প্রচলিত উন্নয়ন কৌশলের কারণে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে-ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান। দীর্ঘ সময় তিনি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউএসএইড, জাইকাসহ বিভিন্ন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষার্থী হোসেন জিল্লুর রহমান পিএইচডি করেছেন যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামে তার জন্ম।


সমকাল: যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ, যাকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা হয়েছে। সেখান থেকে আমাদের উত্তরণ কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: বাংলাদেশের শুরুর কথা চিন্তা করলে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, আপনি যেটা বললেন, বিদেশিরা কী বলেছে, অর্থাৎ তলাবিহীন ঝুড়ির তকমা ইত্যাদি। আরেকটা হলো, আমরা কী স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং সেখান থেকে কতদূর এগোলাম। তলাবিহীন ঝুড়ির প্রশ্নে আসি- এ অভিযোগ আদৌ সত্য নয়। আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। বাংলাদেশের যে বহুমুখী পরিবর্তন হয়েছে, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। দুর্যোগপ্রবণ দেশে আগে দুর্যোগ হলে আমরা ভেঙে পড়তাম। এখন ভেঙে পড়ি না, বরং দাঁড়াতে শিখেছি। আমাদের সবদিক থেকে সক্ষমতা বেড়েছে। যদিও উপরি কাঠামোতে নানা পালাবদল ঘটেছে।

সমকাল: উপরি কাঠামো বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: উপরি কাঠামোতে পরিবর্তন মানে আমরা রাজনৈতিক নানা পরিবর্তন দেখেছি। সামরিক শাসন দেখেছি; ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখেছি। এখানে নানা টানাপোড়েন হলেও দেশের অর্থনীতি কিন্তু ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে। ধাপে ধাপে আমাদের গতিশীলতা এসেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। আমাদের অর্জন হয়েছে বটে, কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, সে স্বপ্নের কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। একটি মানবিক ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ এখনও গড়ে ওঠেনি।

সমকাল: দেশের উন্নয়নে কারা বড় ভূমিকা পালন করেছে?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমি মনে করি, বাংলাদেশের উন্নয়নে আমাদের কৃষকরা একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে, নিঃসন্দেহে। তাদের অবদানের কারণেই আমাদের খাদ্যের শঙ্কা দূর হয়েছে। এখানে কৃষকের পাশাপাশি কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদানও কম নয়। আমরা দেখছি, ব্যক্তি খাত এ সময়ের মধ্যে অনেক এগিয়েছে। গার্মেন্ট শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। নারীরা আগে ঘরে এবং বিশেষত কৃষি খাতে অবদান রাখত। এখন তাদের পদচারণা সব খাতে স্পষ্ট। ক্ষুদ্রঋণ এবং অনেক ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতিও তাদের এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি ও মোবাইল ফোনও যোগাযোগে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

সমকাল: উন্নয়নে আপনি কৃষকের অবদানের কথা বলেছেন। কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে কি?

হোসেন জিল্লুর রহমান: হ্যাঁ, কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমেই দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এমনকি চলমান করোনাদুর্যোগেও কৃষক তার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, কৃষকের নিজের ভাগ্যের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এমনকি কৃষকের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও লক্ষণীয় নয়। কৃষককে শুরু থেকেই যে চোখে সবাই দেখে আসছে, এখনও একই চোখে দেখে। অথচ কৃষি দিয়ে আমাদের আরও বিপ্লব করা অসম্ভব ছিল না। এমনকি কৃষিকে এখনও আমরা জাতীয় প্রবৃদ্ধির আলোচনায় সেভাবে আনতে পারিনি।

সমকাল: বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতি ও কৌশল আপনি কীভাবে ব্যাখ্য করবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান:বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতি ও কৌশল বিভিন্ন সময়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত ভূমিকা পালন করেছে। আমরা দেখছি, প্রচলিত উন্নয়ন কৌশলের কারণে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে অথচ পরিবেশের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে। দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে চিন্তা না করেই নানামুখী প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন নীতি ও কৌশলের কারণে আমরা আরও নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব দেখতে থাকব।

সমকাল: উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ কি উপেক্ষিত থাকছে?

হোসেন জিল্লুর রহমান: পরিবেশের কথা চিন্তা না করে উন্নয়নের কারণে আমরা অপরিকল্পিত নগরায়ণ দেখছি। ঢাকা শহরের কথাই ধরুন। এখানকার খালগুলো বর্তমানে মৃতপ্রায়। আমাদের নদীগুলোর অবস্থাও সঙ্গিন। দেশের সর্বত্র নদীদূষণ ও দখল আমরা দেখছি। আমাদের সব মানুষ এখনও সুপেয় পানি পাচ্ছে না। বিদ্যুতে পরিবেশবান্ধব সোলারে জোর না দিয়ে আমরা পরিবেশ বিধ্বংসী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা হাতে নিচ্ছি। উন্নয়ন অবকাঠামোর জন্য চাষের জমি, নগরের মাঠ, খোলা জায়গা সাবাড় করা হচ্ছে। আমাদের অপরিকল্পিত ইটভাটা কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি করছে না; মানুষও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সমকাল: পরিকল্পিত নগরায়ণের কথা অনেক দিন ধরে শোনা যাচ্ছে…

