Mahfuzur Rahman Manik
নূপুর শর্মার বহিস্কার ও ভারত-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক

মূল: কৃষ্ণ কৌশিক
অনুবাদ: মাহফুজুর রহমান মানিক

গত সপ্তাহে ইসলাম ও নবী মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে রোববার ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দলটির জাতীয় মুখপাত্র নূপুর শর্মাকে বরখাস্ত করে। একই সঙ্গে বিজেপির দিল্লির গণমাধ্যমপ্রধান নবীন কুমার জিন্দালকেও দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিস্কার করা হয়। ওই মন্তব্যের প্রতিবাদে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশ কাতার, কুয়েত ও ইরান ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ভারতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপি এ সিদ্ধান্ত নেয়। দলের নেতাদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে- মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল ভারতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য ১০টি দেশ সৌদি আরব, কাতার, ইরান, ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত, আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান ও ইয়েমেনে বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ বাস করে। মুসলিমবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ তাদের।
ভারত বছরের পর বছর ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। ওই অঞ্চলে গ্যাসসমৃদ্ধ কাতারও ভারতের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের সঙ্গেই ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো তেল, গ্যাস ও বাণিজ্য। এর সঙ্গে আরও দুটি কারণ হলো- উপসাগরীয় দেশগুলোতে অনেক ভারতীয় কাজ করছেন এবং তাঁরা ভারতে রেমিট্যান্স পাঠান।
সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের মতে, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) বা উপসাগরীয় সহযোগী সংস্থা, যার সদস্য আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, কাতার এবং কুয়েত ভারতের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। ভারতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ শরিক হিসেবেও তাদের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। জিসিসির তেল ও গ্যাসের রিজার্ভ ভারতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ সালে আরব আমিরাত ছিল ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বাণিজ্যের পরিমাণ ৭২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তার ওপরে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বাণিজ্যের পরিমাণ যথাক্রমে ১ দশমিক ১৯ ট্রিলিয়ন ও ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন।
সৌদি আরব ভারতের চতুর্থ বৃহত্তর বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২১-২২ সালে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। সৌদি আরব থেকে ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। জিসিসির আরেক সদস্য কাতার ভারতের পঞ্চম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২১-২২ সালে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তা ছাড়া কাতারের সঙ্গেও ভারতের তাৎপর্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী। তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ সালে ভারতে সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি করে ইরাক। ২০০৯-১০ সালের ৯ শতাংশ থেকে তা বেড়ে গত বছর ২২ শতাংশ হয়। কুয়েত এবং আরব আমিরাতও ভারতে তেল রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
এবার দেখা যাক উপসাগরীয় দেশে ভারতের কত মানুষ কাজ করেন এবং তাঁরা কেমন রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠান। ভারতের বহির্বিশ্ব সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ১৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন তথা এক কোটি ৩০ লাখ ৪৬ হাজার ভারতীয় নাগরিক দেশের বাইরে কাজ করেন। এর মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ভারতীয়। আরব আমিরাতে কাজ করেন ৩০ লাখ ৪২ হাজার, সৌদি আরবে ২০ লাখ ৬০ হাজার এবং কুয়েতে ১০ লাখ। এই তিন দেশেই প্রবাসী ভারতীয়দের অর্ধেক সংখ্যক কাজ করেন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২০ সালে ভারত সবচেয়ে বেশি ৮৩ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় অর্জন করে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেক্সিকো (৪২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার) থেকে ভারতের আয় প্রায় দ্বিগুণ। উপসাগরীয় দেশে থাকা ভারতীয়রাই সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন। ২০১৮ সালের এক বুলেটিনের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ সালের ৬৯ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়ের মধ্যে উপসাগরীয় দেশের অবদান ছিল অর্ধেকের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে আরব আমিরাতের অংশ ২৬ দশমিক ৯, সৌদি
আরবের ১১ দশমিক ৬, কাতার ৬ দশমিক ৪, কুয়েত ৫ দশমিক ৫ এবং ওমানের অংশ ৩ শতাংশ। জিসিসির বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২২ দশমিক ৯ শতাংশ।
২০১৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়াতে মনোযোগ দেন। ২০১৯ সালের এক অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, 'মোদি কেন মুসলিম দেশগুলো থেকে এত সহায়তা পাচ্ছে? আজ ভারতের ইতিহাসে উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক।' তিনি আরও বলেছিলেন, ফিলিস্তিন, ইরান, সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং জর্ডানের সঙ্গে ভারতের অসাধারণ সম্পর্ক রয়েছে। আর মালদ্বীপ ও বাহরাইন তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান তাঁকে দিয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে মোদি ওই অঞ্চলে কয়েকবার সফর করেছেন। এই সময়ে ওইসব দেশ থেকেও সেখানকার নেতারা ভারত সফরে এসেছেন। এমনকি মহামারির সময়ে তাঁরা নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। সফরের সময়ে নরেন্দ্র মোদি ওইসব দেশের জনপ্রিয় মসজিদগুলোও দেখেছেন। যেমন ২০১৫ সালে তিনি আবুধাবির (আরব আমিরাত) শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ এবং ২০১৮ সালে মাসকটের (ওমান) সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ পরিদর্শন করেন।
ফলে বর্তমান অবস্থায় নরেন্দ্র মোদি তাঁর দেশের স্বার্থেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবেন। সরকার ইতোমধ্যে বলেছে, এসব মন্তব্য সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব; ভারত সরকারের মনোভাব নয়। ভারত সরকার সব ধমের্র প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল। মন্তব্য করা ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিজেপি ইতোমধ্যে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
কৃষ্ণ কৌশিক :ভারতীয় সাংবাদিক; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর

সমকালে প্রকাশ ৮ জুন ২০২২

ট্যাগঃ , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।