Monthly Archives: নভেম্বর ২০১১

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষক নিয়োগে চাই স্বচ্ছতা

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এগুলোর পড়াশোনার মান, ক্যাম্পাস, সনদ বাণিজ্য প্রভৃতি বিষয়ে গণমাধ্যম প্রায়ই সংবাদ পরিবেশন করে থাকে। ১২ নভেম্বর বণিক বার্তা ‘শিক্ষক নিয়োগে নেই সুনির্দিষ্ট নীতিমালা’ শিরোনামে এসব বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মানার কথা বললেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই তা মানছে না; নিজেদের ইচ্ছামতো শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে। প্রতিবেদনটি আরও বলছে, ৭০ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষককে খণ্ডকালীন হিসেবে নিয়োগ দেয়।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড— এর সঙ্গে মিলিয়ে অনেকে বলেন, শিক্ষক শিক্ষার মেরুদণ্ড। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এমন অবস্থায় সে শিক্ষাব্যবস্থা কেমন চলছে, তা বোঝা কষ্টের কিছু নয়। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে অনেক আগে। ১৯৯২ সাল থেকে যাত্রা। বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন দুই লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এত বছর পার হওয়ার পরও এ ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা নেই, এটা দুঃখজনক। প্রতিবেদনটি যদিও বলছে, ২০০৩ সালে একবার ইউজিসি শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা করেছিল; কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার অনুমোদন দেয়নি। সে নীতিমালায় হয়তো ঘাপলা ছিল। ভালো কথা, সেটার অনুমোদন হয়নি। তাই বলে তা দ্রুত সংশোধন করে কি আবার করা যেত না?
এ ব্যাপারে ইউজিসি দায়িত্ব এড়াতে পারে না। যখন সংবাদমাধ্যম ইউজিসি চেয়ারম্যানকে প্রশ্ন করছে, তিনি বলছেন, এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে; শিগগিরই নীতিমালা হবে। দায়টা এখানেই শেষ নয়। নীতিমালা না থাকলেও ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বলছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করতে; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তারা সেটা করছে না। কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগধারী শিক্ষক হওয়ার কথা না থাকলেও সেটা হচ্ছে। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক-তৃতীয়াংশের বেশি খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের নীতি না থাকলেও তা হচ্ছে। এগুলো তো ইউজিসির দেখা উচিত। বিরাজমান নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বও ইউজিসির।
মজার বিষয় হলো— বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের প্রোসপেক্টাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামিদামি শিক্ষকের নাম ব্যবহার করলেও তাদের অনেকেই বিষয়টা আদৌ জানেন না। সে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের না জানিয়ে নাম ব্যবহার করছে! অথচ এদের নাম দেখেই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার জন্য আগ্রহী হন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের ধোঁকা দিয়ে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের জন্য এসব কাজ করে যাচ্ছে। এটাও কি ইউজিসি দেখছে না!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যে নেই তা নয়। যারা আছেন, তাদের নাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবহার করতেই পারে। বরং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষকের ব্যাপারে এমন অভিযোগও আছে, যারা এগুলোয় সময় দেয়া, ক্লাস নেয়া কিংবা গবেষণার চেয়ে বেসরকারিগুলোতেই বেশি সময় দেন। একেকজন কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। কারণ এতে তিনি বেশি টাকা কামাতে পারছেন। আজকের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এদের কারণেই খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়েই তাদের কাজ স্বাচ্ছন্দ্যে চালাতে পারছে। ফলে এটা একদিকে যেমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্ষতি, একই সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও।
বাংলাদেশে বেসরকারি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটা অঘোষিত দ্বন্দ্ব চলে আসছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে তেমন একটা পাত্তা দিতে চান না। সাধারণ মানুষও উভয়ের মানের ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল তফাত করে। খুবই স্পষ্ট, এগুলো মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এটা অবশ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডেই হয়েছে। অথচ বিশ্বব্যাপী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাপক সমাদৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে প্রথম স্থানে থাকা এমআইটি আর বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রাইভেট।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগের কথা আগেই বলা হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টা স্পষ্ট। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের বিবেচনায় এখানে উচ্চশিক্ষার খরচ বেশি— এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের আরেকটা সমস্যা হলো, সবাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চায়। সে ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলে বাধ্য হয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। অভিভাবকরাও বাধ্য সন্তানের খরচ চালাতে, এতে তার জমি বিক্রি করতে হলেও বা কি!
সমস্যাটা আসলে এখানে নয়। কথা হলো, যেখানে শিক্ষার্থীরা এত টাকা খরচ করে পড়াশোনা করছে, সে অনুযায়ী সেবা যদি তারা না পায়, তাদের যারা পাঠদান করবেন সে শিক্ষকরা যদি যথাযথ পাঠদান করতে না পারেন, সেটা মেনে নেয়া যায় না। ব্যবসায়িক প্রজেক্ট মনে করে যেকোনো ব্যবসায়ী কিংবা ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ একেকটা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসলেন, আর তার আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতদের দিয়ে কিংবা টাকার কথা চিন্তা করে অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেন— এটা হতে পারে না।
এটা অবশ্য বলতেই হবে, কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এসব দিক উতরে এসেছে। তাদের শিক্ষক, পাঠদান পদ্ধতি উন্নত। এখানে ভালো পড়াশোনাও হয়। তাদের ভালো ক্যাম্পাস আছে। এটা হাতেগোনা কয়েকটা। তবে এগুলোয় আবার খরচ অনেক। আমাদের মধ্যবিত্তের সন্তানরা পড়ার সামর্থ্য রাখে না। তবু অধিকাংশের অবস্থা যখন খারাপ হয়, অল্প কয়েকটার অবস্থা দেখে সবাই গড়ে গোটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবেই হোক ভালোভাবে যে চলছে, তার উদাহরণ হলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন। ইউজিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৫৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা রয়েছে; যেগুলো বর্তমান। এর বাইরেও পত্রিকাগুলো সংবাদ দিচ্ছে ৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন পড়েছে, এগুলোর আবেদনকারী কারা সে বিষয়টা আপাতত থাক। ২০০৬ সাল থেকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বন্ধ আছে, এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিলেই অনুমোদন দিতে পারে। তবে সরকার বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা ভেবেই অনুমোদনের কাজ করবে।
আমাদের উচ্চশিক্ষার, বিশেষ করে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করার দায়িত্বে রয়েছে ইউজিসি। সুতরাং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোয় কোথায় শিক্ষক নিয়োগ ঠিকমতো হচ্ছে না, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কত ভাগ শিক্ষক খণ্ডকালীন আছেন— এগুলো ইউজিসিই দেখবে। এ ক্ষেত্রে কোথাও নিয়ম মানা না হলে তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থাও ইউজিসি করবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, শিক্ষক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা। শোনা যাচ্ছে, এখন আবার ইউজিসির চেয়েও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হাইয়ার এডুকেশন কমিশন হচ্ছে। দেখার বিষয় এটা কেমন কাজ করে।

বণিক বার্তা, ৩০.১১.১১

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্ব-মূল্যায়ন, প্রাথমিকেও হোক

