Category Archives: লেখক

নজরুলকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি হয়নি বললেই চলে

সাক্ষাৎকার: ড. নাশিদ কামাল
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মাহফুজুর রহমান মানিক

নজরুলসংগীতশিল্পী অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল অব বিজনেসের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সংযুক্ত অধ্যাপক ছিলেন। ২০১০ সাল থেকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বায়োস্ট্যাটিসটিক বিভাগে অধ্যাপনার আগে তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ১৯৯৬ সাল থেকে বিভাগীয় প্রধানসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৮৬ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে শিক্ষকতা করেন। তিনি কনসালট্যান্ট ও গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন ইউএনএফপি ও আইসিডিডিআর,বিতে। নজরুলসংগীতশিল্পী পরিষদের সহসভাপতি নাশিদ কামাল ১৯৯৬ সালে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনে পিএইচডি করেছেন। তিনি পরিসংখ্যানে কানাডার কার্লটন ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর লিখিত ও অনুবাদ গ্রন্থসংখ্যা ১৭টি। ২০০৯ সালে নজরুল একাডেমি থেকে নজরুল পুরস্কার ও ২০১৪ সালে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে নজরুল পদকসহ একাধিক পদক ও পুরস্কারপ্রাপ্ত নাশিদ কামালের জন্ম ১৯৫৮ সালে।

সমকাল: আপনি নজরুলসংগীত চর্চা করছেন। নজরুলগীতির অন্তত ছয়টি অ্যালবাম আপনার রয়েছে। প্রথম অ্যালবামের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
নাশিদ কামাল: প্রথম অ্যালবাম করার ক্ষেত্রে অনেকেরই নানা ধরনের অভিজ্ঞতা থাকে। আমাদের সময় প্রথম সিডি সাধারণত নিজের অর্থায়নেই করতে হতো। তবে আমি সৌভাগ্যবান, বেঙ্গল আমার প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করে। তার পারিশ্রমিকও আমি পেয়েছিলাম। তার চিত্রায়ণও হয়েছে। ‘আঁচল ভরা ফুল’ শিরোনামে ওই অ্যালবামের কাজ শুরু হয় ১৯৯৬/৯৭ সালের দিকে। রেকর্ডিংয়ের জন্য আমাদের তখন কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগেও আমি আমার ফুফু সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে কলকাতায় যাই; সংগীতের রেকর্ডিং করি। আমার উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি ওঁদের খুব ভালো লাগে। তখন দেশ পত্রিকায় এ নিয়ে লেখাও হয়। সব মিলিয়ে প্রথম অ্যালবামের অভিজ্ঞতা সুখকরই বলা চলে।
সমকাল: গান রেকর্ডিংয়ের জন্য কলকাতায় কেন?
নাশিদ কামাল: ঢাকায় যে গানের রেকর্ডিং হতো না, তা নয়। তবে কলকাতায় যাওয়ার পেছনে আমি বাড়তি দুটি সুবিধার কথা বলব। Continue reading

তার ‘আজিকার শিশু’

বেগম সুফিয়া কামালকে কেবল ‘শিশুদের’ ফ্রেমে আবদ্ধ করা কঠিন। কারণ, তিনি শিশু-কিশোরসহ সবার জন্য লিখেছেন। সে কাজের ব্যাপ্তিও ছিল অনেক বিস্তৃত। তারপরও তিনি শিশুদের। কারণ সবাই চাইলেও শিশুদের হয়ে উঠতে পারেন না। তিনি পেরেছেন। তবে বেগম সুফিয়া কামালের প্রতিভা ও তার যাপিত জীবন ছিল বিস্ময়কর। শতবর্ষেরও আগে (১৯১১) জন্ম নেওয়া এ মহিয়সী নারীর নিবিড় সাহিত্য চর্চা, সামাজিক আন্দোলনে ভূমিকা আর নারী জাগরণের অবদানও নিঃসন্দেহে গবেষণার বিষয়। ১৯৯৯ সালের এই দিনে মৃত্যু পর্যন্ত এক দীর্ঘ জীবনের সদ্ব্যবহার করে গেছেন বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি কেবল সময়ের তুলনায় এগিয়েই ছিলেন না, বরং সময়কেও এগিয়ে নিয়েছেন।

এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, শিশুদের নিয়ে লেখা কঠিন কাজ। শিশুতোষ লেখার জন্য শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ও বিন্যাসে বিশেষ মনোযোগী হওয়া জরুরি। আরও জরুরি শিশুর মনস্তত্ত্ব বোঝা। বেগম সুফিয়া কামালের শিশুতোষ রচনায় আমরা এর সবক’টির উপস্থিতি দেখি। তিনি একে একে বিখ্যাত সব শিশুতোষ ছড়া ও কবিতা লিখে গেছেন। ইতল বিতল, ছোটন ঘুমায়, প্রার্থনা প্রভৃতি ছড়া কবিতা আজও কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়, বরং এখনও শিশু-কিশোরদের মুখে মুখে। তার হাত দিয়ে শিশুতোষ যেসব লেখা প্রকাশ হয়েছে, সেসব রচনা বেগম সুফিয়া কামালকে বাঁচিয়ে রাখবে। বলাবাহুল্য বেগম সুফিয়া কামালের লেখার মুনশিয়ানা এর বাইরেও বিস্তৃত সমানতালে। সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মোর যাদুদের সমাধি পরে, কেয়ার কাঁটা, একাত্তরের ডাইরি ইত্যাদি বিখ্যাত গ্রন্থ তার হাতে সৃষ্টি।

