Mahfuzur Rahman Manik
আসিয়ান থেকে মিয়ানমারকে চাপ দিতে হবে
ডিসেম্বর 10, 2016

 rohingya

মূল: শাফিরা ডি. গায়েত্রী

মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী নৃতাত্তি্বক সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যম মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো পরিকল্পিত সহিংসতা, নিপীড়নসহ গণধর্ষণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও উচ্ছেদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রোহিঙ্গাদের প্রায় ১২৫০টি বাড়ি পোড়ানো হয়েছে।

৯ অক্টোবর সীমান্ত বাহিনীর ৯ সদস্যের নিহতের ঘটনায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের দোষারোপ করেছে। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, সন্দেহবশত দোষারোপ করে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। ফলে নিহত হয় একশ'রও বেশি আর গ্রেফতার করা হয় ৬শ' মানুষকে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার মতে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সীমান্ত পুলিশ 'সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের একত্রে শায়েস্তা করার কাজে জড়িত'_ মিয়ানমার সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এসব তথ্য-উপাত্ত অবশ্য যাচাইয়ের সুযোগ কমই। মিয়ানমার সরকার রাখাইন প্রদেশে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও দাতা সংস্থার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

জাতিগত বৈষম্য এবং চলমান নিপীড়নে অনেক রোহিঙ্গা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে এবং রোহিঙ্গারা এভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে গত বছরের মতোই শরণার্থী সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে। গত বছরের মে মাসে আমরা রোহিঙ্গাসহ বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সংকট দেখেছি। তখন রোহিঙ্গাসহ সাগরে ভাসছিল শরণার্থী হয়ে। মানবতার এ বিপর্যয় ঘনীভূত হয় যখন নিকটস্থ দেশগুলো তাদের দেশে নৌকা ভেড়াতে দিচ্ছিল না। অবশ্য অবশেষে তাদের দয়া হয়, শরণার্থীদের বাঁচাতে আন্দামান সাগরের উপকূলীয় দেশগুলোর কাছে জাতিসংঘের তরফ থেকে বারবার অনুরোধ জানানোর পর তারা আশ্রয় দেয়। বিশেষ করে ইউরোপের কয়েকটি দেশে বেশি শরণার্থী আশ্রয় পায়। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে ১০ লাখের বেশি মানুষ ইউরোপে পাড়ি জমায়। মিয়ানমারের প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায়ও অনেকে আশ্রয় পায়।

তবে মিয়ানমারের সমস্যা আরও বেশি। সেখানে যখন তাদের জীবন বাঁচানোই কষ্ট, যখন রাষ্ট্রের অত্যাচার-নির্যাতন বেড়ে যায়, তখন তারা অন্য দেশে যেতে বাধ্য হয়। তাদের প্রতি প্রতিনিয়ত বৈষম্য চলছে। নিজেদের বৈধ ভূমিতে রোহিঙ্গা মুসলমানের পরিচয় নেই, সেখানে নিজেরাই অত্যাচারিত। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসির মতে, ইতিমধ্যে ৫ লাখের মতো রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। তাছাড়া ২০১৪ সাল থেকে ৯৪ হাজার আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সাগরপথ পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। সাধারণভাবে আশ্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেশ মালয়েশিয়া, দেশটি ইতিমধ্যে এক লাখ ৪২ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় অনিবন্ধিত আশ্রয়প্রার্থী ছাড়াও আচেহ প্রদেশকেন্দ্রিক এক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে এবং তাদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা দিতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো সম্ভাব্য দেশগুলোর প্রস্তুত থাকা উচিত। শরণার্থীদের মধ্যে দুর্বল, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গা সংকটের এ অবস্থায় আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভুয়া ছবি ও বৌদ্ধদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো কেবল অবস্থাকে আরও ভয়ানক করে তুলতে পারে। যার তীর উল্টো রোহিঙ্গাদের ওপরই পড়তে পারে। তার পরিবর্তে আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল প্রতিবেশীর আচরণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য যেসব মানবিক সংস্থা কাজ করছে তাদের মাধ্যমে রাখাইনের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে ওষুধসামগ্রী ও ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মানবিক সংস্থাগুলোর অন্যতম সাউথইস্ট এশিয়া হিউম্যানিটারিয়ার কমিটির (সিহাম) উদ্যোগে হিউম্যানিটারিয়ান ফ্লোটিলা ফর রোহিঙ্গা মিশন ও ইন্দোনেশিয়ার এনজিওগুলো এ লক্ষ্যে কাজ করছে। এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে রোহিঙ্গা সমস্যার গোড়ায় কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে। বর্তমান পদক্ষেপ হিসেবে কেবল ইন্দোনেশিয়ায় আশ্রয় প্রদান একটা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা।

গত বছর ইন্দোনেশিয়া সরকার বিভিন্ন এনজিও, স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে এক বছরের 'ট্রানজিটে'র একটি অ্যাডহক চুক্তি করে। আশা করা হয়েছিল, তাদের আবার দ্রুত কোনো বড় দেশে পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু সেটা দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শরণার্থী গ্রহণকারী দেশগুলোর শরণার্থী গ্রহণে কম সাড়ার কারণে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর জোর তৎপরতা প্রয়োজন। বিশেষ করে আসিয়ানের কর্মতৎপরতায় বিষয়টি আনতে হবে। কারণ বলা চলে, আসিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে কার্যকর সংস্থা। এখানকার দশটি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত আসিয়ান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা। এর লক্ষ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি ইত্যাদি। তাছাড়া আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা সুরক্ষা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। তবে আসিয়ানের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে শরণার্থী ও ফোর্স মাইগ্রেশনের বিষয়টি নেই। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে কেবল ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও তিমুর লেস্টে ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। স্বাভাবিকভাবে আসিয়ানে অর্থনৈতিক বিষয়ই অগ্রাধিকার পাবে এবং রোহিঙ্গার মতো মানবাধিকারের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রাখবে। কিন্তু এখন সময় এসেছে আসিয়ানের নীতি ও অগ্রাধিকার পূনর্মূল্যায়ন করার। এখন রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব সরাসরি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে পড়ছে। ফলে আসিয়ানের উচিত মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্য বন্ধে অবিরতভাবে মিয়ানমার সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় বিভিন্ন সংস্থা যাতে মানবিক ত্রাণ সহায়তা দিতে পারে, এর অনুমতি প্রদানের জন্যও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এ ছাড়াও আসিয়ান অঞ্চলের শরণার্থী ইস্যুতে একটি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হওয়া প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংকটের এ অবস্থায় আসিয়ানের জন্য হস্তক্ষেপ না করার নীতি কখনোই নৈতিকতার বিচারে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ট্যাগঃ , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।