Monthly Archives: জুন ২০১১

নারীশিক্ষা কোন দিকে

যুগান্তরে ৭ জুন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন, মানবৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখায় শিক্ষার ইতিবাচক বিষয়গুলো সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। তবে বাদ পড়েছে নারীশিক্ষার বিষয়টি। নারীশিক্ষায় সাম্প্র্রতিক ইতিবাচক পরিবর্তন এবং অগ্রগতি নিয়েই এ লেখার প্রয়াস।
এ পর্যন্ত চারটি আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়Ñ ১৯৭৫ সালে মেক্সিকো, ১৯৮০-এ কোপেনহেগেন, ১৯৮৫-এ নাইরোবি এবং ১৯৯৫-এ বেইজিংয়ে। সর্বশেষ ’৯৫-এর বেইজিংকে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যাকে বলা হয় বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশন। দেখার বিষয় হল, বেইজিং সম্মেলনের পর কোন নারী সম্মেলন হয়নি, বরং পাঁচ বছর পর পর তার ফলোআপ পর্যালোচনা হয়েছে। বেইজিং কর্মপরিকল্পনার গুরুত্ব এখানেই। এটি ছিল নারীর এক শক্তিশালী দলিল। প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতিসংঘ যে পর্যালোচনা করে তার সঙ্গে + দিয়ে তার হিসাব করে। যেমন ২০০০’র পরের সময়কে বলে বেইজিং +৫, ২০০৫’র পরের সময়কে বলে বেইজিং +১০ আর ২০১০’র পরের সময়কে বলে বেইজিং +১৫।
বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশনের ১২টি ইস্যুর ভিত্তিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো হলÑ নারী ও দারিদ্র্য, নারীশিক্ষা, নারী ও স্বাস্থ্য, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, নারী ও অর্থনীতি, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী।
এখানে যে ১২টি বিষয় রয়েছে, এর মধ্যে শিক্ষার বিষয়টি আমরা দেখব। বাংলাদেশে বেইজিং-পরবর্তী নারীর ১৫ বছরের অগ্রগতি নিয়ে মালেকা বেগম, সেলিনা হোসেন ও মাসুদুজ্জামানের সম্পাদনায় মাওলা ব্রাদার্স থেকে ‘বেইজিং কর্মপরিকল্পনা : নারীর অগ্রগতির পথরেখা’ নামে একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের নারীর অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটেছে, যা শিক্ষামন্ত্রী তার লেখায় উল্লেখ করেছেন। নারী শিক্ষায়ও এ উন্নয়ন কাক্সিক্ষত ধারায় এসেছে। প্রাথমিক স্তরে ছাত্রী ৫০.১ ভাগ, মাধ্যমিক স্তরে মেয়ে শিক্ষার্থী ৫২.৩ ভাগ। উচ্চমাধ্যমিকে এ হার ৪১.৬ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ২৪ শতাংশ। এছাড়া পেশাগত শিক্ষা ৩৫.০ ভাগ এবং ভোকেশনাল শিক্ষায়ও ২৫.৯ ভাগ নারীর অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। মাসুদুজ্জামান তার এক নিবন্ধে (যুগান্তর, ৪ জানুয়ারি ২০১১) এর পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েরা যে ভালো করছে, সে বিষয়টিও এনেছেন।
বাংলাদেশে নারীশিক্ষার অগ্রগতি আমরা সাক্ষরতার হার দেখেও বুঝতে পারি। ১৯৭৪ সালে মেয়েদের সাক্ষরতার হার ছিল ১৪.৮ ভাগ, তা বেড়ে ১৯৯৯-তে এসে দাঁড়ায় ৫৮.২ ভাগে।
বাংলাদেশে নারীরা শিক্ষায় এগিয়েছে, এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। বেগম রোকেয়ার সময়ের কথা যদি ধরি, তার কাছে শিক্ষা অফিসার গ্রাজুয়েট মেয়েদের একটা তালিকা চেয়েছিল, তার উত্তরটা ছিলÑ ‘কিন্তু আমি বঙ্গের একটি গ্রাজুয়েট এবং আগা মঈদুল সাহেবের কন্যাত্রয় ব্যতীত আর কাহারো নাম দিতে পারি নাই।’
