Mahfuzur Rahman Manik
মোটরসাইকেল 'বীরত্ব' নয়, আহাজারি

মোটরসাইকেল সংক্রান্ত সাম্প্রতিক খবরগুলো যতটা না ঘটনা, তার চেয়ে বেশি দুর্ঘটনা। সড়কে প্রায় প্রতিদিনই এ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। মাস শেষের হিসাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার খবরই প্রধান হয়ে উঠছে। ৮ মে সমকালের শেষ পাতায় প্রকাশ, এপ্রিলের দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি নিহত শিক্ষার্থী। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর পেছনের কারণটি মোটরসাইকেল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে এপ্রিলে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৪৩ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২০৬ জন। এমনকি গত মাসের মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল সংক্রান্ত।
মোটরসাইকেল বর্তমান সময়ে তরুণদের বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। কিশোররা বন্ধুদের সামনে নিজেকে হিরো হিসেবে জাহির করতে মোটরসাইকেল কিনতে চায়। অভিভাবকরাও অনেক সময় তাদের আবদার মেটাতে মোটরসাইকেল কিনে দেন কিংবা মোটরসাইকেলের চাবি তাদের হাতে দেন। তরুণ ও কিশোরদের একটি অংশ যেভাবে বেপরোয়া হয়ে দুই চাকার এ যানটি পেতে চায় এবং এটি চালাতে গিয়ে 'বীরত্ব' প্রদর্শন করে, তার করুণ পরিণতি আমরা দেখছি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ৭৯ শতাংশেরই বয়স ছিল ২১ বছরের কম। ১৭ শতাংশের বয়স ৩০-এর কম। বাকি ৪ শতাংশ ৩০-এর বেশি বয়সী। এ পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সঙ্গে বয়সসীমার সম্পর্ক কতটা।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর সমকালে 'কৈশোরের বীরত্ব মৃত্যুতে শেষ' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে নবম শ্রেণির তিন ছাত্র মোটরসাইকেলে আনন্দ ভ্রমণে বেরিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। ভূঞাপুরে নতুন কেনা মোটরসাইকেলে ভ্রমণে বেরিয়ে আরও তিন কিশোরের প্রাণ হারানোর ঘটনা উঠে আসে প্রতিবেদনে। এসব দুর্ঘটনা ঘটছে, কারণ কিশোর-তরুণরা মোটরসাইকেল চালানোর সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। উচ্চ ক্ষমতার মোটরসাইকেল কিশোর-তরুণদের প্রলুব্ধ করবে আরও গতিতে চালাতে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে দুর্ঘটনার কবলে পড়বে।
মোটরসাইকেল যে ক্ষমতা প্রদর্শনেরও মাধ্যম, তা কিশোর-তরুণরা সমাজ থেকেই শিখছে। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে যেভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেওয়া হয়, তখন তাদের ধারণা হয়- মোটরসাইকেল থাকলে ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারে। এটি কিশোর বয়সের স্বাভাবিক প্রবণতাও বটে। মোটরসাইকেল যখন রাজনৈতিক মাঠে বীরত্ব প্রদর্শনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে; মোটরসাইকেল থাকলে অন্যদের ডিঙিয়ে সহজেই সামনে আসার পথ করা যায়; তার প্রভাবও কি কিশোর-তরুণদের ওপর পড়ে না?
গত কয়েক দিন ধরে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে 'মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে বিআরটিএর সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি' প্রকাশ হচ্ছে। ওই বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, দেশে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন সংখ্যা সাড়ে ৩৬ লাখ হলেও মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স সংখ্যা সাড়ে ২৩ লাখ। সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, অন্তত ১৩ লাখ অদক্ষ চালক মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। এর মধ্যে অধিকাংশই যে কিশোর-তরুণ, তা সহজেই বোধগম্য। তা ছাড়া রেজিস্ট্রেশনের বাইরেও কত লাখ অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল চলছে, তার হিসাব কে করবে?
সংগত কারণেই ১৮ বছরের নিচে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা মানে বাহন চালানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা না থাকা কিংবা দক্ষতা থাকলেও প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুনসহ ট্রাফিক আইনের অনেক কিছুই জানা না থাকা। তা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলে দায়িত্ববোধেরও বিষয় থাকে। রাজধানীসহ বড় বড় শহরে হয়তো ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা, তা যাচাই করা হয়। কিন্তু শহর বা মফস্বলে এসবের বালাই নেই। সে জন্যই কিশোর-তরুণরা মোটরসাইকেল চালানোর সাহস করে। এ প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সন্তান যাতে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য অভিভাবকদের কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। অনেক সময় সন্তানরা নানাভাবে আবদার করে এবং অভিভাবকদের জিম্মি করে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর বস্তু ক্রয়ে বাধ্য করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বয়স হওয়ার আগে মোটরসাইকেল কিনে দেওয়া মানে সন্তানের হাতে মৃত্যুদূত তুলে দেওয়া।
আমরা জানি, একটি দুর্ঘটনা আজীবনের কান্না। এ কান্না পরিবারের কিংবা দুর্ঘটনার কবলে পতিত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা ব্যক্তির। সমাজ ও রাষ্ট্রেরও বটে। যার দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্র উপকার পেতে পারত; দুর্ঘটনার কবলে পতিত হয়ে উল্টো তিনি বোঝা হয়ে যেতে পারেন। আর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যেসব কিশোর-তরুণের প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে, তার ক্ষতি কীভাবে নিরূপণ করা সম্ভব? সামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য মূল্যবান প্রাণ কেন দেওয়া? কিশোর-তরুণদেরও তা বুঝতে হবে। তাদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত যান হিসেবে ভালো বিকল্প হতে পারে বাইসাইকেল।

ট্যাগঃ , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।