Mahfuzur Rahman Manik
সাক্ষাৎকার: সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গিনিপিগ নয়
নভেম্বর 1, 2025
ইডেন কলেজের ক্ষমতাধর নেত্রীদের নিয়ে সংবাদমাধ্যমে একের পর এক খবর বেরোচ্ছে।

আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার

 সমকালে প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তি। সেখান থেকে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজের কয়েক বছরের চক্কর কাটা এখানে শেষ হতে পারত। কিন্তু শিক্ষার্থীরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাগত জানালেও ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় নতুন করে আন্দোলন করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংকুচিত করার অভিযোগে গতকাল মানববন্ধন করেছেন শিক্ষকরা। এ বিষয়ে সমকাল কথা বলেছে ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও সাত কলেজের প্রথম সমন্বয়ক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকারের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজুর রহমান মানিক

সমকাল: সাত কলেজের ভাগ্য এখন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির হাতে। শুরুতে সবাই স্বাগত জানালেও এখন নানা বিষয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: এর প্রধান কারণ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কেমন হবে তার বিস্তারিত অনেক কিছুই এখনও স্পষ্ট করা হয়নি। বলা যায়, গোপন রাখা হয়েছে। অফিসিয়ালি এ বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনও প্রস্তাবিত বলা হলেও সেখানে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংবাদমাধ্যম থেকে গত মাসে জানতে পেরেছি, এটি হাইব্রিড বিশ্ববিদ্যালয় হবে। অর্থাৎ অনলাইন-অফলাইন মিলে ক্লাস হবে। আবার যেভাবে ইউনিটভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সাত কলেজের কাঠামোই বদলে ফেলা হবে। অর্থাৎ ঐতিহাসিক কলেজগুলোর স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য থাকবে না। আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ভূমিকা পালন করত, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি তা না করে সাত কলেজের খোলনলচে পাল্টে দিতে চায়। মনে হচ্ছে, মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার আয়োজন চলছে।

সমকাল: সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার পর প্রথম দিকের সমন্বয়ক ছিলেন আপনি। কোন সংকটের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে হলো?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব দিয়ে এর শুরু। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। সাত কলেজ অধিভুক্ত হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দলাদলি, কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর আন্তরিকতার অভাবে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি গ্রুপ আবার সাত কলেজের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পাঠদান বিঘ্নিত হচ্ছে, কর্মপরিবেশ নষ্ট হচ্ছে– এমন ইস্যু তুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। সনদে কলেজের সঙ্গে নতুন করে অধিভুক্ত কলেজ যোগ করায় সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। এভাবেই সংকটের সূচনা। শেষ পর্যন্ত সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে হলো।

সমকাল: এখন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কাঠামোতে আপনারা কী সমস্যা দেখছেন? 

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: মনে রাখতে হবে, সাত কলেজকে কেন্দ্র করেই প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গড়ে উঠছে। হঠাৎ করে প্রশাসন একে হাইব্রিড ইউনিভার্সিটির ঘোষণা দিয়ে দিল! সেখানে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইনে এবং ৬০ শতাংশ ক্লাস অফলাইনে (সশরীরে) অনুষ্ঠিত হবে। আমরা মনে করি, এটা এক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর কোন যুক্তিতে চালানো হবে? সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নামে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানানো হবে? সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গিনিপিগ নয়। এখানকার প্রতিটি কলেজই ঐতিহ্যবাহী। দুই লাখের মতো শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন নিয়ে বছরের পর বছর এভাবে চলতে পারে না।

