নীরবতা

Quietআমার বুঝ হওয়ার পর থেকে মনে হয়েছে অন্তত একটা দিক থেকে আমি ভাগ্যবান। যখনই শুনতাম অমুকের নেই তমুকের নেই অথচ আমার আছে তখনই তা মনে হতো। যদিও একজনের দিক থেকে আমরা ভাই-বোনরা বঞ্চিতই ছিলাম বলা চলে। তারপরও ভালো লাগতো; চারজনের মধ্যে একজন না থাকলে অমন কী।
দাদা-দাদী, নানা-নানীদের কথা বলছি। জন্মের পর থেকেই কাছে পেয়েছি দাদা-দাদীকে। তাদের আদর পেয়েছি। আশকারা পেয়েছি। নানাও ছিলেন আমাদের। কিন্তু নানীকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। মায়ের বিয়ের একবছর পর নাকি মারা গেছেন তিনি। নানা-নানীর বাড়িকে অনেকে নানীর বাড়ি বলেন। আমরা বলি নানার বাড়ি। ধারণা করছি আমাদের নানী নেই বলেই তা বলছি। তবে নানীর অভাব আমরা সেভাবে অনুভব করতে পারিনি। করতাম যদি কিছুদিন হলেও তার আদর পেতাম। এখন যেমন দাদা ও নানা মারা যাওয়ার পর তাদের মিস করছি।
তবে দাদা-দাদীর ভালোবাসা যেভাবে পেয়েছি বলার মত নয়। দাদার কথা আগে বলতে ইচ্ছে করছে। মানুষের একটা প্রবণতা আছে। বেঁচে থাকলে একে অপরের গুণ সেভাবে বলতে চায় না। মৃত্যুর পর সবাই সেটা অকপটে বলে- মানুষটি অসাধারণ ছিলেন। কখনো মিথ্যা কথা বলতেন না। খুব ভালো ছিলেন। সমাজে কেউ খারাপ হিসেবে পরিচিত থাকলেও তখন তার কোনো ভালো গুণ বের করে আনেন- আসলে তিনি যেমনই ছিলেন মানুষের উপকার করতেন। যাহোক আমার দাদা মারা গেলেন। আমার ডায়েরিতে তারিখটা লেখা থাকবে। দেখে নেই। ২৩ নভেম্বর ২০১০। এ বিষয়ে ডায়েরি লিখেছি তার দু’দিন পর ২৫ নভেম্বর ২০১০। সেখানেও দাদার বিষয়ে কিছু কথা লিখেছিলাম। তার পুনরাবৃত্তি আর করছি না। তো তিনি মার গেলেন এখন তিন বছর হতে যাচ্ছে। আর নানা মারা গেলেন দাদার প্রায় বছরখানেক পর।
দাদাকে নিয়ে নানা স্মৃতি আমার। অনেক কিছুই ভুলে গেছি। শিশুদের অন্যান্য প্রাণীর প্রতি ঝোক থাকে। আমার বোধ হয় টিকটিকির প্রতি ছিলো। দেখলে ভয় পেতাম। কিন্তু মানুষ যাকে ভয় পায় তাকে অসহায় অবস্থায় দেখলে হাসি পায়। সে অবস্থায় তার উপযুক্ত সদ্ব্যবহারও করতে ভুলে না কেউ। কথায় বলে- হাতি বিপদে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে। সে যাহোক, দাদা একদিন করলেন কী- একটা টিকটিকি ধরে দড়িতে বেঁধে আমার হাতে দিলেন। টিকটিকি দৌড়াতে চায় কিন্তু দড়ি ধরে টান দিলেই কাছে চলে আসে। কী মজা টিকটিকি এখন আমার হাতে বাধা। কিন্তু একটু পরেই দেখলাম টিকটিকির লেজ ছিড়ে সে এক দৌড়ে পালালো। আব্বাকে ছোটবেলায় খুব ভয় পেতাম, কিছু করলে তিনিই মারতেন। তখন তার হাত থেকে উদ্ধারে দাদাই ভরসা। আমার বাবা আর কাকা তারা দু’জনই। আমরা এক ঘরে থাকতাম। উনারা আরেক ঘরে। সকালে নাস্তা খেয়ে আবার দাদার কাছে গিয়ে ভাগ বসাতাম। দাদা চুরি করে আমার জন্য পাউরুটি, কলা ইত্যাদি রেখে দিতেন। পাছে দাদীর বকা খান।
অবশ্য এ লেখার মূল উদ্দেশ্য দাদা নন দাদী। দাদী বেঁচে আছেন। দেড় বছর আগে আমার মাস্টার্স পরীক্ষার সময় একবার দাদীর অবস্থা খুব খারাপ। সবাই এসেছেন দেখতে। আব্বা আমাকে ফোন দিয়ে বললেন আসবি নাকি, হতে পারে এটাই শেষ দেখা। বললাম- পরীক্ষা, এখন কীভাবে যাই। সেই ধাক্কায় বেঁচে গেছেন দাদী। বেঁচে আছেন তিনি- একা, নিসঙ্গ। বাড়িতে আমার মা, কাকী উভয়েই আছেন। তারপরও দাদী নিসঙ্গতা বোধ করছেন। সারাদিন শুয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে একটু বসেন, দাঁড়ান। এ বয়সে মানুষ একাকীত্ব ঘোচাতে সারাক্ষণ আরেকজনের উপস্থিতি কামনা করেন। একটু কথা বলতে চান। দাদীর সে মানুষটি নেই। মা-কাকী