Mahfuzur Rahman Manik
ট্রাম্পের শান্তির ঝুলিতে ফিলিস্তিনিদের লাশ
জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের প্রতবাদে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে ইসরায়েলের হামলা

মূল : ডানা মিলব্যাঙ্ক

টিভির পর্দায় সম্পূর্ণ দুটি পৃথক দৃশ্য আমরা দেখছি। সোমবার যখন ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনের গাজায় বিক্ষোভরত মানুষকে হত্যা করছে, তখন তারই ৫০ মাইল দূরে জেরুজালেমে চলছে উৎসবের আমেজ। জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেখানে মার্কিন দূতাবাস খোলার আনন্দ উদযাপন করছেন। একই সঙ্গে তারা পরস্পর শান্তির প্রতি তাদের অনুরাগের প্রশংসা করছেন!

যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন সুলিভান ঘোষণা করেছেন, তেলআবিব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর শান্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার এক দৃপ্ত পদক্ষেপ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এক ভিডিওবার্তায় 'শান্তিচুক্তি স্থায়ীকরণে' তার প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তার জামাতা জ্যারেড কুশনারও একই কথা বলেছেন- 'শান্তি নাগালের মধ্যে আসছে' মানে শান্তি প্রতিষ্ঠা হলো! ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরেক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা দিলেন, 'আজকের দিনটি শান্তির জন্য এক মহান দিন।'

তাদের এই 'শান্তির'ই নিদর্শন হলো ৬০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা, ২৭০০ আহত করা আর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শত্রুতার পুনর্বীজ বপন। এভাবে পুরো অঞ্চলে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের 'শান্তির' বার্তা।

ট্রাম্প জামাতা কুশনার দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের 'শান্তি আনয়ন প্রচেষ্টার' দায়িত্বে রয়েছেন। শান্তির এই দূতই তখন ফিলিস্তিনিদের নিন্দা করতে ভোলেননি। কুশনার বলেন, আমরা ফিলিস্তিনিদের তরফ থেকে যে বিক্ষোভ দেখে আসছি, এমনকি আজও দেখছি, এসব সহিংসতা সমস্যারই অংশ, সমাধানের নয়। ইসরায়েলকে তাদের হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাতে ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র অস্বীকার করেছেন।

তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের বিষয়টি হয়তো ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষ হতে পারত। অথচ তার পরিবর্তে আমরা দেখছি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে এটি বিভেদ ও তিক্ততার প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হলো। দিনটিতে ঝরল মানুষের রক্ত। এমনকি এটি হতে পারত শান্তি আলোচনার একটি মুখ্য মাধ্যম। যেমনটা রিপাবলিক ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনই আশা করেছিল। অথচ এটিই কিনা এখন দুটি দেশের সমাধানের আশাকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দিল।

অধিকাংশ ইউরোপিয়ানই ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের এ অনুষ্ঠান বয়কট করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের মাত্র ১৪ জন সদস্য অংশগ্রহণ করে আর তারা সবাই ছিল রিপাবলিকান আর মাত্র একজন ছিল ইহুদি।

১৫ মে ফিলিস্তিনিরা নাকবা দিবস পালন করে। ১৯৪৮ সালের এই দিনে ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠী ফিলিস্তিনিদের তাদের বাড়িঘর ও জমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ। এ বছর ফিলিস্তিনিদের সেই নাকবার মুহূর্তেই ট্রাম্প প্রশাসন জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর করল। ফিলিস্তিনিরা শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। এখনও ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভের মধ্যেই দূতাবাস হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ দমনে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালায়। এতে প্রাণ গেল অন্তত ৬০ ফিলিস্তিনি নাগরিকের। হতাহত ব্যক্তিদের স্মরণে মঙ্গলবার থেকে তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ হামলার পর সেখানে এত বেশি হতাহত হওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার জেইদ বিন রাদ জেইদ আল হুসেইন বলেছেন, যারা এ জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের অনুষ্ঠানে অল্প মানুষই অংশগ্রহণ করে। এটি যতটা না কূটনৈতিক আয়োজন ছিল, তার চেয়েও ছিল প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান। ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান প্রশংসা সূচক বাক্যে বলেন, এই কার্যক্রমের ভিশন যিনি দেখেছেন, স্থানান্তরের সাহস যিনি দেখিয়েছেন, নৈতিকভাবে যিনি স্বচ্ছ, তার কাছে আমরা সবাই ঋণী। আমরা সবাই তার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ, তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।

নৈতিকভাবে স্বচ্ছ! হ্যাঁ, তিনি এখানেও ক্ষান্ত হননি। আরও যোগ করেছেন, 'আমার মনে হয় একজন রিপাবলিকান হিসেবে প্রেসিডেন্ট লিংকন আজ সন্তুষ্টচিত্তে হাসছেন। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পই পেরেছেন এই দূতাবাস স্থানান্তর করে জেরুজালেমে স্থাপন করতে। গদগদ নেতানিয়াহু অনুগত হয়ে বললেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি 'ইতিহাস গড়েছেন'। খ্রিষ্টান নেতা জন হাগি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ সাহসের জন্য। আর যাজক রবার্ট জেফ্রেস ট্রাম্পের নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কুশনার উপস্থিত জনতাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে, ট্রাম্প ইরান চুক্তি বাতিল করেছেন।

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর একটি দৃষ্টান্ত যে, কীভাবে ট্রাম্প ইসরায়েলকে আরও শক্তিশালী করছেন। এটা খুবই খারাপ বিষয় যে, এভাবে যতদিন তিনি প্রেসিডেন্ট থাকবেন, ততদিন হয়তো ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের হত্যা করতে পারবে, তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিতে পারবে, ভূমি দখল করতে পারবে। কিন্তু একদিন ট্রাম্প চলে যাবেন। দুই দেশের সমস্যা সমাধানের আশা প্রায় তিরোহিত। বর্তমান অবস্থা এ কথা বলছে যে, ইসরায়েলের মদদে সংখ্যালঘু ইহুদিরা সংখ্যাগুরু মুসলমানদের ওপর ছড়ি ঘোরাবে, তাদের বঞ্চিত করবে।

অথচ ট্রাম্পের আগে ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন ঐক্য একবার ভেস্তে যাচ্ছিল, যখন নেতানিয়াহু ও আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এসে তার জোড়া লাগালেন। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করলেন। এই বন্ধন কেবল ডেমোক্র্যাট থেকে রিপাবলিকানই নয় বরং আমেরিকান ইহুদি থেকে নেতানিয়াহুর সরকার পর্যন্ত।

যদিও গত বছর আমেরিকার ইহুদি কমিটি কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকার ইহুদিদের মাত্র ২১ শতাংশ ট্রাম্পকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। যেখানে আশ্চর্যজনকভাবে ৬৮ শতাংশই জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। খুব সম্ভবত আমেরিকান ইহুদিরা এটা ভাবছে যে, ট্রাম্পকে পরিচালিত করছে খ্রিষ্টানরা। আর ট্রাম্প হয়তো ইসরায়েলকে গণতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়েও সংকট তৈরি হবে। তার চেয়েও বড় বিষয় হয়তো তারা ট্রাম্পের 'শান্তির' বুলিতে আস্থা আনতে পারছে না। কারণ তারা বাস্তবে শান্তির বিপরীতটাই দেখছে।

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের দিনের ঘটনাই তো তার সাক্ষ্য বহন করছে, জেরুজালেমে হচ্ছে 'শান্তির' কথা আর তার পাশে গাজায় চলছে মানুষ হত্যা!

ট্যাগঃ , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।