সমকাল: এখন কি ঐতিহ্য-স্বাতন্ত্র্য নিয়েই মূল সমস্যা?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: ১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা কলেজ উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক কলেজ। এটি ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও আগে প্রতিষ্ঠিত। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও ঢাকা কলেজের ছিল অবিস্মরণীয় অবদান। ঢাকা কলেজ তার নিজস্ব ক্যাম্পাস কার্জন হল, শহীদুল্লাহ্ হল, লাইব্রেরির ২৫ হাজার বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়। হাইকোর্ট গেট থেকে বঙ্গবাজার এখনও কলেজ রোড হিসেবে কালের সাক্ষী। ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ছাড়াও ডিগ্রি ও মাস্টার্স ছিল। সনদ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের। নতুন প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পাবে না– এ আশঙ্কায় ঢাকা কলেজে উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঢাকা কলেজের শিক্ষকদের বড় একটি অংশ লিয়েনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। ভূমি, ক্যাম্পাস, হোস্টেল, অবকাঠামো, বইপত্র ও শিক্ষক না পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সহজ হতো না।

সমকাল: বাকি ছয় কলেজও তো ঐতিহ্যবাহী?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: ইডেন কলেজ এ দেশের নারীশিক্ষার পথিকৃৎ বলা যায়। ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজের এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৪-২৫ হাজার। পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কবি নজরুল সরকারি কলেজ ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং দেশের চতুর্থ প্রাচীনতম কলেজ; শিক্ষার্থী ২০ হাজারের বেশি। ঢাকা কলেজে ২০ হাজার। এভাবে সাত কলেজে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। অথচ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা রাতারাতি কমিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর যুক্তি কী? গত বছর রাজধানীর সাত সরকারি কলেজে ২১ হাজার ৫৬৩টি আসনে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এবার ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এসে ১৭ হাজার আসন কমিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৭৯ শতাংশ আসন কম। এতে শিক্ষার্থীদের সুযোগ সংকুচিত হবে। দ্বিতীয়ত, হাইব্রিড ইউনিভার্সিটি এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে। এর জন্য দরকার সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, সুলভমূল্যে ইন্টারনেটসহ তথ্যপ্রযুক্তি উপকরণের সহজলভ্যতা। যেখানে উন্নত দেশগুলোয় এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে আছে, সেখানে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবলুপ্ত করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন?

সমকাল: তাহলে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কাঠামো কেমন হওয়া উচিত?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: সাত কলেজ নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি হতেই পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পূর্বাচলে যে ৫৫ একর জমি আছে, সেখানে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস ও প্রশাসনিক ভবন হতে পারে। তারা এফিলিয়েটিং অথরিটি হিসেবে সাত কলেজ পরিচালনা করতে পারে। যেমনটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এখন কলেজগুলোর ওপর করছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি চাইলে কিছু ইনস্টিটিউট খুলতে পারে, যেখানে সাত কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থীরা গবেষণা করতে পারে। এমফিল-পিএইচডিতে ভর্তি হতে পারে, যেটি এখন তাদের দাবি। এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধানও সম্ভব হবে। 
ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস থাকবে, ঢাকা কলেজ থাকবে না; ইডেনের ক্যাম্পাস থাকবে, ইডেন কলেজ থাকবে না! নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত যে কাঠামো জানা যাচ্ছে, তাতে এমন তথ্য আমরা পেয়েছি যে, সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুল ইসলাম কলেজে কেবল আইন বিভাগ হবে। অথচ এই বিভাগের ছাত্রীদের থাকতে হবে ইডেন কলেজের হোস্টেলে। ইডেন কলেজের একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন এত দূর কীভাবে আসা-যাওয়া করবে? আবার ব্যবসার বিষয়গুলোর জন্য তিতুমীর কলেজ বা কলা অনুষদের জন্য মিরপুর বাঙলা কলেজ ক্যাম্পাসে যেতে হবে। অন্য কলেজের ছাত্ররা এসে ইডেন কলেজে ক্লাস করবে, কিন্তু তারা সেখানে থাকতে পারবে না। এমন সব চিন্তার আগে বাস্তব জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে। কোনটা সম্ভব, কোনটা সম্ভব না তা বুঝতে হবে।

