Mahfuzur Rahman Manik
গ্রিন স্কুল, রবীন্দ্রনাথ এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা
মার্চ 24, 2013
GreenSchool-Bali
ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অবস্থিত গ্রিন স্কুল

রবীন্দ্রনাথ কি আজকের দুনিয়ার গ্রিন আন্দোলনের কথা জানতেন? সবকিছুকে গ্রিন করার যে আয়োজন এখন সর্বত্র। 'গ্রিনের' তালিকায় কত কিছুই না আছে; গ্রিন টেকনোলজি, গ্রিন পার্টি, গ্রিন ইকোনমি, গ্রিন টি, গ্রিন ডে, গ্রিন বুক ইত্যাদি। জানুয়ারিতে ব্রিটেনের গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদন পড়ে এই তালিকায় গ্রিন স্কুলের খবরও জানা গেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক বছর ধরে এই গ্রিন স্কুল রয়েছে। আমাদের দেশে গ্রিন স্কুল এখনও সেভাবে নেই। গ্রিন স্কুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচিতি না থাকলেও রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয়ের ধারণা থেকে সহজেই তা অনুমান করা যায়। প্রায় একশ' বছর আগে তিনি যে ধারণা দিয়েছেন সেটাই তো প্রকৃত গ্রিন স্কুল। লোকালয় থেকে দূরে নির্জন পরিবেশে গাছপালার মধ্যে স্থাপিত বিদ্যালয়কেই আদর্শ বিদ্যালয় বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। যেখানে শিক্ষকরা নিভৃতে নিজেরা জ্ঞানচর্চা করবেন এবং ছাত্রদের শিক্ষা দেবেন। যে বিদ্যালয়ের সঙ্গে ফসলি জমি থাকবে, দুধের গরু থাকবে; এগুলো ছাত্ররাই পড়াশোনার অবসরে দেখাশোনা করে নিজেদের আহারের ব্যবস্থা করবে। তার শিক্ষা সমস্যা প্রবন্ধে তিনি আরও বলছেন, 'অনুকূল ঋতুতে বড়ো বড়ো ছায়াময় গাছের তলায় ছাত্রদের ক্লাস বসিবে। তাহাদের শিক্ষার কতক অংশ অধ্যাপকের সহিত তরুশ্রেণীর মধ্যে বেড়াইতে বেড়াইতে সমাধা হইবে। সন্ধ্যার অবকাশ তাহারা নক্ষত্রপরিচয়ে, সঙ্গীত চর্চায়, পুরাণকথা ও ইতিহাসের গল্প শুনিয়া যাপন করিবে।' অপরাধ করলে তার শাস্তির কথা বলেছেন প্রায়শ্চিত্ত পালন করা। বিদ্যালয়ে বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিলের প্রয়োজন নেই। ছাত্ররা 'ভূমিতলে' বসে পড়াশোনা করবে। রবীন্দ্রনাথের তপোবন, আশ্রমের শিক্ষাসহ নানা রচনায় তিনি এসব বিষয়ই তুলে ধরেছেন। আশ্রমের শিক্ষা প্রবন্ধে বলেছেন, 'ছেলেরা বিশ্বপ্রকৃতির অত্যন্ত কাছের। আরাম কেদারায় তারা আরাম চায় না, সুযোগ পেলেই গাছের ডালে, তারা চায় ছুটি। বিরাট প্রকৃতির নাড়িতে নাড়িতে প্রথম প্রাণের বেগ নিগূঢ়ভাবে চঞ্চল। শিশুর প্রাণে সেই বেগ গতি সঞ্চার করে।' শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে রবীন্দ্রনাথ একটা উদাহরণও হয়তো দেখিয়ে যেতে চেয়েছেন।
আজকের গ্রিন স্কুল রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয় থেকে কতটা আলাদা। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের একটি বিদ্যালয়কে বিশ্ববিখ্যাত গ্রিন স্কুল হিসেবে দেখা হয়। যেটি সবুজ বনানীর মাঝে আট একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এটি বাঁশ দিয়ে তৈরি। চারপাশে কোনো দেয়াল নেই, নির্দিষ্ট স্কুল ড্রেস নেই। স্কুলের আঙিনায় শিক্ষার্থীরা ফসল ফলায়, সেগুলো দিয়েই তারা খাবার তৈরি করে খায়। সকালে সূর্যকে অভিবাদন জানিয়ে তাদের দিন শুরু হয়। এখানে সঙ্গীত, শিল্পকলা আর নাটকের অসাধারণ কাঠামোর মধ্যে অঙ্ক, বিজ্ঞান এবং ইংরেজি শেখে। এটি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে পড়াশোনা করে। কিন্তু এখানকার পড়াশোনার খরচ মোটেও কম নয়। যেটা বলা চলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
তবে গ্রিন স্কুল বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুটানের কথা বলতেই হবে। দেশটি আমাদের প্রতিবেশী বলে এটা বেশি জরুরি। এছাড়া ভুটানই বোধহয় একমাত্র দেশ, যারা সরকারিভাবে গ্রিন স্কুল প্রজেক্ট চালু করেছে। গার্ডিয়ান আসলে এই ভুটানকে নিয়েই তাদের প্রতিবেদনটি করেছিল। 'লেট ন্যাচার বি ইউর টিচার : ভুটান টেকস কনজারভেশন ইনটু দ্য ক্লাসরুম' শিরোনামে ২ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ২০০৯ সালে ভুটানের জিএনএইচ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) বা জাতীয় সুখ ইনডেক্সকে কেন্দ্র করেই শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন 'গ্রিন স্কুলস ফর গ্রিন ভুটান' প্রোগ্রাম।
হিমালয়ের পাদদেশের এই দেশটি তাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি পরিমাপে ১৯৭১ সাল থেকে জিডিপির পরিবর্তে চারটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে জিএনএইচ ইনডেক্স চালু করেছে। বিষয়গুলো হলো : সামাজিক ন্যায়সঙ্গত উন্নয়ন; দেশজ সংস্টৃ্কতির রক্ষণাবেক্ষণ; পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুশাসনের প্রসার। এগুলোর মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণের আওতায় ২০০৯ সালে এডুকেটিং ফর জিএনএইচ কনফারেন্স থেকে বিদ্যালয়গুলোর কারিকুলামে পরিবেশ বিষয়কে সংযোজন করার প্রয়াস থেকেই গ্রিন স্কুলের ঘোষণা দেওয়া হয়।

