বিদ্যুতের বৃক্ষপ্রাপ্তি

গাছকেই বানানো হয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি

বিদ্যুৎ নিয়ে রং-তামাশার যেন শেষ নেই। এই তামাশায় একবার আমরা দেখেছি, বিদ্যুতের খাম্বা আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। আবার উল্টো দেখা গেল, বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু খাম্বা কিংবা বিদ্যুতের খুঁটি নেই। খাম্বা বা বিদ্যুতের খুঁটি ছাড়া বিদ্যুৎ থাকে কীভাবে! সে বিস্ময়ই শনিবারের সমকালে এসেছে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে। যেখানে বিদ্যুতের খাম্বা কিংবা খুঁটির বালাই নেই; তবে বিদ্যুৎ ঠিকই গ্রাহক পাচ্ছেন গাছের মাধ্যমে! ঝালকাঠির ‘নলছিটিতে গাছকেই বানানো হয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি’। অভিনব বটে।

প্রাকৃতিক গাছই যদি বিদ্যুতের খুঁটি হিসেবে ব্যবহূত হয়, তাহলে নতুন করে খুঁটি নির্মাণ, আনয়ন ও স্থাপনসহ নানা ঝামেলা পোহানোরই বা দরকার কী! নলছিটিতে গাছকে বিদ্যুতের খুঁটি হিসেবে ব্যবহারের যুক্তি যদিও এটি নয়। সেখানে নিরাপদ বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপনের জন্য এক কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষও হয়েছে কিন্তু কাজ হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই ওই এলাকায় গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে বিদ্যুতের তার। কিংবা গাছের সঙ্গে র‌্যাক দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, সুতরাং বাকি কাজ কখন হবে, কেউ জানে না।

কেতাবে অনেক কিছুই থাকে। যেমন- জীবন্ত গাছের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা বিদ্যুৎ প্রবাহ আইন ও বিদ্যুৎ উনয়ন বোর্ডের নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কারণ, জীবন্ত গাছ এমনিতেই অতিমাত্রায় বিদ্যুৎ পরিবাহী। আর সেটা বর্ষায় বা কুয়াশায় যেভাবেই ভিজুক, তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেখানে এরই মধ্যে নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে বলে সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে।

গাছের সঙ্গে বিদ্যুতের তারের ঘটনা নলছিটিতেই প্রথম নয়। এ রকম গাছে তো বটেই, বাঁশের খুঁটিতেও তার স্থাপনের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায়ই ভুক্তভোগী এলাকার মানুষ। কখন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, এ আতঙ্কে দিনাতিপাত করেন তারা। সমকালের প্রতিবেদন থেকেই বোঝা যাচ্ছে, নলছিটির মানুষের আশাবাদী হওয়ার মতো খুব শিগগির কিছু ঘটছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারের অহেতুক বিলম্বের কারণেই নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। সে ঠিকাদার এখন নতুন করে সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছেন, এরপর কাজ হবে। সময় বাড়ানো মানে একই সঙ্গে খরচও বাড়া। সরকারি প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেই এমনটা দেখা যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণে মেয়াদ যেমন বাড়ছে, একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খরচও।

কোনো এলাকায় যখন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে, তার আগেই নিরাপদ সংযোগ লাইন নিশ্চিত করাটাই স্বাভাবিক। তা নিশ্চিত না করেই কেন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে? আমরা জানি, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিটি ঘরে শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৪ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে- বলছে সরকার। এমনকি বিদ্যুৎ এখন উদ্বৃত্ত রয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে সুখবর। তবে সরকারের এ প্রতিশ্রুতিকে ঢাল হিসেবে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে এভাবে গাছে গাছে বিদ্যুতের তার ঝোলানোর বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না। কারণ, বিদ্যুৎ কোনো খেলার বিষয় নয় যে কোনোভাবে এটি সেট করে দিলেই হবে।

বিদ্যুতের কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনা কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তাই অবিলম্বে ঝালকাঠির নলছিটিসহ দেশের যেখানেই গাছের মাধ্যম বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিদ্যুতের খাম্বা বা খুঁটি স্থাপন করা হোক। যাদের দায়িত্বহীনতার কারণে এসব ঘটছে, তাদেরও জবাবদিহির মধ্যে আনা উচিত। মানুষের জীবন নিয়ে খেলার অধিকার কারও নেই।

Post By মাহফুজ মানিক (437 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *