রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জাতিসংঘের সংস্কার

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত বিশ্বকে এটা স্বীকার করতে বাধ্য করছে, আমাদের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যর্থ

মূল লেখক : অ্যান্থনি পানকে
ভাষান্তর: মাহফুজুর রহমান মানিক

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত বিশ্বকে এটা স্বীকার করতে বাধ্য করছে, আমাদের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যর্থ। বিশেষ করে, তারা যুদ্ধাপরাধের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে বলে মনে হয় না। ফলে চলমান যুদ্ধটি এখনও জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের আবশ্যকতার কথা বলছে, যাতে ভবিষ্যতে আমাদের নিজেদের এমন পরিস্থিতিতে দেখতে না হয়। এই আশাবাদের কারণ হলো, ঐতিহাসিক বিভিন্ন মুহূর্তে জটিল পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে যখন শোকাহত করেছে, তখনই বড় বড় সংস্কার হয়েছে।

ঐতিহাসিক কিছু শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরার আগে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনার দাবি রাখে। প্রথমেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিষয়ে আসি। আইসিসি এর আগে কয়েক ব্যক্তির বিচার করেছে। যেমন যুদ্ধাপরাধের জন্য লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরের বিচার হয়েছে। এখন তারা ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিষয়টি অনুসন্ধান করছেন। প্রশ্ন হলো, যেহেতু ইউক্রেন কিংবা রাশিয়া কেউই রোম স্ট্যাটিউটে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, সেহেতু আইসিসি পুতিনের বিচার করতে পারবে কিনা? তা ছাড়া বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একমত, আইসিসি যদি রাশিয়ার এই নেতার বিরুদ্ধে অপরাধ পায়ও, তার পরও তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে না, কারণ তিনি এখনও ক্ষমতায় আসীন।

জেনেভা ও হেগ কনভেনশনেও যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষ ও কারাগারে বন্দিদের চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘ সনদের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে আগ্রাসী যুদ্ধের নিন্দা জানানো হয়েছে। জেনেভা কিংবা হেগ কনভেনশন বা জাতিসংঘ সনদে থাকার পরও তার বিচারের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। আর সেখানে পুতিনের বিষয়টি অকার্যকর এ জন্য যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের যে কোনো সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাশিয়ার রয়েছে।

২০০২ সালে নিরাপত্তা পরিষদের সবার সমর্থন নিয়ে জাতিসংঘ সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিকের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ১৯৯০-এর দশকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের জন্য তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। তার পরও রাশিয়ায় ক্ষমতা পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক আদালতে পুতিনের বিচার হবে কিনা সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এই বিবর্ণ চিত্রের পরও জাতিসংঘের ঐতিহাসিক বিকাশ একই সঙ্গে দেখাচ্ছে জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে কেন এই অচলাবস্থা এবং সংস্কারের প্রশ্নে কোথায় আশার আলো রয়েছে।

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ইউরোপ জার্মানির নাৎসি বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন গ্রেট ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আটলান্টিক চার্টার তৈরি করেছিল। এই দলিলই মূলত জাতিসংঘ তৈরির পথ একধাপ এগিয়ে দেয়। আটলান্টিক চার্টারে ঘোষণা করা হয়, কোনো রাষ্ট্র সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি গ্রহণ করে অন্যের জায়গায় নিজ এলাকার সম্প্রসারণ করবে না। বরং এ সনদে স্বাক্ষরকারীরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ও পারস্পরিক সহযোগিতা করতে ব্যবস্থা নেবে এবং নিরস্ত্রীকরণে ভূমিকা রাখবে।