আজ বাংলাদেশে নারীরা যেমন শিক্ষায় এগিয়েছে, তেমনি ক্ষমতায়নের দিক থেকেও নারীর অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। আর এর গোড়ার কারণটা কিন্তু শিক্ষা, অর্থাৎ যখনই নারী শিক্ষায় এগিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষমতায়নও হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি সেলিনা হোসেন তার (সমকালে ৭ মার্চ, ২০১০) প্রবন্ধে দেখিয়েছেন। তার ভাষায়, বাংলাদেশে নারী প্রথম ১৯৭৯ সালে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়, ১৯৮৬-তে পাঁচজন, ১৯৯১-তে চারজন, ১৯৯৬-তে ১১ জন। আর সেটা বেড়ে ২০০৮-এ হয় ১৯ জন। আমরা দেখছি, ১৯৭৯ সালে সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ছিল ৩০। ২০০১ সালে বেড়ে হয় ৪৫।
বেগম রোকেয়া তার সময়ে তিন-চারজন নারী গ্রাজুয়েট খুঁজে পেতেই গলদঘর্ম হয়েছেন, এখন গ্রাজুয়েট তো বটেই, বিসিএসের ২৮টি ক্যাডারে নারী আছেন পাঁচ হাজারের ওপরে। অন্যান্য চকরিতেও নারীর সংখ্যাটা একেবারে ফেলনা নয়।
দেশে নারীশিক্ষার বৈপ্লবিক অগ্রগতির পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রী উপবৃত্তি। বিগত দেড় দশক ধরে সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে ছাত্রীদের এ উপবৃত্তি দিচ্ছে। এ কারণেই প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এতদিন ধরে øাতক স্তরে ছাত্রী উপবৃত্তি ছিল না। বর্তমান সরকার সে পদক্ষেপও নিয়েছে। এই স্তরের ছাত্রীদের উপবৃত্তির জন্য প্রায় ৩৪৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাসের কথা আছে।
বাংলাদেশে নারীশিক্ষায় যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও নারী নির্যাতন এখনও বন্ধ হয়নি। নারীরা শিক্ষিত হলে সচেতন হবে, স্বাভাবিকভাবেই তখন নির্যাতন কম হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবতা হল, অশিক্ষিত তো বটেই শিক্ষিতি নারীও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সাম্প্র্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকার স্বামী কর্তৃক নির্যাতন তার বড় প্রমাণ।
নারীশিক্ষার সঙ্গে সরাসরি দেশের উন্নতির বিষয়টি জড়িত। একজন শিক্ষিত নারী দেশের মানবসম্পদ। এছাড়া নারী তার গৃহকর্মে যে শ্রম দেয়, তাও আমাদের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছে। নেপোলিয়নের কথা ধরলে, শিক্ষিত নারীই একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে সক্ষম। সুতরাং নারী শিক্ষায় অগ্রগতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে নারী শিক্ষায় যে অগ্রগতি আছে, তা আরও বেশি হতে পারত। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে নারীরা এখনও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। একজন অভিভাবক তার মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে নিরাপদ বোধ করেন না। নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট পরিবর্তন দরকার। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের পরিকল্পনা মতে ৩০ ভাগ নারী থাকা দরকার। বেনবেইজের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী নারী শিক্ষক আছেন ১৮ দশমিক ৭ ভাগ। নারী বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় যে কোন পেশায় আসতে চাইলেও পারছে না। পুরুষরাই তাদের জন্য বাধা হয়ে আছে।
