Monthly Archives: সেপ্টেম্বর ২০১২

ইন্টারনেট ও তথ্য অধিকার

‘ক্ষমতায়ন’-এর কথা অহরহই শোনা যায়। জনগণের ক্ষমতায়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়ন ইত্যাদি। এসব ক্ষমতায়ন বাস্তবে না ঘটলেও বুলি হিসেবে যে খুবই জনপ্রিয়_ সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে তা বোঝা কষ্টের নয়। এই ক্ষমতায়নের মাপকাঠি কী এবং কীভাবে ক্ষমতায়ন করা যায়, তারও কিছু মানদণ্ড রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যপ্রযুক্তিকে অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। জনগণের জন্য তথ্যপ্রবাহকে অবাধ করার মাধ্যমে এই ক্ষমতায়ন হবে বলা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইন্টারনেট আসবে, যেহেতু এর মাধ্যমে সহজেই সব তথ্য পেতে পারেন। এমনকি এই তথ্য জানাটা নাগরিকের অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই ২৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্বব্যাপী তথ্য অধিকার দিবস হিসেবে পালন করা হয়। দাতারা তো মনে করেন, এ জন্যই সবার কাছে ইন্টারনেট সেবা পেঁৗছাতে হবে। তাই মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে এটাও অন্যতম লক্ষ্য। সে বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন।
বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেরিটি কমিশন বলছে, দেশে ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় রয়েছে দুই কোটি মানুষ। যার মধ্যে প্রচলিত আইএসপির ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬০ লাখ। এটাকে সরকারের হিসাব বলা যায়। কিন্তু যারা বিশ্বব্যাপী এ হিসাবটা করে, তারা কী বলছে। ২৪ সেপ্টেম্বর আলজাজিরা একটা খবর দিয়েছে_ পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন অনলাইনে। আলজাজিরা জাতিসংঘের টেলিকমিউনিকেশন এজেন্সির তরফে তা প্রকাশ করে। সংস্থার আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) অধীনে ২০১০ সালে দ্য ব্রডব্যান্ড কমিশন ফর ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট নামে একটি কমিশন গঠিত হয়। সে কমিশনই আসলে জরিপ করে। ২০১২ সালে জরিপের ফলাফল বলছে, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে। আইটিইউ একই সঙ্গে এটাও বলছে, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে এ সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন। তারা এও বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ২০ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে। তবে ২০১৫ সালের মধ্যে একে ৪০ শতাংশে পেঁৗছানো তাদের লক্ষ্য।
জরিপটি ১৭০টি দেশের ওপর চালানো হয়। তালিকায় শীর্ষ দেশ আইসল্যান্ড. যেখানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ৯৫ ভাগ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সবার নিচে রয়েছে তিমুর লেস্তে, আগে যেটি পূর্ব তিমুর নামে পরিচিত ছিল। দেশটির ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্য মাত্র ০ দশমিক ৯ ভাগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থান ২৩; ব্যবহারকারী ৭৭ দশমিক ৯ ভাগ। আর বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২ এবং এটি দেখাচ্ছে দেশের ৫ ভাগ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। জরিপে সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টিও আসে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৫৫ ভাগই সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে সক্রিয়। ফিলিপাইনের মানুষ সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। তাদের ৭০ ভাগ মানুষ এগুলো ব্যবহার করে।
ব্যবহারকারী দেশের দিক থেকে না হলেও ডাউনলোড স্পিডের দিক থেকে বাংলাদেশ সবার নিচে। জরিপের মূল প্রতিবেদনেই সেটি এসেছে। বলা হচ্ছে, ‘গ্রাহকদের জন্য গড়ে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড স্পিড রয়েছে লুক্সেমবার্গের, ৪৯ মেগাবাইট; যেখানে এলডিসি দেশগুলোর যেমন বাংলাদেশ, মালাবি এবং সুদানের স্পিড এক মেগাবাইট বা তার চেয়ে কম।’ বাংলাদেশের অবস্থা আরেকটা জরিপ দিয়ে দেখা যাক। সম্প্রতি ফলপ্রসূ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিবেচনায় ৬১টি দেশের ওপর জরিপ করে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ফাউন্ডেশনের টিম বর্নার্স লি। তাদের ওয়েব ইনডেক্সডটঅর্গে প্রকাশিত ফল থেকে দেখা যাচ্ছে, ৬১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৫।
আমাদের অবস্থাটা ভালোই বোঝা গেল। মাত্র ৫ ভাগ মানুষ যেখানে ইন্টারনেটের আওতায়, যেখানে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেটের সুযোগ রয়েছে; সেখানে অন্তত ইন্টারনেট দিয়ে সব মানুষের ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তথ্য জানাটাও জনগণের জন্য কঠিনই থেকে যাচ্ছে। তবে কথা হলো, দিন দিন সংখ্যাটা বাড়ছে। সেটাই হয়তো সান্ত্বস্ননা।

  • ছবি: Courtesy

পুলিশ সিগন্যাল!

