
কোনো কোনো মানুষ প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে পরিচিত হন। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির পরিচয়ে পরিচিত হয়। ব্যক্তি অনেক সময় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন। এমনি এক ব্যক্তিত্ব মাহ্বুব উল্লাহ্। অধ্যাপক এবং ডক্টর বাদ দিয়ে দুই অক্ষরের এই নামেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সেভাবেই তিনি জায়গা করে নিয়েছেন তাঁর পাঠক, শিক্ষার্থী, ভক্তকুল ও মানুষের হৃদয়ে। মাহ্বুব উল্লাহ্র এ পর্যায়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর জীবনের পথচলা একেবারে সহজ ছিল না। যদিও তিনি তাঁর সংগ্রাম সহজবোধ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘আমার জীবন আমার সংগ্রাম’ গ্রন্থে। তাঁর জীবনসংগ্রাম এতে মলাটবদ্ধ হলেও একে ইতিহাসের আকরগ্রন্থ বলা যায়।
১৯৪৫ সালে মাহ্বুব উল্লাহ্র জন্ম হলেও ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত সাত দশকের ইতিহাস তিনি তাঁর বইয়ে তুলে ধরেছেন। আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইয়ের কথা আমরা জানি। সেখানে বইয়ের নামের সঙ্গে ৫০ বছর থাকলেও আসলে ৬০ বছরেরও অধিক সময়ের পর্যালোচনা রয়েছে। সেখানে রাজনীতির তিনকাল– ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ সময়ের শুরুর দিকের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৫ সালে নিজের জন্ম দিয়ে শুরু করার মাধ্যমে মাহ্বুব উল্লাহ্ও ব্রিটিশ শাসনকে স্পর্শ করেছেন। এরপর পাকিস্তান আমল আর বাংলাদেশের সূচনা থেকে ২০২৪-এর হালের ইতিহাস তো আছেই।
ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৬২ সালে মাহ্বুব উল্লাহ্ রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনেও তিনি যুক্ত হন। এরপর এক যুগের বেশি সময় ছিল তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজনৈতিক পরিবারেই বিয়ে করেন। তাঁর শ্বশুর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের এমপি ছিলেন এবং ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে এমপি হন। ১৯৭০ সালের ২১ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তাঁকে কারাগারেই কাটাতে হয় এবং বাংলাদেশ ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হওয়ার পরদিন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে মুক্তি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভিজ্ঞতা তিনি তাঁর বইয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহ্বুব উল্লাহ্র বাবা চেয়েছিলেন, তিনি যেন সিএসএস পরীক্ষা দিয়ে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করেন। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে। সে জন্য তাঁকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য আলাপ-আলোচনা শুরু হলেও পরের বছর তিনি সুযোগ পান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সে ভ্রমণ শেষ হয় ২০০৫ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি অধ্যাপনা করেন। সেটা উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে; ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। মাঝে ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৯০ সালে ভারতের জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সূত্রে মাহ্বুব উল্লাহ্ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ড. ইউনূস তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন এবং সেই সূত্রেই তিনি মাহ্বুব উল্লাহ্কে তাঁর বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতি থেকেও মাহ্বুব উল্লাহ্র বিদায় ঘটে। তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমি যেন অন্তত এক বছর সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ না নেই। আসলে আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত না হওয়ার। তবে আমি জাতীয় স্বার্থে যেসব সেমিনার ও আলোচনা সভা হতো সেগুলোতে যোগ দিতাম’ (আমার জীবন আমার সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ৪১৩)।