বাংলাদেশে নারীশিক্ষায় অগ্রগতির বিপরীতে ঝরে পড়ার হতাশাজনক চিত্রও আছে। সর্বশেষ হিসাবে প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৩৫ এবং মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৪২ শতাংশ ছাত্রী ঝরে পড়ছে। তবে আশার কথা হল, এবারের শিক্ষানীতিতে নারীশিক্ষায় অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছেÑ নারীর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন, বৃত্তিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ, উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা, উপবৃত্তি বাড়ানো ইত্যাদি।
পুরুষশাসিত সমাজে এখনও নারী নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও নারীশিক্ষার বর্তমান উন্নতি অব্যাহত থাকলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী দিনে নারী শিক্ষাসহ ক্ষমতায়ন এবং অন্যসব ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়বে সন্দেহ নেই।

যুগান্তর ২৮.০৬.২০১১

ডিজিটাল ক্যাম্পাস কতদূর

কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড ডট কম ২০০৮ সালের ৬ অক্টোবর একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জরিপের শিরোনামটা বাংলায়- ‘ওয়াইফাই কলেজ শিার্থীদের অধিক নাম্বার পেতে সাহায্য করে’। আমেরিকার ৫০১ জন কলেজ শিার্থীর ওপর করা গবেষণার ফলাফল এটি। ৭৫ ভাগ শিার্থীই মনে করে, তাদের পরীার গ্রেড বাড়াতে ওয়াইফাই এর ভূমিকা অনেক। ৪৮ ভাগ শিার্থী তো বলেই দিয়েছে, তারা বিয়ার খাওয়া ত্যাগ করতে পারলেও ওয়াইফাই ত্যাগ করতে পারবেনা।
২০০৮ সালে আমেরিকার কলেজ শিার্থীদের যখন এই অবস্থা, তখন বাংলাদেশের কলেজ শিার্থীদের অবস্থা কী। আলোচনার প্রাসঙ্গিকতার জন্য কলেজের বিষয়ে যাওয়ার আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা দেখবো।
সম্প্রতি বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো যখন তাদের ফ্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপনে নাগরিক সুবিধার তালিকায় ‘ওয়াইফাই’ কে যুক্ত করেছে, তা দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা একজন শিার্থী আফসোস করে বলছে ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকেও ওয়াইফাই সুবিধা পাচ্ছিনা, আর তা এখন অনেকে বাসায় বসেই পাবে।’ বলা যেতে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো ওয়াইফাই সুবিধা আছে। আছে বটে। ১৭ টি হলের মধ্যে তিন-চারটি হলে, টিএসসিতে, ১১ টি অনুষদের মধ্যে দু’একটিতে আর নয়টি ইনস্টিটিউটের মধ্যে একটিতে। তা ও এগুলো বিচ্ছিন্ন এবং বিপ্তি। কেন্দ্রিয়ভাবে এখানে ওয়াইফাই নেই।
অন্য ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যে বুয়েটের একাডেমিক বিল্ডিং এ, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। সম্প্রতি দেয়া হয়েছে রাজশাহী আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রাইভেট কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচ্ছিন্নভাবে থাকলেও নেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় আঠারশ’ ক্যাম্পাসের কথা বাদই দিলাম।
অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে ওয়াইফাই। অনেক আগ থেকেই। এখন থেকে ১২ বছর আগে ১৯৯৯ সালে কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটি প্রথম তাদের পিটাসবার্গ ক্যাম্পাসে এ সেবা চালু করে। এরপর ২০০০ সালে আমেরিকার ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে ওয়াইফাই সেবা দেয়ার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এভাবে ধীরে ধীরে প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এ সেবা শিার্থীদের প্রদান করে। আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও রয়েছে সেবাটি। ইন্ডিয়া, পাকিান, শ্রীলংকা এমনকি থাইল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়তে কেন্দ্রীয়ভাবে রয়েছে ওয়াইফাই।
রাজধানীর ঢাকার ওয়াইফাই চিত্র নিয়ে গত ২ জানুয়ারি প্রথম আলো ঢাকার পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে ঢকার পাঁচতারা হোটেল, অভিজাত রেঁস্তোরা আর বিমানবন্দর এলাকায় রয়েছে ওয়াইফাই। বিভিন্ন নামিদামি কর্পোরেট হাউজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও এখন নিজস্ব ফ্যাটেও ওয়াইফাই দেখছি। সন্দেহ নেই ঢাকা এগিয়ে যাচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে ক্যাম্পাসগুলো। অথচ এদিকথেকে তাদেরই এগিয়ে থাকার কথা ছিলো।
গত ১২ নভেম্বর প্রথম আলোর কম্পিউটার প্রতিদিন পাতার ছোট্ট একটা সংবাদ, ‘যুক্তরাজ্য জুড়ে বিনামূল্যে ওয়াইফাই। সংবাদ ভাষ্যমতে, যুক্তরাজ্যে ইন্টারনেট সপ্তাহ পালন উপলে এসেবা দিয়েছে ইন্টারনেট ভিত্তিক কথা বলার ওয়েবসাইট স্কাইপ। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। কারন যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, বিশ্বের অনেক শহরেই রয়েছে পাবলিক ওয়াইফাই সেবা। ২০০৮ সাল পর্যন্ত উইকিপিডিয়া দেখিয়েছে, ৩০০ মেট্রোপলিটন এলাকায় এ সেবা আছে। এমনকি ২০১০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রে ১১৫০ টিরও বেশি ওয়াইফাই ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে।
গত বছরের শেষ দিকে বিবিসি একটা জরিপে বলছে, মানুষ মনে করে ইন্টারনেট সেবা পাওয়াটাও তার একটা মানবাধিকার। যদি তা-ই হয়, বাংলাদেশের মানুষ এ অধিকার থেকে কতটা বঞ্চিত, বলার অপো রাখেনা। সাধারণ মানুষের কথা বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীদের অবস্থা দেখলেও হতাশ হতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের একজন শিার্থীকে তার ইমেইল এড্রেস আছে কিনা, প্রশ্ন করলে উত্তরে ‘না’ আসলেও অবাক হওয়ার মত কিছুই থাকবেনা। ক্যাম্পাসগুলো এখনো বিজ্ঞান-প্রযুক্তি থেকে অনেক পিছিয়ে। মূল গলদটা কিন্তু প্রশাসনে। প্রশাসনিক অনেক কাঠামোই এখনো পুরনো অ্যানালগ পদ্ধতিতেই ঢিমেতালে চলছে।
ওয়াইফাই এর কথা বাদ দিলেও শিার্থীদের ইন্টারনেট সেবাও ভালোভাবে দিচ্ছেনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে সাইবার সেন্টার মাত্র দু’টি। ত্রিশ হাজার শিার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে এগুলোর ধারণ মতা ৬০। তাও আবার অনেক উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয় শিার্থীদের।
অনেক আগ থেকেই আমরা একটা কথা শুনে আসছি- শিার্থীদের জন্য সরকার দশ হাজার টাকায় ল্যাপটপ দিচ্ছে। ডেডলাইনের পর ডেডলাইন শেষ হচ্ছে কিন্তু ল্যাপটপ মিলছেনা। ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য আগে ডিজিটালের ক্যাম্পাসের কথা বাদই দিলাম। আজকের পৃথিবী ইন্টারনেট ভিত্তিক এতবেশি এগিয়েছে, একজন শিার্থী এখন তার পড়াশোনা, গবেষনা এমনকি প্রাত্যহিক কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার না করলে অবশ্যম্ভাবি ভাবে সে পিছিয়ে পড়বে।
