
বাজেট নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই এর আগে ও পরে অনেক আলোচনা হয়। বাজেটের আগে সব খাতের অংশীজনই তাদের স্ব-স্ব খাতের জন্য প্রত্যাশিত বরাদ্দ দাবি করেন। শিক্ষা খাত নিয়েও এমন বিস্তর আলোচনা হয়। গত ২৯ এপ্রিল সিরডাপে এমনই এক আলোচনায় বলেছিলাম, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট এবং হয়তো শেষ বাজেটও। সে জন্য এ সরকার শিক্ষা বাজেটে এমন উদাহরণ সৃষ্টি করুক, যা পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। বাস্তবে এবারের বাজেটে সেই পুরোনো ধারাই দেখলাম। অন্তত শিক্ষা বাজেটের ক্ষেত্রে তা-ই বলা যায়।
২ জুন অর্থ উপদেষ্টা বাজেট উপস্থাপনের আগেই সংবাদমাধ্যমে খবর হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ কমছে আর মাদ্রাসা ও কারিগরিতে বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা– যা আগের বছরের মূল বাজেটের তুলনায় কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে। আমি মনে করি না, এই কিছু বরাদ্দ বাড়ানো বা কমানোর মধ্যে কোনো অংশকে বেশি বা কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বরং সার্বিকভাবে গোটা শিক্ষা খাতই যে অবহেলিত থাকছে, সে আলাপটা জরুরি। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ পেয়েছে ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের মূল বাজেটে ছিল ১১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা।
মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি মাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা কিংবা উচ্চশিক্ষা কোনোটাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সামগ্রিকভাবে আমরা দেখছি, বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। অথচ শিক্ষা বাজেটের আলোচনায় এলেই আমরা ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলি। মোট বাজেটের শতাংশ হিসেবে দেখলেও ১২ শতাংশের বৃত্তেই ঘুরপাক খায় শিক্ষা বাজেট। এখানে ২০ শতাংশ বরাদ্দের দাবি করা হয়। এবার শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি মোট বাজেটের ১২ দশমিক ১ শতাংশ আর জিডিপির ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
তার মানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আগের মতো যেই লাউ সেই কদুই আছে। যার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে উদাহরণ সৃষ্টি করার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। অবশ্য বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না। অর্থ উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন, হঠাৎ করে বিপ্লবী বাজেট করে বাস্তবায়ন করা যায় না। তারপরও শিক্ষা বাজেটে অন্তর্বর্তী সরকার আরও সদিচ্ছা দেখাতে পারত। শ্রেণিকক্ষ নির্মাণসহ অন্যান্য অবকাঠামো এবং পাঠ্যবই দেওয়া বলা চলে শিক্ষার রুটিন কাজ। সেগুলো জরুরি বটে। অর্থ উপদেষ্টার বক্তৃতায়ও তা এসেছে। কিন্তু এর বাইরে অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষার জন্য বিশেষ কী উপহার দিয়ে যাচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি তাৎপর্যপূর্ণ বলা যায়। এ কর্মসূচি অনেকদিন ধরে বন্ধ আছে। সরকার যেহেতু এ খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, সেহেতু এটি শিগগিরই শুরু হবে বলে আশা করা যায়। এটি ভর্তির হার ও শিশুর পুষ্টিতে সাহায্য করার প্রত্যাশা করেছেন অর্থমন্ত্রী। কলম শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জরুরি অনুষঙ্গ। সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত যে কর্মসংস্থান, সেখানেও জোর দেওয়া দরকার ছিল। বেকারত্বের বিশাল বোঝার মধ্যে সরকারের চাকরিকেন্দ্রিক চিন্তা আরও জোরালো হওয়া উচিত ছিল।
আমাদের শিক্ষার সব পর্যায়েই নানামুখী সংকট রয়েছে। বিশেষ করে মানের সংকট প্রবল। সে জন্যই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিতভাবে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষায় জিডিপির ৪ শতাংশ কিংবা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া এবং যথাযথভাবে তার বাস্তবায়নের বিষয়টি আগামী দিনের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।