Tag Archives: অমর্ত্য সেন

উপমহাদেশ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী বিভ্রান্তি

শিল্পীর আঁকা পলাশি যুদ্ধের চিত্র

মূল: অমর্ত্য সেন

ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরু হয় ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের মাধ্যমে। যুদ্ধটা ছিল সংক্ষিপ্ত, প্রত্যুষে শুরু হয়ে সূর্যাস্তের ক্ষণে শেষ। পলাশি অবস্থিত কলকাতা ও মুর্শিদাবাদের মাঝামাঝি পর্যায়ে। আম্রকাননে অনুষ্ঠিত ওই যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী নবাব সিরাজউদ্দৌলা সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয় এবং তার বাহিনীকে পরাজিত করে। তারপর ব্রিটিশরা প্রায় দুইশ বছর রাজত্ব করে। এত দীর্ঘ সময়ে তারা ভারতে কী অর্জন করে? আর তাদের ব্যর্থতাই বা কী?

১৯৪০-এর দশকে আমি যখন পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রাগ্রসর স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন এসব প্রশ্ন আমাদের আলোচনায় এসেছিল। এখনও সে প্রশ্নের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। কেবল এ কারণে নয় যে, ব্রিটিশ রাজত্ব প্রায়ই বৈশ্বিক সুশাসনের সফলতায় এ আলোচনা সামনে আনে বরং এ কারণেও যে আজ তারা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিষয়টি দেখাতে চায়। কয়েক দশক আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের স্কুলে এসব আলোচনায় জটিল প্রশ্নে বিরক্তই হতাম। আমরা কীভাবে গত শতকের চল্লিশের দশকে চিন্তা করতে পারতাম যে, ভারতে কখনও ব্রিটিশ শাসন ছিল না? ১৭৫৭ সালে যখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শুরু হয় তার সঙ্গে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের যাওয়ার সময়কার ভারতের পার্থক্য ছিল সামান্যই। যদিও একেবারে পরিবর্তন হয়নি তা নয়। কিন্তু পরিবর্তনগুলোর জবাব আমরা কীভাবে দিতে পারি?

অতীতে ভারতের ইতিহাসে বড় অর্জন হলো- দর্শন, গণিত, সাহিত্য, কলা, স্থাপত্য, সংগীত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাষা ও জ্যোতির্বিদ্যা। ঔপনিবেশিক শাসনের আগে ভারতের অর্থনৈতিক অর্জন বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। ভারতের অর্থনৈতিক সম্পদের বিষয়টি অ্যাডাম স্মিথের মতো ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকরাও স্বীকার করেছিলেন। এসব অর্জন সত্ত্বেও ইউরোপের যে অর্জন ছিল, আঠারোশ শতকের মধ্যভাগে ভারত তা থেকে পিছিয়েই ছিল। পিছিয়ে পড়ার ধরন ও তার তাৎপর্য আমাদের স্কুলের বিকেলে বিতর্কের বিষয় ছিল। Continue reading

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে চল্লিশের দশকের সাম্প্রদায়িকতা ফিরিয়ে আনতে চায়-অমর্ত্য সেন

অমর্ত্য সেন নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ। সম্প্রতি তিনি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সঙ্গে অনলাইনে ও পিটিআইর সঙ্গে ই-মেইলে সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন। সেখানে তার বাড়ির সীমানা, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন, বিজেপির রাজনীতি ও ভারতের কৃষক আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার দুটি ঈষৎ সংক্ষেপে ইংরেজি থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আপনার শান্তিনিকেতনের বাড়ি ‘প্রতীচী’র সীমানায় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি ঢুকে গেছে বলে সম্প্রতি অভিযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

অমর্ত্য সেন: আসলে এ ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। তবে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি অর্থনীতির কথা বলতে পারি। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট আমরা দেখছি। এর মধ্যে আমার বাড়ি নিয়ে কী বলব? ৮০ বছর আগে ওই জায়গাটি লিজ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। এখন এসে বলা হচ্ছে, লিজে সমস্যা আছে। লিজের বাইরেও আমার বাবা আরও কিছু প্লট কিনেছিলেন। তারা যে জনসমক্ষে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে, তার আগে আমাকে কোনো চিঠি দেয়নি। আমার সঙ্গে কোনো কথাও বলেনি।

তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, আপনার বাড়ি ‘প্রতীচী’র ব্যাপারে এত বছরেও বিশ্বভারতী কোনো লিগ্যাল নোটিশ বা চিঠি দেয়নি বা কোনোভাবে জানায়নি?

