Monthly Archives: ফেব্রুয়ারি ২০১১

শতভাগ সাক্ষরতা কি শুধুই প্রতিশ্রুতি?


সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ব্যুরো অব ননফরমাল এডুকেশন বা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট খুললেই একটি বাক্য নজরে পড়বে “We are Committed to
Ensure 100% literacy by 2014″ বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায়- ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কথাটি শুধু এই ওয়েবসাইটেই নয়, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ইশতেহার, জাতীয় শিক্ষানীতিসহ অনেক বক্তব্যেও দেখা যায়। টার্গেট ২০১৪। স্বাভাবিকভাবেই ২০১১ এর এ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে সাক্ষরতার অবস্থা জানার কৌতুহল জাগবে। সাক্ষরতার হার নির্ণয়ে সর্বশেষ জরিপ হয়েছে ২০০৮ এর ডিসেম্বরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘লিটারেসি অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে’ জরিপে সাক্ষরতার হার দেখানো হয়েছে ৪৮.৮ ভাগ। উইকিপিডিয়ায় এখনও দেয়া আছে ৪৭.৫০ ভাগ। অবশ্য আমাদের প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রনালয় বলছে সাক্ষরতার হার ৫৩ ভাগ।
এ হারকে ধরলেও এখনও ৪৭ ভাগ মানুষ নিরক্ষর। এ নিরক্ষর হারকে চার বছরে সাক্ষর করা কতটা সম্ভব। পেছনে ফেরা যাক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সাক্ষরতার হার ছিলো ১৬.৮ ভাগ। স্বাধীনতার পরই সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহন করা হয়। ১৯৯১ সালে অবস্থার পরিবর্তন হয়ে দাঁড়ায় ৩৫.৩ ভাগ। বিশ বছরে সাক্ষরতার হার বাড়ে ১৮.৫ ভাগ। বর্তমান ৫৩ ভাগ সাক্ষরতা ধরলে চল্লিশ বছরে বেড়েছে ৩৬.২ ভাগ। চল্লিশ বছরে যেখানে ছত্রিশ ভাগ বেড়েছে, সেখানে চার বছরে সাতচল্লিশ ভাগ অর্জন কতটা সহজ হবে।

সম্প্রতি ৮ ফেব্র“য়ারি সাক্ষরতা নিয়ে সমকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ নিয়ে পরেরদিন সম্পাদকীয়ও করেছে পত্রিকাটি। ‘চ্যালেঞ্জের মুখে নিরক্ষরতা দূরীকরণ কার্যক্রম’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয় সুত্রে বলেছে, নিরক্ষরতা দূরীকরণ কার্যক্রমের প্রকল্প অর্থের অভাবে সরকারের অনুমোদন পায়নি। অর্থ মন্ত্রনালয়ও এসব প্রকল্পে টাকা দিতে সায় দেয়নি। এমনকি এ নিয়ে বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠির সঙ্গে দেন দরবার করলেও কোন ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রতিবেদনটি।
ঠিক কী প্রকল্প অনুমোদন পায়নি তা বিস্তারিতভাবে প্রতিবেদনে আসেনি। এ বিষয়ে খুঁজতে খুঁজতে চোখে পড়লো গতবছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পত্রিকা। ৮ সেপ্টেম্বর অন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস বলে পত্রিকাগুলো এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করে থাকে। দৈনিক প্রথম আলো ‘নিরক্ষরতা দূর করতে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তরফে বলেছে, ব্যুরো নিরক্ষরতা দূরীকরণে দুটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। মৌলিক সাক্ষরতা ও অব্যাহত শিক্ষা নামে দুটি প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প এক হলো ৬১ টি জেলার মানুষকে সাক্ষরকরণ, যার ব্যয় দুই হাজার কোটি টাকা। আর অন্যটি শুধু পার্বত্য তিনটি জেলার জন্য , ব্যয় পঞ্চাশ কোটিরও কিছুরও বেশি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো আশা করেছে, এ বছরের জানুয়ারির অর্থনৈতিক কমিটির নির্বাহী পরিষদের (একনেকের) বৈঠকে অনুমোদন পাবে। জানুয়ারি হতে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করার কথা, জুন হতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে।