মস্কো ও তেহরান কনফারেন্সে জাতিসংঘ গঠনের বৈঠকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর ইয়ল্টার ডাম্বরটন ওকস কনফারেন্সেও তারা ছিল। বিশেষ করে সোভিয়েতের স্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে- স্টালিনের এ ভয়ের কারণে বৈঠকগুলোতে লিখিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ কারণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্রদের স্থান দেওয়া হয়েছে। যেটি জাতিসংঘের আসল আলোচনার জায়গা। এমনকি যুদ্ধজয়ী ফ্রান্স, ব্রিটেন, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়। জাতিসংঘের কোনো বিলে বা প্রস্তাবে এই পাঁচটি দেশের কোনো একটি দেশ ভেটো দিলে সে বিল অথবা প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা সামরিক বাহিনী প্রেরণের ক্ষেত্রেও ভেটো ক্ষমতা কার্যকর। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরগুলোতে আমরা নুরেমবার্গ বিচার দেখেছি। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৬ সালে নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত নুরেমবার্গ ট্রায়াল বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়।

১৯৪৭ সালে বিশ্ব যখন হলোকাস্ট বা নাৎসি বাহিনী কর্তৃক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি গণহত্যার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে, তখন সে ভবিষ্যৎ গণহত্যা এড়ানোর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে। এরই সূত্র ধরে জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস বা মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার খসড়া হয়। মার্কিন রাজনীতিক এলিনর রুজভেল্টের নেতৃত্বে লেবাননের কূটনীতিক চার্লস মালিক, চীনা রাজনীতিক পেং চুং চ্যাং ও ছয় দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে করা ওই খসড়া ঘোষণা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। যদিও মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা কোনো আইন নয়, তার পরও এটি দুটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কনভেনশন তৈরির ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এর একটি হলো, বেসামরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক কনভেনশন (আইসিসিপিআর) এবং অন্যটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিইএসসিআর)। এসব দলিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তিতে ব্যবহূত হয় এবং রাষ্ট্রগুলোর আইন প্রণয়ন ও বিচারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং এর আলোকে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
এসব বৈশ্বিক পদক্ষেপ সত্ত্বেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার অধিকারী সদস্য রাষ্ট্রগুলো অন্যদের আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থে নীতিগতভাবে চিন্তা করার অবকাশ দিয়েছে। ফলে ইউক্রেনে গণকবরের ছবি এবং সেখানকার বেসামরিক লোকদের লক্ষ্য করে রাশিয়ার বোমা মারার ঘটনা বিশ্বকে শোকাহত করছে বটে। কিন্তু ভেটো ক্ষমতার কাছে অনেক কিছুই অসহায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, কেবল রাশিয়া নয়, এর আগে অন্যদের ক্ষেত্রেও ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা গেছে। তার পরও ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা নিরাপত্তা পরিষদে এই ভেটো ক্ষমতার সংস্কারের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে। এই সংস্কার কার্যকর হলে জাতিসংঘ আরও কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

এখানে ভেটো ক্ষমতা একেবারে শেষ হয়ে যাবে- এমন নয়। বরং এখানে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। যেখানে সাধারণ পরিষদ সদস্যদের থেকে দুই-তিন ভোট যোগ করা যায়। কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যের মধ্যে চার সদস্য সম্মত থাকলেও তা কার্যকর করা যায়। তবে সংস্কার কঠিন হতে পারে, যেহেতু সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ এবং নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য তা অনুমোদন করবে।

রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দরকার। ইউক্রেনের সঙ্গে ন্যাটোর সম্পর্কের ধরন নিয়েও আলোচনা হতে পারে। এমনকি পূর্ব ইউক্রেন ও ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার দাবিও এ আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। আবার ইতিহাসের কাছে যাই। আমরা স্মরণ করি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন পেল্যান্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করেছিল। তখন এটি চ্যালেঞ্জ করা হয়নি, যাতে করে স্টালিন জাতিসংঘের সদস্য হতে সম্মত হন।

উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে আইসিসির মতো সংস্থার তদন্ত কিছুই বন্ধ করতে পারে না। ইউক্রেনে যে নৃশংসতা হচ্ছে, সে জন্য নিরাপত্তা কাউন্সিলের সংস্কারে দীর্ঘমেয়াদের চিন্তা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভেটো ক্ষমতা দুর্বল করে আমাদের বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় এগিয়ে আসা যায়।

অ্যান্থনি পানকে: সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর

 

Post By মাহফুজ মানিক (521 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *