Tag Archives: সমাজ

অন্যের চরকায় তেল দেওয়ার বাতিক

‘পাছে লোকে কিছু বলে’- এটাই বাস্তবতা। তবে তাদের জন্য যথার্থ উত্তর ‘নিজের চরকায় তেল দাও।’

অন্যের বিষয়ে নাক গলাতে আমরা অনেকেই সিদ্ধহস্ত। একনজর দেখেই মন্তব্য করার মতো বিশেষজ্ঞ সমাজে কম নেই। সহপাঠীকে ভালোভাবে ডাকার মতো বন্ধুর সংখ্যা যেন বিরল। অনেক শিক্ষকও শিক্ষার্থীকে সম্বোধন করে যে ‘বডি শেমিং’ করে ফেলছেন, সে হুঁশও নেই। খোশগল্পে সুযোগ পেলেই অনেক সময় কাউকে আকাশে উঠাচ্ছি, আবার কাউকে জমিনে আছড়ে ফেলছি। পরচর্চায় বাঙালির মুনশিয়ানা বলে কথা।

কারও থেকেই যেন নিস্তার নেই। কোনোভাবেই যেন রেহাই নেই। শারীরিকভাবে লম্বা হলে তো কথাই নেই। খাটো হলেও কথা শুনতে হবে। মোটা হলেও উপদেশের বান আপনার দিকে ধেয়ে আসবে। চিকন হলেও সমস্যা। কালো হওয়ার বিপদ ভুক্তভোগীরাই জানেন। আর সুন্দরী হলেও মাপ নেই। আমরা চিন্তাও করতে পারি না, অপরের দিকে মুখ নিঃসৃত যে শব্দ বেরিয়ে যাচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১৬ বছরের কিশোর আজওয়াদ আহনাফ করিমের মৃত্যুর খবর আমরা দেখেছি। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আমাদের হতবাক করেছে। Continue reading

এত সহজেই খাবার অপচয় করি!

একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের কঙ্কালসার দেহ, আরেকদিকে প্লেটভর্তি নষ্ট করা খাবার- দুটি বিপরীত চিত্র। উভয়টিই পৃথিবীর নিদারুণ বাস্তবতা। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী বছরে প্রায় ১০০ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়। জাতিসংঘ পরিবেশবিষয়ক সংস্থা-ইউএনইপির ‘ফুড ওয়াস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২১’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতি ঘরে বছরে গড়ে ৬৫ কেজি খাবারের অপচয় হয়। এমনকি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকান ও জাপানিদের তুলনায় বাংলাদেশিরা বেশি খাবার অপচয় করে। খাদ্যশস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ঘরে তোলা এবং থালা পর্যন্ত নানাভাবে খাবারের অপচয় হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চলে যেন খাবার নষ্টের প্রতিযোগিতা। মনে রাখা দরকার, খাবার অপচয় করা কোনো ফ্যাশন নয় বরং এটি অমানবিকতা এবং অপরাধ।

খাবারসহ জীবন ধারণের যে কোনো বিষয়ে অপচয় না করার তাগিদ রয়েছে বিভিন্নভাবে। কেবল খাবার নষ্ট করাই নয়; সময় এবং জীবনের উপায়-উপকরণেও সব ধরনের অপচয় পরিত্যাজ্য। এর মধ্যে খাবার অপচয়ের বিষয়টি একেবারে ভিন্ন। কেউ যদি মনে করেন, আরেকজনের বিয়েতে এসেছেন; খেতে যেমন বারণ নেই, তেমনি ফেলতেও সমস্যা নেই; বিষয়টি তা নয়। এটা মনে করা যাবে না, অপচয়ের ফলে নিজের টাকা খরচ হচ্ছে না। আমাদের মানসপটে যদি আফ্রিকার ক্ষুধার্ত শিশুর চেহারা ভেসে ওঠে কিংবা না খেয়ে থাকা ইয়েমেনের কোনো মানুষের কথা; তখন কেমন লাগবে? বেশি দূরে যাওয়া নয়, হয়তো আমাদের পাশের কোনো ঘরেই সবার ঠিকমতো তিন বেলা খাবার জোটে না। তাহলে কীভাবে খাবার অপচয় সম্ভব! খাবারের যদি কথা বলার সামর্থ্য থাকত, জানি না নষ্ট হওয়া খাবারগুলো ঠিক কী বলত! যে খাবার এত মজা করে খাওয়া হচ্ছে, অর্ধেক খাওয়ার পরই যদি বলা হয়, আর পারছি না, তাহলে এ খাবার যাবে কোথায়? কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সুস্বাদু খাবারটা পরিণত হলো স্রেফ ঝুটায়? আপনি কতটুকু খেতে পারবেন, খাবার নেওয়ার আগেই তা চিন্তা করা উচিত।