সমকাল: ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা কি এ জন্যই আন্দোলন করছে?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য আন্দোলন করছে। সেখানকার শিক্ষার্থীরা বলেছে, ইডেন কলেজের অবকাঠামো বিশেষভাবে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি। সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত হবে বলে ছেলেমেয়ে একত্রে পড়াশোনার পরিবেশের বিরোধিতা করছে তারা। ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীদের চারটি দাবির মধ্যে আছে সাত কলেজের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা। এটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তারা সিট সংখ্যা কমানোরও পক্ষে নয়। তারা আগে ইডেন কলেজকে স্বতন্ত্র মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল। আমরা দেখেছি, তিতুমীর কলেজও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। আসলে সাত কলেজের অনেকেরই একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার মতো অবকাঠামো আছে। কিন্তু সবাইকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হচ্ছে।

সমকাল: তার মানে, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ভূমিকা কলেজিয়েট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হওয়া উচিত? 

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: হ্যাঁ। সারাবিশ্বেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা প্রচলিত। যেখানে কলেজগুলো স্বাতন্ত্র্য ও কাঠামো বজায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকে। প্রতিবেশী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও এমন একটি কলেজিয়েট ইউনিভার্সিটি। আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও অনুরূপ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এই মডেল আছে। ইউজিসি সেই মডেল অনুসরণ করতে পারে। তা না করে তারা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে কলেজগুলোর ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করছে। কেন করছে, বোধগম্য নয়। আমি মনে করি, সাত কলেজের স্বতন্ত্র মর্যাদা বজায় রেখে প্রতিটি কলেজকে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দিয়ে সার্টিফিকেট অ্যাওয়ার্ডিং কলেজেও রূপান্তর করা যেতে পারে। নতুবা মন্দের ভালো আগের মতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফিরে যাওয়া। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি ও দলাদলি এড়াতে বিকল্প আর্মি ও ডাক্তারদের মতো ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি শিক্ষা ক্যাডারের নিয়ন্ত্রণেও দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষা ক্যাডারে তিন শতাধিক পিএইচডিধারী শিক্ষক আছেন। তাদের এবং ভালো ও মেধাবী শিক্ষকদের সাত কলেজে পদায়নে কঠোর বদলি নীতিমালা অনুসরণ করা যেতে পারে। এর বাইরে কাঠামোগত পরিবর্তন অনেক বড় সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে কথা বলা এবং বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়াও জরুরি। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেক দিন ধরে যে ভোগান্তিতে আছে, নতুন করে সেখানে সংকট তৈরি করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।

সমকাল: কলেজগুলোর কাঠামো ভেঙে পড়া মানে কী? তাতে কি শিক্ষকরাও বিড়ম্বনায় পড়বেন?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: জগন্নাথ কলেজ থেকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় হয়, তখনই শিক্ষকদের সমস্যা আমরা দেখেছি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার সময় কর্মরত শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের আত্তীকরণের কথা বলে চার-পাঁচ বছর ক্লাস করিয়েছিল। যখনই সেখানে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হয়ে গেছে, এরপর সেখানকার কর্মরত সরকারি কলেজ শিক্ষকদের বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি সে পথেই হাঁটছে। এখন ক্ষোভ সামাল দিতে অথবা শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি আনতে কর্মরত অল্প কয়েকজন পিএইচডিধারী শিক্ষককে আত্তীকরণের টোপ দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মঞ্জুরি কমিশনের কয়েকজনকে খুশি করতে বা তাদের চাপে পড়ে সরকার অধ্যাদেশ জারি করলে সাত কলেজে বর্তমানে কর্মরত দেড় হাজার শিক্ষক তাৎক্ষণিক নিজেদের প্রত্যাহার করবে বলে বলা হচ্ছে। তাহলে কী হবে? শিক্ষক সংকটে অনিশ্চয়তায় পড়বে শিক্ষার্থীরা। কারণ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও নানাবিধ কারণে সরকারের পক্ষে রাতারাতি হাজার হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।

সমকাল: সাত কলেজের যেখানে ইন্টারমিডিয়েট আছে, নতুন কাঠামো কি সেখানে সংকট তৈরি করবে?

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাধারা কীভাবে সমন্বয় হবে? ঢাকা কলেজে দেশসেরা মেধাবীরা পড়ে। ১৮৫ বছর ঢাকা কলেজ তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। দেশের বুয়েটসহ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী এই সাত কলেজ থেকেই বেশি যায়। পত্রিকায় দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী হয় ৮ থেকে ১০ শতাংশ। তাহলে এসব কলেজে ইন্টারমিডিয়েট বন্ধ হয় বা নতুন পরিস্থিতিতে মান যদি কমে যায়, এর পরিণতি সহজেই অনুমেয়। ঢাকা কলেজের পরিচিতি ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের মেধাবীদের জন্যই। আবার একই ক্যাম্পাসে ইন্টারমিডিয়েটের জন্য আলাদা প্রশাসন, পরিবহন ও হোস্টেল, ক্যান্টিন, লাইব্রেরি ভাগাভাগি– এটি বাস্তবসম্মত কিনা তাও দেখতে হবে। শিক্ষক-কর্মচারীর আসন ভাগাভাগি কীভাবে হবে? এমনিতেই ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার মারামারিতে রাজধানীবাসীর জীবন অতিষ্ঠ; সরকারও বিব্রত। বরং প্রতিটি কলেজকে তার মতো থাকতে দিলে নতুন নতুন সংকট তৈরি হবে না।

সমকাল: বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের করণীয় কী? 

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: শিক্ষক বিশেষত শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের উচিত হবে দ্রুত সাত কলেজের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী নেতাদের সঙ্গে বসে তাদের আস্থায় নেওয়া। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি যেন কলেজগুলোর ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যে প্রতিবন্ধক না হয়। পাশাপাশি সাত কলেজের যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো নিয়েও কাজ করার সুযোগ আছে। সে জন্য শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে বসা, বাজেট চাওয়া। একাডেমিক ভবন, ল্যাব, নেট সুবিধা, আলাদা লাইব্রেরি ভবন, ছাত্রাবাস নির্মাণ, ডাইনিংয়ের খাবারে সাবসিডি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিবহনের ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বৃত্তির ব্যবস্থা, শিক্ষাঋণ চালু, খণ্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত কর্মচারী নিয়োগ, শিক্ষক ও কর্মচারীদের আবাসন সমস্যার সমাধান করা। সাত কলেজে আইন, সাংবাদিকতা, ট্যুরিজম, ফিন্যান্স, মার্কেটিং, উন্নয়ন অর্থনীতি, কম্পিউটার ও ইঞ্জিনিয়ারিং, ইইই, মাইক্রোবায়োলজি– এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও চালু করা জরুরি। 

সমকাল: ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ শিগগিরই হওয়ার কথা। এ মুহূর্তে সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কী? 

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: আমি বলতে চাই– ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। বিশেষ করে এটা যখন শিক্ষার বিষয়, তখন ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি জরুরি। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেক বছর ধরে যে সব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তার স্থায়ী, গ্রহণযোগ্য ও শিক্ষাবান্ধব সমাধান জরুরি। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সিদ্ধান্ত আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। কিন্তু এটি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন কলেজগুলোর ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা হবে। কলেজগুলোর বিদ্যমান অবকাঠামো ভাঙলে সেখানে নানামুখী সংকট তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, শিক্ষার সংকোচন হবে। সরকারের এ মুহূর্তে জরুরি কাজ হলো, সাত কলেজের অংশীজনের সঙ্গে বসা এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা। তা উপেক্ষা করে অধ্যাদেশ জারি হলে পুনরায় বড় আন্দোলন দেখা দিতে পারে। সে ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে এবং দ্রুত সব সিদ্ধান্ত খোলাসা করতে হবে। পাশাপাশি কলেজ শিক্ষাকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পারস্পরিক দলাদলি ও রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

সেলিম উল্লাহ খোন্দকার: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গিনিপিগ নয়

ট্যাগঃ , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।