এখন সমকালের এ প্রতিবেদনটি বলা চলে সে প্রতিবেদনের আপডেট, পত্রিকার ভাষায় বললে ‘ফলোআপ’- অর্থাৎ জানুয়ারির একনেকে প্রকল্প দুটি অনুমোদন পায়নি। স্বাভাবিকভাবেই ব্যুরো প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেনি। ফলে এ নিরক্ষরতা কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়লো।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আরো দেড় বছর আগে, গত সাক্ষরতা দিবসের আগের দিবসে ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯ এ ও দুটি প্রকল্পের কথা বলা আছে। সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলোতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয় পুরো পৃষ্ঠার একটা বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। ২০০৯ এর এ ক্রোড়পত্রে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালকের প্রবন্ধে এ দুটি প্রকল্পের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। এর অর্থহলো অনেকদিন ধরেই প্রকল্প দুটি ঝুলে আছে।
আরেকটা বিষয় হলো, বর্তমান সরকার ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করলেও তাদের গত হওয়া দুই বছরে এ পর্যন্ত তারা কোন প্রকল্প হাতে নিতে পারেনি।
মজার বিষয় হলো, ২০১৫ সালের মধ্যে শিক্ষাসহ অনেক ক্ষেত্রেই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। যার অংশ হিসেবে তার একবছর আগেই ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত বা শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করার কথা বলেছে সরকার। ভাবখানা এমন, এ আর তেমন কী, ২০১৫ লাগবে কেন, তার আগেই তো আমরা পারবো। বাস্তবতা হলো দেড় বছরের পরিকল্পনা এখনও পরিকল্পনায়ই আছে, আলোর মুখ দেখেনি।

বিশ্বের অনেক দেশ আছে যাদের সাক্ষরতার হার শতভাগ। এ তালিকায় শীর্ষের দেশগুলো হলো- জর্জিয়া, কিউবা, এস্টোনিয়া, পোল্যান্ড, বার্বাডোজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাক্ষরতার হার ৯৯ ভাগ।

অস্বীকার করার জো নেই, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন অত্যন্ত কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ বিষয়। চার বছরে তা অসম্ভব। এর জন্য আগে প্রাথমিক শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি। প্রাথমিক শিক্ষায় বর্তমান ভর্তির হার নব্বই ভাগের উপরে, এটা সন্তোষজনক। উদ্বেগটা ঝওে পড়ায়। এখনও পঞ্চম শ্রেণী হতেই প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ঝরে যায়। ঝরে পড়া বন্ধ করতে না পারলে শতভাগ সাক্ষরতা অকল্পনীয়।
আরেকটা হলো, বয়স্ক শিক্ষা। ১৫ হতে ৪৫ বছর বয়সীদের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় সাক্ষর করার কাজ চলছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর প্রকল্প ছাড়াও এনজিও গুলো কাজ করছে।
সাক্ষরতা অর্জনে শিক্ষানীতিও কয়েকটি ভূমিকার কথা বলেছে, জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি করে সকল শিক্ষিতদের অংশগ্রহণ, স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্তকরণ।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাক্ষরতার কাজে লাগানো একটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হতে পারে। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সামার ভ্যাকেশনে তিন মাস বন্ধ দেয়া হয়। আমাদের দেশেও পরীক্ষা মূলকভাবে সকল বিশ্ববিদ্যালয় এরকম গ্রীষ্মের ছুটিতে তিন মাস বন্ধ দিয়ে, শিক্ষার্থীদের এলাকা ভিত্তিক সাক্ষর কার্যক্রমে লাগানো যেতে পারে। শ্রীলংকাও এটা করেছে, সেখানে সাক্ষরতার হার ৯২ ভাগ।

সরকারি বেসরকারি প্রচেষ্টা, স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতায়ই নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। শুধু শুধু শতভাগ সাক্ষরতার প্রতিশ্র“তি দিয়ে বসে থাকলে, ২০১৪’র স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

Daily Samakal 23-02-2011

রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম:নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


