Mahfuzur Rahman Manik
বোর্ড করে পিইসি স্থায়ীর আয়োজন কার স্বার্থে
নভেম্বর 21, 2021

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিইসি) যখন একেবারে বন্ধ করার কথা, তখনই বিস্ময়করভাবে আমরা দেখছি উল্টো পরীক্ষাটি স্থায়ী করার আয়োজন করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ জন্য আইন করে 'প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড' স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। ইতোমধ্যে 'প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন, ২০২১'-এর খসড়া তৈরি করে জনমত যাচাইয়ের জন্য তা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, এ বোর্ডের অন্যতম কাজ হবে, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার যাবতীয় কাজ করা।

হঠাৎ করে সরকার কার স্বার্থে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষাটি স্থায়ী করার বন্দোবস্ত করছে? অথচ পরীক্ষাটি চালুর পর থেকেই শিক্ষাসংশ্নিষ্টরা এর বিরোধিতা করে আসছেন। করোনার কারণে দুই বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটি বরং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবিও উঠেছে জোরালোভাবে। এমনকি নতুন যে শিক্ষাক্রম আসছে, সেখানেও প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার কোনো সুযোগ নেই। নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় প্রাথমিক সমাপনী দূরে থাক, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট তথা জেএসসি পরীক্ষাও রাখা হয়নি। বরং সেখানে দশম শ্রেণিতে গিয়ে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়ার এ শিক্ষাক্রম আগামী বছর থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আইন করে তড়িঘড়ি ঘরে 'প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড' স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার হেতু কী? সরকার একদিকে শিক্ষায় পরিবর্তন আনছে নতুন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে, এখন তাদের সুপারিশ বাদ দিয়ে প্রাথমিকে শিক্ষা বোর্ড গঠন করে পিইসি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করছে। প্রশ্ন হলো- সরকার আসলে কী চাইছে?

আমরা জানি, সরকার তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সব পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে তাদের মতো শিশুদের পরীক্ষা উঠিয়ে আনন্দদায়ক পরিবেশে শিক্ষার কথা বলেছেন। যদিও ফিনল্যান্ডে শিশুদের ১৬ বছর পর্যন্ত পরীক্ষাই নেই। আমরা তাদেরটা পুরোপুরি না হোক, কিছু তো অনুসরণ করতে পারি। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা উঠিয়ে দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা বাদ দেওয়াও সমান জরুরি। শিশুদের সুন্দর, সুষম ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বিকাশের স্বার্থেই এটি দরকার। আমরা দেখছি, ছোটবেলা থেকেই যেভাবে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার চাপে পিষ্ট; যেভাবে শিশু ও অভিভাবকের মধ্যে পরীক্ষায় 'ভালো ফল'-এর জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা চালু রয়েছে; যেভাবে শিশুরা কোচিং-প্রাইভেট টিউটরের কাছে ধরনা দিচ্ছে, তা থেকে নিস্কৃতি পেতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বাদ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী চতুর্থ শ্রেণি থেকে পরীক্ষা চালু হলে পঞ্চম শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষা থাকার কোনো যুক্তিই নেই। বিদ্যালয়ের নিজস্ব পরীক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু প্রতি বছর যেভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে পিইসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার নেতিবাচক দিকগুলো দিন দিন প্রকটভাবে ফুটে উঠছে। এ প্লাস পাওয়ার সাধনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের আদাজল খেয়ে নামা কিংবা কোচিং-প্রাইভেট ও পড়াশোনার চাপের কথা আগেই বলেছি। একই সঙ্গে আমাদের মনে আছে, প্রাথমিক সমাপনীর সর্বশেষ পরীক্ষাগুলোতে পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নকলের প্রবণতাও দেখা গেছে। এমনকি শিক্ষকদের নকল সরবরাহ, পরীক্ষার হলে অসৎ সহযোগিতা ও নম্বর বাড়িয়ে পাসের সংখ্যা ও জিপিএ বাড়ানোর অঘোষিত 'নির্দেশনা'র বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। এসব কারণেও পিইসি পরীক্ষা পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষার স্বার্থে এবং শিশুর বিকাশে এ পরীক্ষা তুলে দেওয়া জরুরি। করোনার কারণে দুই বছর পরীক্ষাটি বন্ধ। এ সময়ে আমরা স্বস্তি দেখেছি। নতুন করে আইন করে এ পরীক্ষাটি চালু করা কোনোভাবেই উচিত হবে না।

বলাবাহুল্য, পঞ্চম শ্রেণি শেষে সমাপনী জাতীয় পরীক্ষা আগে ছিল না। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতেও এ পরীক্ষাটির কথা বলা হয়নি। হঠাৎ করে কীভাবে এটি চালু হলো, সে ঘটনাও বলা দরকার। ২০০৯-এর আগে পঞ্চম শ্রেণির পর বার্ষিক পরীক্ষা এবং একটি বৃত্তি পরীক্ষা হতো। বৃত্তি পরীক্ষার জন্য কিছু ভালো শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করে তাদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হতো বলে অন্যরা অনেক সময় অবহেলিত থাকত। সে জন্য ওই সময়ের শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি বৃত্তি পরীক্ষা বাতিল করে উপজেলা বা জেলাভিত্তিক অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার কথা বলে। বলা হয়, ওই পরীক্ষায় সংশ্নিষ্ট সব শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে এবং ওই পরীক্ষার ভিত্তিতে বৃত্তি প্রদান করা হবে। পরে সেই প্রস্তাবিত পরীক্ষাটিই শেষ পর্যন্ত জাতীয় সমাপনী পরীক্ষায় পরিণত হয়! অথচ এটি এভাবে হওয়ার কথা ছিল না। সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ করে তুলে যেভাবে পিইসিকে জাতীয়ভাবে নেওয়া শুরু হলো, সেটা এক বিস্ময়। তার প্রভাব আজও আমরা দেখছি।

পিইসির কারণে প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ বেড়েছে। সচ্ছল পরিবারগুলো এক শিক্ষার্থীর জন্য একাধিক শিক্ষকও নিয়োগ করছে। অথচ দরিদ্র পরিবারগুলো তা করতে পারে না। এর বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে পারে না বলে তারা সেভাবে এগোতে পারে না।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাটি যেখানে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর ক্ষতির কারণ; অভিভাবকের মধ্যে দুশ্চিন্তার উপলক্ষ; বৈষম্য ও শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণের পথ উন্মুক্ত করছে; অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে অনৈতিক দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং সর্বোপরি যে পরীক্ষাটি শিক্ষাবিদরাও নাকচ করছে, সেই পরীক্ষাটি নেওয়ার জন্য বোর্ড গঠন করা এবং আইন করে তা স্থায়ী করার আয়োজন আসলে কার স্বার্থে?

শিক্ষার্থী ও শিক্ষাসংশ্নিষ্ট সবাই যদি পিইসির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন, সেখানে তাতে কারা লাভবান হবে? কার জন্য প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় হঠাৎ করে তড়িঘড়ি করে এ প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে? সে উত্তরই বরং বের করা জরুরি। সরকার নিশ্চয়ই বিষয়টি উপলব্ধি করবে। প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ছাড়া যদি বোর্ড অন্য কাজ করে তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু পরিস্থিতি বলছে, পিইসি পরীক্ষাই আসলে এ বোর্ড গঠনের মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং শিক্ষার স্বার্থেই এ প্রক্রিয়া বন্ধ করা জরুরি।

ট্যাগঃ , , , , , ,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।