সম্প্রতি দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর স্ব-মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সরকার। বাংলাদেশে এ ধরনের মূল্যায়ন নতুন হলেও বিশ্বব্যাপি বেশ পুরনো। এ নিয়ে যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পিটার রাড এবং ডেভোরা ডেভিস’ নামে দুই ভদ্রলোকের গবেষণা প্রকাশ হয় ২০০০ সালে। তারা মূল্যায়নের শুরু হিসেবে ১৯৯০ সালকে আবিষ্কার করেছেন। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়ন। উন্নত বিশ্বে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে শিক্ষার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (local education authority) কর্তৃক এ মূল্যায়ন পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশে শিক্ষার এরকম স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নেই বলে কেন্দ্রীয়ভাবে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর-এর সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এসইএসডিপি) আওতায় ১৭ হাজার ৮৭৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে এ মূল্যায়ন হয়। ব্যানবেইজের সর্বশেষ ২০০৯-এর তথ্যানুসারে বাংলাদেশে সরকারি এবং বেসরকারি মিলিয়ে মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৩। মূল্যায়ন বিষয়ে বিস্তর আলোচনার সুবিধার্থে মূল বিষয়গুলো জানা যাক। ‘১৪ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষামান উন্নত’ শিরোনামে ১০ অক্টোবর পত্রিকাগুলো প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যা বলছে ‘পারফরম্যান্স বেজড ম্যানেজমেন্ট (পিবিএম)’ পদ্ধতিতে বিদ্যালয়গুলোর মান যাচাই এবং ক্রমোন্নতি পরিমাপের জন্য সাতটি সূচকের অধীনে মোট ৪৫টি উপ-সূচকের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয় ।

সাতটি সূচক হলো: শিখন-শেখানোর পরিবেশ, প্রতিষ্ঠান প্রধানের নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যকারিতা, শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব, শিক্ষার্থীদের কৃতিত্ব, সহ-শিক্ষাক্রমিক কর্মসূচি ও শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক। এ মূল্যায়নের মান ১০০ ধরে- ৯০ হতে ১০০ নম্বরের ক্যাটাগরিকে ‘এ’ (অতি উত্তম) বলা হয়, ১৭ হাজার ৮৭৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে এই ক্যাটাগরির বিদ্যালয় হলো ২ হাজার ৪৫৫টি, যা মোট সংখ্যার ১৪ শতাংশ। ৮০ হতে ৮৯.৯ নম্বরে ক্যাটাগরি ‘বি’ (ভালো), বিদ্যালয় সংখ্যা ৮ হাজার ৮৯৭টি, এটা মোট সংখ্যার ৫০ শতাংশ। ৭০ হতে ৭৯.৯ নম্বর ক্যাটাগরি ‘সি’ (মধ্যম), এতে বিদ্যালয় রয়েছে ৪ হাজার ৭৪৯টি, যা শতাংশে ২৭ ভাগ। ৫০ হতে ৬৯.৯ নম্বর ‘ডি’ (দুর্বল) ক্যাটাগরি, বিদ্যালয় সংখ্যা ১ হাজার ৬১৯টি, শতাংশে মোট সংখ্যার ৮ ভাগ। এবং ২০ হতে ৪৯.৯ নম্বরকে ‘ই’ (অকার্যকর) ক্যাটাগরি ধরা হয়েছে, যা মোট বিদ্যালয়ের ১ শতাংশ, বিদ্যালয় সংখ্যা ১৫৩।

এ মূল্যায়নের মাধ্যমে আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা খুব ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। যদিও এখানে একটা ভালো অবস্থানই দেখাচ্ছে। বিশেষ করে ‘এ’ এবং ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৬৪ শতাংশ বিদ্যালয় আছে বলা হচ্ছে। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। এখানে যে সাতটি সুচকে হয়েছে প্রত্যেকটা ধরে পর্যালোচনা করলেই এ মূল্যায়নের অসারতা প্রমাণ হবে। বাংলাদেশে সরকারি বিদ্যালয় সংখ্যা মাত্র ৩১৭ টি। আর সবই বেসরকারি। যে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সংকট সারা বছরই লেগে থাকে। শিক্ষকরা ক্লাস নিতে নিতে ক্লান্ত। অনেক বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক, সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম দায়সারা গোছের।

মূল্যায়নের মাধ্যমে ‘এ’ ক্যাটাগরির বিদ্যালয় চিহ্নিত করার মাধ্যমে যেটা বোঝা যাচ্ছে, তা হলো এসএসসির রেজাল্টকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আর এ কারণেই রাজধানীর পরিচিত ভালো ফলাফল করে এরকম প্রতিষ্ঠানই প্রধানত এই ক্যাটাগরি দখল করে আছে। এরা স্বাভাবিকভাবেই প্রথম দিকের অবস্থানে থাকবে ঠিক আছে। তবে এর বাইরের এলাকায়ও যেসব ভালো বিদ্যালয় আছে সেগুলো কতটা গুরুত্ব পেয়েছে তা দেখার বিষয়।

মাধ্যমিক শিক্ষায় আমাদের গ্রাম-শহরের বৈষম্য প্রকট। এটা আমরা যেমন এই মুল্যায়নের মাধ্যমেও দেখছি, ঠিক তেমনি প্রতিবছর এসএসসির ফলাফলের মাধ্যমেই তা জানি। একদিকে শতভাগ পাশ, এমনকি শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়া প্রতিষ্ঠানও আছে, আবার অন্যদিকে আছে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান। গত বছরই এরকম ফেল করা প্রতিষ্ঠান ছিলো ৪৯ টি। বৈষম্যের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোর বাস্তব সমস্যা এ মূল্যায়নের মাধ্যমেই উঠে আসার কথা।

যদিও এবারের মূল্যায়ন নিয়ে যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ১৪ অক্টোবর এসংক্রান্ত সংবাদের প্রতিবেদন হলো ‘১৮ হাজার স্কুলের দায়সারা স্ব-মূল্যায়ন’। প্রতিবেদনটির মাধ্যমে স্পষ্ট বিষয় হলো গবেষণা কার্যক্রমের প্রায় তিন ভাগের মধ্যে দু’ভাগই অসম্পূর্ণ রেখে তড়িঘড়ি করে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ে কর্মশালার আয়োজন করে তা উপস্থাপন করা হয়েছে। এর জন্য প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ি করা হয়েছে।

এবারই প্রথম বলে এ মূল্যায়নে সমস্যা থাকাটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া যায়, তবে শুরু হয়েছে এটাই স্বস্তির বিষয়। অন্যদেশগুলোতে যেটা আছে, আমরা সেটা ১৫/২০ বছর পর হলেও শুরু করলাম। এটা অব্যাহত থাকা জরুরি। এরকম মূল্যায়নের শিক্ষার প্রত্যেক স্তরে হওয়া প্রয়োজন। এর আগে আমরা ইউজিসি কর্তৃক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর গবেষণা হতে দেখেছি (প্রথম আলো, ২৩.০৬.২০১১)।

এ মূল্যায়ন প্রাথমিক শিক্ষায়ও দরকার। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে না হলেও এ শিক্ষার অবস্থা দেখার জন্য মূল্যায়ন আবশ্যক। বিশেষ করে কতটা শোচনীয় অবস্থা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার তা স্ব-মূল্যায়ন ছাড়া পরিমাপ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ৮১ হাজার ৫০৮ টি (ব্যনবেইজ ২০০৯)। এর মধ্যে সরকারি ৩৭ হাজার ৬৭২টি। রাষ্ট্র যেহেতু প্রাথমিকের দায়িত্ব নিয়েছে, তা কতটা ঠিক মতো হচ্ছে তার জন্য গবেষণার, মূল্যায়নের আবশ্যকতা রয়েছে।

আমাদের এরকম ভালো ভালো উদ্যোগ খুব কম নেয়া হচ্ছে তা নয়, কিন্তু সকল উদ্যোগই ভেস্তে যায় বা সফলতার মুখ দেখতে পারে না সরকারের গাফলতি, দুর্নীতি, অদক্ষতা ইত্যাদি নানা কারণে। যে অভিযোগটা এ মূল্যায়নকেও ছাড়েনি। ভবিষ্যতে মাধ্যমিকের মত প্রাথমিক স্তরেও স্বচ্ছভাবে এ মূল্যায়ন হবে, এ আশা সবাই করতেই পারে।

bn.bdeduarticle

রুমের স্বপ্ন পূর্ণ হলো

Salimullah Muslim Hall, University of Dhakaঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে সিট সংকটের বিষয়টি এখন কারই অজানা থাকার কথা নয়। এখানে একটা সিট পাওয়া যে কত কষ্টের তা ভুক্তভোগি মাত্রই জানেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সতেরটি হলের মধ্যে আমার দেখা, সলিমুল্লাহ মুসলিম মানে এসএম হলে এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। এই হলের একজন আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে আমার নিজের সিট পাওয়ার কাহিনীটাই বলার প্রয়াস চালাচ্ছি।

২০০৬-২০০৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মতই ভর্তি কার্যক্রমের সময় আমাকে জানানো হলো আমি এসএম হলে এটাচ। তৎক্ষনাৎ হলে আসলাম। দেখেতো আমি অবাক, কারণ এসএম হল এমন একটা হল যে কাউকে এর সৌন্দর্য, স্থাপত্য-নকশা মোহিত করবে। আমার কাছে আনন্দ আরেকটু বেশি, যেহেতু এই হলেই আমি থাকবো।

ভর্তি কার্যক্রম শেষ। আমাদের ক্লাস শুরু হবে। হলে উঠবো কখন এই নিয়ে টেনশনে আছি। সমস্যাটা হলো তখনও আমার পরিচিত কেউ নেই। আগে শুনতাম বড়ভাই থাকলে হলে ওঠা সহজ। ক্লাস হচ্ছে। ইতিমধ্যে জানলাম আমাদের বর্ষের শিক্ষার্থীরা হলে উঠেছে। কিভাবে উঠলো, কোথায় থাকে এসব জানিনা। একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো, সে উঠেছে। বললো আমরা আছি তুই আজকে রাতে জিনিস পত্র নিয়ে চলে আয়। আমি তো আনন্দে আতœহারা।

বলে নিচ্ছি, তখন ছিলো ফখরুদ্দিনের আমল, তত্তাবধায়ক সরকার ২০০৭ এর শেষ দিক, ফলে তখন রাজনীতি ঠান্ডা। এখন যেমন যে দল ক্ষমতায় তারা ছাত্র ওঠাতো , ওই সময় আমি সেটা দেখিনি। ছাত্রদল-ছাত্রলীগ সবাই নিজেদের বাঁচাতে ব্যস্ত, রাজনীতি করার সাহস ছিলো না। তো ওইদিন রাতে বালিশ, মশারি, কাঁথাসহ একটা ব্যাগ নিয়ে আসলাম। তখনও বলাচলে সন্ধ্যা। প্রথম বর্ষের ছাত্রের সঙ্গে ঘুরছি। দেখলাম এরা টিভি দেখে, ঘুরে ফিরে সময় কাটাচ্ছে। হলে কোনো বড়ভাই নেই, কারও রুমে দেখার জন্য ঢুকারও সাহস পাচ্ছি না।

যাহোক রাত প্রায় এগারোটা বাজবে। এবার ঘুমের পালা। জানি না কোথায় ঘুমাবো। ছেলেটা আমাকে কিছুই বলেনি। তবে আামার ব্যগটা একটা রুমের পাশে রাখলাম। খুব সম্ভবত: ১৫৬ নং রুম। ছেলেটা আমাকে বললো, মাহফুজ চল ঘুমাবো। বললাম কোথায়। বললো ব্যাগটা নিয়ে আয়, দেখাচ্ছি। তার পিছু পিছু হাটলাম। দেখলাম সে আমাকে একটা রুমের পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। স্বভাবসুলভ কিছুই বলিনি।

হঠাৎ থামলো, বললো ব্যাগটা এখানে রাখ। রাখলাম। বললো এখানেই ঘুমাবো। দোতলায় রুমটা ১৬৮ হবে, তার পেছনে। বললো এখানেই ঘুমাতে হবে। কেন? প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বারান্দা ছাড়া কোনো রুম নেই। খুবই অবাক হলাম। কষ্টও পেলাম। কি আর করবো, আজতো ঘুমাতেই হবে। সে আর আমি একই মশারির নিচে বিছানা করে শোয়ার প্রস্তুতি নিলাম। খুবই কষ্ট হচ্ছিলো, পাকার ওপর ঘুমাচ্ছি বলে নয়, বারান্দায় বলে, মানসিক কষ্ট। এই কষ্টটা বেশি হওয়ার কারণটা হলো বড়ভাইরা রুমে ঘুমাচ্ছে আর আমরা বারান্দায়।

ঘুম যে খারাপ হয়েছে তা বলবো না। কিন্তু মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমি হেরে গেলাম। বিশেষ করে যখন জানলাম, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের এভাবে ন্যুনতম একবছর বারান্দায় থাকতে হবে, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, না এভাবে হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম এত যুদ্ধ করে, এখানকার শিক্ষার্থী হয়েও এভাবে বরান্দায় কিভাবে থাকবো। ফলে পরদিন ভোরে উঠেই চলে গেলাম। যদিও ওই ভোরেই দেখলাম আমার মত এরকম আরও ২৫ জনের মত বারান্দায় ঘুমাচ্ছে।

ওই দিন চলে আসা মানে এসএম হলে সিটের স্বপ্নের দৌড়ে একধাপ পিছিয়ে গেলাম। তবুও মনে মনে হলে ওঠার পরিকল্পনা করছি। প্রথম কাজ আমাদের এলাকার বড়ভাই খুঁজে বের করা। দু’একজন পেলাম। তারা যা বললো সেটাও হতাশ করা কথা- ‘হলে রুম পেতে বারান্দায় থাকা ছাড়া গতি নেই’। এদিকে প্রথম বর্ষে যারা আছে তারা দেখলাম এখনও বারান্দায়। এভাবে একবছর পেরিয়ে গেলো কিছুই করতে পালাম না। দ্বিতীয় বর্ষে উঠলাম।

সামনে নির্বাচন, ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮, অনেক দিনের বন্ধে বাড়ি আছি। ঢাকায় ফিরলাম নির্বাচনের পরে। আওয়মীলীগ জিতলো। এর আগেই আমাদের এলাকার ছাত্রলীগের এক নেতার নাম্বার পেলাম, তারেক ভাই। ঢাকায় এসে শুনলাম ছাত্রদলের সবাই হল থেকে চলে গেছে, ছাত্রলীগ হল দখল করেছে। ফলে আমাদের বর্ষের সবাই তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রুমে সিট পেয়ে গেছে।

