারছে। আমি মনে করি, এটি বাংলাদেশের জন্য চমৎকার সম্পদ এবং অসাধারণ বিকল্প।
সমকাল: আপনি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে অনলাইনে পাঠদান করছেন। তাদের ফল কিংবা প্রবণতা কেমন দেখছেন?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: প্রথম কথা হলো, আমরা অন-ক্যাম্পাস শিক্ষা থেকে অনলাইন শিক্ষায় খুব দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছি। আমরা শিক্ষকরা যেমন বিষয়টিতে অভ্যস্ত হয়েছি, তেমনি শিক্ষার্থীরাও মানিয়ে নিয়েছে। অন-ক্যাম্পাসে তো সরাসরি শিক্ষা। কিন্তু অনলাইন হলো প্রযুক্তির মাধ্যমে। মানে আপনার কম্পিউটার থাকতে হবে। কিন্তু অনেকেরই হয়তো ভালো কম্পিউটার নেই কিংবা প্রযুক্তির সঙ্গে ভালো বোঝাপড়া নেই। তাদের জন্য এটা কঠিন। তবে আমি বলব, এদিক থেকে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো করছে। সেটা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী হোক কিংবা অন্য কোনো দেশের। একাডেমিক দিক থেকেও তারা ভালো করছে। তারা উন্নতি করছে। শিক্ষায় তারা মনোযোগী। তাদের অবস্থান সন্তোষজনক, যদিও আরও অনেক কিছু করার রয়েছে। তবে তাদের সমস্যা চিহ্নিত করে আমরাও যথার্থ শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
সমকাল: শিক্ষায় রূপান্তরের কথা বলছেন। তাহলে কি আপনি 'হাইব্রিড' শিক্ষার কথা বলছেন?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: আমি মনে করি, 'হাইব্রিড' পদ্ধতিতেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। কারণ এ পদ্ধতি ভবিষ্যৎ সমাজেরই অংশ। একসঙ্গে অনেক কিছু করতে হবে। ব্যবসা, গবেষণা, যোগাযোগ সব করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার কীভাবে সম্ভব সেটা শিক্ষার্থীদের শিখতে হবে। আমরা সেটা শিক্ষার মাধ্যমে করছি। আধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিখন যথার্থ হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানোর মাধ্যমে অনেক সুযোগও তৈরি হয়। অস্ট্রেলিয়াতে আমাদের শিক্ষার্থীরা রয়েছে। সেখানে তারা বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করছে। মালয়েশিয়াতেও আমরা সে ধরনের ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করছি, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক শিক্ষা নিশ্চিত হয়। শিক্ষার্থীরা একে অপরের থেকেও ভালো শেখে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে বসে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেখার সুযোগ পাচ্ছে। আমি মনে করি, ভবিষ্যতের জন্য এটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ সুযোগ।
সমকাল: উচ্চশিক্ষায় শিখনফলভিত্তিক শিক্ষার ব্যাপারে আপনার কী মত? কীভাবে আমরা শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারের জন্য তৈরি করতে পারি?
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: শিখনফলভিত্তিক শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এমন 'গ্র্যাজুয়েট' প্রয়োজন, যারা একই সঙ্গে যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে কাজ করবে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় গত প্রায় ২০ বছর ধরে একটা পরিবর্তন আমরা দেখছি। আমি যখন শিক্ষা নিয়েছি, তখন আমাদের সময় জ্ঞানের একটা ব্যাপার ছিল। এখন এমন কোনো শিক্ষা নেই, যার উদ্দেশ্য দক্ষতা তৈরি নয়। এমন দক্ষতা, যেটি চাকরির বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তবে জ্ঞানের গুরুত্ব অস্বীকারের উপায় নেই। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং অভিযোজন ক্ষমতা শেখানো।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
অ্যান্ড্রু ওয়াকার: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সমকালে প্রকাশিত ২২ জুলাই ২০২২

ট্যাগঃ , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।