বেগম সুফিয়া কামাল নবাবী ঐশ্বর্যের মাঝে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তাদের পরিবারে বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও মায়ের উৎসাহ ও সহায়তায় মামার প্রসিদ্ধ লাইব্রেরি থেকে বই পড়তেন এবং বাংলা শেখার চেষ্টা করেছেন। তার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তিন সফল। শিশুকাল থেকেই তিনি সকল বৈরী পরিবেশ উতরে এসেছেন। এমনকি ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের পরও তিনি দমে যাননি। বরং স্বামীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি এগিয়ে গেছেন। Continue reading

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম চাইতেন-আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

সাক্ষাৎকার

লেখক ও সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’-এর রচয়িতা। ১৯৫০-এর দশকে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পেশাগত কাজে সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, ইউনেস্কো পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মানিক মিয়া পদকসহ দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে লন্ডনপ্রবাসী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ১৯৩৪ সালে বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর সংবাদমাধ্যম ভাবনা প্রসঙ্গে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন


সমকাল : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার কবে প্রথম দেখা হয়?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে বরিশালে। ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১১ মার্চ রাষ্ট্র্রভাষা দিবস পালন করা হতো। ছাত্রলীগ তখন দ্বিধাবিভক্ত ছিল। একটি মুসলিম লীগ সরকারের সমর্থক। নেতা ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। অন্যটির নেতা মুসলিম লীগ অর্থাৎ তখনকার সরকারবিরোধী ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তখনও আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি। বরিশালে সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগের স্ট্রং হোল্ড ছিল। নেতা ছিলেন মহিউদ্দীন আহমদ (পরে ন্যাপ এবং আরও পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন)। তিনি শাহ আজিজের ব্যক্তিগত বন্ধুও ছিলেন। বরিশালে ১১ মার্চের ভাষা দিবস উদযাপনের বিরাট ব্যবস্থ্থা হয়। শাহ আজিজ তা জানতে পেরে সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগ যাতে সেই দিবস পালনে যোগ না দেয়, সেই ব্যবস্থ্থা করার জন্য বরিশালে আসেন। শাহ আজিজ বরিশাল থেকে চলে যান ৭ মার্চ (১৯৪৯)। যতদূর মনে পড়ে, শেখ মুজিব মার্চ মাসের ৮ কি ৯ তারিখে বরিশালে আসেন। তখন তিনি বঙ্গবন্ধু নন। ছিলেন মুজিব ভাই। বরিশালে মুজিব অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন বাহাউদ্দীন আহমদ এবং শামসুল হক চৌধুরী টেনু মিয়া। বিএম কলেজের একটি হলে শাহ আজিজের বক্তব্য খণ্ডন করে এবং বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো ভাষায় বক্তৃতা দেন মুজিব ভাই। আমি তার বক্তৃতা বরিশালের সাপ্তাহিক নকীব পত্রিকায় ছেপেছিলাম। মুজিব ভাই তাতে খুশি হয়েছিলেন। তার সঙ্গে এই প্রথম আমার পরিচয়। আমি তখন স্কুলে পড়ি। বঙ্গবন্ধু আমাকে ম্যাট্রিকের পর ঢাকা যেতে বলেন।

সমকাল : সাংবাদিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কেমন সম্পর্ক ছিল? Continue reading

নষ্ট সময়ের শুদ্ধ কণ্ঠস্বর

প্পান্ন বছর বয়স ছাপিয়ে উপছে পড়েনি। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল বইয়ের লেখকের। তিনি শুধু লেখকই ননÑ একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক এবং সমাজ সংস্কারকও বটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিকতা। যিনি বিশ্বাস করতেন সাহিত্য, জীবনের মতোই আপত্তিকর। সে হুমায়ুন আজাদ। স্বমহিমায় ভাস্বর। হুমায়ুন আজাদ। ১৯৪৭-এর ২৮ এপ্রিলে আসেন পৃথিবীতে। বিক্রমপুরের রাড়িখালে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ। বাংলার সাহিত্যাকাশের অন্যতম নক্ষত্র। উজ্জ্বল এ নক্ষত্রটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। ২৭ ফেব্র“য়ারি ২০০৪-এ একুশে বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে আঁততায়ী সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হন। জয়ী হন হুমায়ুন আজাদ। এ ঘটনার সাড়ে পাঁচ মাস অব্যবহিত পরেই জীবনাবসান হয় এ নক্ষত্রটির। ২০০৪-এর ১১ আগস্ট। জার্মানির মিউনিখ। রাত ১২টা। আকাশে জ্বল জ্বল তারকারা। ঘুমুতে গিয়েছেন হুমায়ুন আজাদ। জ্বল জ্বল তারকাগুলো হয়ে গেল নিষ্প্রভ। জানা গেল হুমায়ুন আজাদ নেই। আর নেই। চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। এ মাসেরই ১২ আগস্ট।
তার মৃত্যুর পাঁচ বছর হল। তিনি সমাজের সংস্কার চেয়েছেন। সমালোচনা করতে ছাড়েননি কাউকে। ছাপ্পান্ন বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি যেভাবে বলেছেন, যেভাবে লিখেছেন এবং যেভাবে সমালোচনা করেছেন এভাবে কেউ করেননি। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তার ‘নারী’ নিষিদ্ধ করা হয়। সবশেষ ‘পাকসার জমিন সাদ বাদ’ এর মাধ্যমে তিনি হামলার শিকার হন মৌলবাদীদের। সে ঘটনার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আজও বিচার হয়নি তাদের। হুমায়ুন আজাদ সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ চেয়েছেন। চেয়েছেন জীবন ও সাহিত্যকে একত্র করতে।
তিনি চলে গেছেন। রেখে গেছেন অসংখ্য স্মৃতি। তার বইয়ের মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।