আজকে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাই এরকম, সেখানে স্কুল কলেজের কথা বলার অপো রাখেনা। সে বিষয়ে কালের কন্ঠ (৭ এপ্রিল) বলছে, ৩২ হাজার শিা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইন্টারনেট নেই ২৯ হাজার প্রতিষ্ঠানে। প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে- দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ৩২ হাজার ৫৭৭ টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যুৎ নেই সাত হাজার ১৮৮ টিতে। কম্পিউটার নেই ১৩ হাজার ৬৫৩ টিতে। আর ইন্টারেনট সংযোগ নেই ২৯ হাজার ৩৪২ টিতে।
এ কথা অবশ্য ঠিক, ওয়াইফাই বলি আর ইন্টারনেট ভিত্তিক কিংবা ডিজিটাল ক্যাম্পাস বলি, তার প্রচেষ্টার জোয়ারটা অন্তত সাম্প্রতিক সময়েরই। সমস্যা হলো কাজটা দ্রুত এগুচ্ছেনা। অঙ্গীকারের মধ্যেই অনেক কিছু থেমে আছে।
গোটা পৃথিবী যত দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, এসব কাজে আমাদের গতি কচ্ছপের গতির চেয়েও কম। ফলে আমরা পিছিয়ে। এখনও আমাদের বলতে হচ্ছে- আর কতদূর ডিজিটাল ক্যাম্পাসের স্বপ্ন।

ডিজিটাল ক্যাম্পাস কতদূর



কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড ডট কম ২০০৮ সালের ৬ অক্টোবর একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জরিপের শিরোনামটা বাংলায়- ‘ওয়াইফাই কলেজ শিক্ষার্থীদের অধিক নাম্বার পেতে সাহায্য করে’।
আমেরিকার ৫০১ জন কলেজ শিক্ষার্থীর ওপর করা গবেষণার ফলাফল এটি। ৭৫ ভাগ শিক্ষার্থীই মনে করে, তাদের পরীক্ষার গ্রেড বাড়াতে ওয়াইফাই এর ভূমিকা অনেক। ৪৮ ভাগ শিার্থী তো বলেই দিয়েছে, তারা বিয়ার খাওয়া ত্যাগ করতে পারলেও ওয়াইফাই ত্যাগ করতে পারবেনা।
২০০৮ সালে আমেরিকার কলেজ শিক্ষার্থীদের যখন এই অবস্থা, তখন বাংলাদেশের কলেজ শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী। আলোচনার প্রাসঙ্গিকতার জন্য কলেজের বিষয়ে যাওয়ার আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা দেখবো।
সম্প্রতি বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো যখন তাদের ফ্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপনে নাগরিক সুবিধার তালিকায় ‘ওয়াইফাই’ কে যুক্ত করেছে, তা দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা একজন শিক্ষার্থী আফসোস করে বলছে ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকেও ওয়াইফাই সুবিধা পাচ্ছিনা, আর তা এখন অনেকে বাসায় বসেই পাবে।’ বলা যেতে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো ওয়াইফাই সুবিধা আছে। আছে বটে। ১৭ টি হলের মধ্যে তিন-চারটি হলে, টিএসসিতে, ১১ টি অনুষদের মধ্যে দু’একটিতে আর নয়টি ইনস্টিটিউটের মধ্যে একটিতে। তা ও এগুলো বিচ্ছিন্ন এবং বিপ্তি। কেন্দ্রিয়ভাবে এখানে ওয়াইফাই নেই।
অন্য ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যে বুয়েটের একাডেমিক বিল্ডিং এ, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। সম্প্রতি দেয়া হয়েছে রাজশাহী আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রাইভেট কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচ্ছিন্নভাবে থাকলেও নেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় আঠারশ’ ক্যাম্পাসের কথা বাদই দিলাম।
অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে ওয়াইফাই। অনেক আগ থেকেই। এখন থেকে ১২ বছর আগে ১৯৯৯ সালে কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটি প্রথম তাদের পিটাসবার্গ ক্যাম্পাসে এ সেবা চালু করে। এরপর ২০০০ সালে আমেরিকার ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে ওয়াইফাই সেবা দেয়ার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এভাবে ধীরে ধীরে প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এ সেবা শিার্থীদের প্রদান করে। আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও রয়েছে সেবাটি। ইন্ডিয়া, পাকিান, শ্রীলংকা এমনকি থাইল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়তে কেন্দ্রীয়ভাবে রয়েছে ওয়াইফাই।
রাজধানীর ঢাকার ওয়াইফাই চিত্র নিয়ে গত ২ জানুয়ারি প্রথম আলো ঢাকার পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে ঢকার পাঁচতারা হোটেল, অভিজাত রেঁস্তোরা আর বিমানবন্দর এলাকায় রয়েছে ওয়াইফাই। বিভিন্ন নামিদামি কর্পোরেট হাউজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও এখন নিজস্ব ফ্যাটেও ওয়াইফাই দেখছি। সন্দেহ নেই ঢাকা এগিয়ে যাচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে ক্যাম্পাসগুলো। অথচ এদিকথেকে তাদেরই এগিয়ে থাকার কথা ছিলো।
গত ১২ নভেম্বর প্রথম আলোর কম্পিউটার প্রতিদিন পাতার ছোট্ট একটা সংবাদ, ‘যুক্তরাজ্য জুড়ে বিনামূল্যে ওয়াইফাই। সংবাদ ভাষ্যমতে, যুক্তরাজ্যে ইন্টারনেট সপ্তাহ পালন উপলে এসেবা দিয়েছে ইন্টারনেট ভিত্তিক কথা বলার ওয়েবসাইট স্কাইপ। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। কারন যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, বিশ্বের অনেক শহরেই রয়েছে পাবলিক ওয়াইফাই সেবা। ২০০৮ সাল পর্যন্ত উইকিপিডিয়া দেখিয়েছে, ৩০০ মেট্রোপলিটন এলাকায় এ সেবা আছে। এমনকি ২০১০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রে ১১৫০ টিরও বেশি ওয়াইফাই ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে।
গত বছরের শেষ দিকে বিবিসি একটা জরিপে বলছে, মানুষ মনে করে ইন্টারনেট সেবা পাওয়াটাও তার একটা মানবাধিকার। যদি তা-ই হয়, বাংলাদেশের মানুষ এ অধিকার থেকে কতটা বঞ্চিত, বলার অপো রাখেনা। সাধারণ মানুষের কথা বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীদের অবস্থা দেখলেও হতাশ হতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের একজন শিার্থীকে তার ইমেইল এড্রেস আছে কিনা, প্রশ্ন করলে উত্তরে ‘না’ আসলেও অবাক হওয়ার মত কিছুই থাকবেনা। ক্যাম্পাসগুলো এখনো বিজ্ঞান-প্রযুক্তি থেকে অনেক পিছিয়ে। মূল গলদটা কিন্তু প্রশাসনে। প্রশাসনিক অনেক কাঠামোই এখনো পুরনো অ্যানালগ পদ্ধতিতেই ঢিমেতালে চলছে।
ওয়াইফাই এর কথা বাদ দিলেও শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট সেবাও ভালোভাবে দিচ্ছেনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে সাইবার সেন্টার মাত্র দু’টি। ত্রিশ হাজার শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে এগুলোর ধারণ মতা ৬০।তাও আবার অনেক উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয় শিক্ষার্থীদের।
অনেক আগ থেকেই আমরা একটা কথা শুনে আসছি- শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার দশ হাজার টাকায় ল্যাপটপ দিচ্ছে। ডেডলাইনের পর ডেডলাইন শেষ হচ্ছে কিন্তু ল্যাপটপ মিলছেনা। ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য আগে ডিজিটালের ক্যাম্পাসের কথা বাদই দিলাম। আজকের পৃথিবী ইন্টারনেট ভিত্তিক এতবেশি এগিয়েছে, একজন শিক্ষার্থী এখন তার পড়াশোনা, গবেষনা এমনকি প্রাত্যহিক কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার না করলে অবশ্যম্ভাবি ভাবে সে পিছিয়ে পড়বে।
আজকে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাই এরকম, সেখানে স্কুল কলেজের কথা বলার অপো রাখেনা। সে বিষয়ে কালের কন্ঠ (৭ এপ্রিল) বলছে, ৩২ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইন্টারনেট নেই ২৯ হাজার প্রতিষ্ঠানে। প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে- দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ৩২ হাজার ৫৭৭ টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যুৎ নেই সাত হাজার ১৮৮ টিতে। কম্পিউটার নেই ১৩ হাজার ৬৫৩ টিতে। আর ইন্টারেনট সংযোগ নেই ২৯ হাজার ৩৪২ টিতে।
এ কথা অবশ্য ঠিক, ওয়াইফাই বলি আর ইন্টারনেট ভিত্তিক কিংবা ডিজিটাল ক্যাম্পাস বলি, তার প্রচেষ্টার জোয়ারটা অন্তত সাম্প্রতিক সময়েরই। সমস্যা হলো কাজটা দ্রুত এগুচ্ছেনা। অঙ্গীকারের মধ্যেই অনেক কিছু থেমে আছে।
গোটা পৃথিবী যত দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, এসব কাজে আমাদের গতি কচ্ছপের গতির চেয়েও কম। ফলে আমরা পিছিয়ে। এখনও আমাদের বলতে হচ্ছে- আর কতদূর ডিজিটাল ক্যাম্পাসের স্বপ্ন।

য় প্রকাশিত ২৩ জুন ২০১১

সৃজনশীল পদ্ধতি বনাম নোটবই

প্রাইভেট ও কোচিং বন্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সম্প্রতি (৩০ মে) ‘শিক্ষার মানোন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টা’ নামে একটি সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে। নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্তার নেতৃত্বে সংগঠনটির বলা চলে সবাই শিক্ষক। শিক্ষক হিসেবে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ছড়াছড়ি তারা প্রত্যক্ষভাবে দেখছেন। শিক্ষার মানোন্নয়নে এগুলো প্রতিবন্ধক বলে তাদের এ আহ্বান। প্রাইভেট, কোচিংয়ের সঙ্গে আরেকটা যোগ হবে নোটবই। সংগঠনটি এমন সময় আহ্বান জানাল, যার মাত্র দু’সপ্তাহ আগে এসএসসির ফল প্রকাশ হয়। যাকে বলা হচ্ছে ইতিহাসের রেকর্ডকৃত ফল। এটা অবশ্য ২০০১ থেকে জিপিএ পদ্ধতিতে চালু হওয়া ফলের ধারাবাহিকতা, অর্থাৎ ২০০১-এ জিপিএ পদ্ধতি চালুর পর থেকে প্রত্যেক বছরই ফলের নতুন রেকর্ড হচ্ছে। এবারে পাসের হার ৮১.১৬ ভাগ, যা গত বছর ছিল ৭৮.১৯ আর জিপিএ-৫-এর সংখ্যা ৬২ হাজার ৭৮৮, গত বছর ছিল ৬২ হাজার ১৩৪।
বলার বিষয় হলো, এবারের ফলকে সবাই দেখছেন সৃজনশীল পদ্ধতির সফলতা হিসেবে। ফল সম্পর্কে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ফাহিমা খাতুনের বক্তব্যে তা-ই এসেছে- ‘নোট-গাইড না কিনে বিনামূল্যে দেওয়া সরকারের বই পড়লে ভালো নম্বর পাওয়া যায়_ এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।’ ফাহিমা খাতুন সৃজনশীল পদ্ধতির সফলতার ইঙ্গিত দিয়েই এ বক্তব্য দিয়েছেন
। এ ধারণা ঠিক কাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক না শিক্ষকদের, নাকি তার মতো প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের।
২০১০ সাল থেকেই এসএসসিতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়। তখন বাংলা ও ধর্ম শিক্ষায় সৃজনশীলতা ছিল, এ বছর যোগ হয় সাধারণ বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ভূগোল, রসায়ন ও ব্যবসায় পরিচিতি। মোট সাত বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি কার্যকর হলো। এ সাতটি বিষয়ে গাইড কেনেনি এ রকম শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে কি-না বলা মুশকিল কিংবা এসব বিষয়ে কেউ কোনো কোচিং করেনি তা বের করা কঠিন, আর প্রাইভেটের কথা না-ই বললাম। তবে এগুলোর বিস্তার যে সর্বত্র তা ‘শিক্ষার মানোন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টা’র আহ্বান থেকে সহজে অনুমান করা যায়। বাস্তবতাও আমরা দেখছি_ শিক্ষা ব্যবস্থায় যখনই সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হলো, ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে এলো সৃজনশীলের নামে গাইড, নোট। আবার কোচিংগুলোও অটো সৃজনশীল হয়ে গেল।
আজকে যে সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে এত তোড়জোড়
, শিক্ষাব্যবস্থায় ঠিক এ নামে পৃথিবীর কম দেশেই তা আছে, এর তুলনায় কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতির প্রচলন আরও বেশি। বর্তমান সৃজনশীল চালুর আগে নামটা কাঠামোবদ্ধ হিসেবেই হওয়ার কথা ছিল, সেটাই সৃজনশীল নামে হলো। নাম যা-ই হোক, মূলত পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করা হয়, মুখস্থ বিদ্যা নয়। যথার্থভাবে তার মেধার পরিমাপ করা যায় এমন পদ্ধতিই কাম্য। বিশ্বব্যাপী প্রকৃত মেধা যাচাইয়ে অনেক আগ থেকেই একটা পদ্ধতি ব্যাপক পরিচিত, শিক্ষা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ব্লুমস টেক্সোনমি (নষড়ড়স\’ং ঃধীড়হড়সু) বলে। পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেঞ্জামিন এস ব্লুমের নেতৃত্বে একদল গবেষক এ পদ্ধতি চালু করেন। যেখানে শিক্ষার্থীর মেধার প্রধান তিনটি বিষয় দেখা হয়_ জ্ঞানমূলক, অনুভূতিমূলক এবং মনোপেশিজ। এখানকার প্রথমটির (জ্ঞানমূলকের) আবার ছয়টি বিষয় আছে_ জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন। এসব বিষয়ের সংযোগ ঘটিয়ে কোনো প্রশ্ন তৈরি করলে সেটাই হবে মেধা যাচাইয়ের আদর্শ প্রশ্ন। আমাদের যে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু আছে এখানে উপরোক্ত বিষয়গুলোর তিনটি দেখা হয়_ জ্ঞানস্তর, অনুধাবনস্তর এবং প্রয়োগস্তর। ফলে বলা যায় আমাদের পদ্ধতি পুরো সৃজনশীল হয়নি। তবে এ কথা ঠিক, এটা সৃজনশীলতা পূর্ণাঙ্গতার একটা সূচনা, যার আরও কাজ বাকি আছে।
সৃজনশীল পদ্ধতি এখন মোট সাতটি বিষয়ে হয়েছে, গণিতে হয়নি। অথচ গণিতেই সৃজনশীল পদ্ধতি বেশি দরকার। কারণ গণিত এমন একটা বিষয়, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী মুখস্থ বিদ্যার বাইরে গিয়ে তার মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে। বাস্তবতা হলো এখনও অনেক শিক্ষার্থীর কাছে গণিত একটা ভীতিকর বিষয়। অনেক শিক্ষক নিজেরাও এ ভীতি নিয়ে গণিত শিখেছেন, সে ভীতি নিয়েই গণিত করাচ্ছেন, ফলে তার প্রভাব এখনও শিক্ষার্থীর মনে রয়ে গেছে।
সৃজনশীল পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকর না হলেও, এ পদ্ধতির একটা জয়জয়কার অবস্থা এবারের এসএসসির ফলে দেখা গেল। শিক্ষার্থীরা যে এ পদ্ধতিটি বুঝেছে এবং সামনে এ পদ্ধতির আরও উন্নতি ঘটালে তারা তাদের মেধার বিকাশ যে আরও ভালো করে ঘটাতে পারবে, এবারের ফলই তার প্রমাণ। তবে বর্তমান অবস্থায়ও অনেক দুর্বলতা যে রয়ে গেছে, বিশেষ করে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি, তা মাদ্রাসা বোর্ডের ফলই প্রমাণ করে। মাদ্রাসা বোর্ডে জিপিএ-৫ যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে পাসের হার।

সমকাল ৯-০৬-২০১১