একটা তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেইসবুক এবং টুইটার পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ভাষা হতে বাংলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফেইসবুক বা টুইটারের এ স্বীকৃতি তাদের নিজস্ব নয়; তাদের ব্যবহারকারীরা ভোট দিয়েই বাংলাকে নির্বাচন করেছে। ইউনেস্কোও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে এ স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে, ১৯৯৯ সালের পর মিষ্টি ভাষার এ স্বীকৃতি। বাংলার এতসব স্বীকৃতির গোড়ার কারণ একটাই ‘রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম’। ভাষার জন্য রক্ত দেয়া আর সংগ্রামের নজির পৃথিবীতে বিরল। বিরল এ নজিরটিই বাংলার। যা সম্ভব হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বদৌলতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য যে আন্দোলন হয়েছে, তার মাধ্যমে একদিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে আমরা পেয়েছি, অন্যদিকে তার পথ ধরেই পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। ১৯৪৭ সালের চৌদ্দ অক্টোবর পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের তেইশ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই কুমিল্লার শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। সেখানেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীসহ উচ্চস্থানীয় অনেকেই তার বিরোধিতা করে। এ সংবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এগারো মার্চে প্রতিবাদ সভা করে বিক্ষোভ করে। রাষ্ট্রভাষার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বলা চলে এখান থেকেই শুরু। ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ববঙ্গ সফরে আসলে সাতাশ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তিনি ছাত্রসভায় এক ভাষণ দেন। সে সময় ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন) এর নেতৃবৃন্দ প্রদত্ত মানপত্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালের পর ১৯৪৯ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের অন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম তীব্রতর হয়। নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীরা তাদের দাবিদাওয়ার জন্য তিন মার্চ হতে ধর্মঘট করেন। ছাত্র নেতৃবৃন্দ এ ধর্মঘটে সমর্থন দেন। নয় মার্চ কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের ভিত্তিতে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। কর্মচারীরা কাজে যোগ দিতে চাইলে বাধা দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে কর্মচারীদের আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। তারা শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলনের সমর্থন দেয়। যৌথ সমর্থনে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের সমর্থনে আন্দোলন করার ফলে সাতাশ জন ছাত্রকে শাস্তি দেয়, যাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অন্যতম। বলে রাখার বিষয় হলো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরাও ছিলেন। বলা চলে সামনে থেকে নির্দেশনা তাঁরাই দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিশ এর কথা বলতেই হবে। এ সংগঠনটির উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। যার আহবায়ক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়া। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথম থেকেই বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতি এমনকি তদানিন্তন সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা অন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করার পূর্বে ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান ভাষা নিয়ে আরেক কাহিনির জন্ম দেয়। তারা গণশিক্ষা প্রসারের নামে আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের অপপ্রয়াস চালায়। সে সময় এর বিরুদ্ধে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ‘পাকিস্তান শিক্ষাবোর্ড ও বর্ণমালা বিশেষজ্ঞ কমিটি’র নিকট স্মারকলিপি প্রদান করে। পরে প্রতিবাদে সভা হয় কলাভবনে এবং ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক হল)। ১৯৫০ সালেও আরবি হরফের কার্যক্রম চলে। এ সময় বাংলার বিভিন্ন জেলায় আরবি হরফ বাংলায় শেখানোর জন্য বিশটি শিক্ষাকেন্দ্র খোলা হয়। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর খাজা নাজিমুদ্দিন তার স্থলাভিষিক্ত হন। তারপরের ইতিহাস সবার জানা। এই নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের একুশে জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের সম্মেলনে জিন্নাহর কথার পুনরাবৃত্তি করে ঘোষণা দেন ‘টৎফঁ ঝযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ’ উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তার এ বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে সেদিন যারা ‘না’ ‘না’ করেছিলেন, তারা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী। প্রতিবাদে ত্রিশ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের’ ডাকে ধর্মঘট করেন। এ পরিষদের আহবায়ক ছিলেন আবদুল মতিন। সেদিনই কয়েকটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় কর্মপরিষদ’। বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাম মাহবুব আহবায়ক নির্বাচিত হন। তারা পুনরায় চার ফেব্রুয়ারি ছাত্রধর্মঘট ডাকেন। সেদিন সকলের সিদ্ধান্তে একুশে ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। বিশ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পাকিস্তান সরকার ঢাকায় একশ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে। সেদিন ‘সর্বদলীয় কর্মপরিষদ’ সদস্যরা একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগলেও ‘বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ’ এ ব্যপারে ছিলো বদ্ধপরিকর। সারারাত ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোতে তার প্রস্তুতি চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনোবলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনতা একুশে ফেব্রুয়ারিতে একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। যার মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবি পেশ করা হয়। ছাত্ররা শৃঙ্খলার সাথে একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। দলে দলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক অতিক্রম করে তারা। হঠাৎ মারমুখী হয় পুলিশ। পুলিশবাহিনী আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করতে থাকে। ছাত্রজনতার ঢল নামে। বেপরোয়া পুলিশ গুলি করে। নিহত হন রফিক, জব্বার, বরকতসহ আটজন। শতাধিক আহত হন। এখবর শহরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে শহরবাসী। সেদিনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের আন্দোলনই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায় বাংলা। ঊনত্রিশ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। এরপর থেকে বাংলার স্বীকৃতির অভাব নেই। সারা পৃথিবী এখন বাংলাকে চেনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই তার কারিগর।

