Mahfuzur Rahman Manik
সমরখন্দ সম্মেলন সহযোগিতার নতুন বার্তা দেবে
সেপ্টেম্বর 17, 2022
SCO Samakand Conference 2022

মূল: সাবকাত মিরজিয়েভ

অনুবাদ: মাহফুজুর রহমান মানিক

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা-এসসিওর এবারের সম্মেলন ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সংস্থাটির বর্তমান সভাপতি উজবেকিস্তান পুরোনো যুগের সমাপ্তি এবং নতুন যুগের সূচনাকালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আধুনিক পদ্ধতি গড়ে উঠেছে সর্বজনীন নীতি, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে। কিন্তু বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এক ধরনের সংকট আমরা দেখেছি। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এ গভীর সংকটের কারণ হলো ভূরাজনৈতিক বিরোধ এবং নিজস্ব ব্লকের সেকেলে চিন্তা। যে কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ ধারা বা সাপ্লাই চেইনে সংকট তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে চলমান সশস্ত্র সংঘাত বিশ্বের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ধারা অস্থিতিশীল করেছে এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সংকট তৈরি করছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি, প্রাকৃতিক ও পানি সম্পদের ক্রমবর্ধমান সংকট, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও ভয়াবহ সংক্রামক রোগের প্রসার আমাদের সমাজকে যে নাজুক অবস্থায় ফেলছে, তা আগে দেখা যায়নি। যে কারণে পণ্য সংকটের পাশাপাশি মানুষের আয়ের পথ সংকুচিত করছে। এ অবস্থায় কোনো দেশ একাকী বৈশ্বিক ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না।
সংযুক্ত এ বিশ্বে সংকট থেকে বাঁচার একমাত্র পথ গঠনমূলক আলোচনা ও বহুমাত্রিক সহযোগিতা, যেখানে প্রত্যেকের স্বার্থ ও সম্মানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বড়, মধ্য কিংবা ছোট তথা প্রতিটি দেশ যে সংকটে রয়েছে, তা থেকে উত্তরণে তাদের নিজস্ব ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা ভুলে পারস্পরিক মিথস্ট্ক্রিয়া, ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং সবার স্বার্থের বিষয়ে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে শান্তি, নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশ্বকে অধিক স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ করে। আমাদের সবার সাধারণ সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির বিরুদ্ধে সর্বজনীন রক্ষাকবচ তৈরির এটাই সবচেয়ে সহজ উপায়।
বহুপক্ষীয় সংস্থা ছাড়া প্রত্যেকের স্বার্থ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অসম্ভব। নির্দিষ্ট কিছু বাধা থাকা সত্ত্বেও বহুপক্ষীয় সংস্থা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার পার্থক্য দূরীকরণ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া শক্তিশালীকরণে সাহায্য করে থাকে। তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সাংস্কৃতিক ও মানবিক বিনিময়েও সহায়তা করে থাকে। এসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই পরিচালিত হচ্ছে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান সাংহাই সহায়তা সংস্থা। বস্তুত, এটি এমন একটি ব্যতিক্রমী সংস্থা যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতা- বৈচিত্র্যের দেশগুলো একত্র হয়েছে। তুলনামূলক কম সময়ে সাংহাই সহায়তা সংস্থা অনেক দূর এগিয়ে গেছে এবং বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ সংস্থাটি আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সংগঠন। যেখানে ভৌগোলিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা রয়েছে।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার আন্তর্জাতিক আকর্ষণের মূল কারণ হলো, এখানে কোনো ব্লক নেই। এটি খোলামেলা আলোচনার জায়গা, যেখানে তৃতীয় দেশ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় না। বরং অংশগ্রহণকারী প্রতিটি সদস্যের মধ্যে সমতা ও প্রত্যেকের সার্বভৌমত্ব সমান নিশ্চিত করা হয়। এখানে রাজনৈতিক রেষারেষি ও অস্বাস্থ্যকর চর্চা নেই। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সফলতার মূলমন্ত্র হলো, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বহুমুখী সহযোগিতার পথ উন্মুক্তকরণ। বস্তুত শান্তি, সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির নামে বিভাজনের চেয়ে একত্রীকরণের কথা বলছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা। তা ছাড়া, এ সংস্থাটির সঙ্গে অন্য অনেক দেশও সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অর্থনৈতিক মূল্য বাড়ার কারণ হলো, এর বড় ভূসম্পদ। এখানে যেমন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানবসম্পদ রয়েছে, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাও কম নয়। তা ছাড়া এর বিশাল অব্যবহূত প্রাকৃতিক সম্পদ তো আছেই। বর্তমানে সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মোট জিডিপি বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ। বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়নে একটি আঞ্চলিক সংস্থার এটি বড় অবদান; ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত যে সংস্থাটি মাত্র ২০ বছরের সময়কাল অতিক্রম করেছে। বিশ্বে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগের সঙ্গে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা রূপান্তর ও সমৃদ্ধির দিক থেকে গুরুত্বপূূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শুধু পরিমাণগত দিক থেকেই নয়; একই সঙ্গে নতুন কৌশল বিচারে এ অবদান উল্লেখযোগ্য। পরিবহন ও যোগাযোগ, জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তা, উদ্ভাবন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সবুজ অথনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা। সংস্থাটির পূর্ণাঙ্গ সদস্য রাষ্ট্র আটটি- চীন, পাকিস্তান, রাশিয়া, ভারত, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও কাজাখস্তান।
এসসিওর সভাপতিত্ব গ্রহণের পর উজবেকিস্তান সংগঠনটির সব সদস্য রাষ্ট্রের অব্যবহূত সম্পদ ব্যবহারে কৌশল নির্ধারণ করেছে। আমাদের স্লোগান হলো- সব সদস্য রাষ্ট্র শক্তিশালী হলে এসসিও শক্তিশালী হবে। এই নীতির আলোকে আমরা অভ্যন্তরীণভাবে সংস্থাটিকে অধিক শক্তিশালীকরণে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছি, যাতে এসসিও আমাদের আন্তর্জাতিক শরিকদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় হয়। আমাদের সময়ে এসসিওর ৮০টিরও অধিক বড় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি আমরা সম্পাদন করেছি। নিরাপত্তা, পরিবহন খাত শক্তিশালীকরণ এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগও সংস্থাটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে আমরা একটি এজেন্ডা গ্রহণ করেছি।
করোনা মহামারির কারণে বাণিজ্য, অর্থনীতি ও শিল্প চুক্তিতে তিন বছরের স্থবিরতার পর এখন দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ জরুরি হয়ে পড়েছে। 'গ্রেট সিল্ক্ক রোড'-এর রত্ন বলে পরিচিত ঐতিহাসিক নগর সমরখন্দ ১৪টি দেশের নেতাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে এসসিও এবং দেশগুলোর সমৃদ্ধি নতুন স্তরে পৌঁছাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কিংবদন্তি এ নগর এসসিওর সফলতার নতুন দ্বার খুলতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সমরখন্দের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ব সমরখন্দকে দেখেছে একক এবং অজেয় শক্তি হিসেবে। সমরখন্দের চেতনার আলোকে নতুন রূপে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন আন্তর্জাতিক মিথস্ট্ক্রিয়া দেখবে। এ ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী- সমরখন্দে এসসিওর নতুন অধ্যায় রচিত হবে। এখানে সংস্থাটির যে ভবিষ্যৎ রূপরেখা রচিত হবে, সেটি নিয়ে যাবে অনেক দূর।
এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী, এবারের সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সাবকাত মিরজিয়েভ: উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট; আনাদুলো এজেন্সি থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর

সমকালে প্রকাশ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

ট্যাগঃ , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।