এবার তারেক ভাইকে ফোন দিলাম। ভাই দেখা করতে বললো। করলাম। ভাইয়ের সঙ্গে কয়েকদিন ঘুরলাম, কয়েকটা প্রোগ্রামেও যোগ দিলাম। কিন্তু, সিটের কিছু হচ্ছেনা। ভাই আশ্বাস দিচ্ছেন। জানলাম, ভাই একটা রুম নিয়েছেন। ১৫৯ নং রুম। রুম নিয়েছেন মানে। তার রুমে আগে যারা ছিলো তাদের মধ্যে তিনি এবং আরও দুইজন আছে। অন্যরা বের হয়ে গেছে সরকার পরিবর্তনে। এসএম হলে স্বাভাবিক রুমে চারটা খাট থাকে চারকোনায় প্রত্যেকটায় দু’জন করে মোট আটজন এক রুমে থাকে।

দেখলাম তারেক ভাই তার রুমে আরও দুইটা খাট ঢুকিয়েছে, সেখানে আমাদের বর্ষের ছয়জন উঠেছে। আমার উঠার জায়গা নাই। ভাই বললেন, অপেক্ষা কর আরেকটা রুম পাবো। সে আর হলো না। এভাবে কেটে গেছে পাঁচ মাস। জুনের দিকে বিশ্বকিদ্যালয় একমাস বন্ধ। ভাইয়ের রুমে আসলাম। ভাই বললো এখন থাকতে পারিস। ক’দিনের জন্য, যারা বাড়িতে আছে তাদের বেডে থাকলাম। একমাস ভালোই থাকলাম। কারণ সবাই আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয় খুললো। সবাই আসলো।

কোথায় ঘুমাবো? এমনিতেই এক বেডে দু’জন করে। ফলে এমন অনেক দিন গেছে, ছোট্ট বেডে আমরা তিনজন থেকেছি। কোনো দিন মশার কামড় খেয়ে আমি নিচে ঘুমিয়েছি। তবুও হল আর ছাড়া যাবেনা। কারন, পরে সিট পাওয়ার আর চান্স নাই, এসময়টা পার করতে রুমমেটদের সাহায্য ছিলো। আটজনের রুমে বারোজন আছি। খাট চারটার জায়গায় ছয়টা। এমন কষ্টের মধ্যে এক বড় ভাইকে, একটা সমস্যার কারণে তারেক ভাই রুম থেকে বের করে দিয়েছেন। এবার দুশ্চিন্তা কিছুটা কমলো। ছয়টা সিটে এগারোজন ঘুমাচ্ছি। তারেক ভাই একা এক বেড থাকতেন। ছয়মাস এখানে শেষ। অর্থাৎ আমার দ্বিতীয় বর্ষ শেষ। তৃতীয় বর্ষে। দেখলাম এভাবে হলে থেকেও বেশ শান্তি পাচ্ছি। আশ্চর্য হলাম, যারা বারান্দায় থাকে তাদের অবস্থা দেখে। তাদের সংখ্যাটা একশ তো হবেই। কিন্তু, অসন্তোষ নাই। বুঝলাম হলের বারান্দায় থাকা মানেই হলে থাকা। আর হলে থাকার মজাই আলাদা। কষ্ট করে থাকলেও লেখালেখি কিছুটা চালিয়ে যাচ্ছি। আচ্ছা লেখালেখির বিষয়ে আরেকদিন লিখবো।

তৃতীয় বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে রুমমেট এক বড় ভাই সিঙ্গেল রুমে সিট পেলেন, আর এর আগেই আমাদের বর্ষের একজন রুম ছেড়ে চলে গেছে তার টিউশনি, প্রাইভেটসহ অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে। এবার রুমের বেড একটা কমলো। পাঁচ বেডে আমরা নয়জন। তারেক ভাই একটাতে, আমরা আটজন চারটাতে। আরেকটু শান্তি হলো তবুও পুর্ণাঙ্গ রুম কিন্তু এখনও হয় নি।

সে স্বপ্ন পুরণ হলো ২৪ নভেম্বর ২০১১। ইতিমধ্যে অনার্স শেষ করে ফেলেছি। মাস্টার্সও শুরু হয়ে গেছে। তার আগের খবর হলো তারেক ভাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেয়েছেন, ভাইয়ের পুরো নাম- হাসানুজ্জামান তারেক। ১৩ নভেম্বর ছাত্রলীগের ২২০ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষনা হয়। এতদিন ভাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, এখন হলেন কেন্দ্রিয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ভাই পদ পেয়েই সিঙ্গেল রুমে ওঠার সিদ্ধান্ত নিলেন।

SM Hall, DUতারেক ভাই রুম ছাড়লেন ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা পোনে সাতটায়। রুমবাসি সবাই তাকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্য অনেক দিন থেকেই জল্পনা কল্পনা করছে। তার নামে হলের সামনে ব্যানার দেয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে, এছাড়া তাকে দাওয়াত দিয়ে খাইয়ে ক্রেস্ট দেয়ারও কথা রয়েছে। জানিন না সবাই যা করে আছি, যেকোনো কাজে পেছনের সারিতে আমার স্থান, টাকা লাগলে দিই, কিন্তু উদ্যোগের যথেষ্ট শৈথিল্যতা আছে।

যাহোক, তারেক ভাই- আপনার প্রতি আমি আজীবনের জন্য ভীষণ কৃতজ্ঞ, আপনি আমার এসএম হলে একটা রুমের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন। আপনি রুম ছেড়ে চলে গেছেন। আপনাকে আমি কখনোই ভুলবো না। আপনার প্রতি আমি অন্যায় করেছি, তেমন কোনো কাজ করে দিতে পারিনি। আমার স্বভাবজাত কারণে আপনার সঙ্গে ভালো করে কথাও বলিনি। আমি জানি আপনি আমাকে ভীষণ স্নেহ করেন।

আরও লিখতে কষ্ট হচ্ছে, আমার গলাটা ধরে আসছে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তারেক ভাই আপনি ভালো থাকবেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বিড়ম্বনার ৩০ মিনিট

ঘড়ি বলছে, ৩টা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি আছে। ব্যাংক বলে কথা; দেরি করে ফেললাম কি না ভেবে দ্রুত ঢুকলাম। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের একটি শাখা। ঢুকে বুঝলাম, দেরি করিনি। কারণ অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এ ছাড়া টাকা নগদ প্রদান-গ্রহণের তিনটি কাউন্টারের দুটিই খালি। স্বস্তি পেলাম কিছুটা। কিন্তু কাছে গিয়ে যা দেখলাম, তা না বলার মতো নয়। তার আগে ব্যাংকের ভেতরকার অবস্থা বর্ণনা করা যাক।
কর্মকর্তা আছেন ১৫ জনের মতো। কাচ দিয়ে ঘেরা দুটি কক্ষ। একটিতে কর্মকর্তা গোছের একজন। ঢুকলেই বাম পাশে তার কক্ষ। বিপরীতে আছে চারজনের চারটা টেবিলসহ চেয়ার। এর পরই কাচ দিয়ে ঘেরা টাকা নগদ প্রদান ও গ্রহণের কাউন্টার। এখানে সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে আদান-প্রদানে আছেন তিনজন। এ ছাড়া আরেকজন আছেন, যিনি চেক ভেরিফাই করেন। আর এ কাচঘেরা কক্ষের বাম পাশেই আরেক কর্মকর্তা বসে আছেন।
মূল বিষয়ে আসি। কাচ দিয়ে ঘেরা টাকা নগদ প্রদান ও গ্রহণের কাউন্টারে আমার কাজ। দেখলাম অন্য সব কর্মকর্তা নিজস্ব চেয়ারে আসীন, কিন্তু এখানে আছেন তিনজনের জায়গায় একজন, যেটা আগেই বলা হয়েছে। যাকে পেলাম তিনি মুরব্বিই বলতে হবে। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত। বয়স ৫০-এর কম হবে না। অবশ্য তার পেছনে চেক ভেরিফায়ার কিছুটা মুড নিয়ে আছেন, ভাবখানা এমন— আমি কিন্তু বস।
যাহোক, এক গ্রাহক কয়েক বান্ডিল টাকা নিয়ে এসেছেন। ৫০, ২০ ও ১০ টাকার বান্ডিল। বান্ডিলসংখ্যা শ’খানেক তো হবেই। মুরব্বি আর কী করবেন, বসে বসে টাকা গুনছেন। গুনছেন তো গুনছেনই, অন্যদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। এদিকে অন্য গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা আলোচনা চলছে, এ লোকটা কী করছেন পাঁচ-দশ মিনিট ধরে— একজনের টাকাই গুনে যাচ্ছেন? অন্য কারও প্রতি তার নজর নেই।
আমি ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে এ অবস্থা দেখছি আর হাসছি। কারণ এখানে একটাও মানি কাউন্টিং মেশিন নেই। তার হাতে যে টাকা, তা গুনতে আরও অন্তত ২০ মিনিট লাগার কথা। এ রকম অবস্থায় গ্রাহকদের অস্বস্তিটা একটু বেড়েছে। মুরব্বি মনে হয় এবার একটু তাকালেন। বললেন, ‘ভাই কী করব? আমি একা, আবার টাকা গোনার মেশিনও নেই।’ অবশ্য পেছনের ব্যক্তির খবর নেই। গভীর মনোযোগের সঙ্গে কম্পিউটারে কাজ করেই যাচ্ছেন।
কাচের বাইরে কাউন্টারে আমরা যারা অপেক্ষমাণ, তাদের সংখ্যা এতক্ষণে ২০ হয়ে গেছে। আমাদের সামনে এবং ওই কর্মকর্তাদের পেছনে একটা দেয়াল, যেখানে ব্যাংকের লোগোসহ লেখা আছে স্লোগান। সেটা পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মন্তব্য করছেন, ‘অগ্রগতি মানে পিছিয়ে যাওয়া’! ‘সবাই যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের তখন এই দুর্গতি’ তিনি যোগ করলেন। আরেকজন বলছেন, ‘অগ্রগতি তো বটেই, ওই যে দেখেন না নষ্ট মেশিনটা পড়ে আছে’ (আসলেই লেখাটার নিচে নষ্ট একটা টাকা গোনার মেশিন পড়ে ছিল)।
ততক্ষণে শোরগোলটা আরও স্পষ্ট হয়েছে। গ্রাহকরা বলছেন, ‘ওই মিয়া, আপনার টাকা গোনা রাখেন। আমাদের আগে বিদায় করেন। এতক্ষণে তো আমাদের কাজ হয়ে যেত।’ আওয়াজ আরও বেড়েছে। এবার মনে হয় ভদ্রলোকের টনক নড়েছে। যার টাকা গুনছেন, তাকে সবাই ম্যানেজ করলেন। এবার অন্যদের সেবা দেয়া শুরু করলেন তিনি।
এরই মধ্যে সময় ৩টা পেরিয়ে গেছে। মুরব্বির সঙ্গে দুটি খালি চেয়ারের একটা পূর্ণ হলো— এক
ভদ্রমহিলা বসলেন সেখানে। মাঝখানে একটি চেয়ার কিন্তু খালি। খালি কেন? উত্তরটা জানা গেল, ‘এই চেয়ারের উনি বদলি হয়েছেন’— একজন গ্রাহকই বললেন। এবার দুজন মিলেই সবার সেবা দেয়া শুরু করলেন। টাকা গোনার মেশিন নেই, হাতেই গুনে গুনে সেবা দিচ্ছেন। দেরি তো একটু হবেই। তবু মুরব্বির চাপটা যে কমল কিংবা তিনি যে ভরসা পেলেন, তা তার পরবর্তী কিছুটা দ্রুত কর্মকাণ্ডেই বোঝা গেল।
বেশি নয়, মাত্র ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে এবার আমার পালা। চেকটা পেয়েই মুরব্বি তার কাজ শেষ করে ভেরিফায়ারের কাছে দিলেন। চেক দেখে তার ভঙ্গিতে বুঝলাম, কিছুটা সমস্যা আছে। পাঁচ মিনিট ধরে দেখলাম চেকটা বিভিন্ন কর্মকর্তার হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত আমার হাতে এল। না, তারা কোনো সমাধান করতে রাজি হননি। কেন হননি, কী সমস্যা, সেটা এখন থাক। তবে ব্যাংক থেকে বের হতে পেরেছি, এটাই আমার জন্য আনন্দের।

বণিক বার্তা, 25.১১.১১

কোন পথে শিক্ষা নীতি

সন্দেহ নেই, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন বর্তমান সরকারের একটা বড় কৃতিত্ব। কিন্তু পদে পদে শিক্ষা নীতি বা শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যে ধীরগতি লক্ষ্যনীয়, তাতে এ শিক্ষানীতি চুড়ান্তভাবে কার্যকর হবে কি-না তা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে শিক্ষানীতির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জানুয়ারিতে এ সরকারের মেয়াদ হবে তিন বছর, আর এখন পর্যন্ত শিক্ষানীতিও আড়াই বছর পার করে এসেছে। আড়াই বছর পর শিক্ষানীতি এখনও প্রক্রিয়াধিন
এ বিষয়টা বুঝার জন্য কিছু তারিখের অতিরঞ্জিত ব্যবহার করতেই হচ্ছে। ২০০৯ এর ৬ জানুয়ারি বর্তমান সরকার ক্ষমতাগ্রহন করেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যে শিক্ষনীতির কথা বলা হয়েছে ; বলাচলে তাতেই প্রথম হাত দেয়। ওই বছরের ৪ এপ্রিল জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে আঠারো সদস্যের শিক্ষানীতি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি অত্যন্ত দ্রুত সময়ে, মাত্র চারমাসের মাথায় ২ সেপ্টেম্বর খসড়া রিপোর্ট পেশ করে। খসড়া রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে এবং তার ওপর মন্তব্য জানাতে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় সরকার।
দ্রুত খসড়া রিপোর্ট পেয়েই সরকারের শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন ২০০৯ এর ডিসেম্বরের মধ্যে তা চুড়ান্ত করে জানুয়ারি থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করবেন। যদিও সে আশায় গুড়েবালি। অবশ্য সে রিপোর্ট চুড়ান্ত হয়েছিলো তারও একবছর পর ২০১০ এর ৭ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার মাধ্যমে। মাঝখানে এটি মন্ত্রী-পরিষদের বৈঠকে ওঠে ৩১ মে ২০১০, এছাড়া ২৭ জুন গঠন করা হয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নসংক্রান্ত ৩২ জনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় কমিটি।
তবে শিক্ষানীতি চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য এ বছরের (২০১১) ২৬ জানুয়ারি ২৪ টি উপকমিটি গঠন করা হয়। যেমন শিক্ষা আইন প্রনয়ণ কমিটি, পাঠ্যপুস্তক আধুনিকীকরণ কমিটি, শিক্ষা কমিশন কমিটি, পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বর্ধিতকরণ কমিটি ইত্যাদি। এসব কমিটিকে দুই-তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলেও এখন নভেম্বর; অর্থাৎ আট মাস পরও কোনো কমিটি তাদের প্রতিবেদন পেশ করতে পারে নি।
এ বিষয়ে গত সেপ্টেম্বরে যুগান্তরসহ প্রায় প্রত্যেকটি দৈনিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনগুলো দেরির কারণ হিসেবে একটি বিষয়কেই দেখিয়েছে ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে উপ-কমিটিগুলোর প্রায় প্রত্যেকটির মূল দায়িত্বে আছে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের আমলারা। যারা নিজেদের দাফতরিক কাজ, জনপ্রতিনিধিদের ডিও লেটার নিষ্পত্তিসহ নানা কাজ সামাল দিতেই ব্যস্ত।
শিক্ষানীতির অগ্রগতি সংক্রান্ত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের পরই শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে শিক্ষানীতি জাতীয় কমিটির এক বৈঠক হয় ২৯ সেপ্টেম্বর। বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী কোনো অজুহাত না দেখিয়ে সকল কমিটিকে ২০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেন। অবশ্য শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া সে ২০ দিনও ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে বলে আমরা জানি না। এটা ঠিক যে কাজ ২০০ দিনেও হয়নি সেটা ২০ দিনে কিভাবে হবে।
এ হলো শিক্ষানীতি ২০১০ এর সর্বশেষ চিত্র। যেটি হতাশা ছাড়া কোনো আশার আলো দেখাচ্ছে না। যদিও বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষানীতির কিছু বাস্তবায়নের কথা সরকার বলছে, যেমন- পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী, অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি ইত্যাদি। এছাড়া নতুন কারিকুলামের কাজ শুরু হয়েছে বলেও গনমাধ্যম বলছে, আবার বিনামূল্যে বই বিতরণকেও এরই সাফল্য হিসেবে দেখাতে চায় সরকার।
বর্তমান শিক্ষানীতির বড় বৈশিষ্ট্য আকারে সবাই দেখছে প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণী হতে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করাকে। ২০১২ সাল থেকেই তা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা হয়তো হচ্ছে না। এখানে প্রথমত: সংশ্লিষ্ট কমিটির ব্যর্থতা। কমিটি যদি এবছরের আরও আগের দিকে বর্ধিত করণ সংক্রান্ত সুপারিশ পেশ করতে পারতো; হয়তো সরকারের পক্ষে তার বাস্তবায়ন সহজ হতো, বা সরকার ২০১২ হতে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারতো। আসল কথা হলো সংবাদ মাধ্যম বলছে, বিষয়টা নিয়ে কমিটি নিজেরাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। অস্বীকার করার জো নেই বাংলাদেশের জন্য হুট করেই প্রাথমিককে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বাড়ানো কষ্টকরই বটে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সম্প্রতি সর্বকালের সেরা বাজেট ২২ হাজার কোটি টাকার পিইডিপি-৩ শুরু হওয়ার কথা। সেখানে খাত হিসেবে কিন্তু শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কথা আসেনি। যদিও বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষার যে অবস্থা তাতেই অনেক নতুন বিদ্যালয় প্রয়োজন, প্রয়োজন নতুন শিক্ষক নিয়োগ এছাড়া বিদ্যালয় অবকাঠামোসহ সার্বিক উন্নয়ন ভালোভাবে করতে এ বাজেট প্রয়োজন। এর বাইরে নতুন করে শিক্ষাস্তর বর্ধিতকরণের খরচতো লাগবেই। অবশ্য সরকার চাইলে উভয়কে একীভূত করে একই সঙ্গে উন্নয়ন এবং বর্ধিতকরণের কাজে হাত দিতে পারে।
তবে শিক্ষানীতি অগ্রগতির প্রতিবন্ধকতার অন্যতম কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সূত্র যে অর্থনৈতিক কারণকে দেখিয়েছে এটা দুঃখজনক। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ না থাকলে এর কাজ এগুবে না এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য বিষয়টা আমরা এবারের ২০১১-২০১২ জাতীয় বাজেটেই দেখেছি। সেখানে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ ছিলো বলাচলে আগেকার বছরগুলোর তুলনায় আরও কম- শিক্ষাও প্রযুক্তি উভয় খাত মিলে বরাদ্দ দেয়া হয় মোট বাজেটের ১২.৪ ভাগ মাত্র। যেখানে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য কোনো বাজেট ছিলো না।
শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কমিটিগুলোতে আমলা নির্ভরতা কমিয়ে যারা যথার্থ শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করে তাদেরকে অন্তর্ভূক্তকরণটা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা নিয়ে যারা পড়াশোনা করে, গবেষণা করছে তারাও এখানে কাজ করতে পারে। তবে কমিটিগুলোর ওপরই এখন নির্ভর করছে শিক্ষানীতির পরবর্তী বাস্তবায়ন কাজ। এক্ষেত্রে মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়টা নিশ্চয় দেখছেন। তবে ২০ দিন বা এরকম তাড়াহুড়া করে কোনো সময় বেঁধে না দিয়ে প্রকৃত কাজ যাতে হয় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকার শুরু থেকেই যে প্রণোদনা নিয়ে কাজটা শুরু করেছে, তাড়াহুড়ো করে করা শিক্ষানীতির শেষটা দেখতেই এখন সবাই আগ্রহী। এটা নানা কারণে, এখনও এ শিক্ষানীতি যে স্তরে আছে তা আগের শিক্ষানীতিগুলোর মতই। এর আগে ২০০৪ এর মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশনও বলা চলে কমিটি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। অবশ্য এবারেরটা আরেকটু এগিয়ে আছে। কারণ এটা জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। সরকারও শুরু থেকেই এটা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এজন্যই অতীতের ‘খসড়া রোগে আক্রান্ত’ শিক্ষানীতিগুলো থেকে এবারের নীতিকে সবাই ভিন্ন চোখে দেখে আসছে।
বলার অপেক্ষা রাখেনা, শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য যে প্রস্তুতি, প্রক্রিয়া দরকার তা সময় সাপেক্ষ বটে। এর জন্য গবেষণারও প্রয়োজন আছে। শিক্ষানীতির সুপারিশক্রমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন যে দুটি পাবলিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে, তার যথার্থতা বা কার্যকারিতার জন্য গবেষণা হয়েছে বলে জানিনা। এমনকি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বর্ধিতকরণের জন্য কোনো স্টাডি হয়েছে বলেও কিছু পাওয় যায়নি। তবুও এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হোক, এটি বাস্তবায়নে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিক। পরে ধাপে ধাপে এর মানানসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।

যুগান্তর ২১.১১.১১

এসএসসির বর্ধিত ফি: ওদের খবর কেউ রাখে না

পাবলিক পরীক্ষা, বিশেষ করে এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে গণমাধ্যমে আমরা কিছু অদম্য মেধাবীর কথা শুনি। যারা সংগ্রাম করে নানা প্রতিকূল অবস্থার ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ ফল করে থাকে। এই প্রতিকূলতা আর সংগ্রাম প্রধানত অর্থনৈতিক। কারণ আমাদের সমাজে পড়াশোনার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কটা খুব নিবিড়ভাবে জড়িত। আমরা দেখছি, প্রথম শ্রেণীতে যত শিক্ষার্থী ভর্তি হয় তাদের শতকরা সত্তর জনই এসএসসি পর্যন্ত ঝরে যায়, এ ঝরে পড়ার প্রধান কারণও অর্থনৈতিক। দরিদ্র পরিবার, যাদের প্রতিদিনের খাবারের বন্দোবস্ত করাই দায়, তাদের সন্তানদের পড়াশোনা তো দূরের বিষয়।
শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ বাবদ একটা ভালো অঙ্কের টাকা শিক্ষা বোর্ডকে দিতে হয়। বোর্ড বিভাগ অনুযায়ী শিক্ষার্থীপ্রতি ১০০০-১২০০ টাকা নির্ধারণ করে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য এটা একটা বোঝা। এর আগে সে প্রতি বছর যে পরীক্ষা দিয়ে আসছে কোথাও এ পরিমাণ টাকা বা এর অর্ধেক টাকাও তাকে দিতে হতো না। এখন সে এই টাকা দিতে বাধ্য, কারণ এটা পাবলিক পরীক্ষা। তার জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে সে যে করেই হোক টাকা জোগাড় করে ফরম পূরণ করে। কিন্তু সমস্যাটা অন্যখানে। শিক্ষা বোর্ড যে পরিমাণ টাকা নির্ধারণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এর দ্বিগুণ-তিনগুণ এমনকি ছয়গুণ টাকাও দাবি করে।
এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ ১৬ নভেম্বর শেষ হলো। এ সময়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংবাদপত্র ফরম পূরণে বিদ্যালয়গুলোর বর্ধিত ফি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কেউ বলছে, ‘এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ ফি আদায়ে নৈরাজ্য’, কারও ভাষায় ‘এসএসসির ফরম পূরণে গলাকাটা ফি আদায়’। মজার বিষয় হলো বর্ধিত ফির এ নৈরাজ্য শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের সর্বত্র। সমকালের ১৭ নভেম্বরের খবর_ ‘এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ : ঠাকুরগাঁওয়ে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ’ আর ১৬ তারিখের খবর হলো_ ‘রাজশাহীর স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়’। সারাদেশে বোর্ড নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি ১২শ’ টাকার বেশি নয়। এ টাকাই রাজধানীতে হয়েছে ১৩ হাজার পর্যন্ত, আর গ্রামে সেটা দুই থেকে চার হাজার।
এটা শুধু এবারের চিত্র নয়, প্রতি বছরই এমনটা দেখা যায়। অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ন্যায্যতা হিসেবে বেতন, সেশন ফি, কোচিং ও মডেল টেস্টসহ আরও অনেক খাত দেখানো হয়। ফেব্রুয়ারিতে এ পরীক্ষা হচ্ছে, ফলে সারাবছরের সেশন চার্জের নামে তিন-চার হাজার টাকা নেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? আবার কোচিং ও মডেল টেস্টের নাম করে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হবে কেন? এমনকি যারা বিদ্যালয়ে কোচিং করবে না তারাও ফি দিতে বাধ্য। মার্চ পর্যন্ত বেতনও বা কেন নেবে, শিক্ষার্থীরা তো নভেম্বর থেকেই বিদ্যালয়ের বাইরে। এ ছাড়া এ সময় বিদ্যালয় যে সেবা তাদের দেবে তার টাকা কোচিংয়ের নাম দিয়েই নেওয়া হচ্ছে। বলা যায়, শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে বিদ্যালয়গুলো টাকা আদায় করছে।
নির্বাচনী পরীক্ষায় যারা অকৃতকার্য হয় তাদের সঙ্গে বিদ্যালয়গুলোর আচরণ দেখার মতো। নির্বাচনী পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থী দু’একটা বিষয়ে অকৃতকার্য হতেই পারে। তাই বলে তাকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবে না, এ সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও মূল পরীক্ষায় এ-প্লাস পেয়েছে। এটা আবার বিদ্যালয়গুলোর টাকা আদায়ের আরেক খাত। রাজধানী তো বটেই, সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর_ গ্রামেও অকৃতকার্যদের বিষয়প্রতি দেড় থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। এমনকি এর বাইরে অকৃতকার্য বিষয়ে সিকিউরিটি মানি নামে অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা নিয়েছে কোনো কোনো বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তারা শেষ সুযোগ হিসেবে যত পারছে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে নিচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শিক্ষকরাও সোৎসাহে টাকা আদায়ে চাপ দিচ্ছেন। এর মানে এই টাকার একটা অংশ তাদের পকেটেও যাবে। আর কর্তৃপক্ষও টাকা আদায়ে মরিয়া। কোনো কোনো জায়গায় তো তারা অভিভাবকদের হুমকি দিয়ে বলছে, যারা বিদ্যালয় নির্ধারিত ফির এক টাকাও কম দেবে তাদের সন্তানদের ফরম পূরণ করা হবে না। এসব খেলা আমরা যেমন দর্শক সারিতে বসে দেখছি, তেমনি দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বছরের পর বছর ধরে বিদ্যালয়গুলোর এসব স্বেচ্ছাচারিতা চলছে, অথচ কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের দায়িত্ব থাকলেও তারা এ পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানি না।
একজন অভিভাবক কত কষ্ট করে টাকা দেয়, তা বলাই বাহুল্য; যাদের ভূরি ভূরি টাকা আছে তারা ছাড়া। নিজেদের অভিজ্ঞতায়ই আমরা দেখেছি, নিজেরা না খেয়ে, না পরে, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে এনে, বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ধার করে; এমনকি নিজেদের জায়গা-জমি বিক্রি করে হলেও অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালান, তার ফরম পূরণের টাকা জোগাড় করেন। টাকার পরিমাণটা অভিভাবকদের সাধ্যের মধ্যে থাকলে এর জন্য তাকে অতিরিক্ত কষ্ট করতে হয় না। এর জন্য যেমন শিক্ষা বোর্ড তার ফি কমাতে পারে, পাশাপাশি এর বাইরে কোনো ফি বিদ্যালয় যাতে না নেয় তার নিশ্চয়তাও দরকার।
আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থী নিজে কীভাবে তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করে, তা বোঝার জন্য অদম্য মেধাবীদের দিকে তাকানো যায়। যাদের কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিক গত বছর জিপিএ-৫ পাওয়া জয়পুরহাটের নাসিরের কথা বলেছে, যার পরিবার দরিদ্র, পড়াশোনা চালানোর জন্য রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ নেয়। পড়ার জন্য তার একটি টেবিল নেই, রাতে পড়ার হারিকেন নেই, কুপি জ্বালিয়ে সে পড়েছে। ফরম পূরণের অর্ধেক টাকা সংগ্রহ করেছে স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে। এ রকম নাসিরের আমাদের সমাজে অভাব নেই।
আমরা সেসব নাসিরের কথাই জানি, যারা যুদ্ধ জয় করে এসেছে; কিন্তু এ রকম অসংখ্য নাসির আছে যারা এই সমাজের কাছে পরাজয় বরণ করেছে। যাদের ফরম পূরণের টাকা নেই। অভিভাবকদের কাছ থেকে চেয়ে পায়নি। অবশেষে বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়েছে। এরা হয়তো একটু সহযোগিতা পেলে জ্বলে উঠত। তাদের কথা গণমাধ্যমে আসে না। কারণ সবাই বিজয়ীর কথাই বলে। বিদ্যালয়গুলো কিংবা কর্তৃপক্ষ কি এদের দিকে একটু তাকাবে না?

সমকাল উপসম্পাদকীয় ২০ নভেম্বর ২০১১

জলবায়ু তহবিল: প্রয়োজন গবেষণা ও স্বচ্ছতা

হাল দুনিয়ায় ব্যাপক প্রচলিত একটি বিষয় ‘জলবায়ু পরিবর্তন’। উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্ব তথা সবার কাছে পরিভাষাটি বেশ পরিচিত। আমরা তো এটি অহরহই শুনছি। শুধু শুনছিই না, প্রত্যক্ষও করছি। এর প্রভাবে ২০০৭ সালে সিডর দেখেছি, ২০০৮-এ দেখেছি নার্গিস, আইলা দেখলাম ২০০৯-এ। আমরা যখন এগুলোর শিকার হচ্ছি অন্যরা গবেষণা করছে— আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ ২০১০-এ প্রকাশিত তাদের ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেস্কে বাংলাদেশকে এক নম্বর ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে দেখিয়েছে।
এ রকম হাজারো গবেষণা হয়েছে। সব গবেষণায়ই ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চ্যাম্পিয়নশিপটি বাংলাদেশের। এসব গবেষণায় কেবল ক্ষতিগ্রস্তদেরই চিহ্নিত করা হয়নি, বরং দায়ীদেরও শনাক্ত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। সহজ ভাষায় বললে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন। বিশ্বব্যাংক ক্লাইমেট ডাটাবেজ-২০০৪ থেকে জানা যায়, ২০০২ সালে একজন আমেরিকান গড়ে ২০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় এর পরিমাণ ১৬ টন, যুক্তরাজ্যে ৯ টন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮ টন আর একজন বাংলাদেশী নিঃসরণ করেন শূন্য দশমিক ৩ টন। শিল্পায়নও এর জন্য দায়ী। চীন এবং ভারতেরও এখানে দায় রয়েছে। অবশ্য এর অন্য কারণও রয়েছে।
উন্নত বিশ্বের এ দায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বলে তারা তা মেটাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে তহবিল দিয়ে থাকে। এ লেখার মূল বিষয় হলো জলবায়ু তহবিল। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উন্নত বিশ্বকে তাদের আর্থিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তার দাবির ন্যায্যতার জন্য ঠিক এ কথাটিই বলেছেন— বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে ক্ষতিকর দেশগুলোর একটি।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসি) চার নম্বর ধারা অনুযায়ী উন্নত বিশ্ব তহবিল দিতে বাধ্য। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে তারা এ তহবিল দিয়ে আসছে। বাংলাদেশও যে ওই তহবিল পায়নি, তা নয়। বাংলাদেশ সে তহবিল ও নিজস্ব ফান্ড মিলে গঠন করেছে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড। এ ফান্ড দিয়ে কাজও শুরু হওয়ার কথা। গত ২৩ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— এ ফান্ড থেকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠন (এনজিও) ও সরকারি সংস্থাগুলোকে দেয়া হচ্ছে।
জলবায়ু তহবিল আমাদের প্রয়োজন কেন? এর উত্তর— অভিযোজনের জন্য। অভিযোজন হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়ে গেছে তার ক্ষতিপূরণ। যেমন— উপকূলীয় যেসব এলাকায় বাঁধ ভেঙে গেছে তা নির্মাণ, যারা উদ্বাস্তু হয়েছে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি হতে বাঁচার উপায় বের করা, পানি সহনীয় ধান বা ফসল উদ্ভাবন, গ্রিন টেকনোলজি উদ্ভাবন। পরিবেশ বিপর্যয়ে খাপ খাওয়ানোর মতো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনও রয়েছে এর মধ্যে। এর জন্য গবেষণায়ও তহবিল দরকার, অবশ্য গবেষণায় আমরা বরাবরই কম জোর দিয়ে থাকি। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতিসহ এ রকম নানা অভিযোজনের কাজে জলবায়ু তহবিল আবশ্যক।
প্রতি বছর ইউএনএফসিসির সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ডিসেম্বরে। ১৯৯৫ সাল থেকে চালু হওয়া কোপ (কনফারেন্স অব কান্ট্রিজ)-১৭ সম্মেলন হচ্ছে আগামী মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। একে কেন্দ্র করে ১৩ ও ১৪ নভেম্বর ঢাকায় হচ্ছে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভা। এ নিয়ে ১ নভেম্বর পররাষ্ট্র এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন করে। যেখানে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় জলবায়ু তহবিল পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার’। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশা করছেন এ সভায় অন্তত ১০টি দেশের মন্ত্রীরা অংশগ্রহণ করবে এবং এর মাধ্যমে ক্লাইমেট গ্রিন ফান্ড কার্যকর করতে ভুক্তভোগী দেশগুলোকে নিয়ে একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড বিষয়ে আসা যাক। ২০১০ সালে গঠিত হয় এ ফান্ড। শুরু থেকেই এ ফান্ড নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এ লেখার শুরুর দিকে একটি জাতীয় দৈনিকের কথা বলা হয়েছে, যার শিরোনাম ছিল— জলবায়ু তহবিল নয়-ছয়! এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু তহবিল থেকে ৫৩টি এনজিও ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচ্ছে, যেগুলোর বেশির ভাগই অদক্ষ এবং ১১টির কর্ণধার ক্ষমতাসীন দলের লোক। আর এর বাইরে ৪৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে সরকারি সংস্থার জন্য। এখানেও রয়েছে এলাকাপ্রীতির অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়েও এ ফান্ডের বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর টিআইবি এর স্বচ্ছতা খতিয়ে দেখতে ‘ফলো দ্য মানি’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
অভিযোগের অন্ত নেই। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতু প্রকল্প বন্ধ রয়েছে, বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় করতে চাইছে না। তদন্ত চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তহবিল যেখানে আমরা দাতা গোষ্ঠীকে রাজি করিয়ে আদায় করছি, সেখানে বাস্তবায়নের এ অসঙ্গতি দুঃখজনক। বলা চলে, বাংলাদেশ তেমন একটা তহবিল পায়নি। এখনো ১১ কোটি ২ লাখ ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ( ডেনমার্ক ১৬ লাখ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১ কোটি ৪ লাখ, সুইডেন ১ কোটি ১৫ লাখ ও যুক্তরাজ্য ৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার দেবে)। এ দেশগুলো প্রতিশ্রুত তহবিল দেয়ার আগেই যদি এখানে নয়-ছয় দেখে, তারা তা দিতে আগ্রহী হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের এখনো অনেক তহবিল প্রয়োজন। সিডর ও আইলার কয়েক বছর পার হলেও সে ক্ষত রয়েই গেছে, সেখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যাও তীব্র। এসব বিষয়ে অভিযুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দেন-দরবারের প্রয়োজন রয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশের যথেষ্ট প্রস্তুতি ও গবেষণার প্রয়োজন। যুক্তি ও বাস্তবতা ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারলে তহবিল পাওয়াটা খুব কষ্টের হবে না বলেই মনে হয়। তবে তার আগে প্রয়োজন স্বচ্ছতার।

বণিক বার্তা, উপসম্পাদকীয় ১১.১১.১১