Mahfuzur Rahman Manik
আধখাওয়া জীবনে ফেলে রাখা কেক
মার্চ 29, 2024

ভেতরে ভেতরে মা লাকী বেগম নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলেছিলেন। এতটা শেষ হয়েছিলেন যে, মেয়েকে নিয়েই আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেন। মেয়েটি এভাবে নিজেকে মৃত্যুর কাছে সঁপে দিতে চায়নি। মা যখন তাকে নিয়ে ট্রেনের সামনে দাঁড়াচ্ছিলেন, শেষ মুহূর্তেও নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে গেছে। ১২ বছরের মেয়ে আর কতটুকুই পারে! উভয়েই মৃত্যুর কোলে শয়ান। সমকাল শিরোনাম করেছে– রেললাইনে লাশ, পাশে ছিল আধখাওয়া কেক। মেয়ের প্রিয় ছিল কেক। মা সেই কেক কিনে এনে রেললাইনের পাশে একসঙ্গে কিছুটা খেয়েছেনও। খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই ট্রেন চলে আসে। মা বুঝি তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।

মা নিজে বাঁচতে চাননি, মেয়েটিকেও বেঁচে থাকতে দেননি। যে দহনে তিনি পুড়েছেন; বেঁচে থাকলে সন্তানের ভাগ্যও তেমন হতে পারে। হয়তো সে কারণেই জোর করে মেয়েকে নিয়ে গেছেন। কী এমন বেদনা বহন করছিলেন তিনি?

যশোরের এক গ্রামের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী লাকী বেগম। নিজ বাড়িতে তিনি থাকতেন না কিংবা থাকতে পারেননি। মেয়েকে নিয়ে স্থানীয় বাজারের কাছে এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তাঁর বোনের সূত্রে আমরা জানতে পারি, ১২ বছর আগে ঝিনাইদহ জেলায় লাকীর বিয়ে হয়েছিল। মেয়ে হওয়ার চার বছর পর স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। মেয়েটিকে নিয়ে বাবার বাড়ি যশোরে চলে আসেন। এর পর তিনি আরেকজনকে বিয়ে করেন। সেখানেও বিচ্ছেদ হয় তাদের। এর পর মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। সম্প্রতি দ্বিতীয় স্বামী নাকি আবারও বিয়ে করতে চান লাকী বেগমকে। কিন্তু পরে টালবাহানা করতে থাকেন।

তার মানে, সামাজিক এক টানাপোড়েনের মধ্যে ছিলেন এই মা। আবার তিনি একাকী নন, মেয়েটিও বড় হচ্ছিল। সে জন্যই হয়তো হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। নিশ্চয় পাছে লোকে কিছু বলেছে তাঁকে কিংবা না বললেও সমাজের আচরণ তিনি ভালো করেই জানতেন। ভবিষ্যতে তাঁর কী হবে, মেয়েটিই বা কী পরিচয়ে বড় হবে? এমন আরও কত কল্পনা হয়তো আমরা করতে পারি। বাস্তবে কী হয়েছে, কী ঘটেছে– আমরা জানি না। এখন আর জানার সুযোগও নেই।

যে মা তাঁর সব সুখ বিসর্জন দিয়ে প্রত্যাশা করেন– সন্তান সুখে থাক; এমন কোনো পরিস্থিতি এলে নিজের জীবন দিয়ে হলেও সন্তানকে বাঁচাতে চান; সেই মা কিনা সন্তানকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ট্রেনের নিচে! কতটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন; প্রিয় সন্তানের ব্যাপারে কতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন, তা আমরা জানি না।

২.
রোববার রাজধানীর বনানীর বস্তিতে আগুন লাগে। এতে বস্তির সব পুড়ে যায়। একটা চ্যানেল নিউজ করেছে– ‘দুই আনার সম্পদও বের করতে পারেনি বনানী বস্তির মানুষ’। সেই বস্তিরই ছোট্ট এক মেয়ের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সব হারিয়ে বস্তিবাসী মাতম করলেও মেয়েটির মুখে ছিল হাসি। তার উত্তর ছিল– ‘সবকিছু পুইড়্যা যাক গা, আমার মা তো আছে!’

মাকে পেয়ে মেয়েটা খুশি। আর লাকী বেগম তাঁর সন্তানসহ আত্মহননের মধ্যেই কি কল্যাণ খুঁজেছিলেন? জীবন বড়ই বিচিত্র। তবে এর মধ্যে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকাটাই সার্থকতা।

সমকালে প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৪

ট্যাগঃ , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।