দূরে জ্বলছে সিগনাল বাতি, তার মধ্যে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা -সমকাল

রাস্তায় নামলেই নগরবাসী ট্রাফিক জ্যাম আর ট্রাফিক সিগন্যালের সম্মুখীন হন। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় এই দুটির মধ্যে কোনটি বেশি বিরক্তিকর? একজন জবাব দিলেন, ট্রাফিক জ্যাম। আসলেই কি ট্রাফিক জ্যাম? ধরা যাক কেউ একজন গাড়িতে বসে আছেন। তার সামনে বিশাল জ্যাম, তিনি জানেন এটি ছাড়তে ২০ মিনিট কিংবা ৩০ মিনিট লাগবে এবং এখান থেকে বাঁচার আপাত কোনো উপায় নেই। আবার একই ব্যক্তি চার রাস্তাবিশিষ্ট মোড়ের এক রাস্তায় গাড়িতে বসে আছেন। তার সামনে গাড়ি নেই অথবা কয়েকটা আছে। সামনে পুলিশ তার একটা হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা সিগন্যালে লাল আলো জ্বলছে। অন্য রাস্তাগুলো দিয়ে একটার পর একটা যানবাহন যাচ্ছে। এমনকি ইতিমধ্যে কোনো রাস্তা দিয়ে দু’বার করে যানবাহন যাচ্ছে। ২০ মিনিট প্রায় শেষ। গাড়িতে বসে আছেন তো আছেনই। পুলিশেরও খবর নেই, সিগন্যালের লাল বাতিটাও জ্বলে আছে। এবার সহিহ উত্তরটা কী হবে? নিশ্চয়ই ট্রাফিক সিগন্যাল।
ঠিক এই প্রশ্নটা দিয়ে ব্লগেও একটা পোস্ট দেওয়া হলো। দু’জন ব্লগার জবাব দিলেন, দুটিই বিরক্তিকর। একজন বললেন, দুটিই আমার সয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর ট্রাফিক পুলিশ। তিনি অবশ্য আরেকটা কথা বলেছেন, সেটা দিয়েই লেখাটা শেষ হবে।
ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিগন্যালের অবস্থা আসলে এই রকমই। কয়েকটা রাস্তার ক্ষেত্রে তো এটি অবধারিত যে, সহজেই পুলিশ ছাড়তেই চায় না। বিশেষ করে পান্থপথ দিয়ে যারা কারওয়ান বাজার হয়ে এফডিসির সামনে আসেন তারা ভালোই বলতে পারবেন। এমনকি কোনো কোনো সময় পুলিশ অকারণেই ৩০ মিনিট পর্যন্তও আটকিয়ে রাখেন। এখন যেহেতু পুরোটাই পুলিশের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয়, তার মানে ঢাকা শহরে এখন আর ট্রাফিক সিগন্যাল নেই; আছে পুলিশ সিগন্যাল। যেটা আসলেই বিরক্তিকর।
যদিও ট্রাফিক সিগন্যাল বাস্তবে নেই, তা ব্যাখ্যা করার দরকার পড়ে না। আসলে ট্রাফিক সিগন্যাল মানে কী? বিশ্বের সব আধুনিক শহরের উদাহরণ টেনে বললে, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল। যেটা লাল-নীল-সবুজ বাতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেটা ১৮৬৮ সালে ইংল্যান্ডে শুরু হয়েছিল। আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৫ সালে রাজধানীতে প্রথম স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালের কাজ শুরু হয়। ২০০৯ সাল পর্যন্ত পরিবহন চালকসহ সংশ্লিষ্টদের সচেতন করতে কয়েক দফায় বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করা হয়। এ নিয়ে আইনও হয়েছে, না মানলে চালকদের বিরুদ্ধে এক হাজার টাকা জরিমানা এবং তিন মাসের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল।
২০১০ সালের প্রথমদিকে এ নিয়ে বেশ তোড়জোড় চালানো হয়। ওই বছরের ৪ জানুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, ট্রাফিক আইন অমান্য করায় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৬০৩টি মামলা করে তারা। সেই তোড়জোড় এখন কতটা আছে, নগরবাসী সেটা ভালোই বলতে পারবেন। তবে এখন সে আইন যানবাহনচালকরা দূরে থাক খোদ পুলিশই মানছে কি-না যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল এখানেই অসার। যেখানে পুলিশের হাতের ইশারায় যানবাহন চলাচল করে; যেখানে লালবাতি জ্বললেও পুলিশের ক্ষমতায় যানবাহন চলতে পারে; যেখানে পুলিশ নিজেই সিগন্যালের সময় নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে পিক-অফপিক সময় বিবেচনা করে বিভিন্ন রুটে ট্রাফিক সিগন্যালের সময় নিয়ন্ত্রণ করেই দিলেই-বা কী। পুলিশই সর্বেসর্বা। সুতরাং আমাদের সিগন্যালকে ট্রাফিক সিগন্যাল না বলে পুলিশ সিগন্যাল বললে কি একেবারে অত্যুক্তি হবে?
পুলিশকে ইঙ্গিত করে ওই ব্লগারের মন্তব্যের করা শেষাংশ_ মাঝে মধ্যে মনে হয় রাস্তার মোড়ে এসব তালগাছ দাঁড়িয়ে না থাকলে যানজট আরেকটু কম হতো।

গাছতলার স্কুল!

শ্রেণীকক্ষের অভাবে গাছতলায় ক্লাস হচ্ছে_ এ ধরনের চিত্র গণমাধ্যমে প্রায়ই আসে। অবশ্য সোমবারের ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘গাছতলায় আসন পেতে গুরুদক্ষিণার পাঠশালা’ শিরোনামে যে পাঠশালার কথা বলা হচ্ছে এবং সে পাঠশালার ক্লাস যে গাছতলায় হচ্ছে সেটা কিছুটা ভিন্ন ধরনের। মুর্শিদাবাদের পৃথি্বরাজ ঘোষ হাজরা যিনি স্কুলজীবনে এলাকার সোলেমান স্যারের কাছে পড়তেন। স্যারের দক্ষিণা সামান্য হলেও পৃথি্বরাজের সেটা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। স্যার কিন্তু যথার্থ গুরুর দায়িত্ব পালন করে বলেছেন, তোমাকে গুরুদক্ষিণা দিতে হবে না, তুমি বড় হয়ে তোমার মতো অসামর্থ্যদের পড়াশোনা করাবে, সেটাই গুরুদক্ষিণা। পৃথি্বরাজ অবশ্য কথা রেখেছেন। স্নাতক পাস করেই পাড়ার একটা বাড়ির ভাঙা বারান্দায় তিনজনকে নিয়ে পড়ানো শুরু করে দিয়েছিলেন, যাদের দু’জন যাযাবরের সন্তান এবং একজন শিশু শ্রমিক। বিনাবেতনে পৃথি্বরাজের পড়ানো দেখে গরিব পরিবারগুলো তাদের ছেলেমেয়েদের তার কাছে পাঠাতে লাগল। পৃথি্বরাজের শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় তাকে শেষ পর্যন্ত যেতে হয়েছে গাছতলায়। ছয় বছর ধরে গাছতলায়ই সহায়-সম্বলহীন পরিবারের ছেলেমেয়েদের নিষ্ঠার সঙ্গে পড়িয়ে যাচ্ছেন। এখন তার ছাত্রছাত্রী ষাট। পৃথি্বরাজের ছয় বছরের নিষ্ঠা মুর্শিদাবাদের জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মকর্তারাও স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার গাছতলার বিদ্যালয়ই হয়তো একদিন পাকা দালান হবে। পৃথি্বরাজের বিদ্যালয়ের সফলতা এখানেই যে, তিনি সমাজের একেবারে অবহেলিত পরিবারের সন্তানদের পড়ানোর বন্দোবস্ত করেছেন। এর চেয়ে বড় বিষয় হলো শিশু শ্রমিকরাও এই বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ করতে পারছে। বিদ্যালয়টি বসে সকালে।
আমাদের দেশে এখনও অনেক শিশু শিক্ষার বাইরে। সরকারের হিসাব মতে ৯৯ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে গেলেও অনেক শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ে। গণসাক্ষরতা অভিযান তাদের এক গবেষণায় দেখিয়েছে, এখনও ৪৯ লাখ শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এ শিশুদের অধিকাংশই নানা ধরনের শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। পরিসংখ্যান ব্যুরো এক হিসাবে দেখাচ্ছে, ৩২ লাখ শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত, এর মধ্যে ১৩ লাখ একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম করে যাচ্ছে।
পৃথি্বরাজদের বিদ্যালয়ে কিন্তু সবাই পড়তে পারছে, হোক যাযাবর কিংবা হরিজন। আমাদের দেশে এখনও অনেক জায়গায় সে বৈষম্যটা রয়ে গেছে। সামাজিক বৈষম্য আমাদের এ রকম নানা পশ্চাৎপদ পরিবারের শিশুদের পিছিয়ে রাখছে।
শিশু শ্রমিক ও এ শিশুদের জন্য শিক্ষার তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। অবশ্য অনেকে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে এদের শিক্ষায় চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে সেটা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। একটি উদ্যোগের কথা তো বলাই যায়, ১৯৯৪ সালে রংপুর পৌরসভার সাবেক কমিশনার ফাতেমা ইয়াসমিন ইরার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পৌরসভার তত্ত্বাবধানে সুইপার শিশুদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল হরিজন প্রাথমিক বিদ্যালয়। অর্থাভাবে সেটি একদিন
বন্ধ হয়ে যায়।
সরকার সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়, ফলে তাদের এ রকম স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো প্রমোট করা দরকার, যেন এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়ে।
পৃথি্বরাজের উদ্যোগ যেভাবে আনন্দবাজার সামনে নিয়ে এসেছে, একইভাবে আমাদের এ রকম উদ্যোগগুলোকেও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সামনে আসা উচিত। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি সরকারের সহযোগিতায় সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত হবে, হোক না সেটা গাছতলার কোনো স্কুল।

আপনার জন্মদিনে

প্রথম আলোতে প্রকাশিত ওয়াসিম ভাইয়ের গল্পের একাংশ

গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম ফ্রেন্ডশীপ ডে মানে অনেকে যাকে বন্ধু দিবস বলেন সেটা কবে। আগস্ট মাসের প্রথম রোববার। কিছুটা বিব্রতই হলাম, এখন আবার ২০০৯ এর দিনটা বের করতে হবে; দেখলাম ২ আগস্ট ২০০৯। দিনটা বের করা খুব জরুরী ছিলো কিনা জানিনা তবে প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করার জো নেই। তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ শেষ হওয়ার পথে। লেখালেখির ঝোঁকটা মাথায় আরো আগ থেকেই । তো সেদিন আসলে বন্ধু দিবস ছিলো কি-না জানিনা, সেদিন অথবা তার আগের কিংবা পরের দিন বা সে সপ্তাহই হবে। দিনটি উপলক্ষে সাপ্তাহিক-২০০০ বিশেষ আয়োজন করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বন্ধুত্বের স্মৃতি টাইপের কিছু ছিলো। দেখেই কিনে ফেললাম।
হলে নিয়ে এসে রাতে পড়তে লাগলাম। পড়তে পড়তে হঠাৎ বুয়েটের একজনের লেখা পেলাম। পড়ে বেশ ভালোই লাগলো। সেসময় প্রায় প্রত্যেকের লেখার নিচে নাম্বারও দেয়া ছিলো। বুয়েট দেখে বিছুটা কৌতুহল হলো। লেখাটি ভালো লেগেছে বলে একটা এসএমএস পাঠিয়ে দিলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই রিপ্লাই পেলাম, বুঝলাম আসলে নাম্বারটা ভুয়া না। এরপর কয়েকটি এসএমএস। ফোন আর এসএমএস চালাচালি ভালোই চলছিলো। বিশেষ করে আমার লেখা পত্রিকায় আসলে আমি জানাতাম, তখন পাঠকদের জায়গাগুলোতেই লিখতাম। উনিও দেখে রিপ্লাই দিতেন। বেশ প্রশংসা করে রিপ্লাই করতেন। জানিনা প্রশংসা করার মতো আদৌ কোন লেখা ছিলো কি-না। হঠাৎ একদিন প্রায় সকালে তার ফোন পেলাম ‘প্রথম আলো সাহিত্য পাতায় আমার একটা গল্প ছাপা হয়েছে, দেখবেন’। প্রথম আলো আমাদের রুমে রাখা হয়, সুতরাং গল্পটা ওইদিনই পড়ে ফেলি। আমার কয়েকজন রুমমেটকেও পড়াই। বেশ ভালো গল্প। কিছুটা অবিশ্বাস্য। বর্ষার রাতে শিরোনামে গল্পটা এখন খুজে দেখলাম প্রকাশ হয়েছে ৪ ডিসেম্বর ২০০৯। তাকে জানালাম খুব সুন্দর লিখেছেন। Continue reading

ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং

Students on campus at MIT:  Photograph: Eamonn Mccabe for the Guardian

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন, দিন দিন এর মান কমে যাচ্ছে। এর ভিত্তি হিসেবে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংকেও তারা দেখে থাকেন। এ বছরের অবস্থান দেখাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা অপরিবর্তনীয়। যদিও র‌্যাংকিংয়ের মাথাব্যথা শীর্ষস্থান নিয়েই। এ প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান পত্রিকার শিরোনামটিই যথেষ্ট। যেটি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যেন একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে। অবশ্য একটু গভীরভাবে দেখলে মনে হবে, গার্ডিয়ানই হয়তো এই প্রতিযোগিতাটা উস্কে দিচ্ছে। কারণ এর আগের বছরও যেখানে ইংল্যান্ড প্রথম ছিল, এবার সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ে ক্যাম্ব্রিজ ও হার্ভার্ডকে টপকিয়ে এমআইটি শীর্ষে’_ প্রতিবেদনটির হাইলাইটই সেই প্রতিযোগিতার বিষয়টি নিয়ে আসছে। যেটি বলছে, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি শীর্ষস্থানটি দখল করেছে এবং তালিকার প্রথমদিকে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অব্যাহতভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তবে শীর্ষে থাকা ছয়টির মধ্যে চারটিই ব্রিটিশ। এটাই বোধ হয় গার্ডিয়ানের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয়। আর অস্বস্তির বিষয় হলো, ক্যাম্ব্রিজ প্রথম স্থানটি হারিয়ে এখন দ্বিতীয়, আর তৃতীয় স্থানে রয়েছে হার্ভার্ড।
প্রতি বছর পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের ভিত্তিতে এই র‌্যাংকিং করা হয়। ২০০৪ সাল থেকে কিউএস (Quacquarelli Symonds) নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই র‌্যাংকিং করে থাকে। ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয় ২০১২ সালের অবস্থা এবং ওই দিনই এ নিয়ে প্রতিবেদন করে গার্ডিয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করার ক্ষেত্রে গবেষণার গুণগত মান, শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষমতা, শিক্ষকদের শিক্ষাদান এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ইত্যাদি দেখা হয়। অবস্থানের দিক থেকে প্রথম ২শ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ নম্বরে থাকা ইউনিভার্সিটি অব হংকং ছাড়া ওপরের সবই ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, সিঙ্গাপুর. হংকং এবং ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রথমদিকে উঠে এসেছে। চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ও ১শ’র মধ্যে আছে।
এই তালিকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা ভাবা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা অপরিবর্তনীয় বলা হলো। আসলেই অবস্থান কত? কিউএস প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইট www.topuniversities.com -এ ২০১২ সালের কেবল প্রথম ৭শ’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নির্দিষ্টভাবে দেওয়া নেই। বলা আছে ৬০১+। ২০১১ সালের অবস্থা তা-ই ছিল। অথচ ২০০৫ ও ২০০৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং ছিল ৩৬৫। আর মূল তালিকায় না থাকলেও বিশেষায়িত বা উপ-তালিকায় এ বছর প্রকৌশল এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বুয়েটের অবস্থান ২৬৯।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এশিয়ার মধ্যে কেমন। ৩শ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ২০১-২৫০-এর মধ্যে। এ ছাড়া ৩শ’র মধ্যে বাংলাদেশের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
এই হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং। এই র‌্যাংকিংই যে চূড়ান্ত, তা নয়। এ নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনাও রয়েছে। অনেকে যেমন এই র‌্যাংকিংকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট নয় বলেছেন; অনেকে আবার ঘোরতর সমালোচনাও করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যখন ক্যাম্ব্রিজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় শীর্ষে দেখানো হলো, এর বিরোধিতায় মার্কিন এক অর্থনীতিবিদ ব্লগে লিখেছেন ‘এই র‌্যাংকিং আসলে আবর্জনা মাত্র। এটি ভ্রান্ত পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নির্ণয় করছে। এর ওপর বিশ্বাস করা যায় না। একে উপেক্ষা করা উচিত।’ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষে ছিল না বলেই হয়তো তার এত ক্ষোভ। এর মধ্যে যে একটা রাজনীতিও আছে, সেটাও কিছুটা বোঝা গেল। এ বছর তো এমআইটি শীর্ষে। এখন তারা কী বলেন_ সেটাই দেখার বিষয়।
সমালোচনা সত্ত্বেও এই র‌্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটা অবস্থা যে পরিমাপ করা যাচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার জো নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এর বাইরে দেখলেও কি খুব ভালো আছে? প্রতি বছর শীর্ষস্থান নিয়ে এমআইটি, ক্যাম্ব্রিজ কিংবা হার্ভার্ডের উত্তাপেও নিজেদের দেখার সুযোগ আছে। অন্তত তাও যদি নিজেদের অবস্থা উন্নয়নের চিন্তার মাধ্যম হয়, মন্দ কি!

দুটি প্রকল্পের পোস্টমর্টেম এবং শতভাগ সাক্ষরতা

 Website of Bureau of Non-Formal Education (www.bnfe.gov.bd)

সাক্ষরতা নিয়ে সম্প্রতি দুটি প্রকল্পের মৃত্যু হয়েছে, এতদিন ধরে যে প্রকল্পগুলোকে সরকার ‘শতভাগ সাক্ষর বাংলাদেশের স্বপ্নে’র মাধ্যম হিসেবে দেখিয়েছে। প্রকল্প দুটির পোস্টমর্টেম করা আবশ্যক। গত বছরও সাক্ষরতা দিবসের প্রাক্কালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেই প্রথমে নজরে আসত ‘২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ’ লেখাটি। এ বছর প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতেই দেখাচ্ছে, This Account Has Been Suspended অর্থাৎ এই অ্যাকাউন্টটি স্থগিত করা হয়েছে। ডিজিটাল সরকারের ওয়েবসাইটের এই দশা কেন? এই প্রশ্নটির চেয়েও কৌতূহলের বিষয় ছিল, এখন আসলে সেখানে কী লেখা থাকত; মানে শতভাগ সাক্ষরতা ঠিক কত সালের মধ্যে।
এই কৌতূহলেরও সঙ্গত কারণ আছে। সেটা বলার আগে প্রকল্পগুলোর অবস্থা দেখা যাক। আজ ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ঠিক তিন বছর আগে ২০০৯ সালে দিনটি উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে বলা হয়, ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে ব্যুরো দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। যেগুলো কেবল সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্প দুটি হলো_ মৌলিক সাক্ষরতা ও অব্যাহত শিক্ষা প্রকল্প-১ ও মৌলিক সাক্ষরতা ও অব্যাহত শিক্ষা প্রকল্প-২। আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়, প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে দেশের সকল নিরক্ষরকে সাক্ষর করা হবে। এক বছরের মধ্যে এ বিষয়ে আর বিস্তারিত জানা যায়নি। ঠিক এক বছর পর ২০১০ সালে সাক্ষরতা দিবসে ‘নিরক্ষরতা দূর করতে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প’ শিরোনামে প্রথম আলো বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে প্রকল্প দুটির বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়। প্রথমটি ৬১ জেলার নিরক্ষরদের সাক্ষর করার জন্য, ব্যয় ২ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা আর অন্যটি এর বাইরের ৩টি পার্বত্য জেলার জন্য, ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি। যেখানে বলা হয় প্রকল্পগুলো শুরু হবে ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে এবং তিন ধাপে কাজ করে ২০১৩-এর মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। তার আগের কথা হলো বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৪ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করার ঘোষণা দেয়। এ প্রকল্প হলো সে ঘোষণার ফল আর এ জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো তার ওয়েসবাইটে ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিতকরণের কথা বলে।
যা হোক, ২০১০-এ প্রথম আলোর প্রতিবেদনের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পগুলো ডিসেম্বরের মধ্যেই পাস হবে এবং ২০১১-এর জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু হচ্ছে। কিন্তু তা হয়নি। সমকাল ২০১১-এর ৮ ফেব্রুয়ারি ‘চ্যালেঞ্জের মুখে নিরক্ষরতা দূরীকরণ কার্যক্রম’ শিরোনামে ফলোআপ রিপোর্ট করে দেখিয়েছিল অর্থের অভাবে প্রকল্প দুটি অনুমোদন দেয়নি সরকার। আবার সমকালই ‘সাক্ষরতা অর্জনে মহাপরিকল্পনা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল। অনেকটা ২০১০-এর সাক্ষরতা দিবসে প্রথম আলোর মতোই ছিল প্রতিবেদনটি, যেখানে দুটি প্রকল্পের বর্ণনার বাইরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাক্ষরতার কাজে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে প্রকল্প দুটি বলা হলো চালু হবে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। এপ্রিলের পর সেপ্টেম্বরে সাক্ষরতা দিবসে এসে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ক্রোড়পত্র ঠিক সেটাই আবার বলল এবং প্রকল্প ২০১২ জানুয়ারিতে চালু হয়ে ২০১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। মানে প্রকল্প দুটি ২০১৩ সালে শেষ করার মাধমে ২০১৪ সালের মধ্যেই শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত হবে! অনেকটা এ রকম বিষয় আর কি।
মজার বিষয় হলো, এরপর ২০১২-এর জানুয়ারি গেল, জুনে বাজেট গেল কিন্তু প্রকল্প দুটির বিষয়ে আর তেমন কিছু জানা যায়নি। অবশেষে এই লেখক নিজে সপ্তাহখানেক আগে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে গিয়ে জানলেন, প্রকল্প দুটি চালু হয়নি। আরও বিস্তারিত জানা গেল ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিক থেকে। যেটি বলছে প্রকল্প দুটি একনেকে গত তিন বছর ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। টাকার অঙ্ক বেশি হওয়ায় সেটি অনুমোদন পায়নি। এখন টাকার অঙ্ক তিন হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪৯৯ কোটি টাকার প্রকল্পের নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তিন বছর ধরেও যে প্রকল্পের কোনো সদগতি হয়নি, এখন সেটাকে টাকার অঙ্কে কয়েকগুণ কমিয়ে খুব দ্রুত বাস্তবায়নের আশা করছেন কর্তাব্যক্তিরা। আসলেই কবে নাগাদ হচ্ছে তার চেয়ে জরুরি প্রশ্ন_ শতভাগ সাক্ষরতার কী হবে?
উত্তরটা মাননীয় মন্ত্রীই দিয়েছেন। আজকের সাক্ষরতা দিবসকে সামনে রেখে ৬ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৪ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের ঘোষণা থাকলেও সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা একটি ট্র্যাকে পেঁৗছাতে চাই।’ মন্ত্রীর ‘সম্ভব হচ্ছে না’ বলার গোড়ার বিষয় কিন্তু ওই দুটি প্রকল্প। এখন সাক্ষরতার হার তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তরফে বলেন ৫৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। যদি এমন হতো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, তখন হয়তো ভিন্ন কথা শোনা যেত, দৃঢ়তার সঙ্গে বলতেন ২০১৪ সালের মধ্যে আমরা পারবই।
খুবই আশ্চর্যের বিষয়, তিন বছরেও সরকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রকল্প টাকার কথা বলে অনুমোদন করেনি। অথচ বিগত প্রত্যেক বছরই আগামী বছর থেকে চালু হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আর এখন এরকম ঢিলেমি করতে গিয়ে প্রকল্পগুলোরই মৃত্যু হলো। তার স্থলে ৪৯৯ কোটি টাকার প্রকল্প কতটা কার্যকর হবে, কিংবা আদৌ অনুমোদনই হবে কিনা সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার, সরকার যা-ই করুক অন্তত সাক্ষরতার গুরুত্ব বোঝেনি। বোঝেনি দেশ থেকে নিরক্ষরতার অভিশাপ দূর করার তাৎপর্য। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলি আর মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে ২০১৫ সালের মধ্যে ‘সবার জন্য শিক্ষা’য় সরকারের প্রতিশ্রুতির কথাই বলি। কেবল সাক্ষরতা দিবস এলে যত তোড়জোড় দেখা যায়। এখন যেহেতু ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষর করা সম্ভব হচ্ছে না, সুতরাং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ওয়েবসাইটে তার স্থলে ঠিক কী লেখা থাকত সে কৌতূহল থেকেই যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট পুনরায় কবে চালু হচ্ছে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সমকাল |৮ সেপ্টেম্বর ২০১২

ভাটির দেশের নাইয়া

শিল্পী আব্দুল আলীম (২৭ জুলাই, ১৯৩১- ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪)