এরপর আমরা একজন একাডেমিশিয়ান মাহ্বুব উল্লাহ্কে আবিষ্কার করি। যদিও রাজনৈতিক জীবনে তিনি মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জুলফিকার আলী ভুট্টো, আতাউর রহমান খান, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, মোহাম্মদ তোয়াহা, কমরেড আবদুল হক, সুখেন্দু দস্তিদার, দেবেন সিকদার প্রমুখের সান্নিধ্য লাভ করেছেন।
বস্তুত ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকায় লেখালেখি করে আসছেন। তিনি জটিল অর্থনৈতিক বিষয়ও সহজভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে সিদ্ধহস্ত।
ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিক হিসেবে এবং সম্পাদকীয় বিভাগের কর্মী হিসেবে মাহ্বুব উল্লাহ্র সঙ্গে অনেক দিন ধরেই কাজের সুযোগ হয়েছে। তাঁকে স্যার বলতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তাঁর বিস্ময়কর যে বিষয়টি আমাকে অভিভূত করে সেটা তাঁর স্মৃতিশক্তি। অনেক সময় অনুলিখন করতে গিয়ে আমি দেখেছি, এখনও তিনি ছয় দশক আগের তথ্য স্মৃতি হাতড়ে ঠিক ঠিক বলে দিচ্ছেন। কোথায় কমা কিংবা দাঁড়ি হবে, তাও তিনি বলে দেন। বলাবাহুল্য, নিবন্ধ হিসেবে সেগুলো শুধু সুখপাঠ্যই নয়, তথ্যবহুলও বটে।
অনেকে জীবনীগ্রন্থ পড়তে আগ্রহী; আবার কারও পছন্দের ইতিহাস পড়া। মাহ্বুব উল্লাহ্ ‘আমার জীবন আমার সংগ্রাম’ গ্রন্থটি এই উভয় শ্রেণির পাঠকেরই চাহিদা পূরণ করবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে, ইতিহাসের বিষয়গুলোই বেশি আলোচিত হয়েছে। কিংবা তিনি তাঁর জীবনকে ইতিহাসের সময়ের নিরিখেই বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। এটা তাঁর বর্ণনার মুনশিয়ানাও বটে। স্বাভাবিক কারণেই এ বইয়ে আওয়ামী লীগের গত দেড় দশকের শাসন আমল এসেছে। তিনি যেভাবে ২০১৪ সালে এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হন, সেটিও বাদ পড়েনি। খালেদা জিয়ার বক্তব্য চলাকালে ছেঁড়া শার্টে মাহ্বুব উল্লাহ্ মঞ্চে ওঠেন। সমকালের খবরকে কোট করে তিনি লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়া বলেন, দেখেছেন, একজন অধ্যাপককে কী করেছে তারা।’ তারও আগে বিএনপির সময় এবং ব্যক্তিগতভাবে তিনি যেসব দায়িত্বে ছিলেন তার অভিজ্ঞতা এসেছে।
মাহ্বুব উল্লাহ্ ১৯৯৩-৯৭ মেয়াদে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিআইডিএস, রেভিনিউ রিফর্মস কমিশন এবং উচ্চশিক্ষা বিষয়ক কৌশলপত্র প্রণয়ন কমিটিতে কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত আগ্রহের জায়গা থেকে মাহ্বুব উল্লাহ্র জীবনের সঙ্গে জড়িত শিক্ষার বিষয়গুলো আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে। তিনি বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বইয়ের প্রথম দিকেই একটি উপশিরোনাম ছিল: আলীগঞ্জ প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও আমার পিতা। চাঁদপুর আমার নিজ জেলা। সেখানকার হাজীগঞ্জের কাছে আলীগঞ্জের সেই প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বা পিটিআই এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। পিটিআই ইনস্ট্রাক্টররা সরকারের নবম গ্রেডে সম্মানের সঙ্গেই সেবা দিচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯৫৩ সালে তাঁর পিতা পদোন্নতি পেয়ে আলীগঞ্জ পিটিআইর সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হন। পুরো বছর প্রশিক্ষণ হতো। সেখানে শিক্ষানীতি, শিশু মনোবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান দেওয়ার কথা তিনি বলেছেন। তবে এটিও তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো পিটিআইর প্রশিক্ষণেরও অবক্ষয় ঘটেছে বললে অত্যুক্তি হবে না।’ সরকার নিশ্চয়ই সেদিকে নজর দেবে। অন্তত প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে পিটিআই প্রশিক্ষণ বিশ্বমানে উন্নীত করার বিকল্প নেই।
দীর্ঘজীবনে মাহ্বুব উল্লাহ্ ব্যাপক জীবন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন এবং তাঁর বইয়ে সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে। পাঠক বইটি পড়ে নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ হবেন এবং ইতিহাসকেও লেখকের সমৃদ্ধ অভিযাত্রার আলোকে দেখতে পাবেন। আজ এই গুণীর জন্মদিন। জন্মদিনে মাহ্বুব উল্লাহ্কে আমাদের শুভেচ্ছা।
সমকালে প্রকাশ, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫: জীবন-সংগ্রামের মলাটে সাত দশকের ইতিহাস