Mahfuzur Rahman Manik
বন্ধ হয়নি সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা
এপ্রিল 4, 2010
মাহফুজুর রহমান মানিক
ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আয়তনে ভারত বাংলাদেশের চাইতে কয়েক গুণ বড়। ভারত যেমন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশও তেমন। আয়তনে বড় বলে তাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ
-এর এ অধিকার নাই যে তারা বাংলাদেশীদের হত্যা করবে। আশ্চর্য়ের বিষয় হলো যখন আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন ঠিক তার প্রাক্কালে এবং সে দেশে আবস্থানকালীন সময় ও বিএসএফ আমাদের নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে। গত মাসের ১০ জানুয়ারি ছিলো প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, এর আগের দিন ৯ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বেনাপোল সীমান্তে মনিরুল ইসলাম এবং হজরত আলী নামে দুজনকে হত্যা করে বিএসএফ। এদের একজন নিরীহ কৃষক আরেকজন গরু ব্যবসায়ী। আগে যেটা দেখা যেতো শুধু গুলি করে হত্যা, এবার পিটিয়েই হত্যা করেছে গরু ব্যবসায়ীকে। ১০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ভারত গেলেন। ১২ তারিখ তিনি তখনও ভারতে সে অবস্থায়ও দৌলতপুর সীমান্তে ১
জনকে গুলি করে হত্যা করেছে ১ জনকে। ১৩ তারিখ প্রধানমন্ত্রী সফর শেষ করে বাংলাদেশে আসেন সেদিন সাতক্ষীরা সীমান্তে ১ জন নিহত হয় বিএসএফ-এর হাতে।আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে অন্তত কয়দিনের জন্য হলেও এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা যেতো। যাই হোক প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল। প্রধানমন্ত্রী তার সফরে নিশ্চয়ই বিএসএফ-এর এ খুনি আচরণ বন্ধের
বিষয়টি উল্লেখ করছেন বলেই আ
মাদের বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাঁর সফরের আগে, সফরকালীন সময়ে এবং এর পরের বিএসএফ-এর সে নিরীহ মানুষ হত্যার চিত্রের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বরং বেড়েই চলেছে খুনের পাল্লা। গত ১৪ তারিখ রোববার এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ৩০ জানুয়ারি, ২৮ জানুয়ারি ও এ হত্যাকা- হয়েছে। কাউকে মেরেছে গুলি
করে আবার কাউকে পিটিয়ে।শেষ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএসএফ-এর অতর্কিত গুলিতে এক মহিলাসহ আহত হয়েছেন চার বাংলাদেশী। সীমান্তের একই স্থানে ৪ ফেব্রুয়ারি গুলি চালিয়ে এক বিডিআর সদস্যকে হত্যা করে বিএসএফ। লাশ নিয়ে যাওয়ার একদিন পর ফেরত দেয় তারা। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর
সফরের পরও আগের হিংস্রতা কমেনি। ইড়ঃঃড়স ড়ভ ঋড়ৎসএর আগে এ সমস্যার সমাধানে গত ১০ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই বিডিআর ও বিএসএফ-এর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক হয়। ঢাকার বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় অনুষ্ঠিত হয় এ বৈঠক। বৈঠকের সফলতার কথা বলেছিলেনন দুই মহাপরিচালক-ই। বৈঠক সফল হলেও কতটা সুখকর হয়েছে তাই প্রশ্ন। প্রথম দিনের ঘটনা ছিলো সত্যিই দুঃখজনক। তিন দিনের বৈঠকের বসতে না বসতেই খবর বিএসএফের গুলিতে দুজন বাংলাদেশি নিহত। আশ্চর্য বৈ কি! নিস্ফল দুটি প্রাণ। কোনো কারণ নেই। একজন কৃষক। মাঠে কাজ করছেন। হঠাৎ বিএসএফের গুলি। সাথে সাথে প্রাণ হারান। অন্যজন ব্যবসায়ী। গরু কিনে বাংলাদেশে আসছেন। বিএসএফের

গুলিতে তিনিও প্রাণ হারান। নিরীহ প্রাণগুলো ঝরে যাচ্ছে। নির্বিকার বিএসএফ। বৈঠক হয়েছে অনেক। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিএসএফ দাবি করেছে নিহতদের মধ্যে ৮৫ ভাগই অপরাধী। গুলির যত ঘটনা ঘটেছে সবই রাতে। বিএসএফ বিশ্বের সবচাইতে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। ভারতের সীমান্ত রক্ষায় অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে তারা। শ্রদ্ধা করি তাদের। কিন্তু সীমান্তের এ হত্যাকা-ে বিএসএফ-এর যুক্তি কতটা বাস্তব সম্মত। সেদিন দুজনের হত্যা কী প্রমাণ করে। তারাতো রাতে নিহত হননি তারা চোরা কারবারীও ছিলেন না। অতীতের এ নিরীহ মানুষ গুলি করে হত্যার দৃশ্য আরো করুণ বিএসএফ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে বৈঠকের প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ জুলাই পর্যন্ত ৫৯ বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর দেয়া তথ্য মতে, গত ১০ বছরে বিএসএফ এর হাতে ৮৪৮ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে আহতের সংখ্যা ১০০০ এর মত। এছাড়াও ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে, অনেক বাংলাদেশী ধরে নিয়ে গেছে যাদের কোম হদিস মেলেনি।বিএসএফ-এর গুলিতে ২০০৮ এ মোট নিহত হয়েছে ৬২ জন। জানুয়ারি ২০০৮ থেকে ১০ জুলাই, বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকের প্রথম দিন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১২১ জন। ২০০৭ এ নিহত হয়েছে ১২০ জন। ২০০৬ এ ১৪৬ জন ২০০৫ এ ১০৪ জন। ২০০৪ এ ৭৬ জন। ২০০৩ এ ৪৩ জন। ২০০২ এ ১০৫ জন ২০০১ এ ৯৪ জন এবং ২০০০ সালে ৩৯ জন নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত হয়েছে।এ ১০ বছরে বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকের সংখ্যাও কম ছিলো না। বিডিআর-বিএসএফ সমঝোতাও হয়েছে অনেক বার। কিন্তু বেপরোয়া বিএসএফ, কোন চুক্তি, সমঝোতা কিংবা অলোচনাকে আমলে নেয়নি তারা।বাস্তবে দেখা গেছে সীমান্তে গুলিতে যারা নিহত হয়েছেন অধিকাংশই কৃষক। যারা কৃষি কাজ করে জীবন ধারণ করেন। এছাড়াও নিহতদের মধ্যে রয়েছে জেলে, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, রাখাল, নারী এমনকি শিশুও। ভারত বলেছে তাদের সীমানায় তারা অপরাধীদের হত্যা করেছে, অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এরা অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ সীমানায়। ৪১৪৪ কিলোমিটার সীমান্ত-এর মধ্যেই এত হত্যা। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে বিএসএফ-এর গুলিতে বেশি নিহত এলাকাগুলো হলো- সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম।এসব এলাকার সীমান্তবর্তী মানুষ খুবই গরিব। অধিকাংশই কৃষি কাজ করে খায়। এছাড়াও মাছ ধরে কিংবা কোন মতে জীবন ধারণ করে। এ অসহায় মানুষগুলো সবসময়ই বিএসএফ-এর গুলির ভয়ে তটস্থ থাকেন ।বিএসএফ-এর এ বেপরোয়া ভাবের কথা খোদ ভারতেও শোনা যাচ্ছিল। ভারতের মোচা নামক একটি মানবাধিকারণ সংগঠন তাদের এক জরিপে বলেছে, ২০০৮-এর জানুয়ারি থেকে ১৩ জুলাই ২০০৯ পর্যন্ত এ ১৯ মাসে বিএসএফ-এর হাতে ভারতেরই ১৮ জন নাগরিক মারা গেছে।বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা সম্পর্কে বিএসএফের বক্তব্য গুলিতে নিহত হওয়া ৮৫ ভাগই অপরাধী। তাদের এ বক্তব্য যদি সঠিকও হয়, অপরাধী হলেই কী তাদের দেখা মাত্রই গুলি করতে হবে? গুলি করে হত্যাই কী সমাধান? এ ছাড়া বুঝি কোন পথ নেই। দেখা মাত্রই গুলির প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিৎ চোরাকারবারী, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, নারী-শিশু পাচারকারীদের মতো অপরাধীদের বিরুদ্ধে সীমান্তে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেটা যে দেখলেই সাথে সাথে গুলি, তা নয়। গুলির এ প্রবণতার ফলে নিরীহ মানুষ বিনা অপরাধে মারা পড়ছে। আবার সীমান্তে অনেক সময় সীমানা চিহ্নের খুটি দেখা যায় না, ভুলে কেউ ওপারে গেলেই গুলি চালায় বিএসএফ।বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকে অবশ্য এ নিরীহ নাগরিক হত্যার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিলো। বিএসএফের মহাপরিচালক মাহেন্দ্র লাল কুমাওয়াত এ হত্যা বন্ধের অঙ্গীকার করেছেন। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে পাকিস্তান-ভারত সীমান্তের মত যৌথ টহলের ব্যবস্থা করলে হয়তো এ হত্যা বন্ধ হতে পারে।ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রতিবেশী বললেও পরিচয়টা খাটো হয়ে যায়। ভারত গোটা বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এ ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ সেভাবে লক্ষ্যণীয় নয়।বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে অনেক অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে। প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা চিহ্নিত করা এখনো বাকি রয়েছে। আমাদের তালপট্টি দ্বীপ রয়েছে ভারতের দখলে। ছিটমহর সমস্যা জিইয়ে রেখেছে ভারত আমাদের উপকূলীয় গ্যাস-তেল ক্ষেত্রগুলোকে আন্তর্জাতিক লিজ দেয়ায় বাধা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক ফোরামে এগুলোর মালিকানা দাবী করে বসেছে। একবার ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের একাংশকে মরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন আবার টিপাইমুখ বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশে অন্য একটি বিস্তীর্ন অঞ্চল বিপর্যস্ত করে তোলার পথে। ভারতের সাথে আমাদের দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু থাকলেও অন্তত নিরীহ মানুষ হত্যার বিষয়টির জরুরি সমাধান হওয়া দরকার। সীমান্তে বারবারই জিরো টলারেন্স নীতির কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে ফলে না। আমাদের নিরীহ বাংলাদেশীদের গুলি করে, পিটিয়ে এমনকি বিদ্যুতের শক দিয়ে মারছে। এগুলো কখনোই মেনে নেয়ার মতো নয়। পাশাপাশি দুই দেশের উন্নয়নে বন্ধুত্ব জরুরি। এর জন্য আলোচনার বিকল্প নেই। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুই দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। আমরা প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে প্রতিবেশী সুলভ আচরণই চাই। এটা সত্যিকারই দুঃখজনক এভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের নিরীহ লোকগুলো প্রাণ হারাবে। এ বিষয়ে সমঝোতা বৈঠক হলেও বাস্তবে ফলবে না।বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক অনেক ভালো বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ভালো সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এ বিষয়টির ফয়সালা করা সময়ের দাবী। সরকার নিশ্চয়ই চাইবেন না আমাদের নাগরিকরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে এভাবে মারা পড়–ক। দেশের স্বার্থে, নাগরিকের কল্যাণে এ ব্যপারে সরকারের কিছু করা আবশ্যক। সীমান্তের সাথে জড়িত তাদের কর্র্র্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রের উচ্চ মহলে আলোচনা বা যেভাবে সম্ভব একটা সমাধান সবাই চায়।আমাদের বিশ্বাস বিএসএফকে তাদের খুনি আচরণ বন্ধ করতে সরকারের উদ্যোগ কাজে দিবে। নিরীহ কোন বাঙ্গালী আর এভাবে বিনা বিচরে মারা যাবে না। য
(DAILY DESTINY)
ট্যাগঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।