MDG : Bhutan : Green Schools
ভুটানের একটি গ্রিন স্কুল

এই গ্রিন স্কুলকে সরকার কীভাবে দেখছে তা জানা গেল ভুটানের শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, 'গ্রিন স্কুল কেবল পরিবেশ সম্পর্কিতই নয়। এটা একটা দর্শন। আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা সবুজ মনের চেতনা সঞ্চার করতে চাই। বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান প্রদান এবং জ্ঞান অর্জেনর বিষয়ে আমরা নমনীয়, জানার সুযোগ এখানে অবারিত।' শিক্ষা বলতে তারা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনকেই বোঝাচ্ছেন না। এর বাইরে অনেক বিষয়, যেমন_ শিশুদের মানসিকতার বিকাশ ঘটানো, তাদের মানবিক হতে শেখানোর কথা বলছেন এবং এর জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
ভুটানের রাজধানী থিম্পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা বলেছে গার্ডিয়ান। যাদের একটি যৌথ সবজির বাগান আছে, শিশুদের সেখানে মৌলিক কৃষি দক্ষতা শেখানো হয়। প্রত্যেক শ্রেণীকক্ষকে দেখাশোনার একটি গাছ এবং একটি করে ফুলের বাগান দেওয়া হয়। শিশুরা প্রতিনিয়ত এদের যত্ন করে। সেখানে 'গ্রিন ক্লিন' স্কিমের আওতায় শিশুরাই প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয় পরিষ্কার করে। পাশাপাশি এরা প্রতিদিন প্রার্থনা ও মেডিটেশনে অংশ নেয়। এ ছাড়া অন্যান্য সামাজিক দায়িত্বও পালন করে থাকে। স্কুলগুলোতে দেশজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গান-গল্প শোনানো হয়।
আমাদের অবস্থা না ঘরকা না ঘাটকা। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করে। কখন ছাদটা ভেঙে মাথার ওপর পড়বে এ ভয়ে থাকে শিক্ষার্থীরা। আবার কোথাও একেবারে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের ডিজিটাল ক্লাসরুমে বসে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করে। যেখানে আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য একটা খেলার মাঠ নেই, সেখানে গ্রিন স্কুলের চিন্তা অবান্তর। রাজধানী তো বটেই, গ্রামেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই। শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়টা চার দেয়ালের মাঝখানে আবদ্ধ, যেন একটা জেলখানা।
তবে দিন যত যাচ্ছে স্বাভাবিক আর প্রাকৃতিক বিষয়গুলো আমাদের কাছে ততটাই শৌখিন বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। পরিবেশকে প্রতিনিয়তই আমরা কুঠারাঘাত করছি। এখন সবকিছুুর সঙ্গে গ্রিন যোগ করে একে পরিবেশসম্মত করার চেষ্টা করা হচ্ছে ঠিকই, একই সঙ্গে এটি শৌখিন হয়ে উঠছে, চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অথচ যদি সবাই পরিবেশকে সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতন হতো, সবকিছু তার প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় বেড়ে উঠত, তখন আর বিশেষভাবে 'গ্রিন' যোগ করে পরিবেশসম্মত করার প্রয়োজন হতো না। বাংলাদেশে এখন গ্রিন স্কুল না থাকলেও নানা রঙে গজিয়ে উঠতে কতক্ষণ। সেটা তখন আর সাধারণ মানুষের থাকবে বলে মনে হয় না। বিশেষ শ্রেণীর কৃত্রিম গ্রিনই হয়তো দেখব। তারপরও এ উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য।

ট্যাগঃ , , , , , , , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।