Mahfuzur Rahman Manik
জাদুঘরের 'শক্তি'

জাদুঘর কোনো জাদু বা মায়াবিদ্যার ঘর নয়। তবে জাদুঘরে যে এক ধরনের মায়া আছে, তা অনস্বীকার্য। সেখানে গেলে আমরা প্রাচীন নিদর্শনাবলি দেখতে পাই। অনেক বস্তু আমরা এক ধরনের আশ্চর্য নিয়ে দেখি। শত বছর আগে যে মুদ্রা অমূল্য ছিল, আজ তা প্রদর্শনীর বস্তু। আবার আজ আমাদের কাছে যেটি দামি, ১০০ বছর পর হয়তো তার স্থান এমন জাদুঘরে হবে। জাদুঘরের এই সত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মায়া; রয়েছে বিস্ময়। বলা বাহুল্য, জাদুঘরের ক্ষমতাও সেখানেই। এ বছর আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্যও সেই ক্ষমতার কথা বলছে- 'দ্য পাওয়ার অব মিউজিয়ামস'।
জাদুঘর আমাদের অতীত সম্পর্কে জানান দিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার নির্দেশনা প্রদান করে। আইকম বা ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে দিবসটির প্রতিপাদ্য বিশ্নেষণে তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। টেকসই বা স্থিতিশীলতা অর্জনে ভূমিকা, উদ্ভাবনের ভূমিকা এবং শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ গঠনে ভূমিকা। এসবের মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে জাদুঘর যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তা অনন্য। আমরা জানি, জাদুঘর আমাদের ইতিহাস বহন করে আছে। জাদুঘরে গেলেই আমরা ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন চাক্ষুষ দেখতে পাই। আমাদের পূর্বপুরুষরা কী ব্যবহার করতেন, তাদের নির্মিত বস্তু, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসহ স্মরণীয় ব্যক্তিদের সংগ্রহশালাও জাদুঘরে থাকে। জাদুঘর যেমন ব্যক্তির উদ্যোগে তৈরি হতে পারে, তেমনি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠছে। কেবল গড়ে ওঠাই নয়, বরং তা প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার মধ্যেই জাদুঘরের সার্থকতা। তাই জাদুঘর জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত এবং সমাজসেবামূলক এমন প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য শিক্ষালাভ, জ্ঞানচর্চা, বিনোদন এবং গবেষণা। জাদুঘর ঐতিহাসিক বস্তু সংরক্ষণ করে, প্রদর্শন করে এবং যারা সেগুলো নিয়ে কাজ করতে চায়, তাদের সহায়তা করে।
জাদুঘরের শক্তি এখানেই। এটি অতীত ধারণ করে থাকলেও তা একই সঙ্গে বতর্মান ও ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বেঁচে থাকার স্বার্থেই আমাদের অতীতে দৃষ্টি দিতে হয়। হঠাৎ আমরা কেউই আমাদের বাসভূমে উড়ে আসিনি। আমরা যে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস করছি তার সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের স্মৃতিচিহ্ন জ্বলজ্বল করে জাদুঘরে। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে অবস্থিত আমাদের জাতীয় জাদুঘরে গেলে আমরা যেমন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের নানা উপাদান দেখি; তেমনি বাঙালির সংগ্রামের একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নও দেখি। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পর আজকের প্রজন্ম যখন তার ইতিহাস-ঐতিহ্য জানতে চাইবে, জাদুঘরই সেখানে শেখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। ইতিহাস পড়ে যতটা না অনুধাবন করা যাবে, জাদুঘরে চাক্ষুষ দেখে তার চেয়ে সহজেই তা জানতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনেরও ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। তারও আগের প্রাচীন নিদর্শন যেমন- নৌকা, মৃৎশিল্প, পোড়ামাটি, মুদ্রা, শিল্পকর্ম, অস্ত্রশস্ত্র, ধাতব শিল্পকর্ম, পোশাক, পাণ্ডুলিপি প্রভৃতির সংগ্রহশালা জাতীয় জাদুঘর।
জাতীয় জাদুঘরের বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানের জাদুঘরে ঐতিহাসিক নানা নিদর্শন দৃশ্যমান। ঢাকার আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর, কুমিল্লার ময়নামতি জাদুঘর, বগুড়ার মহাস্থানগড় জাদুঘর, ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় বিভিন্ন যুগের নিদর্শনাবলি দেখা যায়। তথ্যপ্রযুক্তির এ সময়ে জাদুঘরগুলোও সময়ের আলোকে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশেও প্রাচীন নিদর্শনাবলি ডিজিটালাইজেশনের কাজ শুরু হয়েছে। জাদুঘরের তথ্য সংশ্নিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।
শিকড়ের সন্ধানে মানুষ জাদুঘর পরিদর্শনে যায়। আমরা যেমন আমাদের অতীত অস্বীকার করতে পারি না, তেমনি আমাদের শিকড়ও ভুলে থাকতে পারি না। জাদুঘরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ তাই জরুরি।
জাদুঘর কিংবা এর নিদর্শনাবলি কথা বলতে না পারলেও সেগুলো যে বার্তা বহন করে আছে, তা বোঝা অসম্ভব নয়। এটাই জাদুঘরের শক্তি। হাজার বছর আগের অনেক নিদর্শন হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তার তাৎপর্য হয়তো এখন স্পষ্ট নয়, কিন্তু তা অনুধাবনযোগ্য। আমরা এখন থেকে ভবিষ্যতের পানে কত দূর দেখতে পাই তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কত পেছনে যেতে পারি, তা অনুধাবনের শক্তিওবা কম কীসে!

ট্যাগঃ , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।