pataka, February2011

স্কুলবাস হাজির!


সমকালে প্রথম পৃষ্ঠায় একটি ছবি। বাসের ভেতরকার ছবি। সব যাত্রীর মুখে হাসি। পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্কুলের শিক্ষার্থী, তাদের সাথে রয়েছেন অভিভাবক। ষোল জানুয়ারি ঢাকার স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হওয়া বাসের ছবি। প্রাথমিকভাবে ঢাকার আজিমপুর হতে পল্লবী রুটে ছাব্বিশটি স্কুলের জন্য চালু হয় এ সেবা।
যানজটের নগরী, মেগাসিটি ঢাকার জন্য স্কুল বাসের উদ্যোগ কতটা প্রশংসনীয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের প্রাণ কাড়া হাসিই বলে দেয়, বাস পেয়ে তারা কতটা খুশি। শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে, কেউ আবার ভ্যান কিংবা অনেক কষ্টে অন্য গাড়িতে চড়ে স্কুলে আসে। ব্যক্তিগত গাড়ি যেমন একদিকে তীব্র যানজট সৃষ্টি করে অন্যদিকে এর বাইরের অন্যান্য যানবহনে রয়েছে কষ্ট আর নিরাপত্তাহীনতা। স্কুল বাস সেসব ঝক্কিঝামেলার চমৎকার সমাধান।
প্রতিদিন সকাল ছয়টা হতে নয়টা, দুপুর এগারোটা হতে তিনটা পর্যন্ত দশ মিনিট পরপর বাস চলবে। বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ বাস থামার জন্য তেত্রিশটি স্থান নির্ধারণ করেছে। আপাতত চৌদ্দটি বাস দিয়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন।
স্কুলের বাসের ধারনাটি আমাদের কাছে নতুন হলে আন্তর্জাতিকভাবে বেশ পুরনো। আঠারশ সাতাশ সালে লন্ডনের জর্জ শিলবিয়ার প্রথম এ ধারনার প্রচলন করেন। এরপর থেকে লন্ডন আমেরিকাসহ অনেক দেশই চালু হয় স্কুল বাস। বাসগুলোর রঙ সাধারনত হলুদ, এর জন্য রয়েছে আলাদা লেন-রুট।
স্কুল বাস চালুর সপ্তাহখানেকের মাথায় পত্রিকার প্রতিবেদন দেখে যে কেউ হোঁটচ খাবে। তেইশ জানুয়ারি ‘স্কুলবাসে ভিড় নেই’ শিরোনামে সমকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি শুধু যাত্রী শুন্যতার কথাই নেই আছে আরো দুর্দশার কথা। এ দুর্দশার চিত্র আরো স্পষ্ট হয় ‘অনেক অভিযোগের পরও স্কুল বাস চান সবাই’ শিরোনামে আরেকটি দৈনিকের প্রতিবেদনে। সমকালের প্রতিবেদক দেখিয়েছেন- বাইশ জানুয়ারি প্রথম বাসটি ছাড়ে যাত্রী শুন্য। পনের মিনিট পর দ্বিতীয় বাসটির অবস্থাও তাই।এর পনের মিনিট পর তৃতীয় বাসটির জন্য যাত্রী মেলে দুই শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। দিনের অন্যান্য সময়ের চিত্রও খুব ভালো নয়। বায়ান্ন সিটের বাস যাত্রী পাচ্ছে বিশ-পঁিচশ জন। যাত্রীর এ অবস্থায় নিশ্চিতভাবেই ‘অনিশ্চিত গন্তব্য যাচ্ছে স্কুল বাস’ একথা সবাই বলবে।
প্রত্যেকদিন বাসপ্রতি খরচ বাইশ-তেইশশত টাকা। বাস কিনতে প্রত্যেকটির জন্য খরচ হয়েছে বত্রিশ লাখ টাকা। স্কুল বাস চালাতে নামমূল্যে পাঁচ হতে আঠারো টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেয়া হয়। বাসগুলোতে শিক্ষার্থী ভরপুর হলে বিআরটিসির লোকসান কিছুটা হলেও কম হতো। এখন একদিকে লোকসান অন্যদিকে যাত্রীনেই। যাত্রী বেশি থাকলেও এ লোকসান বৃহত্তর স্বার্থে মেনে নেয়া যেতে।
এক সপ্তাহের মধ্যেই ‘স্কুল বাস প্রকল্প’র অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ার বাস্তব কারন অবশ্যই আছে। প্রথমতঃ এর যথেষ্ট প্রচার হয়নি। দ্বিতীয়তঃ যারা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে সন্তানদের স্কুলে পাঠান, তারা এখনো এ বাস ব্যবহার করছেননা। তৃতীয়তঃ দশ মিনিট পরপর বাস ছাড়ার কথা থাকলেও তা বিশ-পঁচিশ এমনকি ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত দেরি হয়। আরো দেখছি যেসব বিদ্যালয়ে দিবা শাখা চালু আছে তারা এ সেবা হতে বঞ্চিত। তাদের ক্লাস শুরু হয় বারোটায় শেষ হয় পাচঁটায়।
লক্ষ্যকরার বিষয় হলো ‘স্কুল বাস’ কার্যক্রমটি দুটি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চলছে। ফলে তাদের মাঝে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও উঠে এসছে। বাস সার্ভিস কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিআরটিসি, স্কুলে স্কুলে প্রচার, টিকেট ব্যবস্থার কাজ করছে মাউশি তথা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।
আশ্চর্যের বিষয় হলো- কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, এক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে স্কুল বাস কার্যক্রম শুরু হলেও এখনও বলা হচ্ছে প্রচারের অভাব। একজন অভিভাবকই বলেছেন স্কুলের তরফে তারা কোন সংবাদ পাননি। গনমাধ্যমের সংবাদের মাধ্যমেই তিনি জেনেছেন। তার মানে স্কুলগুলোর এ কাজে একটা অবহেলা এখনও স্পষ্ট।
সবকিছুর পরও প্রধান সমস্যা একটাই অভিভাবকদের অনীহা। অভিভাবকরা যদি আগ্রহী হয়ে তাদের সন্তানদের ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে না পাঠিয়ে স্কুল বাসে পাঠান, একদিকে এ কার্যক্রমের প্রধান উদ্দেশ্য হাসিল হবে, যানজট কমবে। অন্যদিকে কার্যক্রমটি সফল ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। অবশ্য বাস নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের উৎসাহ আছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে এখন বেগ পেতে হয়না। তারা চাননা এ সুন্দর ব্যবস্থাটি বন্ধ হোক।
স্কুল শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের মত কর্তৃপক্ষেরও উৎসাহ আছে। এ কার্যক্রম সফল হতে আছে বিস্তর পরিকল্পনা। এখন বাস সংখ্যা চৌদ্দটি আর একটা রুটে হলেও, আরো একশ পঁচাত্তরটি বাস দিয়ে ঢাকার সবগুলো রুটে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা আছে দক্ষ নারী নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের। এছাড়া বাসে শিশুতোষ ও শিক্ষামূলক ভিডিও আর স্কুলে শিক্ষার্থী পৌঁছলে, অভিভাবকদের নিকট অটো মেসেজিং সিস্টেম চালুরও পরিকল্পনা আছে।
এতসব পরিকল্পনা আর উৎসাহ থাকতে ভেস্তে যেতে পারেনা স্কুল বাস কার্যক্রম। বিটিআরসি, মাউশি, স্কুল কর্তৃপক্ষ সর্বোপরি অভিভাবকদে সকলের অংশগ্রহন ও প্রচেষ্টায় সফল হবে এ কার্যক্রম। যাজট কমবে। স্বস্তি আসবে।