অমর্ত্য সেন: না। আমার বাবা মারা গেলেন। এর পর আমার মা। লিজ নিয়ে তাদের সঙ্গে অনেক আগে কথা হয়েছে। স্বাভাবিক কথাবার্তা। তারা মিডিয়াতে বলেছে, আমি আরও অনেক জমি নিয়েছি। জমির ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই। কারণ এর সব কাগজপত্র রয়েছে। কিন্তু তারা আমার সঙ্গে কথা না বলে মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শান্তিনিকেতনের নিজস্ব ঐতিহ্য ও উপাচার্যের আচরণের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারতাম। কারণ, তিনি পশ্চিমবঙ্গের ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেই দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত হয়েছেন। বিজেপি আমাকে মানুষ হিসেবে নীচু করছে। সত্যটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভালো করেই জানে। সামনে নির্বাচন আসছে। এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবাষ্প ছড়ানোর এজেন্ডা থাকতে পারে। ১৯৪০-এর দশকে আমরা ঢাকা ও কলকাতায় বাংলার সাম্প্রদায়িকতার কদর্য রূপ দেখেছি।

আপনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া দেখেছেন। তিনি আপনাকে সমর্থন করেছেন। এমনকি আপনাকে একটি চিঠিও লিখেছেন।

অমর্ত্য সেন: যারা আমার প্রতি সমবেদনা প্রদর্শন করেছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি আমাকে যে চিঠি দিয়েছেন, তা আমাকে স্পর্শ করেছে। তাকে আমি ধন্যবাদ জানাই। Continue reading

কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ

যদি কর্তৃত্ববাদের আচরণ একই হয়, সেখানে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে অভিন্ন কারণও স্পষ্ট।

লেখক: অমর্ত্য সেন

দার্শনিক এমানুয়েল কান্ট যেমনটা বলেছেন, ‘যে কোনো বিষয়ে কারও মত প্রকাশ্যে তুলে ধরার স্বাধীনতার’ মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, কান্ট এটাও বলেছেন, সমাজই তর্কের সুযোগ প্রায়শ বন্ধ করে দেয়। কখনও কঠোরভাবেই বন্ধ করে। আজকের বিশ্বের একটি দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রবণতা লক্ষণীয়। অপ্রিয় হলেও সত্য, এ তালিকায় আমার দেশ ভারতকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভারতও সেই দুর্ভাগ্যজনক দেশগুলোর অন্যতম।

ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর কয়েক দশক ধরে ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। মানুষ তাদের স্বাধীনতার প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় দেয়। তারা কঠোর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করে সেই স্বাধীনতার প্রতি তাদের সংকল্পও প্রদর্শন করে। উদাহরণস্বরূপ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনের কথা বলা যায়। যে নির্বাচনে স্বৈরাচারী আইন যাকে ‘জরুরি অবস্থা’ বলে ঘোষণা করা হয়, তাকে মানুষ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সরকার দ্রুতই তা মেনে নেয়।

যা হোক, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাধীনতা দৃশ্যত অনেকের ক্ষেত্রেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তারই আলোকে বর্তমান সরকার সেখানে ভিন্ন ধরনের সমাজ গড়তে আগ্রাসী নজির হাজির করছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, যাকে বিস্ময়করভাবে গ্রেপ্তারের প্রয়োজনীয় উপাত্ত হাজির করে ও বিরোধী নেতাদের বন্দি করে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করছে সরকার। এ প্রক্রিয়ার ভেতরে স্বৈরাচারী মনোভাবের বাইরেও চিন্তার গভীর সংশয় রয়েছে। কারণ সরকারের সঙ্গে দ্বিমত মানে রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা কাউকে উৎখাত নয় Continue reading