হোসেন জিল্লুর রহমান: পরিকল্পিত নগরায়ণের কথা বলা হলেও সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পরিকল্পিত নগরায়ণ কিন্তু সার্বিক বিষয়। মানে ধরুন, নগরের পরিবহন ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত। নগরের মানুষের অবসর কাটানোর জন্য সবুজ পরিবেশ নেই। জলাধার ধ্বংস হচ্ছে। আমাদের সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে কিছু নেই। মনুষ্যবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, প্রযুক্তির বর্জ্য মানুষের ক্ষতি করছে। সে ব্যবস্থাপনা জরুরি। আমরা এখন গ্রামেও জলাবদ্ধতা দেখছি, যেটা আগে কল্পনাও করা যেত না। সেটাও হচ্ছে গ্রামকে শহর বানানোর প্রচেষ্টার কারণে।

সমকাল: উন্নয়ন কি তাহলে অবকাঠামো খাতেই বেশি হচ্ছে?

হোসেন জিল্লুর রহমান: অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বললে আশির দশকের গ্রামীণ রাস্তাঘাটের কথা শুরুতেই বলতে হবে। তখনকার ওই উন্নয়নের কারণে কৃষক ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে। তারা সড়ক ব্যবহার করে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে পেরেছে। এর পর অনেক সড়ক-কালভার্ট-ব্রিজ-উড়াল সেতু হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু আমাদের একটাই সমস্যা- এগুলো টেকসই হচ্ছে না। একটা সড়ক করার ছয় মাস পরই আমরা দেখছি, সেটা ভেঙে পড়ছে। একদিকে এসব উন্নয়নমূলক কাজে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহূত হচ্ছে, অন্যদিকে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণেরও যথাযথ ব্যবস্থা নেই।

সমকাল: বর্তমানে অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান…

হোসেন জিল্লুর রহমান: বড় প্রকল্পের কাজ হচ্ছে- এটা ভালো বিষয়। পদ্মা সেতুসহ কিছু প্রকল্প উন্নয়নে ভূমিকা পালন করবে নিশ্চয়ই। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সব প্রকল্পই যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

সমকাল: উন্নয়নের বিচারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাধা কী বলে আপনার মনে হয়?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমি মনে করি, বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা দক্ষ জনশক্তির অভাব। সস্তা শ্রমিকের আমাদের অভাব নেই, কিন্তু দক্ষ শ্রমিক নেই। ফলে আমরা দেখছি, যখন তৈরি পোশাকসহ বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানেই টপ লেভেলের উল্লেখযোগ্য জনশক্তি বিদেশ থেকে এসে বাংলাদেশে উচ্চ বেতনে কাজ করছে। এই দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হওয়ার অন্যতম কারণ আমাদের মানসম্মত শিক্ষার অভাব। শিক্ষায় এনরোলমেন্ট বাড়ছে বটে, কিন্তু ঝরে পড়া থেমে নেই। আবার মানের সমস্যাটাই সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমাদের শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে এ কারণেই যে, তারা দক্ষ শ্রমিক হতে পারছে না। আমরা দেখছি বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক যাচ্ছে কম বেতনে। অথচ দক্ষ শ্রমিক তৈরি হলে দেশ-বিদেশ উভয় ক্ষেত্রেই তারা ভূমিকা রাখতে পারত।

সমকাল: দক্ষ শ্রমিক তৈরি হচ্ছে না কেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমাদের কাগজে অনেক পরিকল্পনাই রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা রূপ নিচ্ছে না। শিক্ষার সর্বস্তরে মান খুব জরুরি। এটি নিশ্চিত করতেই হবে। না হলে এই জনশক্তি দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর আমরা পার করতে পারব, কিন্তু একশ বছরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারব না।

সমকাল: উন্নয়নের জন্য যে বিনিয়োগ প্রয়োজন। দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমরা দেখছি, অনেক দিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। দেশি বিনিয়োগেও অনেকে এখন সাহস পাচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাবে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক হয়রানি দূর করা না গেলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে না। আর ব্যক্তি খাতও সেভাবে সম্প্রসারিত হবে না।

সমকাল: করোনাদুর্যোগের প্রভাব দেশের অর্থনীতি কত দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আপনার ধারণা?

হোসেন জিল্লুর রহমান: করোনা মহামারি একটা বৈশ্বিক দুর্যোগ। করোনা পরিস্থিতির এখনও সেভাবে উন্নয়ন ঘটেনি। মাঝখানে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটলেও আবার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়- এ রকম কত ঢেউ আমরা দেখব, বলা যায় না। এ জন্য অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব উত্তরণের সময়সীমাও এখনই বলা যাচ্ছে না।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

হোসেন জিল্লুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

 

Post By মাহফুজ মানিক (470 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *