Monthly Archives: জুলাই ২০১১

বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি

সবলরা যে অধিকার ভোগ করবে দুর্বলদের সে অধিকার থাকাই গণতন্ত্র
-মহাত্মা গান্ধী

লৈঙ্গিক বিচারে মানবজাতির দু’ভাগ_ নারী এবং পুরুষ। বর্তমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মানুষের এ লৈঙ্গিক বিভাজন, মহাত্মা গান্ধীর উক্তির মতো সবল এবং দুর্বল দু’শ্রেণীতে ভাগ হয়ে গেছে। পুরুষরা সবল, নারী দুর্বল। নারী জাতি হিসেবে দুর্বল নয়, পুরুষরাই তাদের দুর্বল করে রেখেছে, রেখেছে অবলা আর অধিকারহীন করে। সময় যত গড়াচ্ছে নারীরা এসব বুঝতে পারছে। তারা যখন সচেতন হচ্ছে ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসেছে পুরুষ শাসিত সমাজে। নারীর অবস্থার উত্তরণে শুরু হয়েছে নানা পদক্ষেপ। নারীর জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে ঊনবিংশ শতকের সূচনা থেকে এ পদক্ষেপ খুব বেশি স্পষ্ট। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে আন্তর্জাতিকভাবে নারী উন্নয়নের একটা সামষ্টিক রূপ আমরা দেখি। ১৯৪৫ সালে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নকশা তৈরি, ১৯৪৬ এ নারীর মর্যাদা শীর্ষক কমিশন গঠন, ১৯৫২-তে নারীর রাজনৈতিক অধিকার সনদ প্রনয়ণ ও অনুমোদন ইত্যাদি জাতিসংঘের মাধ্যমেই হয়। এর পর ১৯৭৫ সালে নারীবর্ষ পালন এবং ঠিক এ বছরই মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম নারী সম্মেলন। ১৯৭৬-১৯৮৫ সময়কালকে জাতিসংঘ বিশ্ব নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করে। নারীর অগ্রগতির পথে ১৯৭৫ সালে মেক্সিকোর নারী সম্মেলনের পর ১৯৮০-তে কোপেনহেগেন সম্মেলনসহ পরবর্তী ‘৮৫-র নাইরোবি এবং ‘৯৫-র বেইজিংকে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সর্বশেষ ১৯৯৫ সালের চীনের রাজধানী বেইজিং সম্মেলন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেটি বেইজিং প্লাটফরম ফর অ্যাকশন বা পিএফএ নামে পরিচিত। এ সম্মেলন থেকে বিশ্বের সব দেশ নারীর উন্নয়ন ও অধিকারবিষয়ক বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তার আলোকে বাংলাদেশের পরিকল্পনা এবং সম্মেলন-পরবর্তী বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়েই পরবর্তী আলোচনা।
১৯৯৫ সালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর পরিপূর্ণ এবং সম-অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ১৮৯টি দেশ মিলে যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা-ই বেইজিং কর্মপরিকল্পনা।
বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশনের ১২টি ইস্যুর ভিত্তিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়ন। বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশনের ১২টি ইস্যু হচ্ছে নারী ও দারিদ্র্য, নারীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, নারী ও স্বাস্থ্য, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, নারী এবং সশস্ত্র সংঘাত, নারী ও অর্থনীতি, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী, নারীর অগ্রগতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কার্যপদ্ধতি, নারীর মানবাধিকার, নারী এবং প্রচার মাধ্যম, নারী এবং পরিবেশ ও কন্যাশিশু।
দেখার বিষয় হলো বেইজিং কর্মপরিকল্পনা অথাৎ ১৯৭৫ সালের বেইজিং সম্মেলন এর আগে ১৯৭৫, ১৯৮০ এবং ১৯৮৫-তে ৫ বছর পর পর বিশ্বনারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বেইজিং সম্মেলনের পর কোন নারী সম্মেলন হয়নি, বরং ৫ বছর পর পর তার ফলোআপ পর্যালোচনা হয়েছে। বেইজিং কর্মপরিকল্পনার গুরুত্ব আসলে এখানেই। এটি ছিল নারীর এক শক্তিশালী দলিল। তার প্রত্যেক ৫ বছর পর পর জাতিসংঘ যে পর্যালোচনা করে তার সঙ্গে যোগ দিয়ে তার হিসাব করে। যেমন ২০০০ সালের পরের সময়কে বলে বেইজিং +৫, ২০০৫ সালের পরের সময়কে বলে বেইজিং +১০ আর ২০১০ সালের পরের সময়কে বলে বেইজিং +১৫।
মূলত বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশন হচ্ছে নারী উন্নয়ন নীতিমালার একটি আন্তর্জাতিক গাইডলাইন। এ গাইডলাইন মেনে চলতে আমাদের রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ গাইডলাইনের আলোকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রায় সবগুলো বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। খাতওয়ারি তা আমরা দেখব_ প্রথম হচ্ছে নারী ও দারিদ্র্য। বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় নারীর দারিদ্র্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রথমে এনেছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এমনিতেই বাংলাদেশের ২৫.১ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যের নিম্ন সীমায় বাস করে (অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১০)। যদিও বিশ্বব্যাংক দেখাচ্ছে দারিদ্র্যসীমার নিচে ৪০ ভাগের বেশি মানুষ বাস করছে। হার যা-ই হোক, এর মধ্যে অধিকাংশই নারী। নারীর এ দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে চিত্তরঞ্জন সরকার (২০১১) দেখাচ্ছেন_ বাংলাদেশে যে পরিমাণ (৫ কোটি) শ্রমশক্তি রয়েছে তার একটা অংশ নারী হলেও নারীদের দেখা হয় অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে। তিনি আরও দেখিয়েছেন, নারী তার পুরো জীবনে অন্যের ওপর নির্ভর করে_ শৈশবে বাবার, যৌবনে স্বামীর এবং বার্ধক্যে ছেলের। ফলে তাদের একজনের বিয়োগ ঘটলে নারী অসহায়। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন বিবাহিত নারী, যার সন্তান রয়েছে, তাকে যদি তার স্বামী ছেড়ে চলে যায় সে নারীকে তার সন্তান দেখতে হয়। সুতরাং সে দারিদ্র্যে নিপতিত হয়।
বাংলাদেশে নারীর এ দারিদ্র্য সত্ত্বেও তাদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটাচ্ছে দিন দিন। রাষ্ট্রযন্ত্রও অবশ্য তাকে সাহায্য করছে। মাসুদুজ্জামান তার নারী উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ (যুগান্তর, ৪ জানুয়ারী ২০১১) শীর্ষক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, বিগত বছরগুলোতে নারীর দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। তিনি উন্নয়নের পথে যেসব পদক্ষেপের কথা বলেছেন তা হলো_ জেন্ডার সংবেদশীল বাজেট প্রনয়ণ, আইনি সংস্কারের মাধ্যমে সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, কৃষিখাতসহ অন্যান্য চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ, দক্ষ মানবসম্পদরূপে গড়ে তুলতে নারীর প্রশিক্ষণ প্রদান, মাঝারি ও কুটির শিল্পে অনুদান প্রদান ইত্যাদি। তবে আমাদের নারীর প্রতিবন্ধকতার পথে এখনো বাধা অনেক, প্রচলিত পুরুষালি মনোভাব, আইন, সামাজিক প্রচলিত রীতি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, দুর্নীতি ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, নারীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, যে কোন উন্নয়নে প্রধান অনুষঙ্গটি কিন্তু শিক্ষা। নারীর উন্নয়নেও শিক্ষার বিকল্প নেই। বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় তাই নারীর শিক্ষাও প্রশিক্ষণের ওপর বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রথম যে বিষয়টি নারী ও দারিদ্র্য, নারীর সে দারিদ্র্যও শিক্ষার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। এর মাধ্যমে নারী সচেতন হয়, ফলে তার ক্ষমতায়ন ঘটে। বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় নারী-পুরুষ উভয়ের শিক্ষায় জোর দেয়া হয়েছে। ফলে জেন্ডারবান্ধব শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। কৌশল হিসেবে বলা আছে_ শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, নারীর নিরক্ষরতা দূর করা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, বৈষম্যহীন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ উন্নত করা, মেয়ে ও নারীর জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটেছে। নারী শিক্ষাতেও এ উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত ধারায় এসেছে। জাহেদা আহমদ (২০১১) গৌতম রায়ের, জেন্ডার আলোকে বাংলাদেশের শিক্ষাচিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন_ প্রাথমিক স্তরে ছাত্রীর হার ৫০.১ ভাগ, মাধ্যমিক স্তরে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতকরায় বেশি ৫২.৩ ভাগ। উচ্চ মাধ্যমিকে এ হার ৪১.৬ ভাগ, উচ্চশিক্ষায় ২৪ ভাগ। এছাড়া পেশাগত শিক্ষা (৩৫.০ ভাগ) এবং ভোকেশনাল শিক্ষাতেও (২৫.৯) নারীর অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। মাসুদুজ্জামান তার প্রবন্ধে এর পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েরা যে ভালো করছে সে বিষয়টি এনেছেন। বাংলাদেশের নারীশিক্ষার অগ্রগতি আমরা সাক্ষরতার হার দেখেও বুঝতে পারি, যেখানে ১৯৭৪ সালে মেয়েদের সাক্ষরতার হার ছিল ১৪.৮ ভাগ, সে সংখ্যা বেড়ে ১৯৯৯ সালে এসে দাঁড়ায় ৫৮.২ ভাগে। তবে এর বিপরীতে হতাশার চিত্র হলো নারীর ঝরে পড়া। নারীশিক্ষার উন্নয়নে সাম্প্রতিক শিক্ষানীতিও (২০১০) নারীশিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। মোটের ওপর বেইজিং-পরবর্তী নারীশিক্ষার একটা ইতিবাচক ধারা আমরা দেখছি।
বেইজিং কর্মপরিকল্পনার পরবর্তী বিষয় নারী ও স্বাস্থ্য, নারীর স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে এ পরিকল্পনার ‘গ’ অধ্যায়ে বিশ্বব্যপী নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারের কথা বলে ৫টি কৌশলগত উদ্দেশ্য আলোচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশে নারীরা স্বাস্থ্যগত দিক থেকে নানাভাবে দুর্দশার শিকার। নারীর স্বাস্থ্যসেবাও এখানে অপ্রতুল। নারীর স্বাস্থ্যেও আলোচনায় প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, যার অন্তর্ভুক্ত হলো মায়ের পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব, জন্ম বিরতিকরণ, গর্ভপাতের চিকিৎসা, এইডস ইত্যাদি।
বাংলাদেশে নারী স্বাস্থ্যের ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে, মাসুদুজ্জামান তার প্রবন্ধে এ অগ্রগতিটা আয়ুষ্কালকে মান ধরে করেছেন। ১৯৯৮ সালে আমাদের জীবনের গড় আয়ু যেখানে ৫৮ বছর ছিল, ২০০৮ সালে তা হয়েছে ৬৬.৮। এর মধ্যে পুরুষের ৬৫.৬ ভাগ, নারীর ৭০.০ বছর (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০)। নারীর স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারের আগ্রহও সাম্প্রতিক এ উন্নয়নের কারণ। জেন্ডার বাজেটিং, তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পেঁৗছানোর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বেইজিং কর্মপরিকল্পনার আরেকটি বিষয়, এখানে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা তথা নারী নির্যাতনের বিষয়টা স্পষ্টভাবেই এসেছে। বাংলাদেশে নারীরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার। নারী তার পারিাবারিক পরিবেশে, শিক্ষাক্ষেত্রে, কর্মসংস্থানে তথা সর্বত্রই নির্যাতনের শিকার। নারী অন্দোলনকারীরা মনে করছেন বাংলাদেশে ৪০ ভাগের ওপর নারী নির্যাতনের শিকার, আর তাদের ভাষায় নারীর মানসিক এবং একেবারে পারিবারিক নির্যাতন ধরলে এ হার হবে ৯৮ ভাগ। নারীর নির্যাতনের চরম রূপ হলো ধর্ষণ, সংবাদপত্রে প্রায়ই দেখা যায় নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া এসিড নিক্ষেপ, যৌতুক, যৌন হয়রানি ইত্যাদি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা স্পষ্ট নিদর্শন।
মালেকা বেগম (২০১১) নারীর এ সহিংসতার কারণ দেখিয়েছেন_ ধর্মান্ধতার বোঝা, কুসংস্কারের বোঝা, পরনির্ভরতার বোঝা ইত্যাদিকে। সাম্প্রতিক সময়ে নারী নির্যাতনের আরেকটা বীভৎসরূপ হিসেবে ইভটিজিংকে দেখেছি। তবে আদালত রায় দিয়েছে যৌন হয়রানি হিসেবে। আদালতের এ পদক্ষেপসহ নারীর সচেতনতা এবং পুরুষদের এগিয়ে আসার মাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কিছুটা হলেও কমেছে।
নারী নির্যাতনের আরেকটা মোক্ষম শিকার হলো সশস্ত্র সংঘাত। বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় এ বিষয়টায় গুরুত্ব এসেছে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি সশস্ত্র সঙঘাতে নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমাদের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধেও বহু মা-বোন নির্যাতিত হয়েছেন, অনেকে ধর্ষিতা হয়েছেন। যখনই যুদ্ধ লেগেছে বিজয়ী গোষ্ঠী নারীকে করেছে ভোগ্যপণ্য, তাই যুদ্ধ লাগলেই পুরুষরা তাদের মা, স্ত্রী, মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। নারীবাদী লেখক আগস্ট বেবেল ঠিক তা-ই লিখেছেন_ ‘প্রাচীনকালে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে যুদ্ধ শুরু হলে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে পুরুষরা বেশি শঙ্কিত থাকত। নারীদের যুদ্ধের প্রতিকূল মনে করে পরিত্যাগ করে চলে যেত কিংবা যুদ্ধযাত্রায় তাকে সঙ্গে নেয়া হতো না।’
যুদ্ধে নারী নানাভাবে নির্যাতিত হয়। একদিকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সে নিগ্রহের শিকার; অন্যদিকে যুদ্ধে নারী তার স্বামী, বাবা কিংবা ছেলেকে হারিয়ে এক প্রকার নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
পুরুষ এবং নারী যেখানে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ভূমিকা পালন করছে সেখানেই সুষম উন্নয়ন ঘটেছে। এ অর্থনৈতিক বিষয়টি বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। কোন একশ্রেণীকে পেছনে রেখে সার্বিক উন্নয়ন করা অসম্ভব। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার। প্রথমত, নারীর গৃহস্থালি কাজ অর্থনৈতিক হিসেবে গণ্য হয় না। দ্বিতীয়ত, নারী-পুরুষের সমান কাজ করেও সমান মজুরি পায় না। তৃতীয়ত, নারী উদ্যোক্তা একজন নারী হিসেবে তার সাপোর্ট সমাজ করে না।
বাংলাদেশের নারীরা বেইজিং-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কাজে ব্যাপক অংশগ্রহণ করেছে। মোট শ্রমশক্তি ৫.৩৭ কোটির মধ্যে নারী প্রায় ২ কোটি (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০)। দেশের কৃষিক্ষেত্রে, কুটির শিল্পে, চা শিল্পে, খাদ্যজাত প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে নারীরা অবদান রেখে চলেছে। ক্ষেত্র হিসাব করলে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি ঘটেছে পোশাক শিল্পে, যেটি বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় খাত।
অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণের ফলে দিন দিন আমাদের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে অনেক বেড়েছে। সম্প্রতি (৪ জুন ২০১১) প্রথম আলো প্রতিবেদনে বলেছে_ আমাদের দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ৬.৬৬%, যেটা আমাদের লক্ষ্যমাত্রাকে ছুঁয়েছে। নারী এবং পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণেই এ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
বেইজিং পরিকল্পনায় নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নারী উন্নয়নের একটা মাপকাঠি অবশ্যই নারীর ক্ষমতায়ন। ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে যখনই নারীরা থাকবে স্বাভাবিকভাবেই নারীর অগ্রগতি ঘটবে। বাংলাদেশে একসময় এই দিকটাতে নারীরা একেবারে পিছিয়ে থাকলে সাম্প্রতিক সময়ে এর বেশ উন্নতি ঘটেছে। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণের একটা ধারাবাহিকতা শীর্ষক, সমকালে প্রকাশিত সেলিনা হোসেন এক প্রবন্ধে (৭ মার্চ, ২০১০) লিখেছেন_ ‘ ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো সংসদে নারী প্রতিনিধি সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করনে। ১৯৮৬ সালে ৫জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে ৪ জন, ১৯৯৬ সালে ১১ জন, ২০০১ সালে ৬, ২০০৮ সালরে নির্বাচনে ১৯ জন। এভাবে এগিয়েছে। এছাড়া জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষতি আসন আছে। ১৯৭৯ সালে আসনের সংখ্যা ছিল ৩০। ২০০১ সালে ৫টি বেড়ে হয় ৪৫। এখন পর্যন্ত এ সংখ্যাটি একই আছে। লক্ষণীয় যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বেশিসংখ্যক নারী সরাসরি আসনে নির্বাচন করেন এবং উল্লখেযোগ্য সংখ্যক নারী নির্বাচনে জয়লাভ করেন। নারীর ক্ষমতায়ন ইস্যুতে এটি নিঃসন্দহে অগ্রগতির নজির। অন্যদিকে বর্তমান সরকার নারীকে তিনটি গুরুত্বর্পূণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও কৃষি। এবারই প্রথম ৬ জন নারী মন্ত্রসিভায় যুক্ত আছেন।’ মাসুদুজ্জামানও (২০১১) এ বিষয়গুলো দেখিয়েছেন, এর সঙ্গে তিনি যোগ করেছেন, নারীর চ্যালেঞ্জিং পেশা যেমন পুলিশ, সেনাবাহিনীতে তাদের অবস্থান, প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে শীর্ষপদে তাদের অবস্থান।
নারীর প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজমের অগ্রগতি হিসেবে রঞ্জন কর্মকার (২০১১) কতকগুলো বিষয়ের অবতারণা করেছেন_ নারী উন্নয়ন পরিষদ গঠন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা, মহিলাবিষয়ক অধিদফতর শক্তিশালীকরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন পাস (২০০০), বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নামের প্রচলন ইত্যাদি। এছাড়া অ্যালোকেশন অফ বিজনেস সংশোধন করে সব মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন কর্মকা-ে নারী উন্নয়নকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
নারীর জন্য মানবাধিকারের বুলি বিশ্বস্বীকৃত। আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার দলিল থেকে শুরু করে ১৯৬৩ সালের নারীর প্রতি সব বৈষম্য বিলোপ, ১৯৭৯ সালের সিডও, ১৯৭৫-পরবর্তী চারটি নারী সম্মেলন ইত্যাদিতে নারীর মানবাধিকার নিয়ে আলোচনার কথা বলা আছে। বেইজিং পরিকল্পনা তার অন্যতম। বাংলাদেশেও নারীর অধিকার নিয়ে কম কথা হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধান তো বটে, এর বাইরেও নারীর জন্য আলাদা আইন হয়েছে। ১৯৯৭ সালের জাতীয় নারীনীতি, ১৯৯৮ সালে বেইজিং কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততায় ঘধঃরড়হধষ অপঃরড়হ ঢ়ষধহ ভড়ৎ ড়িসবহ্থং ধফাধহপবসবহঃ গৃহীত হয়, ২০০০ সালে হয় নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, ২০০২ সালে এসিড অপরাধ দমন আইন আর ২০০৮ সালে হয় পারিবারিক নির্যাতন আইন। সাম্প্রতিক সময়ে ইভটিজিং বন্ধে তাৎক্ষণিক আদালতের মাধ্যমে তার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে নারীর মানবাধিকার সমুন্নত রাখার চেষ্টা হচ্ছে। এতে জনগণের সচেতনতা বাড়ছে, নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে এবং নারীরা তাদের অধিকার পাচ্ছে। ফলে এ ধারায়ও একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে যে সেক্টরটি নারীর পদচারণায় মোটামুটি মুখরিত তা গণমাধ্যম। গণমাধ্যমে নারীর এ পদচারণা মানে এই নয়, এখানে নারীরা বুঝি খুব এগিয়েছে; বরং উল্টো_ এখানে নারীরা বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে এটা খুবই সত্য কথা। শ্রোতার কাছে নারীর সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে ‘ভোক্তা’ হিসেবে নারী এখানে উপস্থিত। কাবেরী গায়েন (২০১১) ডড়ৎষফ অংংড়পরধঃরড়হ ড়ভ ঈযৎরংঃরধহ ঈযঁৎপয (ডঅঈঈ)-এর সূত্র ধরে গণমাধ্যমে নারীর একটা চিত্র দেখিয়েছেন_ বিশ্বের ৪১ ভাগ উপস্থাপক ও সাংবাদিক নারী, অথচ এর মধ্যে ১৮ ভাগ সংবাদ নারীর, নারীবিষয়ক সংবাদের ১৯ ভাগ হলো নির্যাতনের, টেলিভিশন সাংবাদিক-উপস্থাপক ৫৬ ভাগ নারী, রেডিও-সংবাদপত্রে এ হার যথাক্রমে ২৮ ও ২৬ ভাগ। তিনি আরও দেখিয়েছেন সংস্কৃতি ও বিনোদন নারীর উপস্থিতি কিছু বেশি (৩৫ ভাগ), সেলিব্রিটি বিষয়ক সংবাদও একেবারে কম নয় (২৬ ভাগ), কিন্তু রাজনীতি (১২ ভাগ), আন্তর্জাাতিক সংকট (১১ ভাগ) এবং প্রতিরক্ষায় (৬ ভাগ) নারীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। মজার বিষয় হলো, এর মধ্যে অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ৩৪। আর ৫০ বছরের ঊধর্ে্ব নারী এখানে নেই বললেই চলে। অনেকে বলেন, কোন বিজ্ঞাপন নারী ছাড়া হয় না, পুরুষ ছাড়া ঠিকই হয়। এটা ঠিক সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। সরকার এবং বেসরকারি পর্যায়েও নারীর অগ্রগতিতে কিছু উদ্যোগ আমরা দেখছি। প্রেস ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ নারীর জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নিয়ে থাকে। এছাড়া আরও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ আছে। নারীর অগ্রগতি গণমাধ্যমের অনুষ্ঠান পরিকল্পনায়, নীতিনির্ধারণ এবং উপস্থাপনায় দেখা যাচ্ছে।
বেইজিং পরিকল্পনায় নারীর অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে পেিববেশকেও তুলে আনা হয়েছে। নারী-পুরুষ সবাই পরিবেশের কাছে সমান। পরিবেশ যখন অশান্ত হয়ে ওঠে তখন সবাই সমানভাবে আক্রান্ত হয়। এটা ঠিক, পরিবেশ আপনিতেই রূঢ় হয় না মানুষের কর্মকা-ই তা বাধ্য করে। বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় নারীর সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশকেও গুরুত্বেও সঙ্গে দেখা হয়েছে। কৌশল হিসেবে বলা আছে_ পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব স্তরে নারীকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের নীতি ও কর্মসূচিতে জেন্ডার প্রেক্ষাপট সংযুক্ত করা, নারীর ওপর উন্নয়ন ও পরিবেশগত নীতিমালার প্রতিক্রিয়া নিরূপণের জন্য জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে শক্তিশালী ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠা।
পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশকে দেখা হয় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম দিকে; যার প্রভাব হিসেবে আইলা, সিডরের মতো ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে দেখছি। এসব দুর্যোগে নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে সবার সচেতনতা বেড়েছে। নারীরাও এখন এগিয়ে এসেছে অর্থাৎ বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় কৌশল হিসেবে পরিবেশ বিষয়ে নারীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে। সরকার টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায় নারী চাহিদার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পসহ জাতীয় বনায়ন প্রকল্পে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। পরিবেশ সচেতনতার বিভিন্ন কর্মকা-ে নারীর সম্পৃক্ততা বেড়েছে।
বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় কেবল আজকের দিনে যারা নারী তাদের বিষয়েই বলা হয়নি, বরং আগামী দিনে যারা নারী হয়ে উঠবে তাদের বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে, অর্থাৎ আজকের মেয়ে শিশু। মেয়ে শিশুটি যাতে একটা বৈষম্যমূলক বাধাহীন সমাজে বড় হতে পারে, তার বিকাশটা যাতে ঠিকভাবে হয় সে বিষয়ে বলা আছে। বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় এ সংক্রান্ত ৯টি কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়, এর মধ্যে কয়েকটি হলো_ মেয়েশিশুর বিরুদ্ধে নেতিবাচক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎপরতা বিলোপ করা। শিক্ষা-দক্ষতার উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণে মেয়েদের প্রতি বৈষম্য বিলোপ করা। মেয়ের শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিলোপ করা। মেয়ে শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূল করা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের মেয়ে শিশুরা সাম্প্রতিক সময়ে ইভটিজিংসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় মেয়েশিশুরা ভুগছে। গ্রাম ও শহরভেদে মেয়েশিশুদের বৈষম্য এখানে স্পষ্ট। বাংলাদেশের মেয়েশিশুর সাম্প্রতিক সময়ে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর মধ্যে মেয়েশিশু দশক ঘোষণা, জাতীয় শিশু কর্মপরিকল্পনায় মেয়েশিশুর স্বার্থ ও চাহিদায় মনযোগ দেয়া, প্রতি জেলায় নারী ক্রীড়া কম্পেস্নক্স প্রতিষ্ঠা, মেয়েশিশুকে জেন্ডারসচেতন করা, ইভটিজিং প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতকরণ ইত্যাদি।
বাংলাদেশে বেইজিং-পরবর্তী ১৫ বছরে নারীর অর্জন একেবারে কম নয়। রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ নানা বিষয়ে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে পুরুষ শাসিত সমাজে এখনো নারী নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নারীর বর্তমান উন্নতি অব্যাহত থাকলে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী দিনে নারীর অগ্রগতি লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়বে সন্দেহ নেই।

দৈনিক সংবাদ ২২ জুলাই ২০১১

শিক্ষানীতির অগ্রগতি কত দূর?


নিউ এজের সাম্প্রতিক (৩ জুলাই) একটি প্রতিবেদন দিয়ে শুরু করা যাক। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘২০১২ 2012 start of primary edn extension uncertain’Ñ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা বর্ধিতকরণ অনিশ্চিত। শিক্ষানীতি ২০১০-এর বর্তমান অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি বলছে, ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণী থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করার কথা থাকলেও তা অনিশ্চিত।
প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, গত ২৬ জানুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণী থেকে কীভাবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করা যায়, এর বাস্তবায়ন কৌশল কী হবে, তা জানিয়ে কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন পেশ করার কথা বলা হয়। দু’মাসের জায়গায় এখন পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও কমিটি কোনো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। কমিটির চেয়ারম্যানসহ অনেক সদস্য নিজেরাই বাস্তবায়ন বিষয়ে সন্দিহান।
শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নে একটি উপকমিটির চিত্র এটি। অন্য কমিটিগুলোর অবস্থাসহ সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে গত ৭ জুন প্রতিবেদন করে দৈনিক জনকণ্ঠ ও সংবাদ। উভয় পত্রিকার শিরোনাম প্রায় অভিন্ন। পত্রিকাগুলো বলছে, শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ২৬ জানুয়ারি ২৪টি উপকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দু’তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি কমিটিও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
কারণ হিসেবে একটি বিষয়ই উঠে এসেছে_ ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে উপকমিটিগুলোর প্রায় প্রতিটির মূল দায়িত্বে আছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের আমলারা; যারা নিজেদের দাফতরিক কাজ, জনপ্রতিনিধিদের ডিও লেটার নিষ্পত্তিসহ নানা কাজ সামাল দিতেই ব্যস্ত। অনেক কমিটি শিক্ষানীতি নিয়ে এখনও একবারের জন্যও বসতে পারেনি।
এ শিক্ষানীতি শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দু’বছরেরও বেশি সময় পার করে ফেলেছে। ২০০৯-এর ৪ এপ্রিল শিক্ষানীতি কমিটি গঠন, ২০০৯-এর ২ সেপ্টেম্বর কমিটির খসড়া শিক্ষানীতি প্রকাশ, ২০১০-এর ৩১ মে শিক্ষানীতি চূড়ান্তকরণ এবং মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত হয়। শিক্ষানীতি ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় আর তা বাস্তবায়নে ২৬ জানুয়ারি ২০১১-তে ২৪টি উপকমিটি গঠন করা হয়। এভাবে শিক্ষানীতির প্রক্রিয়ায়ই দু’বছরের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। মূল বাস্তবায়নের কাজ তো বাকিই রয়ে গেছে।
শিক্ষানীতির দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতায়ও ভাটা পড়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসেই ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে তড়িঘড়ি করে যে শিক্ষানীতি করল, সেটাই এখন নানা স্তরে কচ্ছপের গতিকেও হার মানাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষানীতির প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করার প্রধান যে চ্যালেঞ্জ, তার অগ্রগতিও প্রশ্নবিদ্ধ। আবার এবারের বাজেটে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে, শিক্ষাক্ষেত্রে যে বাজেট দেওয়ার কথা ছিল, তাও সরকার দেয়নি। শিক্ষা ও প্রযুক্তি উভয় খাত মিলে বরাদ্দ দেওয়া হয় অন্যান্যবারের মতোই মোট বাজেটের ১২ দশমিক ৪ ভাগ মাত্র।
শিক্ষানীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, এর বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণে আমলাপ্রধান উপকমিটি গঠনের আবশ্যকতা কোথায়? এ বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ আছেন, কিংবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের দ্বারা তা করানো যায়। সবচেয়ে ভালো হয়, বাংলাদেশে যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন বা শিক্ষা নিয়ে যারা একাডেমিক গবেষণা করেন তাদের দায়িত্ব দেওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এ ক্ষেত্রে যথার্থ প্রতিষ্ঠান। এতে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের কাজে অবদান রাখতে পারে, অন্যদিকে যেহেতু তাদের এ বিষয়ে গবেষণা আছে, তারা দ্রুত সময়ে ভালো কাজ করে দিতে পারবে। এভাবে আমলানির্ভর কমিটি দিয়ে শিক্ষানীতির অগ্রগতি কতটা সম্ভব বলা মুশকিল।
অতীতের ‘খসড়া রোগে আক্রান্ত’ শিক্ষানীতিগুলো থেকে এবারের নীতিকে সবাই ভিন্ন চোখে দেখে আসছে। এ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নে ধীরগতিও তাই সবাইকে ব্যথিত করবে। অবশ্য শিক্ষাসচিব ঠিকই বলেছেন, শিক্ষানীতির কিছু কাজ শুরু হয়েছে, যেমন_ পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী, অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি ইত্যাদি। এরপরও একটি আশঙ্কাই সবার মনে_ এ নীতি অতীতের শিক্ষানীতিগুলোর ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে না তো?

সমকাল ০৯-০৭-২০১১