Tag Archives: স্বাধীনতা

কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ

যদি কর্তৃত্ববাদের আচরণ একই হয়, সেখানে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে অভিন্ন কারণও স্পষ্ট।

লেখক: অমর্ত্য সেন

দার্শনিক এমানুয়েল কান্ট যেমনটা বলেছেন, ‘যে কোনো বিষয়ে কারও মত প্রকাশ্যে তুলে ধরার স্বাধীনতার’ মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, কান্ট এটাও বলেছেন, সমাজই তর্কের সুযোগ প্রায়শ বন্ধ করে দেয়। কখনও কঠোরভাবেই বন্ধ করে। আজকের বিশ্বের একটি দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রবণতা লক্ষণীয়। অপ্রিয় হলেও সত্য, এ তালিকায় আমার দেশ ভারতকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভারতও সেই দুর্ভাগ্যজনক দেশগুলোর অন্যতম।

ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর কয়েক দশক ধরে ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। মানুষ তাদের স্বাধীনতার প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় দেয়। তারা কঠোর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করে সেই স্বাধীনতার প্রতি তাদের সংকল্পও প্রদর্শন করে। উদাহরণস্বরূপ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনের কথা বলা যায়। যে নির্বাচনে স্বৈরাচারী আইন যাকে ‘জরুরি অবস্থা’ বলে ঘোষণা করা হয়, তাকে মানুষ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সরকার দ্রুতই তা মেনে নেয়।

যা হোক, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাধীনতা দৃশ্যত অনেকের ক্ষেত্রেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তারই আলোকে বর্তমান সরকার সেখানে ভিন্ন ধরনের সমাজ গড়তে আগ্রাসী নজির হাজির করছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, যাকে বিস্ময়করভাবে গ্রেপ্তারের প্রয়োজনীয় উপাত্ত হাজির করে ও বিরোধী নেতাদের বন্দি করে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করছে সরকার। এ প্রক্রিয়ার ভেতরে স্বৈরাচারী মনোভাবের বাইরেও চিন্তার গভীর সংশয় রয়েছে। কারণ সরকারের সঙ্গে দ্বিমত মানে রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা কাউকে উৎখাত নয় Continue reading

একাত্তরের যুদ্ধশিশু

যুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম ছিল নারী নির্যাতন। এর ফলে জন্ম নেয় যুদ্ধশিশু। আমাদের মহান বিজয় দিবসে শহীদদের সঙ্গে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদেরও স্মরণ করি। কারণ যুদ্ধশিশু নিজেরাই মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধশিশুদের নিয়ে আলোচনা কমই দেখা যায়। এমনকি যারা এ নিয়ে গবেষণা করেছেন, তারাও যুদ্ধশিশুর সংখ্যা, অবস্থান ইত্যাদি নিয়ে সরকারি তথ্য-উপাত্ত যথেষ্ট পাননি। ফলে তাদের স্বীকৃতির ব্যাপারটিও জোরালোভাবে সামনে আসেনি। উল্টো যেটা ঘটেছে, অনেক সময় যুদ্ধশিশুরা বিদেশ থেকে আমাদের দেশে ঘুরে যায়; যেন তারা ‘অপরিচিত’।

১৩ ডিসেম্বর সমকালে ‘যুদ্ধশিশুদের কে দেবে স্বীকৃতি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর আগের দিন জাতীয় জাদুঘরে এ-সংক্রান্ত আলোচনা সভায় বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। সভায় আলোচকরা যথার্থই বলেছেন, যুদ্ধশিশু বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। সুতরাং তাদের স্বীকৃতি দেওয়াসহ তারা কে কোথায় রয়েছেন, তা জানা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের পর অনেক যুদ্ধশিশুকেই দেশের বাইরে দত্তক দেওয়া হয়। যুদ্ধশিশু ঠিক কতজন ছিল, তা নিয়ে সঠিক তথ্য নেই। তবে উইকিপিডিয়ায় এ সংখ্যা ১০ হাজারের কথা এসেছে। বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম এগিয়ে আসে কানাডা। মাদার তেরেসা ও তার মিশনারিজ অব চ্যারিটির সহকর্মীদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুটি কানাডীয় সংগঠন দত্তক গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এভাবে বিভিন্ন দেশে তারা আশ্রয় গ্রহণ করে।

বলাবাহুল্য, একাত্তর সালের যুদ্ধশিশু এখন কিন্তু শিশু নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বয়সও ৪৭ বছর। তাদের অনেকেই বিভিন্ন দেশে নানাভাবে হয়তো প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন দেশে থাকলেও তাদের মূল কিন্তু বাংলাদেশেই। তাদের অনেকেই নিশ্চয় নিজের ‘মা’কে চেনে না। দেশে এলে জননী বা বসতভিটার দেখা পাওয়ারও কথা নয়। সেটা তাদের জন্য বেদনার বিষয়ই বটে। Continue reading

প্রাণের পতাকা

Patakaদেশের প্রতি মানুষের অনুরাগ যেমন সহজাত, তেমনি পতাকার প্রতিও। লাল-সবুজ খচিত আমাদের পতাকা তো দেশকেই প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্বব্যাপী যেখানেই বাংলাদেশি থাকুক তার কাছে এই পতাকার একটা অর্থ আছে। দেশকে বোঝানোর ১০ :৬ কিংবা ৫ :৩ ফুটের পতাকাই যথেষ্ট। সবুজের বাংলাদেশ আর রক্তে রঞ্জিত শহীদের যে চিহ্ন পতাকায় রয়েছে তার যে অর্থ সবাই বোঝেন। তাই বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলেই আমরা চারদিকে দেখি পতাকা। রাস্তায় পতাকা নিয়ে বেড়াচ্ছে হকার; ছেলেমেয়েদের হাতে শোভা পাচ্ছে; যানবাহনেও অনেকে লাগাচ্ছেন পতাকা; অনেকে আবার হাতে বা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পতাকার স্কেচ আঁকেন, দেখিয়ে বেড়ান। এর মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি খোঁজে মানুষ। পতাকা বিক্রেতার অনেক সময় কম বেচাবিক্রি হলেও অভিযোগ থাকে না। সাংবাদিকদের বলেন, ‘আয় কম, তবুও পতাকা বিক্রি করে শান্তি পাই।’ Continue reading

ট্রেনযাত্রায় প্রকৃতির কাছে

Riverএবারের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখে কর্মব্যস্ত নগরজীবনের বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে কাটানোর অসাধারণ অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে রাখতেই এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। যদিও একদিনের তারপরও এটি সার্বজনীন ছুটি। মানে ১৬ ডিসেম্বর কিংবা ২৬ মার্চের মত দিনে সংবাদপত্র খোলা থাকলেও এদিন বন্ধ। পহেলা বৈশাখের ৪/৫ দিন আগ থেকেই চিন্তা করছিলাম, একদিনের জন্য বাইরে কোথায় যাওয়া যায়। ঢাকার আশেপাশে কয়েকটা জায়গার কথা মাথায় আসলো- নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁও, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও মাওয়া ঘাট তার অন্যতম। এই চিন্তার সঙ্গে মনে মনে বুয়েটের বন্ধু জাহের ওয়াসিম ভাইকে যোগ করে নিলাম। ওয়াসিম ভাই আমার একটু-আধটু ঘুরাঘুরির অধিকাংশ সময়ের সঙ্গী হিসেবে। কিন্তু চারদিন আগে যখন তিনি গ্রামের বাড়ি গেলেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে বাদ দিতে হল। তবে ঘুরাঘুরি আসলে একাকী হয় না সেভাবে। পরে লেখক বড়ভাই বন্ধু সোহেল নওরোজকে বললাম ঢাকার বাইরে যাইতে মন চায়। উনি খুলনা থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই বললেন, খুলনা চলে আসো। বললাম, ইচ্ছা থাকলেও একদিনের ছুটি বলে খুলনা যাওয়া যাচ্ছে না। Continue reading

‘বিস্মৃত শহীদ’ স্মৃতি

esamakal১৯৭১ শুনলেই আমরা চলে যাই ৪৩ বছর আগে। মানসপটে ভেসে ওঠে মহান মুক্তিযুদ্ধের চিত্র। যে চিত্র গৌরবের, আত্মত্যাগের। জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার সে চিত্র আমাদের অশ্রুসিক্ত করে। ‘১৯৭১ : বিস্মৃত সেই সব শহীদ’ বইতে ইজাজ আহমেদ মিলন সে চিত্রই দেখিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের রক্ত-মাংসের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে, ১৯৭১-এর পর জন্ম হলেও যেন আমরা সেই যুদ্ধের অগ্রসেনানি ছিলাম, যেন সেদিনের বিজয় আমাদের চোখেও ভাসছে। মুক্তিযুদ্ধকে এভাবে দেখানোর কৃতিত্ব অনেকের। ইজাজ আহমেদ মিলন সে কাতারের একজন। তিনি নিজেও বইটিতে লিখেছেন_ ‘আমি বিজয় দেখিনি’। তারপরও তিনি বিস্মৃত শহীদদের নিয়ে লিখেছেন। সমকালের শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীপুরের ২৫ শহীদকে খুঁজে বের করে তিনি সাংবাদিকতাকেই মহিমান্বিত করেননি একই সঙ্গে বিস্মৃতদের সবার সামনে এনে অসাধারণ কাজও করেছেন। Continue reading

ছুটি

sleepছুটি নিয়ে লেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। অনেক দিন বলতে এক বছর তো হবেই। বিশেষ করে যত দিন ধরে ফুল টাইম সাংবাদিকতা করছি। সাংবাদিকতা আসলে একটা আলাদা জগৎ। নানাদিক থেকেই পেশাটি ব্যতিক্রম। ছুটি তার অন্যতম। ঈদ বা এ রকম জাতীয় উৎসবে যখন সবাই আনন্দ করেন অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা তখন সেটা কাভারেজ দিতে দৌড়ান। ১৬ ডিসেম্বর যখন সবাই উদযাপন করছে সাংবাদিকরা তখন ব্যস্ত তার পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে। এ ক্ষেত্রে বড় পার্থক্যটা সপ্তাহের ছুটি নিয়ে। সরকারি কর্মচারীরা সপ্তাহে দুইদিন ছুটি ভোগ করেন। অন্য অনেক পেশায়ও দুইদিন ছুটি। অনেকের অবশ্য একদিন ছুটিও রয়েছে। তবে সাপ্তাহিক এ ছুটির ক্ষেত্রে সবারই একটা কমন থাকে। শুক্রবার। ব্যতিক্রম সাংবাদিকতা। এখানে শুক্র-শনি নাই। সংবাদপত্র প্রতিদিন বের হয়। অনলাইনে অনুক্ষণ সংবাদ আপডেট হয়। টিভি চ্যানেলও চলে প্রতিক্ষণ। এগুলো বন্ধ হয় না। তাই এখানে ছুটিও নাই।  Continue reading

রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে মাওলানা আজাদ

Abul Kalam Azadএস. ইরফান হাবিব

১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দুনিয়া থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নেন ভারতবর্ষের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম এর লেখক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। এটি কেবল অসাধারণ মানবিকতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্বের মৃত্যুই ছিল না। বরং এর মাধ্যমে একটি স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটে। অবিভক্ত ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে, এ ধরনের একটি স্বপ্ন কয়েক দশক ধরেই দেদীপ্যমান ছিল। শত শত বছর আগে মুসলমানরা ভারতে তাদের আবাসস্থল গড়েছিল এবং এ  দেশকে তাদের নিজেদের দেশ মনে করত। মাওলানা আজাদের মতে, ভারতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। যদিও ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে মাওলানা আজাদের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। এরপরও আজাদ আরও দশ বছর বেঁচে ছিলেন। সে সময় তিনি নতুন ভারতের ক্ষত নিরাময় এবং দেশটিকে নতুনভাবে সাজানোর জন্য চেষ্টা করেছিলেন।
মাওলানা আজাদের এক জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল। তার কিছু কিছু সবাই জানে আর কিছু স্বপ্ন এখনও রহস্যজনকভাবে অজানা। এসবের কমই বলা চলে জানা গেছে কিংবা লিখিত হয়ে মানুষের সামনে এসেছে। Continue reading