সংসারের কাজ করেই ব্যস্ত। দাদীকে গোসল করানো, খাওয়ানোসহ অন্যান্য আনুসঙ্গিক সেবার কাজ তারা করেন। এর বাইরে আলাদা সময় করে দাদীর কাছে বসার সময় কোথায়? কাকীর দুই মেয়ে এখনো ছোট। ওরা মাঝে মাঝে যায় দাদীর রুমে। কাকা আছেন মালয়েশিয়ায়। আমরা ভাই-বোন সবাই পড়াশোনা, চাকুরি আর স্বামীর বাড়িতে বিভিন্ন জায়গায়। আব্বাও চাকুরিসূত্রে কুমিল্লায় থাকেন। প্রতিসপ্তাহে বাড়ি গিয়ে শুক্র-শনি দুদিন থেকে আসেন। তখন হয়তো দাদীর কাছে যান। এর বাইরে সারা সপ্তাহে সুযোগ কই।
দাদীর এই নিসঙ্গতা আমি বুঝতে চেষ্টা করি। বেশি বাড়ি যাওয়া হয় না। তারপরও যখনই বাড়ি যাই দাদীর রুমে ঘন ঘন যেতে চেষ্টা করি। নিজেকে দাদীর জায়গায় রেখে চিন্তা করি। সারাক্ষণ একাকী শুয়ে থাকা কতটা সম্ভব। এভাবে নিসঙ্গ শুয়ে থাকা আর কবরে থাকার মধ্যে পার্থক্য কোথায়। ফলে তার কাছে অনেক্ষণ বসি। তিনি অভিযোগ করেন কেউ আসে না রে… ভাই, কেউ আসে না। এভাবে পড়ে থাকি। একাকী কতক্ষন থাকা যায়? আমি কিছু বলি না। বোঝার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে কষ্ট লাগে। তখন ভাবি একদিন সবাইকেই হয়তো এরকম সময় পার করতে হবে। আরও ভাবি বাস্তবতা বড় কঠিন। মানুষ সবাই ব্যস্ত। কে এসে সারাক্ষণ দাদীকে সময় দিবে, তার পাশে বসে থাকবে?Think
আমি দাদীর পাশে বসলেও দাদী কতটা উপভোগ করেন জানা নেই। এক অদ্ভুত মানুষ আমি। কারও কাছে গিয়ে আলাপ জুড়ে দিবো সে অভ্যাস নেই। কেমন আছেন, কি খাইছেন- ইত্যাদি প্রাথমিক সম্ভাষণের পর কাজের কথার পরই আমার কথা শেষ। এরপর জিজ্ঞেস করলে কথা আগাবো না হলে আমি আর উদ্যোগি হয়ে কিছু বলি না। দাদীর কাছে গেলেও এই আচরণই ফুটে ওঠে আমার। প্রথমে নিজের তরফে দু’চার কথা হয়। তারপর দাদী জিজ্ঞেস করেন তার জবাব দেই। এরপর কতক্ষন নীরব। দাদী বিভিন্ন দোয়া দুরুদ পড়া শুরু করেন। তিনি যখন আরেকটু সুস্থ ছিলেন, নানা জায়গা থেকে মানুষ আসতো। শিশুদের নিয়ে মা-রা আসতেন। দাদী দোয়া দুরুদ পড়ে ঝেড়ে দিতেন। তারা সুস্থ হয়ে যেতো। দাদী এখন তেমন পারেন না। সেসব দোয়া আমার এক ফুফুকে শিখিয়েছেন। আমার মাকেও শিখিয়েছেন। মানুষ নাকি তাদের কাছেও আসে। আমাকে এসব বলেন। আরও বলেন কারা কারা এসে তার কাছে দোয়া শিখে যান। আমি কিছু বলি না। শুনে যাই। আমি নীরব। দাদী বলতে থাকেন। এভাবে কত কথাই না বলেন। আমার নীরবতা তিনিও লক্ষ্য করেন। সেটা বুঝলাম এবার ঈদে গিয়ে। দাদীর কাছে বসে আছি।  তার কাছে আমাদের পরিচিত একজন এসেছেন, আমাকে দেখিয়ে দাদী তাকে বলেন- ও এমনি। কথা কম বলে। চুপ থাকে। তারপরও আমি নীরব। দাদী কথা বলেই যান। কথা শেষ হয় না। আমি বসে আছি তাতেই তিনি খুশী। সময়ে সময়ে যখন তার কাছে যাওয়ার জন্য তিনি নিজেই ডাকেন তখনই সেটা বোঝা যায়। তার ডাক শুনে আবার যাই। কথা শুনি। নীরব থেকে জীবনের বিচিত্র রূপ দেখি আর ভাবি। কী ভাবি আমি জানি না।

  • বিশেষ দ্রষ্টব্য: ২৫ আগস্ট ২০১৫ সালে দাদীও চলে গেছেন। লেখাটি তার জীবতাবস্থায় লিখলেও তিনি দেখে যেতে পারেননি। অার সময়ের পরিক্রমায় আমাদের ভাইবোনদের অবস্থানও পরিবর্তন হয়েছে।
  • ছবি: ইন্টারনেট

Post By মাহফুজ মানিক (451 Posts)

Mahfuzur Rahman Manik, Profession: Journalism, Alma Mater: University of Dhaka, Workplace: The Daily Samakal, Dhaka, Birthplace: Chandpur, Twitter- https://twitter.com/mahfuzmanik, Contact: mahfuz.manik@gmail.com

Website: →

Connect


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *