
প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’র খসড়া অধ্যাদেশের ওপর অংশীজনের মতামত গ্রহণে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয় সোমবার। তার পরদিন থেকে রাজধানীর সরকারি সাত কলেজে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পূর্ণদিবস কর্মবিরতি চলছে। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া অধ্যাদেশটির সঙ্গে একমত নন এ শিক্ষকরা।
শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় আমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও উপস্থিতির অধিকাংশই অধ্যাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন, আমি বাস্তবতার আলোকেই বিনয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে যেসব বিষয় তুলতে পারিনি, সেগুলোই এখানে আলোকপাতের চেষ্টা করছি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ২০ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত দেওয়ার অবকাশ আছে। আশা করি, আমার সামান্য নিবন্ধ তাদের চোখে পড়বে।
খসড়া অধ্যাদেশটি নিয়ে আমি ইতোমধ্যে লিখেছি: ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি: শিক্ষা সংকোচনের বিপজ্জনক পথ’ (সমকাল, ১ অক্টোবর ২০২৫)। তার পুনরাবৃত্তি না করে মনে রাখতে বলি- সমস্যার মূল কারণ কাঠামোগত। যেখানে খসড়া অধ্যাদেশের অনুচ্ছেদ ৬ এর ১-এ সাতটি কলেজ ক্যাম্পাসকে চারটি স্কুলে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। তার মানে আগের সাত কলেজের আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাতন্ত্র্য আর বজায় থাকবে না।
ইতোপূর্বে কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কলেজগুলো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার পর যে অব্যবস্থাপনা দেখা দেয়, সে কারণে শিক্ষার্থীরা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি শিক্ষার্থীরা করতেই পারে। কিন্তু দাবি করলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় বানানো যায় না। তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করেছিল; তাদের দাবি আমলে নেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় করার আগে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও সমীক্ষা যাচাই করা জরুরি। সাত কলেজ সমস্যার সমাধান হিসেবে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি উঠেছিল তখন এর সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা কতটা হয়েছে– প্রশ্ন উঠেছে।
গবেষণা ও সমীক্ষা যাচাইয়ের সঙ্গে জরুরি ছিল সাত কলেজের অংশীজনের মতামত গ্রহণ করা। অথচ সরকার অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশের আগে কলেজগুলোর শিক্ষকদেরই মতামত নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ইউজিসি সাতটি ঐতিহ্যবাহী কলেজকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার ‘পরিকল্পনা’ নিয়েই এগিয়েছিল। সেভাবেই তারা শিক্ষার্থী ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। এখন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হওয়া নিয়ে অচলাবস্থা চলছে। শিক্ষকদের বক্তব্য, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ার আগেই কেন এই বিজ্ঞপ্তি?
শিক্ষকদের দাবি অযৌক্তিক নয় এ অর্থ যে, প্রস্তাবিত বা প্রক্রিয়াধীন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বা সমকক্ষ প্রতিষ্ঠান ওইসব শিক্ষার্থীকে ভর্তি নেবে। অথচ সেই প্রতিষ্ঠান এখনও গঠন করা হয়নি। তবে কোন এখতিয়ারে সাত কলেজের শিক্ষকরা তাদের ভর্তি নেবেন? এখানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট।
শিক্ষকরা বলেছেন, দ্রুততম সময়ে সাত কলেজের স্বতন্ত্র কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ জারি করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ খসড়া অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে চারটি স্কুল করার প্রস্তাব বাতিল করে কলেজিয়েট পদ্ধতিতে যাওয়া। আগের মতোই কলেজগুলো থাকবে; তাদের কর্তৃপক্ষ হবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। অধিভুক্ত হিসেবে কলেজগুলো আগের মতো পরিচালিত হবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই সংশোধনী আনা কঠিন নয়।
বস্তুত সরকার যে এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক, তাও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট। কারণ শিক্ষা উপদেষ্টা উপস্থিত থেকেই ইতোমধ্যে কয়েকটি বৈঠকে অংশীজনের মতামত নিয়েছেন। তিনি তাদের মতামত গ্রহণের আশ্বাসও দিয়েছেন। আর অনলাইনে আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় মতামত গ্রহণ করেছে।
তা ছাড়া মঙ্গলবার বিকেলে নিবন্ধটি যখন লিখছি, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ফেসবুক পেজে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে এও বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির খসড়া অধ্যাদেশের ওপর প্রাপ্ত প্রতিটি মতামত আইনগত ও বাস্তবতার নিরিখে গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছে। অনলাইনে প্রাপ্ত ও প্রত্যক্ষ মতামত পর্যালোচনা করে খসড়া পুনর্মূল্যায়ন ও পরিমার্জন কাজ মন্ত্রণালয় শুরু করেছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য এটাও জানানো হয়েছে, এ কাজে যেহেতু সময় লাগছে সেহেতু সাত কলেজের জন্য যে অন্তর্বর্তী প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে, তার অধীনে যেন ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করে ২৩ নভেম্বর শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করতে পারে।
সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতিগত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলতে চাই, সাত কলেজের শিক্ষকরা যে দাবি করেছেন, সে দাবি আমলে নিয়েও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। সে জন্য শিক্ষার্থীদের আরও এক সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে শুরু হতে পারে অধ্যাদেশ চূড়ান্তকরণ।
আগেও বলেছি, শিক্ষা সংকোচন রোধে খসড়া অধ্যাদেশের সংশোধন জরুরি। অধ্যাদেশে বিস্ময়করভাবে সাত কলেজে কর্মরত বর্তমান শিক্ষকদের কথা নেই। তারা কোথায় যাবেন? এর পরও অভিনব অনেক বিষয় এসেছে। সেগুলো অনেকাংশেই সাত কলেজের বিদ্যমান কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই সম্ভব। খসড়া অধ্যাদেশের যৌক্তিকতা হিসেবে দুটি বিষয় শুরুতেই লেখা হয়েছে– শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি পৃথক্করণ। এর একটি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কলেজ হওয়ার মাধ্যমে পূরণ হবে। অন্যটিও তথা শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে সম্ভব। সে জন্য প্রয়োজনে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষাক্রম উন্নততর করা যাবে। অন্যদিকে কলেজগুলো ভেঙে স্কুল করার অহেতুক সিদ্ধান্ত সংকট কেবল বাড়াবে। এ সংকট সমাধানে সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে সাত কলেজের অচলাবস্থারও নিরসন হবে বলে আশা করা যায়।
সমকালে প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫– সাত কলেজের অচলাবস্থা কাটাতে সদিচ্ছাই যথেষ্ট