Mahfuzur Rahman Manik
ঘরের কথা পরে জানে যেভাবে
অক্টোবর 7, 2022
foreign-intervention

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে বিদেশিরা প্রায়ই বক্তব্য দিয়ে থাকেন। দেশের রাজনীতিসহ অন্যান্য বিষয়ে তাঁরা কথা বলেন। মঙ্গলবারের সমকালে আমরা দেখেছি, ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন জরুরি। তাঁর ভাষায়, এ দেশের সুন্দর একটি সংবিধান রয়েছে। এ সংবিধানের আলোকেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব। এর আগের দিন সোমবারের সমকালে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্য। জাতীয় পার্টির সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা প্রত্যাশা করেছেন, বাংলাদেশে যেন সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়। রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে হামলা ও বাধার ঘটনা তাঁরা দেখতে চান না।
বিদেশিদের এমন ধরনের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীনরা ভালোভাবে নেন না। সে জন্য তাঁরা এর পাল্টা বক্তব্য দেন। মঙ্গলবারের সংবাদমাধ্যমে এমন বক্তব্য এসেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিদেশিদের উদ্দেশে বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে আপনাদের এত মাথাব্যথা কেন? আগে নিজেদের দেশের অবস্থা দেখুন; তার পর বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলুন।
সরকারের মন্ত্রীরা যে পরামর্শ দিয়েছেন, তাকে অযৌক্তিক বলার সুযোগ নেই। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যাবে না- আমাদের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে বিদেশিরা অনেক আগ থেকেই বক্তব্য দিয়ে আসছেন এবং আমরাই তাঁদের এ সুযোগ করে দিয়েছি। রাজনীতি বিষয়ে সাংবাদিকরা অনেক সময় আগ্রহী হয়ে বিদেশিদের কাছে জানতে চান- 'আগামী নির্বাচন কেমন হবে' কিংবা 'সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ আছে কি' ইত্যাদি। আবার বিরোধী দলও সংকটে পড়লে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেয়। রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতনমাত্রই জানেন, নব্বইয়ের দশক থেকে এমন চর্চা চলে আসছে। বড় দুই দলও তাদের অবস্থানের আলোকেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা যখন তাদের পক্ষে যায়, তখন তারা চুপ থাকে বা সমর্থন জানায়। বিপরীত দিকে গেলেই 'অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ'-এর অভিযোগ করে। বস্তুত আমাদের সামষ্টিক এ অবস্থানের কারণেই বিদেশিরা এ সুযোগ পান।
আমাদের এ অবস্থা কেন তৈরি হলো, সেটি বোধগম্য। প্রথমত, আমাদের এখানে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক চর্চার অভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এখানে সুশাসন ও মানবাধিকার নিয়ে সংগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বিদেশনির্ভর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলা চলে আমাদের পণ্য রপ্তানির প্রধান বাজার। তা ছাড়া বড় বড় প্রকল্পে ঋণ দেওয়াসহ অনেক ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশকে সহায়তা করে। সে কারণেই পশ্চিমা বিশ্ব অনেক সময় নাক গলাতে চায়, যা অপ্রত্যাশিত। পারিবারিক কোনো বিষয়ে ওই পরিবারের সদস্য ছাড়া যেমন তৃতীয় ব্যক্তির নাক গলানো গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে পারিবারিক বিরোধে ছোটখাটো বিষয়ে নিজেরা সমাধান করতে পারে। কিন্তু যখন বিরোধ অনেক বড় হয়ে ওঠে এবং ঘরের খবর আর ঘরে থাকে না, তখন তৃতীয় পক্ষ হাজির হতে বাধ্য হয়।
এটাও সত্য, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অন্তর্জাতিক আইন এবং রীতিনীতির কারণে অনেক বিষয় আর অভ্যন্তরীণ নেই। কোনো কোনো বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেবল উপদেশ দেওয়াই নয়, বরং হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশই জাািতসংঘের সদস্য (১৯৩টি)। এর বাইরেও জাতিসংঘের অনেক অঙ্গ সংস্থা রয়েছে নানা বিষয়ে। জাতিসংঘ রচনা করেছে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র। তাই কোনো দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবাদ হয়। যেমন রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি যেভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন করেছে; জাতিগতভাবে তাদের নির্মূল করতে চেয়েছে, তাতে সেটি বৈশ্বিক সংকটে রূপান্তরিত। সে জন্যই এর বিরুদ্ধে বিশ্ব সোচ্চার। উইঘুরে চীন যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে মার্কিন প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
বাংলাদেশ নিয়েও আমরা দেখেছি অন্যদের আলোচনার অন্যতম বিষয় মানবাধিকার। এখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো কথা বলেছে। এর বাইরে বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়েও বৈশ্বিক উদ্বেগ আমরা দেখেছি। অনেক আগ থেকেই আমাদের এখানে দুর্নীতি যেভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে, সেটিও প্রকাশ হয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছরই বৈশ্বিক দুর্নীতি সূচক প্রকাশ করে এবং যথারীতি সেখানে বাংলাদেশের দুরবস্থা লক্ষণীয়। তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরও মন্ত্রীরা সংস্থাটির সমালোচনা করেন। নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা প্রায়ই যে বক্তব্য দেন, তার ভিত্তিও অনস্বীকার্য।
মনে রাখা দরকার- 'গ্লোবাল ভিলেজ'-এর অংশ হিসেবে বিশ্ব থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন নই বলেই অভ্যন্তরীণ বলে অনেক বিষয় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং প্রয়োজনে অন্যদেরও ডাকতে হয়। এমনকি অভ্যন্তরীণ যে নির্বাচন; তার গ্রহণযোগ্যতা পেতেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং স্বীকৃতি প্রয়োজন। ফলে অভ্যন্তরীণ বলে অনেক বিষয়েই উদাসীন থাকার অবকাশ নেই। আমাদের ঘর ঠিক থাকলে অন্যরা কথা বলার সুযোগ পাবে না কিংবা কথা বললেও পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো আমাদের শক্তি ও অবস্থান থাকবে।

সমকালে প্রকাশিত ৬ অক্টোবর ২০২২

ট্যাগঃ , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।