রেফ্রিজারেটর তথা ফ্রিজ আসায় খাবার অপচয় অনেকখানি রোধ করা সহজ হয়েছে; এটা সত্য। কিন্তু সদিচ্ছা না থাকলে ওই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রটি কিছুই করতে পারবে না। আবার ইচ্ছা থাকলে ফ্রিজ ছাড়াও খাবার সংরক্ষণ করা অসম্ভব নয়। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি, কীভাবে আমাদের মা-দাদিরা ফ্রিজ ছাড়া খাবার সংরক্ষণ করতেন। অপচয় বন্ধে সদিচ্ছাই যখন প্রধান, তখন ধনী কী, আর গরিবই বা কী? জাতিসংঘের পরিসংখ্যানে আমরা দেখছি, উন্নত দেশগুলোতে যত খাবার অপচয় হয়, তার চেয়ে বেশি অপচয় হয় নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। অপচয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান, এর পর নেপাল। Continue reading

বিসিএসের চেয়ে জীবন অনেক বড়-ড. মোহাম্মদ সাদিক

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক সিভিল সার্ভিসে বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। তিনি শিক্ষা সচিব ও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ড. সাদিক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ‘সিলেটি নাগরী লিপির’ ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার জন্ম ১৯৫৫ সালে সুনামগঞ্জে। লেখালেখিতে সক্রিয় ড. মোহাম্মদ সাদিক ২০১৭ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন

সমকাল: আপনি পিএসসির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আগের তুলনায় যে জনআস্থা ও বিশ্বাস আমরা দেখছি তার কারণ কী বলে আপনি  মনে করেন?

ড. মোহাম্মদ সাদিক: আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টি যারা বাইরে আছেন আপনারা দেখবেন। পিএসসি পরীক্ষা ও ফল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী সুপারিশের কাজ করে। কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য আমাদের বিজ্ঞ সদস্যবৃন্দ, পিএসসির সচিব ও সংশ্নিষ্ট সবাই মিলে আমরা একটি টিম হিসেবে কাজ করেছি। এখানে প্রশ্নকারী, মডারেটর, পরীক্ষক, নিরীক্ষক, পরিদর্শক এবং ভাইভা বোর্ডে যারা থাকেন, সবাই মিলেই কাজটি সম্পন্ন হয়। Continue reading

প্রকল্প ও দিবসনির্ভর সাক্ষরতা

করোনাদুর্যোগের মধ্যেই এবারের সাক্ষরতা দিবসের তাৎপর্য বহুমুখী। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোও বিষয়টি ধরে দিবসটির প্রতিপাদ্য করেছে- ‘কভিড-১৯ সংকট :সাক্ষরতা শিক্ষায় পরিবর্তনশীল শিখন-শেখানো কৌশল এবং শিক্ষাবিদদের ভূমিকা’। অর্থাৎ করোনার নতুন পরিস্থিতিতে সাক্ষরতা শিক্ষায়ও পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখবেন শিক্ষক বা শিক্ষাবিদরা। বলাবাহুল্য, দেশে সাক্ষরতার যতটুকু অর্জন, সেখানে শিক্ষকরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে এসেছেন। আর সাক্ষরতার হার বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবদানই বেশি। রোববার সাক্ষরতা দিবসের সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪.৭ শতাংশ। গত এক বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। সাক্ষরতার হার নিয়ে বেসরকারি তথ্যে অমিল থাকলেও সরকারি হিসাব অনুযায়ীই চার ভাগের এক ভাগ মানুষ এখনও নিরক্ষর।

অথচ সরকার ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এরপর অর্ধযুগ পার হলেও আমরা শতভাগের কাছে যেতে পরিনি। এখানে ব্যর্থতা প্রকল্পের। সাক্ষরতা সংক্রান্ত দুটি বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হলেও সেগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন হয়নি বলেই আমরা পিছিয়ে পড়েছি। অবশ্য সাক্ষরতার যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, সেগুলোর ফলও সন্তোষজনক নয়। ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষকে সাক্ষর করতে ২০১৪ সালে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া চলমান ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের (৬৪ জেলা)’ ফলও হতাশাজনক। ৩ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে, চার বছরের এই প্রকল্প দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ছয় বছর করলেও সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে সংসদীয় কমিটি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ একে ‘ব্যর্থ’ প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংসদীয় কমিটি প্রকল্পটির মেয়াদ আর না বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন নেওয়ার পরামর্শ দিলেও মুজিববর্ষের কথা বলে প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয় দফায় ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেখার বিষয়, এই প্রকল্প আর কতদূর যায়। Continue reading

সামাজিক চাপ ও ব্যক্তির আত্মহনন

করোনার মধ্যে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল শিখিয়েছে উদযাপনে পরিমিতিবোধ

 

করোনা সংক্রমণের মধ্যেই এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো। আর তাই এর প্রভাবও এতে স্পষ্ট। বলা বাহুল্য, সংখ্যার বিচারে তুলনামূলকভাবে শিক্ষার্থীরা এবার ভালো ফল করেছে। পাসের হার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ ৫। ফলে আপাতদৃষ্টিতে গ্রেড কিংবা পাসের হারে করোনার তেমন প্রভাব পড়েনি। যদিও সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, শিক্ষকরা উদারভাবে খাতা দেখেছেন। উদারতার এ নমুনা দেশে নতুন নয়। তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এবারের ফল নতুুন কিছু দৃশ্যপট সামনে এনেছে।

দুই.
করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকেই অনলাইনে তার ফল জানতে পেরেছে। আগে দেখা যেত, যে কোনো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভালো গ্রেডধারীরা একসঙ্গে আনন্দ-উল্লাস করত। অনেক সময় এ উদযাপনে অতিরঞ্জনও লক্ষণীয়। দুই আঙুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে শিক্ষার্থীরা যে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে, তা অনেকেই দৃষ্টিকটু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটা সত্য যে, কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করেছে সেটা নিশ্চয়ই তার সাফল্য। তাতে উদযাপন থাকতেই পারে। তবে সেটি হওয়া চাই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে এবং তা যেন অন্যকে আঘাত না দেয়। যে শিক্ষার্থীটি কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পারেনি তারই সহপাঠীর এমন উদযাপনে সে কষ্ট পেতে পারে। Continue reading

মায়া

মেয়েটি আমার যত বড় হচ্ছে মায়া মনে হচ্ছে ততই বাড়ছে

গতকাল আমার পিতৃত্বের এক বছর পূর্ণ হলো আলহামদুলিল্লাহ। ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীতে আসার পর থেকেই কেবল নয়, বরং তারও প্রায় নয় মাস আগ থেকে আমাদের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েটি। সন্তান-মা-বাবাকে ঘিরে পৃথিবীর যে মায়ার জগৎ এতদিন তা কেবল সন্তান হিসেবেই দেখে আসছিলাম এখন সেটা বাবা হিসেবেও আবিষ্কারের চেষ্টা করছি।
প্রথম প্রথম মেয়েটিকে দেখতাম বিস্ময়ের সঙ্গে। নবজাতকের কান্না, হাসি, আড়মােড় ভাঙ্গার মধ্যে কতটা শিল্প, কতটা সৌন্দর্য রয়েছে মেয়ে না হলে তা দেখার সৌভাগ্য হয়তো হতো না। মেয়েটি যখন আরেকটু বড় হচ্ছে শিশুর কাজ দেখারও সুযোগ হচ্ছে, এক সেকেন্ডের জন্যও তার ফুরসত নেই; যতক্ষণ সজাগ থাকবে, ততক্ষণ ব্যস্ত। এই এটা ধরবে, ওটা ধরবে। এক হাতে না পারলে দুই হাতে, এক হাত ছাড়ালে আরেক হাতে। মেয়েটার কাজ দেখে আমরা হয়রান হই। মেয়েটি যখন কথা বলা শিখছে ওর মুখ থেকে ফুটছে- আম্মা, বাব্বা, দাদ্দা, নান্না। মুখ থেকে একটা কথা বেরুবে সেটাই বলতে থাকবে। এক নাগাড়ে, এ নিশ্বাসে, একই শব্দ সুন্দর করে, দরদ দিয়ে এভাবে কাউকে বলতে দেখিনি।
মেয়েটি যতই একটু করে বড় হচ্ছে ততই চিনছে বাবাকে। বাবা হিসেবে সেটা আমার জন্য যেমন আনন্দের তেমনি মধুর বিড়ম্বনারও। বাবাকে সবসময় সামনে থাকা চাই। মেয়েকে রেখে বাইরে বেরুবার অধিকার, অফিসে যাওযার সুযোগ নেই। আহা প্রতিদিন অফিসের জন্য বেরুতে মেয়েকে যেভাবে বাসায় রেখে আসতে হয় সেটা এক কষ্টের ব্যাপার। অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি কিন্তু মেয়েটি কোলে এসে বসে আছে। এমনভাবে বসবে যে, তাকে ছাড়া সহজ নয়। Continue reading

ইফা, তুমি পথ হারাইয়াছ?

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন জাতি সোচ্চার, যখন সরকারি নানা অফিসে শোভা পাচ্ছে ‘আমি এবং আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’; সেখানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা) ও এর মহাপরিচালকের (ডিজি) নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত ঘোষণা করলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি কতটা দুর্নীতিমুক্ত, সেটি আমরা জানি না। তবে এটা অন্তত অনুধাবন করা যায়, দুর্নীতিমুক্ত করতে প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিদের সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু যেখানে গোড়ায় পচন ধরে, অর্থাৎ খোদ প্রতিষ্ঠানপ্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত হন, অনিয়ম ও স্বেচ্চাচারিতায় বেপরোয়া হন, সেখানে গোটা প্রতিষ্ঠানই তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ভুলে একজনের আজ্ঞাবহ ও সেবাদাসে পরিণত হতে বাধ্য। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ঠিক তা-ই হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির জন্য ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ উক্তিই যথার্থ।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামের সমুন্নত আদর্শ প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে। এমন মহান উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন যখন দুর্নীতির জন্য টানা খবর হয়, তার চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে! রোববার সমকালের প্রতিবেদন ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশনে জেঁকে বসেছে দুর্নীতি’ পড়ে যে কেউ অবাক হবেন; হেন কোনো প্রকল্প নেই যেসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়নি। এক টাকা, দুই টাকা নয়; প্রতিষ্ঠানটিতে অডিট করে প্রায় আটশ’ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের নেতৃত্বে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ। ১০ বছর ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। পুরো সময়টির তদন্তে দেখা গেছে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, বেশি ব্যয়, অপচয়সহ তিনি নানা অপকর্ম করেছেন। সমকালের প্রতিবেদন বলছে, নিরীক্ষায় প্রথমে ১৩২টি অনিয়ম ও ৯০০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়। পরে ৩৬টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়। ডিজি ১০০ কোটি টাকার বেশি সরকারি কোষাগারে ফেরতও দেন।

এত বড় দুর্নীতি যে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার বিষয়। আর সেখানে যদি একজনই অভিযুক্ত হন, তাহলে তো কথাই নেই। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দুর্নীতিতে তোলপাড়ের কারণ কেবল প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, ব্যক্তির কারণেই নয় বরং কারণটি খোদ প্রতিষ্ঠানের ধরন-ধারণের জন্যও। প্রতিষ্ঠানটির নামের সঙ্গেই রয়েছে ইসলাম। Continue reading

‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নিরক্ষর মানুষদের সাক্ষরতার কাজে নিয়োজিত করা যায়

আজকের সাক্ষরতা দিবসের প্রাক্কালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফে আমরা জানছি, দেশে বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ। এখনও প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। অর্থাৎ শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনে বাকি এ সংখ্যাটি। এর সঙ্গে আরেকটি হিসাবও জরুরি। এ জন্য একটু পেছনে ফিরতে হবে। ঠিক ১০ বছর আগে আমরা দেখেছি, তখন সরকার ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের অঙ্গীকার করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত জোরেশোরে এ প্রচারণা চলে। তখন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ওয়েবসাইট খুললেই লেখা উঠত- ‘উই আর কমিটেড টু এনশিউর হান্ড্রেড পার্সেন্ট লিটারেসি বাই টোয়েন্টিফোরটিন।’ কিন্তু ২০১২ সালের সাক্ষরতা দিবসের দু’দিন পর আমরা জানতে পারলাম- সে সময়ের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, ‘২০১৪ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের ঘোষণা থাকলেও সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা একটি ট্র্যাকে পৌঁছাতে চাই।’ হঠাৎ করে সম্ভব না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে আমি ওই সময় সাক্ষরতা দিবসে (৮ সেপ্টেম্বর ২০১২) সমকালেই লিখেছিলাম, ‘দুটি প্রকল্পের পোস্টমর্টেম এবং শতভাগ সাক্ষরতা’। সে সময় সরকার দুটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রথমটি ৬১ জেলার নিরক্ষরদের সাক্ষর করার জন্য, ব্যয় ২ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা আর অন্যটি এর বাইরের তিনটি পার্বত্য জেলার জন্য, ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি। সে সময় টাকার অভাব দেখিয়ে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করেনি সরকার। আর ওই দুটি প্রকল্প যখন বাতিল হলো, তখন শতভাগ সাক্ষরতার স্লোগানও শেষ হলো। তার মানে শতভাগ সাক্ষরতার স্লোগান ছিল প্রকল্পসর্বস্ব। আরও আশ্চর্যের বিষয়, সে সময় দুটি প্রকল্পের স্থানে গ্রহণ করা হয় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প। সেই প্রকল্পই মেয়াদ বাড়িয়ে এখনও চলছে। গত এক বছরে তার সুফল হলো সাক্ষরতার হার বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। এভাবে করে ২০১৪ সাল থেকে পিছিয়ে আসা ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ আমাদের কবে অর্জিত হবে? Continue reading

অপরাধবোধ এবং এক নিষিদ্ধ গল্প!


উপন্যাস- গল্পটি শুনতে চেয়ো না
লেখক- সোহেল নওরোজ,
প্রকাশক- দেশ পাবলিকেশন্স
প্রচ্ছদ- সোহানুর রহমান অনন্ত

নাই কাজ তো খই ভাজ। লেখক বলছেন, না খইও ভাজা যাবে না; কারণ এটাও একটা কাজ। অলসভাবে শুয়ে থাকাটাই হতে পারে কাজহীন অবস্থা কাটানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। যদিও এর সঙ্গে ‘গল্পটি শুনতে চেয়ো না’ উপন্যাসের মূল ‘গল্পের’ কোনো সম্পর্ক নাই। তাহলে গল্পটা কী। যে গল্পটি শুনতে চাওয়া বারণ? যে গল্পটি হাফিজুল হক তার মেয়ে অর্পাকেও শুনতে দেননি। গল্পটা ঠিকই সোহেল নওরোজ পাঠকদের শুনিয়েছেন। কিন্তু সব পাঠকই যে তা ধরতে পারবে, সে নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। লেখকের মুনশিয়ানা বোধহয় এখানেই।

মোচড়ের পর মোচড় আর মন খারাপ করে দেওয়া উপন্যাসটি শুরু হয়েছে হাফিজুল আর মেয়ে অর্পার কথোপকথন দিয়ে। হাফিজুল হক লেখক মানুষ। একটি উপন্যাস তিনি দাঁড় করাচ্ছেন। উপন্যাসের চরিত্রগুলো লেখার সঙ্গে সঙ্গে হাতেও আঁকছেন। প্রথমে এসেছে এতিমখানার নাহিদ আর অনিকেত। মেধাবী নাহিদ অনিকেতের খপ্পরে পড়ে সামান্য অন্যায়ের শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে এক রাতে বেরিয়ে পড়ে অজানার উদ্দেশে। তারা ওঠে অনিকেতের পরিচিত এক কাকির বাসায়। সেখানে নাহিদকে চিঠি দিয়ে আবারও অনিকেতের নিরুদ্দেশ যাত্রা। এরপর নাহিদকে কেন্দ্র করে আগায় উপন্যাসটি। যেখানে নাহিদের এগিয়ে চলার প্রেরণা ছিল অনিকেতের চিঠি। Continue reading

প্রভাব-বলয়

দার্শনিক ও লেখক রুশো বলেছেন, মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মায়; কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত। এ শৃঙ্খল কত প্রকার ও কী কী তা জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রত্যেকে টের পায়। শিশু থাকতেই এটা ধরা যাবে না, ওটা করা যাবে না, ওর সঙ্গে মেশা যাবে না ইত্যাদি নানা বাধা। মানুষ যত বড় হয় তার শৃঙ্খলও বাড়ে। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানা শৃঙ্খল। বিশেষ করে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো কেউ চাইলেই এককভাবে নিতে পারে না। সেখানে অন্যের প্রভাব থাকবেই। আপনি চাইছেন এ স্কুলে পড়তে আর অভিভাবকের পছন্দ অন্য স্কুল। আপনি পড়তে চান ইঞ্জিনিয়ারিং; বাসা থেকে বলছে, ডাক্তারি পড়তে হবে। এভাবেই আমরা সবাই জড়িয়ে পড়ি এক শৃঙ্খলে। যে শৃঙ্খল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভাঙার নয়।

একজন রাষ্ট্রনায়কও কি একক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? তার চারপাশে যারা থাকেন, তারা তার মতকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার দেশের মানুষও সিদ্ধান্তে প্রভাবক ভূমিকা পালন করতে পারে। দলের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান তো একক সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন না; কারণ অন্যের কথা তাকে শুনতে হয়। পরিবারের কর্তার সিদ্ধান্তে প্রভাব থাকে কর্ত্রীর, সন্তান-সন্ততির। আপনার জীবন-সংসার ভালো লাগছে না, সব ছেড়ে একদিকে পালিয়ে যেতে চান। কিন্তু তা এতটা সহজ নয়। প্রিয় মানুষগুলোর কথা আপনি কয়েকবার ভাববেন।

বলা বাহুল্য, প্রভাব-বলয় পরিবার, সমাজ, দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত। মার্কিন প্রভাব, রাশিয়ান প্রভাব, চীনা প্রভাব, ভারতের প্রভাব-বলয়ের কথা আমরা জানি। Continue reading