অগ্রজ অনেকেই অভিযোগ করেন বর্তমান শিল্পীরা নাকি গান গায় গলা দিয়ে। তারা বলেন গান গাইতে হয় হৃদয় দিয়ে। হৃদয়ের আবেগ উজাড় করে দিয়ে যে গান গাওয়া হয় সেটাই তো সঙ্গীত হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে সাধনা। বর্তমান প্রজন্মের একজন হিসেবে আব্দুল আলীমের গান শুনলে মনে হয় তারা ঠিকই বলেছেন। কী অসাধারণ গেয়েছেন তিনি! মানুষের মনের সঙ্গে ‘হলুদিয়া পাখি’র কী চমৎকার তুলনা! আব্দুল আলীম যেন সারাটা জীবন গানের মধ্য দিয়ে মানুষ, মন ও প্রকৃতিকেই খুঁজেছেন। বিশেষ করে নদী। আমরা দেখেছি, নদীকে উপজীব্য করে তার গানে বারবারই এসেছে মাঝির কথা. নৌকার কথা, ঘাটের কথা। তিনি গেয়েছেন রূপালি নদী রে… গেয়েছেন কলকল ছলছল নদী করে টলমল… কিংবা মেঘনার কূলে ঘর বান্ধিলাম…।
এক প্রমত্তা পদ্মা দেখেছেন আব্দুল আলীম, গেয়েছেন গলা ছেড়ে_ ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী…’। এখন পদ্মার আর সেই রূপ নেই, প্রবাহ নেই; নেই আব্দুল আলীমও। সেও ৩৮ বছর; ১৯৭৪ সালের ঠিক আজকের দিনটায় তিনি পাড়ি দেন পরপারে। কিন্তু তার গান এখনও তাঁকে জীবন্ত রেখেছে। এখনও মানুষ তাকে স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে। সঙ্গীতের জগতে এক জীবন্ত কিংবদন্তি তিনি। তার গান মানুষের মুখে মুখে। তিনি পল্লীগীতি, লোকসংস্কৃতি, ভাটিয়ালি সব গেয়েছেন। মারফতি আর মুর্শিদির সুরে তিনি গেয়েছেন। গান দিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছেন সাধারণ মানুষের অন্তর।
আব্দুল আলীমের গানের বিষয় যেমন ছিল নদী, তেমনি তার গানগুলোও ছিল নদীর মতো বহমান। নদীর সঙ্গে সঙ্গে তিনি এনেছেন পরিবেশ-প্রকৃতিকে। তার গানে ফুটে উঠেছে আল্লাহ-নবীর কথা, মুর্শিদের কথা। গেয়েছেন নবী মোর পরশমণি… কিংবা মুর্শিদ পথের দিশা দাও। আব্দুল আলীম মানুষের বন্ধুত্ব, প্রেম-ভালোবাসা, সংসার নিয়েও গেয়েছেন অজস্র গান। তার সব সখিরে পার করিতে নিবো আনা আনা.. জনমুখে প্রচলিত এক বিখ্যাত গান। একই সঙ্গে গেয়েছেন বহু দিনের পিরিত গো বন্ধু… বা বন্ধুর বাড়ি মধুপুর। এসব কিছুর মাঝেও যেন আব্দুল আলীম অন্য কিছু খুঁজেছেন। তার শ্রোতাদের নিয়ে গেছেন অন্য কোনো খানে; নদীর ওপারের এক ভিন্ন জগতে। পরের জায়গা পরের জমি… আর সেই পারে তোর বসত বাড়ি… কিংবা চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখী… তা-ই বলছে।
১৯৩১ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদে জন্ম নেওয়া আব্দুল আলীম ছোটবেলা সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট ছিলেন। আজকের দিনের মতো গান শুনবার কিংবা শিখবার এরকম সাজ-সরঞ্জাম তখনকার সময় না থাকলেও তিনি গ্রামোফোন রেকর্ড শুনতেন। তিনি ঢাকায় আসেন ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর। ঢাকায় এসে সঙ্গীতের তালিম নেন মমতাজ আলী খান ও মোহাম্মদ হোসেন খসরুর মতো সঙ্গীতবোদ্ধাদের কাছে। এ সময়ই তিনি কবি জসীম উদ্দীন, বেদার উদ্দিন আহমেদ. আবদুল লতিফ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সানি্নধ্যে আসেন। কবি নজরুলের সঙ্গে আগ থেকেই তার পরিচয়। তারও আগে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক তো তার গানে মোহিত হয়ে তাকে বিশেষ পুরস্কার দেন। তার রেকর্ড করা গানের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এ ছাড়া তার গান রয়েছে বেতার স্টুডিওতে। তিনি গান করেছেন পাকিস্তানের প্রথম ছবি মুখ ও মুখোশসহ টেলিভিশন ও অসংখ্য ছায়াছবিতে। আব্দুল আলীমের ঝুলিতে পুরস্কারেরও কমতি নেই, জীবদ্দশায় তো বটেই এরপরও পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার ইত্যাদি।
মাটি আর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত আব্দুল আলীম বরাবরই বলেছেন ভাটির দেশের কথা। তার গান মানুষকে নিয়ে যায় গ্রামে, সুন্দর বহমান নদীর ধারে, ছলাৎ ছলাৎ চলমান কী সুন্দর সে নদী!

সমকালে প্রকাশিত ৫ সেপ্টম্বর ২০১২

ভুয়া সার্টিফিকেট

ভুয়া শব্দটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় বোধহয় একটু বেশিই। ভুয়া র‌্যাব, ভুয়া সাংবাদিক, চিকিৎসক ইত্যাদি তো রয়েছেই। একই সঙ্গে অনলাইনের বদৌলতে ভুয়া প্রোফাইল, অ্যাকাউন্ট ইত্যাদিও দেখছি। ভুয়া সার্টিফিকেটের কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। এর দৌরাত্ম্য যে ভারতেও আছে সেটা বোঝা গেল সম্প্রতি ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার একটি প্রতিবেদন থেকে। যেটি বলছে ‘ওয়াচ আউট ফর দ্য ফেইক!’ ভুয়া হতে সাবধান। এখানে ভুয়া বলতে প্রধানত ভুয়া সার্টিফিকেটই ইঙ্গিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি একটু অন্যরকমভাবেই শুরু হয়েছে_ ইন্টারনেটে প্রদত্ত একটি প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন, সব চিন্তা ঝেড়ে একটু কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিজ্ঞাপনটি বলছে_ আপনি কি ভাবছেন একটা ডিগ্রি দরকার, বা আপনার ডিগ্রিটা পাল্টিয়ে মানানসই একটা ডিগ্রি নেবেন, বা আপনার সার্টিফিকেটটা হারিয়ে গেছে কিংবা নষ্ট হয়ে গেছে। তো ভাবনা কি, আপনার জন্য আছি আমরা ডিপ্লোমা কোম্পানি! এখানে শত শত ডিজাইনে সার্টিফিকেট টেমপ্লেট রয়েছে। আপনার পছন্দমতো ভারতের যে কোনো প্রতিষ্ঠানের হুবহু সার্টিফিকেটের নিশ্চয়তা আমরা দিচ্ছি। যেখানে স্বল্প সময়ের জন্য ১৩ শতাংশ ছাড়ের বিষয় তুলে ধরে সম্পূর্ণ খাঁটি সার্টিফিকেটেরও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
ভারতে ভুয়া সার্টিফিকেটের বিষয়টি নতুন নয়। ২০১১ সালের মার্চে ভারতে পাইলটদের ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি বেশ জানাজানি হয়। তখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাইলটের লাইসেন্স বাতিল হয়, অনেককে গ্রেফতারও করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর লোকসভায় একটি বিল উত্থাপন করা হয়। বিলটির জন্য একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠিত হয়। এ বছরের প্রথমদিকে কমিটি একটি প্রতিবেদন পেশ করে। বিলটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে, যার অন্যতম হলো অ্যাকাডেমিক ডিগ্রির একটি ড্যাটাবেইজ প্রতিষ্ঠা, যার মাধ্যমে সহজেই অনলাইনে যে কেউ সার্টিফিকেটের সত্যতা যাচাই করতে পারবেন। বিশ্ব পরিমণ্ডলেও যে এসব ভুয়ামির খবর কম আছে তা নয়। ওবামার জন্ম সনদ ভুয়া বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। চীনের ভুয়া সার্টিফিকেটের খবর আছে, আইইএলটিএসেরও ভুয়া সার্টিফিকেট নাকি বিক্রি হচ্ছে। ইন্টারনেটে কেউ ফেইক সার্টিফিকেট শব্দটি লিখে সার্চ দিলে মজার কিছু ফলাফল বেরিয়ে আসবে। যেখানে আপনি দেখবেন অজস্র প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। এ রকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম হলো_ এনডি-সেন্টার, ডিপ্লোমা রিপ্লেসমেন্ট সার্ভিস, ডিপ্লোমাস অ্যান্ড মোর ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠান আপনাকে ভুয়া সার্টিফিকেট বানানোর অফার করছে। অনলাইনেই অর্ডার দেবেন, নাম-পরিচয়-প্রতিষ্ঠান দেবেন, স্যাম্পল দেবেন, ব্যস পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত সার্টিফিকেট!
ভারতের চেয়ে কোনো দিক দিয়েই ‘ভুয়া’র বিচারে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ভুয়া শিক্ষার্থী ধরা পড়েছে। কেউ ভুয়া সার্টিফিকেট বানিয়ে ডাক্তার হচ্ছেন, কেউ আবার ভুয়া র‌্যাব সেজে কার্য সিদ্ধি করছেন। সবখানেই ভুয়ার কারবার আর কি!
ভুয়া সার্টিফিকেটের না হয় একটা রফা হলো, মানে অনলাইনের মাধ্যমে আসল সার্টিফিকেট শনাক্ত করা গেল। কিন্তু ভুয়া কাজের কী হবে। কারও উদ্দেশে যদি বলা হয় লোকটা আসলে ভুয়া, তাকে সংশোধনের এ রকম কোনো ব্যবস্থা আছে কি? কিংবা যে ভুয়া ক্ষমতাশালী সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে তারও কি কোনো সমাধান আছে? অনেকে হয়তো বলবেন, নৈতিকতার অভাব। সোজাসাপ্টা উত্তরটা হয়তো না-ই আসতে পারে। তবে ভারত জাল সার্টিফিকেট ধরার জন্য যে অনলাইন ড্যাটাবেইজের কথা ভাবছে আমরা কি সেটা শুরু করতে পারি না? অন্তত সার্টিফিকেট দিয়েই শুরু হোক না। জাল সার্টিফিকেট যখন ধরা যাবে জাল মানুষও নিশ্চয় একদিন ধরা যাবে।